গ্রন্থিক যুগে ফিরার আহবান বনাম এ-কালের জীবন ও সমাজের প্রতি যৌক্তিক অভিনিবেশ

78 জন পড়েছেন

মানুষ কালের সন্তান। তার নিজ সময়ে বা কালে যা কিছু করার ও মানার প্রয়োজন মনে করে সে তা’ই স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে করতে পারে, কিন্তু যেসব বিষয়ের প্রয়োজন তার জীবনের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়و যেসব কাজের সার্থকতা তার যুক্তির আওতাভুক্ত হয় না, সেগুলো ভয়-ভীতি বা সামাজিক অনুজ্ঞার মাধ্যমে চালিয়ে নিতে বাধ্য করলে সে তাতে বিড়ম্বনার মুখামুখি হয়। সে কখনো মানে, কখনো মানে না, কেননা সে কালের সন্তান, কালের আক্কেল, অভিজ্ঞতা বুঝে – সে ‘একালে’ বসে সে ‘সেকালের’ জীবন যাপন করতে পারে না। আজ প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন ধর্মে এই সমস্যাই লক্ষ্য করা যায়। এই প্রেক্ষিতে এই লেখা।

– এক –

সুদূর অতীতে অনেক ধর্ম ও গ্রন্থ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেগুলোতে কালের রূপ, অভিজ্ঞান ও যুক্তি পরিবাহিত হয়েছে। সেকালের সেই সমাজে আজকের মত শিক্ষা-দীক্ষা ছিল না। গোত্রীয় বাস্তবতায় যুদ্ধংদেহী হুমকি থাকত। সমাজে দাস-দাসীর বেচাকেনা হত। এক প্রতিষ্ঠিত শ্রেণীর বাইরে জীবন কঠোর, নির্মম ছিল। তখন বিশ্ব জগতের জ্ঞান-বিজ্ঞানও আজকের মত ছিল না। অনেক বাস্তবতা কুসংষ্কারপূর্ণ ছিল। অধিকন্তু, যুদ্ধংদেহী বাস্তবতায় বিভিন্ন অঞ্চলের গোত্রীয় ও জাতীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নিজেদের ঐক্য ও সংহতি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হত। ধর্ম ও বিশ্বাস সমাজেরই অংশ বিধায় সমাজের বাস্তবতা সেগুলোতে প্রতিফলিত হয়ে থাকত।

সেকালে এক বিশ্বাসের লোকজন আরেক বিশ্বাসের লোকজনকে ধর্মান্তরিত করত। এতে নিজেদের সংখ্যা ও শক্তি বৃদ্ধি হত। সেদিন ধর্মে ধর্মে হিংসা-বিদ্বেষ লেগেই থাকত। ধর্মের জন্য যুদ্ধ করা হত, পরধর্মের লোকদের প্রতি শত্রুতা (عداوة) ও হিংসা-বিদ্বেষ (بغضاء) রাখা হত। কোন কোন ধর্ম এগুলোকে “আদর্শ” হিসেবে উল্লেখ করত। এগুলো গ্রন্থে পাওয়া যায়।

সেকালে এক ধর্মের লোক আরেক আরেক ধর্মের লোকদেরকে বলতে পারত: আমাদের বিশ্বাসের দিকে এসো, না হলে স্রষ্টা আগুণ দিয়ে পুড়িয়ে তোমাদেরকে কাবাব তৈরি করবেন, কেননা তিনি তোমাদের বিশ্বাসে ও কর্মে সন্তুষ্ট নন। অথবা আমাদের বাণী না মানলে স্রষ্টা গোটা জাতিকে: নারী, শিশু, দুর্বল, আবাল-বৃদ্ধ সবাইকে ম্যাসাকার করে ফেলবেন। তারপর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের নানান ঘটনাকে খোদার আক্রোশ হিসেবে এনে ইনডিস্ক্রিমিনেইট ম্যাসাকারের উদাহরণ টানা হত। তারপর বলা হত অমুক জাতি অভিশপ্ত, অমুক জাতি পথভ্রষ্ট – এসব কথা পঠিত হত, এবাদত আরাধনায় স্মরণ করা হত। এগুলো গ্রন্থে পাওয়া যায়।

ধর্ম গ্রন্থ এক শ্রেণীর বিশ্বাসীকে ‘মানুষ’ হিসাবে আখ্যায়িত করত, এবং যারা এই শ্রেণীর বিশ্বাস গ্রহণ করত না তাদেরকে অনেকটা গালিগালাজের ন্যায় উল্লেখ করতে পারত, জন্তু-জানোয়ার বলতে পারত, অভিশাপ দিত, মন্দ ভাষণে সম্বোধন করত, বা সবগুলোই এদিক সেদিক মিশ্রণে বলে যেত।

সেদিন আত্মসমর্পিত সৈন্যদের হত্যার নির্দেশও গ্রন্থে থেকে থাকত, নারী-পুরুষ ও শিশুদেরকে পণ্য হিসেবে গ্রহণের ভাষণ পাওয়া যেত, বণ্টিত নারীর সাথে যৌনসম্পর্কের বৈধতা পাওয়া যেত, বাজারে নারীর বেচা-কেনা পাওয়া যেত। বিভিন্ন ধর্মে এসবের উপর ধর্মতত্ত্বও গড়ে উঠেছে। এসব নিয়ে ব্যাখ্যার পর ব্যাখ্যার স্তূপ রচিত হয়েছে, কিন্তু এগুলো ব্যাখ্যায় মুছে যায় না: যাকিছু সার্বজনীন নয়, তার উপর ব্যাখ্যা জড়ালে সার্বজনীন হয়ে যায় না। যা কালীন তা কালীনই থেকে যায়।

সেদিনের অনেক গোঁজামিলকে বিশ্বাসের সাথে গলাধঃকরণ করার অনুজ্ঞা হিসেবেও পাওয়া যায়। হয়ত ‘ফ্রি উইল’ ও ‘প্রিডেস্টিনেশন’ বিষয়কে বিভিন্ন গোত্রের ধারণা থেকে নিয়ে খিচুড়ি তৈরি হয়েছে। তারপর বিশ্বাসের অংশ বানানো হয়েছে। কখনো স্রষ্টার ক্ষমতা দেখাতে মানুষের সকল কাজই স্রষ্টারই কাজ বলে দেখানো হত, আবার যখন মন্দ কাজের উল্লেখ হত তখন বলা হত এগুলোতে স্রষ্টার হাত নেই –এগুলো মানুষেরই কাজ।

গ্রন্থে হয়ত এক ঘটনায় দেখা যাবে স্রষ্টা সুবিচারক, তিনি একজনের পাপের জন্য আরেকজনকে হত্যা করেন না বা একজনের পাপের বোঝা অন্যের ঘাড়ে চাপান না, তারপর অন্য ঘটনায় দেখা যাবে তিনি কিছু লোকের (নেতাদের) অপরাধের জন্য গোটা জাতিকে ম্যাসাকার করেন। এক জায়গায় পাওয়া যাবে তিনি কাউকে পাপ করার আগেই তার পূর্বজ্ঞান মতে শাস্তি দেন না, আবার পরের গল্পে দেখা যাবে তিনি সেটাই করেন।

সেকালের নানান বাণীর ‘জেনারেলাইজেশন’ ভয়ঙ্কর রূপেও পাওয়া যায়। প্রতিপক্ষের প্রতি অভিশাপ, তির্যা, মন্দ ভাষণ –এগুলো সাধারণ বিষয় ছিল এবং এসবের অনেককিছু কালান্তরিত হতে দেখা যায়।

পূর্বেকার অনেক গ্রন্থে হিংস্রতা পাওয়া যায়। হ্যাঁ, ব্যাখ্যার মাধ্যমে সেগুলোর উপর পানি ঢালা হতে দেখা যায়, কিন্তু নানান ঘটনাপ্রবাহে মাঝে মাঝে তোষের অনল থেকে বেরিয়ে অগ্নিরূপ ধারণ করতেও দেখা যায়।

এখন সেকালের সেই গ্রন্থসমূহে ফিরে যাবার আহবান সেইসব জটিলতায় জড়িয়ে পড়ার নামান্তর। আজ গ্রন্থ যাদেরকে পশু, অধম, মুক, বধির বলবে তারাই হয়ত আপনার আশে-পাশের সমাজ। যাকে অভিশাপ দেবে সে হয়ত আপনার প্রতিবেশি বা সেবক। এসব বক্তব্য বিব্রতিকর হয়ে দেখা দিতে পারে। আজ সেইসব স্থানে, সেইসব গল্পে, সেইসব উপমায় ফিরে যাবার মানি হল সেইসব বিষয়ের যথার্থতা চোখ বুজে মেনে নেয়া বা সেই বাণীর স্থানকে গ্রহণ করে, সেই রিমিটের সীমার ভিতরে থেকে কথা বলা। তাছাড়া, এই ফিরে যাওয়া, ক্ষেত্র বিশেষে, সেইসব কালীন স্থানে ও যুগের যুদ্ধাদির প্রেক্ষিতগত বক্তব্য ও ভাষার দিকে ফিরে যাওয়া।

-দুই-

আজকের সামাজিক বাস্তবতা সেকালের গ্রন্থিক বাস্তবতা থেকে ভিন্ন। আজকের সমাজ নানান জাতী, নানান ধর্ম, নানান বিশ্বাসের লোক নিয়ে গঠিত। কী ব্যবসায়, কী কাজে কর্মে, কী স্কুল বা হাসপাতালে একে অন্যের গ্রাহক, বা ক্লায়েন্ট, বা সেবাদানকারী। এই সমাজ সকলকে নিয়ে এক মিশ্রিত সমাজ। এখানে নিজ বিশ্বাসের বাইরের লোকদেরকে শত্রুর আকিদা পোষণ, নিজেদেরকে উত্তম (superior) আর অন্যদেরকে অধম ভাবা, ধর্ম বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে বৈষম্য সৃষ্টি –এগুলো মানানসই হয় না। এখানে সাম্য, সুনীতি, বৈষম্যহীনতা, মানবিক মূল্যবোধের সমাজ গঠন –এগুলোই চলনসই। আজ যদি এই মানবতাবোধ ও সহিষ্ণু-বাস্তবতা ত্যাগ করে সেই পূর্বকালীন হিংসা-বিদ্বেষের জগতে ও সেইসব বাণীতে ফিরে যাবার আহ্বান করা হয়, তবে তা কোন সমাজের জন্য, কোন ধরণের মানবিক কল্যাণ বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। আজকে একথা বলা যাবে না যে তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের বিশ্বাসে না এসেছ, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের সাথে আমাদের শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ লেগেই থাকবে।

আজ একটি দিরহামের এক তৃতীয়াংশ মূল্যের কিছু চুরির অপরাধে কারো হাত কাটা যাবে না, কেউ পারস্পারিক প্রেম ও সম্মতির ভিত্তিতে শারীরিক সম্পর্ক গড়লে তাদেরকে মাটিতে দেহের অর্ধেক অংশ গেড়ে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা যাবে না। এগুলোর কাল চলে গিয়েছে।

-তিন-

পূর্বকালের সমাজ মানুষেরই সমাজ ছিল, সেখানে ভাল-মন্দ সবই ছিল। আজকের সমাজও মানুষের সমাজ। এখানেও ভাল-মন্দ আছে। কিন্তু কালের সাথে জীবনের অবস্থান ভিন্ন হয়েছে গিয়েছে। তাই সবাই নিজেদের কালে নিজেদের জীবন যাপন করাটাই উত্তম। একালে বসে সেকালের গ্রন্থিক বাস্তবতায় বা নির্দেশিত অনুজ্ঞায় ফিরে যাওয়ার আহবান না করে একালেই স্রষ্টাতে বিশ্বাস করা যেতে পারে, ভাল কাজ করা যেতে পারে, সমাজকে সুন্দরের দিকে আহবান করা যেতে পারে, নৈতিক জীবনের কথা বলা যেতে পারে, মানুষে মানুষে পারস্পারিক ভালোবাসা ও সৌহার্দের সম্পর্ক গড়ে তোলা যেতে পারে –এই বিপুল সম্ভাবনা একালেও রয়েছে। স্রষ্টা সবদিনই ছিলেন, এখনো আছেন। ভাল কাজ, ভাল আচরণ, আধ্যাত্মিক বিকাশ –এগুলো কোন এক কালে, কোন এক অতীতে তালাবদ্ধ হয়ে যায় নি।

আজকের বাস্তবতা এটাও দেখিয়ে যাচ্ছে যে বিশ্ব এখন আগের মত ভৌগলীকভাবে বিভক্ত নয়। আজ অর্থবহভাবে সবাই সবাইকে ধারণ করতে হবে – এই পথে চলা শিখতে হবে। আজ সব ধরনের ফ্যাসিজম, সব ধরনের সুপিরিয়রিটি, সব ধরনের হিংসা-বিদ্বেষের বাণী বর্জন করতে হবে। সকল অযৌক্তিকতাকে ‘না’ বলতে হবে।

আজ আপনার জীবনের গল্প অতীত-জীবনের গল্প থেকে অনেক ভিন্ন। যে জাতি প্রাকৃতিক দুর্যোগে চরম ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সেটা দেখিয়ে খোদাকে ম্যাসাকারকারী দেখানো অবশ্যই সকলের যুক্তিতে খাপ খাবে না। হাজার হাজার বছর আগের প্রাকৃতিক সঠিক তথ্য যেখানে অনুপস্থিত সেখানে খোদাকে ম্যাসারকারী দেখানো কী বিশ্বাসের অনুকূল হবে? এভাবে অতীতের অসংখ্য গল্প অসংখ্য সমস্যা হাজির করবে। আজকের দাবী হয়ত কালেরই দাবী, আজকের জীবনের দাবী, আজকের সমাজের দাবী। সামাজিক বিবর্তন খুব দ্রুতই রূপ লাভ করছে। কেউ বাস্তবতার প্রতি বিমুখ হয়ে পড়লে বাস্তবতা তার বহমান স্রোত থেকে থেমে যাবে না – সময় ও স্রোত কারো অপেক্ষা করে না।

_____________

অন্যান্য লেখা:

অতীতের টানা-পুড়নে বর্তমানের বাপ-দশা

সাম্য, বৈষম্য ও রাজ্য কাহিনী

রাসূলুল্লাহর জগত –দুনিয়া ও আখেরাত

Have Women Gained Dignity, Equality and Freedom?

স্তন ও মাথা অনাবৃত দাসীদের পরিবেশ

ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা

প্রোটো ধর্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম

দেওয়ানবাগী ও সামাজিক সত্যের এপিঠ ওপিঠ

স্রষ্টা ও সৃষ্টির একক সম্পর্ক

Facebook Comments

78 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.