ইসলাম বিদ্বেষ ও ইসলাম সমালোচনা

267 জন পড়েছেন

মুসলিম মানসে ইসলাম বিদ্বেষ (hatred) ও ইসলাম সমালোচনা (criticism) এখনও স্পষ্ট হয়নি – আমি বৃহত্তর মানস-এর কথা বলছি, অতি অল্প সংখ্যকের নয়। কেউ দালিলিক ভিত্তিতে নৈর্ব্যক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করলেও, যেহেতু তা ইসলামের প্রশংসা ও গ্লোরিফিকেশনের ক্যাটাগরিতে পড়ে না, এবং যেহেতু মুসলিম মানস এ দুটি বৈশিষ্ট্যের বাইরে কথা বলতে বা শুনতে ঐতিহাসিকভাবে মোটেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেনি, (বরং মুহাম্মাদ (সা) ও কোরানের সমালোচককে তারা শক্তি-সুযোগের আয়ত্তে  পেলে সর্বদাই হত্যা করেছে), তাই ঐতিহাসিক ধারায় এই সমালোচনাকে তারা বিদ্বেষ হিসেবে দেখে থাকেন।

অনেকে আজ ইসলাম বিদ্বেষের সাথে আরেকটি পরিভাষা প্রচার করেন। সেটি হচ্ছে ইসলামোফোবিয়া (ইসলাম ভীতি)। ইসলামের প্রাথমিক কালের ইতিহাস ও আজকের বিশ্বে সংঘটিত অনেক ভয়াবহ কাণ্ড দেখে অনেক মানুষ ইসলামকে ভয় করে।  ইসলামোফোবিয়া পরিভাষায় দেখানো হয় যে তাদের এই ভয় আসলে সঠিক নয় এটা তাদের মনের একটি ভীতি মাত্র।

ইসলামের কোন বিষয় নিয়ে কেউ  সমালোচনা করলে তাকে বিদ্বেষী বলা, জন্তু-জানোয়ার বলা, ভাষিক আক্রমণ করা, গালাগালি করা এসবের মূল কী হতে পারে পারে? আমরা মনে করি এর কারণ হতে পারে ইসলামের প্রাথমিক সৌর্স ((কোরান, হাদিস, ইসলামের প্রাথমিক কালের ইতিহাস যেমন সিরাতে ইবন হিশাম, বা তাবাকাত ইবন সাদ, বা ইবন জরির তাবারির ‘তারিখ’, বা ইবন কাসিরের ‘আস সিরাহ আন নবুয়্যাহ’ (বিদায়াহ নিহায়ার এক অংশ), বা হালাবির ‘আস সিরাহ আল হালাবিয়াহ’, বা এ জাতীয় বই-পুস্তক)) না পড়ে কেবল প্রশংসা ও গ্লোরি-কীর্তনে প্রশিক্ষিতদের ব্যাখ্যা-বয়ানের বই-পুস্তক পড়া, যার ফলে নিজেদের চিন্তার বিকাশ ও আপন দৃষ্টিতে দেখার মওকা সৃষ্টি না হওয়া এবং নিজেদের চিন্তা রাজ্য ভীতির মুচলেকায় আবদ্ধ করে নেয়া, এই অর্থে যে আমার চিন্তায় যদি কিছু ভুল হয়ে যায়, তবে উদ্ভূত চিন্তার অপরাধে (for the thought crime), এই মহাবিশ্বের অসীম ক্ষমতার অধিকারী সত্তা আমাকে জ্বলন্ত আগুনে ফেলে অনন্তকাল পুড়াতেই থাকবেন।

অন্যদিকে সমালোকচকরা যেহেতু মানসিকভাবে এই মুসিবতের মুখামুখি হননি, তাই তারা যখন তাদের পাঠকী অভিজ্ঞতার আঙ্গিকে ইসলাম নিয়ে কথা বলেন, যেসব কথার ভিত্তি হচ্ছে ইসলামের ইতিহাস, হাদিস, কোরান ও বর্তমান কালের বাস্তব ঘটনাসমূহ, তখন মুসলিম মানসে শুধু অস্বস্তিই আসে না, বরং তাদের মনে এই ভীতিও আসে যে এই সমালোচনার কারণে আমাদের ধর্মের ভিত হয়ত নড়বড়ে হয়ে যাবে – সর্প তার নিজ ভীতির কারণেই কামড় দেয়। কিন্তু কোন সমালোচায় ধর্মের ভীত নষ্ট হয়ে যায় না, যদি হত তবে অনেক ধর্ম অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত।

যেসব তথ্যের ভিত্তি হচ্ছে ইসলামের ইতিহাস, হাদিস, কোরান ও বর্তমান কালের বাস্তব ঘটনাসমূহ সেসব নিয়ে আলোচনার কারণে কেউ বিদ্বেষী হতে পারে না, কেউ ফোবিয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারে না। অনেক উৎসগত তথ্য সুস্পষ্ট অর্থ প্রকাশ করে যায় যেখানে কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজনই হয় না। তাহলে এমন ক্ষেত্রে কী বলা যাবে যে মূল উৎসই বিদ্বেষী বা ফোবিয়া-সর্বস্ব? তথ্যে যা রয়েছে, যা অতীতের মুসলিম ঐতিহাসিকগণ, হাদিসবেত্তাগণ, তফসীরকারগণ নিজেদের পুস্তকে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন সেগুলো কেউ উল্লেখ করলে সেকী বিদ্বেষী হয়ে যায়? এসব কী যৌক্তিক কথাবার্তা? আজ অন্যের প্রতি গালি ছুড়ার আগে,  বিদ্বেষ ঢালার আগে, অন্যায় অভিযোগ আরোপণের আগে নিজেদের তথ্যের স্থান বিবেচনা করার দরকার। আচরণ সংশোধন করা দরকার। ধর্ম যদি আত্মসংশোধন করাতে ব্যর্থ হয়, তবে অন্যদের সাথে মারামারি-কাটাকাটি, গালাগালি ইত্যাদিতে সেই অন্তঃস্থিত সৌন্দর্যের অভাব পরিপূর্ণ হবে না।

Facebook Comments

267 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.