রাসূলুল্লাহর জগত –দুনিয়া ও আখেরাত

130 জন পড়েছেন

দু-জাহান, ক্ষমতা,গণিমত, পৌরুষ, নারী, সুগন্ধি ইত্যাদি ও আখেরাত

ভূমিকা:

সকল সমাজে ধর্ম থাকে, ধর্মে নানান স্তর থাকে। অনেকের জন্য এইসব স্তর অতিক্রম করার সময়, সুযোগ ও অধ্যয়নের স্কীল আসে না। মানুষ তাদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন এবং ধর্মের ব্যাপারে সাধারণ বইপুস্তক আর ধর্মীয় লোকের বয়ান ব্যতীত অন্যত্র বিচরণের করার মওকা আসে না।

সকল ধর্মই তাদের আপন আপন বিশ্বাসীদের কাছে সত্য ধর্ম, এবং এক ধর্মের কাছে অন্য ধর্ম মিথ্যা ধর্ম, কারণ বিশ্বাসী যা সত্য বলে বিশ্বাস করেন, তা’ই তার জন্য সত্য। ধর্ম আসে আমাদের চিন্তা ঘিরে। চিন্তায় মানসিকতা কাজ করে। সেখানে জটিলতাও থাকতে পারে। তবে ধর্মের মূল জিনিস হয় খোদাতে বিশ্বাস আর ভাল কাজ: হিংসা-বিদ্বেষ ত্যাগ, আত্ম-উন্নয়নের চর্চা ইত্যাদি। এগুলোই মানুষের মূল ধর্ম, বা মৌলিক স্তর। এর পরে আরও অনেক স্তর পাওয়া যায়। সেই স্তরগুলো ঘিরে আসে কালীন বিষয় যেমন গোত্রীয়, রাজনৈতিক, ক্ষমতা-কেন্দ্রিক, যুগের আদর্শ, যুগের বিশ্বাস, সমাজ, সংস্কৃতি ইত্যাদি।

এখানে চেষ্টা করা হয়েছে কোন ব্যাখ্যার প্রাচীর না গড়তে। কেননা ব্যাখ্যা মানি অন্যের চশমা পরে অন্যের রঙে কিছু দেখা। মূলত পাঠকের দেখাই আসল দেখা। এই সামান্য ভূমিকাই হয়ত যথেষ্ট।

-দুনিয়া-

[১] রাজ্য, ক্ষমতা ও জিযিয়া: আবু তালিবের মৃত্যুর সময় মক্কার নেতাগণ শেষ বারের মত একটি সমাধান চান। তারা চান তার ভাতিজা মুহাম্মাদ (সা) যেন তাহাদের ধর্ম ও দেব-দেবীর অবমাননা থেকে বিরত হন। আবু তালিব তার ভাতিজাকে ডেকে এই বিষয়ে বললে তিনি উত্তর দেন: ‘হে চাচা, আমি তাদের কাছ থেকে কেবল একটি ‘বাক্যই’ চাই। তারা যদি এই বাক্য উচ্চারণ করেন, তবে গোটা আরব জগত তাদের অধীনস্থ হবে, এবং অনারবগণ তাদেরকে জিযিয়া দেবে (ইবন কাসির, মুখতাসার তাফসীর ইবন কাসীর, বাইরূত: দারুল কোরানিল কারীম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৯৭-৯৮)। এই বাক্য ছিল ‘লা-ইলাহার’ কলিমা পড়ে তার নবুয়ত মেনে নেবার বাক্য, কিন্তু নেতাগণ এই কাজ করতে রাজি হননি।

[২] যুদ্ধ ও ধর্ম প্রতিষ্ঠা। হাদিস। ইবন ওমর থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘আমি নির্দেশিত হয়েছি যে আমি মানুষের সাথে যুদ্ধ করে যাব যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দিয়েছে যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, এবং নামাজ কায়েম করেছে ও যাকাত দিয়েছে। তারা যদি এই কাজগুলো করে, তবে তাদের জান-মাল আমার হাত থেকে রক্ষা পাবে, তবে ইসলামের বিধান ছাড়া। (বুখারি শরিফ)।

আরবি টেক্সট عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَيُقِيمُوا الصَّلاَةَ، وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلاَّ بِحَقِّ الإِسْلاَمِ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ ‏”‏‏.‏

[৩] বল্লমের ছায়াতলে রিজেক ও ধর্ম না মানলে অবমাননা ও অপমান। হাদিস। ইবন ওমর থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা) বলেছেন, ‘আমি, এই কালে, তলোয়ারসহ প্রেরিত হয়েছি যাতে কেবল এক আল্লাহরই ইবাদত করা হয় যার কোন শরীক নেই, এবং আমার রিজেক আমার বল্লমের ছায়াতলে স্থাপন করা হয়েছে, আর যারা আমার নির্দেশ (কর্তৃত্ব/রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা) এর বিরোধিতা করবে, তাদের জন্য অবমাননা ও অপমান স্থাপন করা হয়েছে; আর যারা অপর সমাজের বেশভূষা, চাল-চলন গ্রহণ করবে, তারা সেই সমাজের লোক বলে গণ্য হবে।’ (সহিহ, মুসনাদে ইমাম আহমদ, আল-আলবানী (ইরওয়াউল গালিল), আয-যাহাবি (সিয়ার আ‘লামিন নাবালা) এবং অন্যান্য)।

আরবি টেক্সটعن ابن عمر – رضي الله عنهما أنَّ النبيَّ (صلعم) قال: « بُعِثتُ بين يديِ السَّاعةِ بالسَّيفِ حتَّى يُعبَدَ اللهُ وحدَه ، لا شريكَ له ، وجُعِل رزقي تحت ظلِّ رُمحي ، وجُعِل الذُّلُّ والصَّغارُ على من خالف أمري ، ومن تشبَّه بقومٍ فهو منهم

(৪) হাদিস। বর্ণনায় আব্দুল্লাহ বিন আওফা। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “তোমরা জেনে রেখো, জান্নাত তলোয়ারের ছায়াতলেই অবস্থিত” (বুখারি শরিফ)।

আরবি টেক্সট  عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَبِي أَوْفَى ـ رضى الله عنهما ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ وَاعْلَمُوا أَنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ ظِلاَلِ السُّيُوفِ ‏”‏‏.‏ تَابَعَهُ الأُوَيْسِيُّ عَنِ ابْنِ أَبِي الزِّنَادِ عَنْ مُوسَى بْنِ عُقْبَةَ‏.‏

[৫] ত্রাস (ভয়ভীতি) দিয়ে সাহায্য। হাদিস। আবু হুরাইরা বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘আমাকে ভাষার ভাণ্ডার দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে; আর আমাকে ত্রাস (ভয়ভীতি) দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে। আমি যখন ঘুমন্ত ছিলাম তখন আমার কাছে এই বিশ্বের সকল ভাণ্ডারের চাবিগুলো আনা হয়েছে এবং আমার হাতে দেয়া হয়েছে’ (বুখারি শরিফ)।

আরবি টেক্সটأَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ، قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏ “‏ بُعِثْتُ بِجَوَامِعِ الْكَلِمِ، وَنُصِرْتُ بِالرُّعْبِ، وَبَيْنَا أَنَا نَائِمٌ أُتِيتُ بِمَفَاتِيحِ خَزَائِنِ الأَرْضِ، فَوُضِعَتْ فِي يَدِي ‏”‏‏.

[৬] ইয়াহুদিদেরকে মদিনা থেকে বহিষ্কার। হাদিস। ওমর (রা) বর্ণনা করেন যে তিনি শুনেছেন যে রাসূলুল্লাহকে (সা) বলেছেন, “আমি অবশ্যই ইয়াহুদী ও খৃষ্টিয়ানদেরকে আরব উপদীপ থেকে বহিস্কার করে দেব এবং এখানে কেবল মুসলমান ছাড়া কাউকে রাখব না।” (মুসলিম শরিফ। সহিহ হাদিস)।

আরবি টেক্সটوَعَنْ عُمَرَ ‏- رضى الله عنه ‏- أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اَللَّهِ ‏- صلى الله عليه وسلم ‏-يَقُولُ: { ” لَأَخْرِجَنَّ اَلْيَهُودَ وَالنَّصَارَى مِنْ جَزِيرَةِ اَلْعَرَبِ, حَتَّى لَا أَدَعَ إِلَّا مُسْلِماً” } رَوَاهُ مُسْلِمٌ

[৭] হাদিস। আসিম বিন ওমর বিন কাতাদাহ বর্ণিত। বদর যুদ্ধে (মক্কার) কোরাইশদের পরাজয় ঘটার পরে, নবী (সা) মদিনায় ফিরলেন। তিনি বনি-কাইনুকাহ নামক ইয়াহুদী গোত্রকে ‘কাইনুকা-বাজারে’ একত্রিত করলেন। তারপর বললেন, “হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়, আল্লাহ কোরাইশদের উপর যে পরিণতি ঘটিয়েছেন সেই পরিণতি তোমাদের উপর ঘটিয়ে দেবার আগেই তোমরা ইসলাম গ্রহণ করে নাও।” তারা বলল, ‘হে মুহাম্মাদ, আপনি আত্ম-প্রবঞ্চিত হবেন না এজন্য যে আপনি কোরাইশদের কিছু লোককে হত্যা করে ফেলেছেন। তারা অপর্যাপ্ত একটিই দল ছিল যাদের যুদ্ধ কৌশলও জানা ছিল না। আপনি যদি আমাদের সাথে যুদ্ধ করেন, তবে বুঝতে পারবেন যে আমরা যুদ্ধ জানা লোক। আপনি আসলে আমাদের মত কারো মুখামুখি হন নি।’ (তফসিরে ইবন কাসির, ৩:১২ আয়াতের ব্যাখ্যায়)।

আরবি টেক্সট  ذكر محمد بن إسحاق بن يسار عن عاصم بن عمر بن قتادة، أن رسول الله صلى الله عليه وسلم لما أصاب من أهل بدر ما أصاب، ورجع إلى المدينة، جمع اليهود في سوق بني قينقاع، وقال ” يا معشر يهود أسلموا قبل أن يصيبكم الله بما أصاب قريشاً ” فقالوا يا محمد لا يغرنك من نفسك أن قتلت نفراً من قريش كانوا أغماراً لا يعرفون القتال، إنك والله لو قاتلتنا لعرفت أنا نحن الناس، وأنك لم تلق مثلنا.

নোটস:

(ক) পরবর্তীতে বানু কাইনুকাহ গোত্রকে তাড়িয়ে দেয়া হয়, তাদের সয়-সম্পত্তি কেড়ে নেয়া হয়। একই দশা বানু নাদীরকেও বরণ করতে হয়। আর বানু কুরাইযাহকে ধ্বংস করে দেয়া হয়।

(খ) ইয়াহুদি, খৃষ্টিয়ান ও পৌত্তলিকদেরকে জাজিরাতুল আরব থেকে বহিস্কার করার হাদিসসমূহ: [এই লিঙ্কে ক্লিক করলে অনেক হাদিস দেখা যাবে]।

এই জগত দুই জনেরই: আল্লাহ ও তার রাসূলের

[৮] জমিন আল্লাহর ও রাসূলের। হাদিস। আবু হুরাইরা বর্ণিত। ‘আমরা একসময় যখন মসজিদে বসে আছি তখন রাসূলুল্লাহ (সা) এসে বললেন, “চলো ইয়াদীদের ওখানে যাই।” আমরা সবাই তার সাথে বেরিয়ে পড়লাম। আমরা যখন ইয়াহুদীদের (শিক্ষাকেন্দ্র) মিদ্রাসে উপনীত হলাম তখন তিনি দাঁড়িয়ে তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, “হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়, তোমরা মুসলমান হও এবং নিরাপত্তা লাভ কর।” তারা বলল, “হে আবুল কাসেম, আপনি আপনার (ধর্মের) দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন।” তখন তিনি বললেন, “আমি ওটাই চাই -তোমরা মুসলমান হও এবং নিরাপত্তা লাভ কর।” তারা বলল, “হে আবুল কাসেম, আপনি আপনার (ধর্মের) দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন।” তিনি বললেন, ““আমি ওটাই চাই”, তিনি তা তৃতীয় বার বললেন, তারপর বললেন, “তোমরা জেনে রাখো এই জগত আল্লাহ ও তার রাসূলের এবং আমি তোমাদেরকে এই ভূমি থেকে তাড়িয়ে দিতে চাই (নির্বাসন করতে চাই)। সুতরাং তোমাদের যাদের মালিকানায় যা কিছু আছে তারা যেন তা বিক্রি করে দেয়। নতুবা জেনে রাখো, এই জগত আল্লাহ ও তার রাসূলের।” (বুখারি শরিফ)।

আরবি টেক্সটعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ بَيْنَا نَحْنُ فِي الْمَسْجِدِ خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏”‏ انْطَلِقُوا إِلَى يَهُودَ ‏”‏‏.‏ فَخَرَجْنَا مَعَهُ حَتَّى جِئْنَا بَيْتَ الْمِدْرَاسِ فَقَامَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَنَادَاهُمْ فَقَالَ ‏”‏ يَا مَعْشَرَ يَهُودَ أَسْلِمُوا تَسْلَمُوا ‏”‏‏.‏ فَقَالُوا بَلَّغْتَ يَا أَبَا الْقَاسِمِ‏.‏ قَالَ فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ ذَلِكَ أُرِيدُ أَسْلِمُوا تَسْلَمُوا ‏”‏‏.‏ فَقَالُوا قَدْ بَلَّغْتَ يَا أَبَا الْقَاسِمِ‏.‏ فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ ذَلِكَ أُرِيدُ ‏”‏‏.‏ ثُمَّ قَالَهَا الثَّالِثَةَ فَقَالَ ‏”‏ اعْلَمُوا أَنَّمَا الأَرْضُ لِلَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِنِّي أُرِيدُ أَنْ أُجْلِيَكُمْ مِنْ هَذِهِ الأَرْضِ، فَمَنْ وَجَدَ مِنْكُمْ بِمَالِهِ شَيْئًا فَلْيَبِعْهُ، وَإِلاَّ فَاعْلَمُوا أَنَّمَا الأَرْضُ لِلَّهِ وَرَسُولِهِ ‏”‏‏

[৯] ইসলামের রাজ্য কোরেশ বংশের হাতে থাকবে। হাদিস। হযরত মোয়াবিয়া বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘[রাষ্ট্র-পরিচালনার/খেলাফতের] এই দায়িত্ব কোরাইশ বংশের হাতে থাকবে। যতদিন পর্যন্ত তারা শাসন কায়েম রাখবে [বা ‘দীন’ প্রতিষ্ঠিত রাখবে], ততদিন পর্যন্ত কেউ তাদের বিরোদ্ধারণ করতে পারবে না। যদি কেউ তা করে, তবে আল্লাহ তাকে মুখের উপর উপুড় করে দেবেন (লাঞ্জিত করবেন)। (মোয়াবিয়া/আল-বুখারি)।

আরবি টেক্সটإِنَّ هَذَا الأَمْرَ فِي قُرَيْشٍ، لاَ يُعَادِيهِمْ أَحَدٌ إِلاَّ كَبَّهُ اللَّهُ عَلَى وَجْهِهِ، مَا أَقَامُوا الدِّينَ

[১০] নবীকে (সা) পাঁচটি জিনিস দেয়া হয় যা অন্য নবীদেরকে দেয়া হয় নি। হাদিস। জাবির বিন আব্দুল্লাহ বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘আমাকে পাঁচটি জিনিস দেওয়া হয়েছে যা আমার পূর্বে কাউকে (কোন নবীকে) দেওয়া হয় নি: আমাকে এক মাসের রাস্তার দূরত্ব-সীমা পর্যন্ত  ত্রাস (ভয়ভীতি) দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে (অর্থাৎ সেই দূরত্ব পর্যন্ত আমার ভয়ে মানুষ সন্ত্রস্ত থাকে); দুনিয়াকে (দুনিয়ার মাটিকে) আমার জন্য সেজদার স্থান করা হয়েছে ও পবিত্র করা হয়েছে, সুতরাং যেকোনো ব্যক্তি নামাজের সময় হলে সে নামাজ আদায় করে নিতে পারে; গণিমতসমূহ (যুদ্ধলব্ধ নারী, পুরুষ, শিশু, পশু, স্থাবর অস্থাবর সম্পদ -সবকিছু) আমার জন্য হালাল করে দেওয়া হয়েছে যা আমার পূর্বে কাউকে (কোন নবীকে) দেওয়া হয় নি; আমাকে শাফায়াত দান করা হয়েছে; আগের নবীদেরকে বিশেষ করে তাদের কওমের কাছে পাঠানো হত, কিন্তু আমাকে সকল মানুষের জন্য পাঠানো হয়েছে’ (বুখারি শরিফ)।

আরবি টেক্সটجَابِرُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ أُعْطِيتُ خَمْسًا لَمْ يُعْطَهُنَّ أَحَدٌ قَبْلِي نُصِرْتُ بِالرُّعْبِ مَسِيرَةَ شَهْرٍ، وَجُعِلَتْ لِيَ الأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا، فَأَيُّمَا رَجُلٍ مِنْ أُمَّتِي أَدْرَكَتْهُ الصَّلاَةُ فَلْيُصَلِّ، وَأُحِلَّتْ لِيَ الْمَغَانِمُ وَلَمْ تَحِلَّ لأَحَدٍ قَبْلِي، وَأُعْطِيتُ الشَّفَاعَةَ، وَكَانَ النَّبِيُّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ خَاصَّةً، وَبُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ عَامَّةً ‏”‏‏.‏

দুনিয়ার তিনটি জিনিস নবীর (সা) প্রিয় ছিল

[১১] নারী, সুগন্ধি ও খাবার। হাদিস। আনাস (রা) বলেন নবী করিম (সা) বলেছেন: ‘আমি তোমাদের জগতে আকর্ষিত হয়েছি নারীর প্রতি ও সুগন্ধের প্রতি। আমি খাবার ও পানীয় বস্তুর ব্যাপারে ধৈর্য্য ধরতে পারি, কিন্তু নারীর ব্যাপারে পারি না।’ (কিতাব আয-যুহদ/ইমাম আহমদ)।    

আরবি টেক্সটيوسف بن عطية الصفَّار، عن ثابت عن أنس، عن النبي- صلى الله عليه وسلم -:” حُبب إليّ من دنياكم النساء والطيب ، أصبر عن الطعام والشراب ولا أصبر  عنهن. (كتاب الزهد للإمام أحمد).

[১২] হাদিস। আয়েশা (রা) বলেন, ‘নবীকে (সা) দুনিয়ার ৩টি জিনিস আকর্ষণ করত: সুগন্ধ দ্রব্য, নারী ও খাবার। তিনি দুটি পেয়ে গিয়েছেন, কিন্তু একটি পান নি। তিনি নারী ও সুগন্ধ দ্রব্য পেয়েছেন, কিন্তু খাবার অর্জন করেন নি। (ইবন সাদ, আত-তাকাকাত আল-কুবরা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৯৮ [অনলাইন], এবং ইমাম আহমদের ‘কিতাব আয-যুহদে’ও আনাস (রা) থেকে বর্ণিত।)। 

আরবি টেক্সট عن عائشة رضي الله تعالى عنها قالت كان يعجب نبي الله صلى الله عليه وسلم من الدنيا ثلاثة أشياء الطيب والنساء والطعام فأصاب اثنتين ولم يصب واحدة أصاب النساء والطيب ولم يصب الطعام  الطبقات الكبرى – محمد بن سعد – ج ١ – الصفحة ٣٩٨،  ما في كتاب الزهد للإمام أحمد عن أنس رضى الله عنه

আধুনিক অর্থের ভায়াগ্রা বা এমন জিনিস

[১৩] হাদিস। বর্ণনায় সাফয়ান বিন সালিম। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘জিবরিল একটি পাত্র নিয়ে আমার সাথে দেখা করলেন। আমি সেই পাত্র থেকে খেলাম এবং আমাকে “কাফিত” দেয়া হল যা চল্লিশ জন পুরুষের যৌন-শক্তি’র তুল্য (ইবন সা‘দ, আত-তাবাকাত আল-কুবরা, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৯২, এবং জামিউস সুন্নাহ ও শুরুহুহা (جامع السنة و شروحها)

আরবি টেক্সটأَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُمَرَ ، حَدَّثَنِي أُسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ اللَّيْثِيُّ ، عَنْ صَفْوَانَ بْنِ سُلَيْمٍ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : لَقِيَنِي جِبْرِيلُ بِقِدْرٍ فَأَكَلْتُ مِنْهَا وَأُعْطِيتُ الْكَفِيتُ قُوَّةُ أَرْبَعِينَ رَجُلًا فِي الْجِمَاعِ

কাফিতের বয়ান

[১৪] হাদিস। আনাস বর্ণিত: রাসূল (সা) এক গোসলের সাথে তার স্ত্রীদের সাথে সঙ্গম করতেন (অর্থাৎ শেষ জনের পরে এক গোসল করতেন) (মুসলিম শরিফ)।

আরবি টেক্সটعَنْ أَنَسٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَطُوفُ عَلَى نِسَائِهِ بِغُسْلٍ وَاحِدٍ ‏.‏

[১৫] হাদিস। আনাস বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সা) একই রাতে তার নয় জন স্ত্রীর সাথে যেতেন (সঙ্গম করতেন)। বুখারি শরিফ।

আরবি টেক্সটعَنْ أَنَسٍ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَطُوفُ عَلَى نِسَائِهِ فِي لَيْلَةٍ وَاحِدَةٍ، وَلَهُ تِسْعُ نِسْوَةٍ‏.‏

[১৬] হাদিস। জাবির বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সা) একজন নারীকে দেখলেন। তারপর তিনি তার স্ত্রী যাইনাবের কাছে গেলেন। তখন যাইনাব তার চামড়া সংষ্কার-কর্মে লিপ্ত ছিলেন (চামড়া নরম করছিলেন)। রাসূলুল্লাহ তার সাথে তার ‘প্রয়োজন’ মেটালেন। তারপর তিনি তার সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বের হলেন এবং বললেন: নিশ্চয় নারী শয়তানের রূপ ধরে আসে এবং শয়তানের রূপ ধরে যায়। সুতরাং তোমাদের কেউ যখন কোন নারীর দেখা পায় তখন সে যেন তার স্ত্রীর কাছে যায়। নিশ্চয় তা তার মনের মধ্যে যা রয়েছে তা দূর করে দেবে (মুসলিম শরিফ)।

আরবি টেক্সটعَنْ جَابِرٍأَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم رَأَى امْرَأَةً فَأَتَى امْرَأَتَهُ زَيْنَبَ وَهْىَ تَمْعَسُ مَنِيئَةً لَهَا فَقَضَى حَاجَتَهُ ثُمَّ خَرَجَ إِلَى أَصْحَابِهِ فَقَالَ إِنَّ الْمَرْأَةَ تُقْبِلُ فِي صُورَةِ شَيْطَانٍ وَتُدْبِرُ فِي صُورَةِ شَيْطَانٍ فَإِذَا أَبْصَرَ أَحَدُكُمُ امْرَأَةً فَلْيَأْتِ أَهْلَهُ فَإِنَّ ذَلِكَ يَرُدُّ مَا فِي نَفْسِهِ

নবী সুলাইমানকে (আ) যদি ‘কাফিত’ দেয়া হয়ে থাকে তবে সেটার মাত্রা হয়ত অনেকগুণ বেশি ছিল

[১৭] হাদিস। বর্ণনায় আবু হুরাইরাহ। রাসূল (সা) বলেছেন, দাউদ-পুত্র সুলাইমান বললেন, ‘আজ রাতে আমি আমার ১০০ জন স্ত্রীর সাথে মিলন করব এবং প্রত্যেক স্ত্রীই একজন একজন পুত্র সন্তান প্রসব করবে এবং সে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করিবে।’ একজন ফেরেশতা বললেন, ‘আপনি ইনশাল্লাহ বলুন।’ তিনি বললেন না –ভুলে গেলেন। তারপর সকল স্ত্রীর সাথে মিলন করলেন। কিন্তু (পরে) কেবল একজন স্ত্রী একটি অপূর্ণাঙ্গ, অর্ধ-আদম-শিশু ব্যতীত আর কেহই প্রসব করলেন না। যদি তিনি ইনশাল্লাহ বলতেন, তা হলে তিনি ব্যর্থ হতেন না। (বুখারি শরিফ)।

আরবি টেক্সটعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ ‏”‏ قَالَ سُلَيْمَانُ بْنُ دَاوُدَ ـ عَلَيْهِمَا السَّلاَمُ ـ لأَطُوفَنَّ اللَّيْلَةَ بِمِائَةِ امْرَأَةٍ، تَلِدُ كُلُّ امْرَأَةٍ غُلاَمًا، يُقَاتِلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، فَقَالَ لَهُ الْمَلَكُ قُلْ إِنْ شَاءَ اللَّهُ‏.‏ فَلَمْ يَقُلْ وَنَسِيَ، فَأَطَافَ بِهِنَّ، وَلَمْ تَلِدْ مِنْهُنَّ إِلاَّ امْرَأَةٌ نِصْفَ إِنْسَانٍ ‏”‏‏.‏ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لَوْ قَالَ إِنْ شَاءَ اللَّهُ لَمْ يَحْنَثْ، وَكَانَ أَرْجَى لِحَاجَتِهِ ‏

পরকালে কি আরশের উপর দুইজন উপবিষ্ট থাকবেন: আল্লাহ ও তার রাসূল (সা)?
আল্লাহ মুহাম্মাদকে (সা) তার আরশে বসাবেন –মাজম‘ আল-ফাতাওয়া

[১৮] “শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া (র) বলেন, আল্লাহর রেজামন্দ-প্রাপ্ত আলিমগণ ও তার মকবুল ওলিগণ বর্ণনা করেন: মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (সা) তার প্রভু, তার সাথে, তার আরশে বসাবেন। এটা মুহাম্মাদ বিন ফাদিল লাইস থেকে, লাইস মুজাহিদ থেকে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন: “সম্ভবত, আপনার প্রতিপালক আপনাকে মাকামে মাহমুদে পৌঁছাবেন” (১৭:৭৯) এবং এটা বিভিন্ন উৎসের প্রেক্ষিত থেকে মারফু হিসাবে ও গাইর-মারফু হিসাবে বর্ণনা করেন, [মারফু হচ্ছে সেই বর্ণনা যা সাহাবার মাধ্যমে রাসূল পর্যন্ত পৌঁছে]” (মাজমু‘ আল-ফাতাওয়া ৪/৩৭৪)।

আরবি টেক্সটيجلش الله محمدا (صلعم) على عرشه – مجموع الفتاوى قال شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله: ” حدث العلماء المرضيون وأولياؤه المقبولون: أن محمدا رسول الله صلى الله عليه وسلم يجلسه ربه على العرش معه ، روى ذلك محمد بن فضيل عن ليث عن مجاهد؛ في تفسير: عسى أن يبعثك ربك مقاما محمودا وذكر ذلك من وجوه أخرى مرفوعة وغير مرفوعة. “مجموع الفتاوى”(4/ 374).

রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহর সাথে যে আরশে বসবেন সেটার সাইজ একটু অনুধাবন করা যাক। প্রথমে কুরসির সাইজ এবং পরে আরশের সাইজ, আরশ সবচেয়ে বড় আর কুরসি হচ্ছে দুই পা রাখার স্থান (والكرسيُّ موضعُ القدميْنِ)।

[১৯] কুরসির সাইজ। হাদিস। ইবন আব্বাস বলেন, নবীকে (সা) এই আয়াতের অর্থ জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: ‘তার কুরসি আসমানমূহ ও জমিনে বিস্তৃত হয়ে আছে” (২:২৫৫)। তিনি বললেন, ‘তার কুরসি হচ্ছে তার দুই পা রাখার স্থান। আর তিনি ছাড়া তার আরশ (সীমা) বুঝার কুদরত কারো নাই।’ (২:২৫৫ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবন কাসিরের তফসিরে উদ্ধৃত।)

আরবি টেক্সটعن ابن عباس، قال سئل النبي صلى الله عليه وسلم عن قول الله عز وجل { وَسِعَ كُرْسِيُّهُ ٱلسَّمَـٰوَاتِ وَٱلأَرْضَ }؟ قال ” كرسيه موضع قدميه، والعرش لا يقدر قدره إلا الله عز وجل “

[২০] হাদিস। ইবন যাইদ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘কুরসির মোকাবেলায় সাত আসমান হচ্ছে যেন সাতটি দিরহাম (বা দিরহাম চিহ্ন) কোন বড় এক ঢালের মধ্যে বিক্ষিপ্ত -এই তুলনায়।’

আরবি টেক্সট ابن زيد حدثني أبي قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ” ما السموات السبع في الكرسي إلا كدراهم سبعة ألقيت في ترس”

আরশ ও কুরসি সাইজের তুলনা

[২১] হাদিস। আবু যর গিফারি বর্ণিত। রাসূল (সা) বলেছেন, “আরশের মধ্যে (অর্থাৎ তুলনায়) কুরসি হচ্ছে একটি লোহার আংটির মত যা দুনিয়ার কোন বড় মরুভূমিতে নিক্ষেপ করলে তা যেমন হয় (অর্থাৎ সেই মরুভূমির তুলনায় আংটিটির যে নগণ্য স্থান হয়) সেরূপ” (হাদিস সহিহ, মুহাদ্দিস আল-আলবানি, শারহুত তাহাওয়িয়্যাহ (شرح الطحاوية)। আত-তাবারি তার তফসিরেও এটা উল্লেখ করেছেন)।

আরবি টেক্সটما الكرسيُّ في العرشِ إلَّا كَحلقةٍ من حديدٍ أُلْقيَت بينَ ظَهْري فلاةٍ منَ الأرضِ الراوي : أبو ذر الغفاري | المحدث : الألباني | المصدر : شرح الطحاوية | الصفحة أو الرقم : 279 | خلاصة حكم المحدث : صحيح | التخريج :أخرجه الطبري في ((التفسير)) (5794)

সারাংশ: ভূমিকায় বলা হয়েছে যে ব্যাখ্যা মানি অন্যের চশমা পরে অন্যের রঙে কিছু দেখা। আমরা তাই এখানে আমাদের ব্যাখ্যা টানব না। যারা পাঠ করতে জানেন, তারা নিশ্চয় আমাদের ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী নন।

অন্যান্য আনুষঙ্গিক পোস্ট:

[১] সাম্য, বৈষম্য ও রাজ্য কাহিনী

[২] Have Women Gained Dignity, Equality and Freedom?

[৩] স্তন ও মাথা অনাবৃত দাসীদের পরিবেশ

[৪] প্রোটো ধর্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম

[৫] স্রষ্টা ও সৃষ্টির একক সম্পর্ক

[৬] এনলাইটনমেন্ট: গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা

[৭] ইসলাম বিদ্বেষ ও ইসলাম সমালোচনা

[৮] দেওয়ানবাগী ও সামাজিক সত্যের এপিঠ ওপিঠ

Facebook Comments

130 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.