অতীতের টানা-পুড়নে বর্তমানের বাপ-দশা

80 জন পড়েছেন

-এক-

মানুষের অতীতে অনেক যুগ, অনেক কাল ছিল  যখন তারা কচি কচি মেয়েদেরকে বিবাহ দিত,  স্বামীরা এমন মেয়েদেরকে তালাকও দিত,  অথচ তখনও তাদের মাসিক ঋতুও আসত না,  অর্থাৎ তখনো তারা শারীরিকভাবে স্বামীর ঘর করার  উপযুক্ত হত না। আজকের সমাজ এটাকে বেআইনি করেছে। অতীতের প্রথা থেকে উত্তরণ করেছে। তাদের জ্ঞান উন্নত হয়েছে। শুধু তাই নয়, অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের সাথে যৌন আবেগের  শারীরিক প্রকাশ বা শারীরিকভাবে জড়ানোকে পিডোফিলিক (paedophilic) অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করেছে, এবং এর জন্য আইনানুগ শাস্তির ব্যবস্থাও রেখেছে।

অতীতের অনেক সমাজে যৌন হয়রানি, যৌন নির্যাতন, বা অপব্যবহার – যেমন কোন মেয়েকে/নারীকে ধরে চুমু দেয়া,  তার গায়ে হাত দেয়া, তাকে জড়িয়ে ধরা ইত্যাদি তেমন কোন বড় অপরাধ হিসাবে গণ্য হত না,  বরং ধার্মিক লোক হলে দৈনন্দিন জীবনের ধর্মীয় কাজ সমাপনের সাথে সাথে সেই ‘ছোটখাটো’ অপরাধ মিটিয়ে যাবার বিশ্বাস করত। কোন শাস্তি তো ছিলই না। এই মন্দ আচরণের ফলে একজন নারীর মনের কষ্ট, তার মানসিক যন্ত্রণার বিষয়টি ধর্ম বিবেচনায় নিত না।

কিছু সমাজ ধর্ষণকেও  খুব বড় অপরাধ হিসেবে দেখত না। একান্তভাবে কেউ ধরা পড়লে, এবং ধর্ষিতা সম্ভ্রান্ত পরিবারের হলে, প্রচলিত মোহরানার পরিমাণ (common amount of dowry) টাকা দিয়ে সমস্যা মিটিয়ে নিত, আর ধর্ষিতা অন্য লোকের অধিকারভুক্ত দাসী-বাদী হলে, অতি সামান্য পরিমাণ কিছু দিয়েই সারত।

নারীকে পুরুষের সমান বিবেচনা করা হত না। তার জ্ঞান পুরুষের অর্ধেক মনে করা হত।  তাই পিতার সম্পত্তিতে মেয়েদের উত্তরাধিকার ছেলেদের অর্ধেক হত, কোন কোন সমাজে সেই অধিকার মোটেই পেত না। তারপর নারীর সাক্ষ্যদান পুরুষের অর্ধেক বিবেচিত হত অর্থাৎ আদালতে দুইজন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সাক্ষের সমান হত।

পুরুষ ব্যক্তি তার স্ত্রীকে পেটাতে পারত। এর জন্য কোন শাস্তির ধারণা ও ব্যবস্থা ছিল না। 

– দুই –

অতীত সমাজের প্রথা নিয়ে নানান ব্যাখ্যা রয়েছে। এর একটি হচ্ছে জীবন দার্শনিক ও সংস্কৃতিক (যা দীর্ঘ বিধায় ব্লগ আলোচনায় আনা মুস্কিল), আর অন্যটি হচ্ছে আর্থ-সামাজিক। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে সেদিনের সামাজিক বিশ্বাস ও প্রথার সাথে সমাজের অর্থ-ব্যবস্থা ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের ঘননিবিষ্ট সম্পর্ক ছিল যার ভিত্তিতে সেই অর্থব্যবস্থায় নারী ও পুরুষের শ্রমের বিভাজন গড়ে উঠত। আধুনিক ভাষায় উৎপাদনের প্রক্রিয়াগত চাহিদা ও পদ্ধতি সম্পর্কের ভিত্তি ও সামাজিক রূপের প্রভাব বিস্তার করত। কালের উন্নতির সাথে সাথে আর্থসামাজিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে, তাই আর্থ-উন্নয়নের ময়দানে শ্রমের সম্পর্কও ভিন্ন হয়েছে। তাই আজকের অর্থ-ব্যবস্থায় নারী পুরুষ সমানভাবে নিজেদের শ্রম নিয়োগ করে। নারী যেমন বেঁচে থাকার জন্য পুরুষ নির্ভরশীল নয়, পুরুষও তেমনি নারী নির্ভরশীল নয়। এই আর্থসামাজিক প্যারাডাইমের প্রভাব মানুষের চিন্তায়, তাদের আদর্শে, তাদের আচার-আচরণে এবং সর্বোপরি তাদের ভাষিক  ব্যবহারে রূপায়িত হয়েছে। আজ তারা সেই সুদূর অতীতের সমাজ নয়, সেকালের মানুষও নয়, কিন্তু পূর্বকালীন কিছু ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিকতা সেই পুরাকালের আচার-আচরণ, সামাজিক প্রথা ইত্যাদিকে স্রষ্টার নামে ও তার পবিত্রতার সংশ্লিষ্টতায় জড়িয়ে এবং মানুষকে পরকালীন মুক্তির ভয়-ভীতি দেখিয়ে সমাজে চালিয়ে নিচ্ছে। যেসব শিক্ষার্থী বাল্য বয়স থেকে ক্লাসিকাল ও মধ্যযুগীয় স্টাডিজ সেন্টারগুলোতে অধ্যয়ন করতে প্রবেশ করেন, তারা ধর্মীয় ধারণায় সেখানে যান, এবং বয়স্ক হয়ে যখন বেরিয়ে আসেন, তখন সেই ক্লাসিক্যাল ও মধ্যযুগীয় আচার-আচরণ, প্রথা ও সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমকেই তাদের জীবিকা নির্বাহের একান্ত অবলম্বন হিসাবে পান। এই চেইন থেকে থেকে বের হবার অন্য কোন সুযোগ থাকে না এবং অনেকের সেই ইচ্ছাও হয়না, কেননা তারা সেই পূর্ববর্তী কালীন ধ্যান ধারণা ও প্রথাকে  বিশ্বমানবের সার্বজনীন ও চিরন্তন প্রথা হিসাবে পালনীয় মনে করেন।

– তিন –

সেই হাজার হাজার বছর আগে মানুষ জানত না যে মানুষের প্রজনন প্রক্রিয়ায় নারীর ডিম্ব কাজ করে। তারা ভাবত পুরুষের যেভাবে বীর্য রয়েছে নারীরও তেমনি। নারীর গর্ভাশয়ে বীর্য একত্রিত হয়ে প্রজননের সূত্রপাত হলে পুরুষের বীর্য যদি নারীর বীর্যের উপর বলবত হত তবে অনাগত শিশু পুরুষের দৃশ্যগত রূপের বৈশিষ্ট্য পেত, এবং নারীর বীর্য পুরুষের বীর্যের উপর বলবত হলে নারীর দৃশ্যগত রূপ পেত,  কেননা তখন ডিম্বের  ধারণাই ছিল না, এবং এই প্রক্রিয়ায় নারী-পুরুষের ক্রোমোজোমের হারের সংশ্লিষ্টতার ধারণা ছিল না। এই ধারণা থাকারও কথা ছিল না।

প্রায় কয়েক হাজার বছর আগ থেকেই মানুষ সাত আসমান সাত জমিনের ধারণা রাখত, যেমন একটি তাবুর ভিতরে বা আশে-পাশে আরও তাবুর অভিজ্ঞতার আকারে। তারপর এই সাত আসমান ও সাত জমিনের একটি সূর্য ও একটি চন্দ্র আলো দান করে যাচ্ছে বলে বিশ্বাস করত। তারা প্রত্যেক বস্তুতে সজ্ঞার ধারণা রাখত। দৈত্য, ফিরিশতা, জিন, ভূত, প্রেত  ইত্যাদির প্রভাবে প্রভাবিত হওয়ার ধারণা রাখত। আসমান, জমিন, পশুপাখি, গাছ, তৃণলতা, রোগ-বালাই ইত্যাদিকে সেই সজ্ঞার ধারণায় রাখত। এদের মন্দ প্রভাব থেকে বাঁচতে নিজেদের ভাষায় ছন্দবদ্ধ এবং ছন্দহীন বাক্য রচনা করে ঝাড়ফুঁক দিত: তিন ফুঁক, পাঁচ ফুঁক, সাত ফুঁক – এমনকি হাজার হাজার ফুঁকও দিত, যাতে করে বাক্যগুলোর অর্থ বুঝে সেই সজ্ঞাত-সত্তাগুলো সরে পড়ে বা প্রভাব অপরারিত হয়।

– চার –

আজ অতীত চলে গিয়েছে, অতীতের সমাজও চলে গিয়েছে। আজ সেকালের বাস্তবতা নেই, সেই আর্থসামাজিকতা নেই, সেই প্রথার প্রেক্ষিত ও আচার-আচরণ নেই। অতীতের মানুষ তাদের বাস্তবতায় তাদের জীবনযাপন করেছে। আজ আমাদের বাস্তবতায় আমাদের জীবন যাপন করতে হবে। আমাদের জগতে বসে তাদের জীবনযাপন করার উপায় নেই। তাদের যুগের নিয়ম প্রথাকে আমাদের জন্য উপযোগী করতে প্রাণান্তকর ব্যাখ্যাবাজির দরকার নেই। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে তার সমাজে, তার যুগে, তার আপন বাস্তবতায় জীবন যাপন করার আক্কেল বুদ্ধি সহকারে সৃষ্টি করেছেন। এটা শুধু মানুষের জন্য নয় বরং  যাবতীয় জীবজন্তু, পশুপাখির বেলায়ও।

তারপর, পরবর্তীদের জন্য যদি পূর্ববর্তীদের অনুকরণ ভালো জিনিস হয়, তবে আমরাও আমাদের যুগে আমাদের ধ্যান-ধারণা মোতাবেক উত্তম কাজ করব যাতে করে তা পরবর্তীদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। আবার, পরবর্তীরা কেনইবা আমাদেরকে অনুকরণ করতে হবে, কেননা তারা তো তাদের আপন বাস্তবতায় নিজেদের কালের জন্য উত্তম কাজ ও আদর্শ স্থাপন করবে। সুতরাং এদিক থেকে কোন এক অতীতের সাথে পরবর্তী মানব সমাজের জ্ঞান ও মুক্তি তালাবদ্ধ করে নেয়া যুক্তি-সংগত দেখায় না। আর সৃষ্টিকর্তাও সকল কালের ও সমাজের ভিন্ন বাস্তবতা, আর্থসামাজিক ভিন্নতা, চিন্তার বিবর্তন ও উন্নয়ন ইত্যাদিকে উপেক্ষা করে কোন এক অতীত কাল ও সমাজকে ‘চিরন্তন’ হিসেবে ধারণ করার কোন অনুজ্ঞা মানুষের উপর চাপিয়ে দেবেন, এবং এটিকেই তাদের পরকালীন মুক্তির চাবিকাঠি বানিয়ে দেবেন, এমন ধারণা যুক্তির আওতাভুক্ত হয় না।

– পাঁচ-

আজ বুঝতে হবে যে ভাল-মন্দ কেবল অতীতের লোকই বুঝেছিল এবং সেই অতীত ছাড়া বর্তমানের লোক ভাল-মন্দ বুঝার সমর্থ রাখে না – এমন ধারণা ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট পরকালীন ভয়-ভীতি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষা-ব্যবস্থার ধারা বেয়ে বর্তমানের সমাজে এসেছে। আজকের সমাজ তাই এই ধারণাকে পুনর্বিবেচনা ও পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।

Facebook Comments

80 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.