কভিড-কালের এ কোন ঈদ?


গত ৪/৫ দিন ধরে ঈদ নিয়ে সশ্যিয়াল মিডিয়ায় এবং ঘরে-বাইরে অনেক কথা হচ্ছে। এ বিষয়ে আমি গতকাল একটি ব্লগ লিখেছি এই শিরোনামে:  ‘আনাস বিন মালিক ও ঘরে ঘরে ঈদের নামাজ।’ আজ ভাবছি আরেক কিস্তি লিখি,কেননা ঘরে নামাজ পড়া: ২ রাকাত, না ৪ রাকাত, তকবিরের সাথে, না তকবিরসহ ইত্যাদি আলোচনা আরও বিস্তৃতভাবে আলোচিত হচ্ছে। আমি ভাবছি আলোচনাটির একটু মূলের দিকে যাই এবং  পূর্বকালের কিছু বিশেষজ্ঞের অভিমত সামনে আনি, যাতে আলোচনার কিছু উপাদান, কিছু যুক্তি, ও এখন ঘরে ঘরে নামাজ পড়ার কিয়াসের স্থান আসে। তবে সবাই নামাজ পড়বে যার যার মযহাবের মুফতির মত অনুসারে -সেটা আলাদা বিষয়। আমরা কাউকে কোন নির্দেশনা দিতে যাচ্ছি না, বরং প্রশ্নের কিছু স্থানকে প্রশস্ত করছি।

কভিড-১৯ এর এমন বিশ্ব-ব্যাপী পরিস্থিতি ইতিপূর্বে কোনদিন আসেনি, তাই এখানে ‘কিয়াসের’ প্রয়োজন হয়েছে। কিয়াস হল কোন একটি বিষয়কে অনুরূপ বা নিকটতম অনুরূপ কিছুর আলোকে দেখা। এই দেখাতে সামঞ্জস্যতা ‘যৌক্তিকভাবে’ নিশ্চিত হতে হবে।

এখন যে কিয়াস (analogy) নেয়া হচ্ছে তা মধ্যযুগের আলেমগণ ঈদের নামাজ কেউ জামাতে পড়তে না পারলে সে কি বাসায় একাকী বা আরও কয়েকজন মিলে আদায় করে নিতে পারবে এই বিষয়ে তাদের অভিমতকে কভিডের পরিস্থিতি আনা, বা কিয়াস করা। কিয়াসে দুটি বিষয় সামঞ্জস্য থাকতে হয়: বক্ষস্থিত বস্তুটি কী, ও যার সাথে কিয়াস করা হচ্ছে সেটি কী এবং সাদৃশ্য কোথায়, তা না হলে কিয়াসের উপযোগিতা থাকে না। সেদিন নামাজ আরেকটি কারণে মিস হত। কেউ শহর থেকে অনেক দূরে থাকত এবং জামাত ধরতে পারত না। এখন আপনাকে সেদিনে উদাহরণ দেখতে হবে এবং কভিডের পরিস্থিতির সাথে তুলনা করতে হবে।

আগের দিনে ঈদের নামাজ প্রত্যেক শহরে খলিফা নিযুক্ত গভর্নর, বা তার প্রতিনিধি পড়াতেন। প্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে জামে মসজিদের নিয়োগপ্রাপ্ত ইমাম পড়াতেন, তার অভাবে এলাকার বিজ্ঞ আলেম পড়াতেন। এই জামাত আজকের ইউরোপীয় মসজিদের মত সকাল ৭টা থেকে প্রতি ৪৫ মিনিট পর পর হতে থাকত না, বরং এক জামাতই হত, এবং সেক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির জামাত ফৌত হয়ে গেলে, অর্থাৎ কেউ জামাত মিস করে ফেললে অথবা শহর থেকে দূরে অবস্থান করার কারণে না আসতে পারলে, এমতাবস্থায়, এক বা একাধিক ব্যক্তির পঠিত নামাজের ধর্মতাত্ত্বিক যৌক্তিকতা কী হবে?

এখানে যুক্তির স্থান হবে ঈদের নামাজের শর্ত -যেমন এলাকা শহুরে হওয়া, মাঠ বা জামে মসজিদ হওয়া, সামষ্টিক বৈশিষ্ট্য থাকা, খলিফা বা তার প্রতিনিধি, বা বিজ্ঞ আলেমের ইমামতি থাকা। এই শর্তগুলোর আওতাভূক্তিতে যে নামাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সে নামাজ একাকী পড়ার কারণে সকল শর্ত বহির্ভূত হওয়ায় এই মর্মে ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্ন আসে যে সেই নামাজটি ওয়াজিব হল, না মোয়াক্কাদা হল, না নফল হল? সে একা পড়বে, না পড়বেনা, না পড়লে কয় রাকাত পড়বে?  নামাজ যদি ওয়াজিব না হয়ে থাকে, তবে কী না পড়লেও চলবে? ইত্যাদি।

দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক ইবন রুশদ (১১২৬-১১৯৮) কয়েকটি মত-দ্বিমতের কথা উল্লেখ করেন। আমরা মতগুলো তার বই থেকে অনুবাদ করছি।

তিনি বলেন এক দল বিশেষজ্ঞ বলেন, সে একাকী ৪ রাকাত পড়বে। এটা ইমাম আস-সাওরি ও ইমাম আহমদের মত, এবং তা ইবন মাসউদের বিবরণ মোতাবেক। আরেক দল বলেন, সে ২ রাকাত পড়বে, কাযা হিসাবে, এবং ইমাম যেভাবে তকবিরসহ পড়েন সেভাবে। এই অভিমত ইমাম শাফেয়ী ও আবু সাওরের। তৃতীয় দল বলেন, সে ২ রাকাত পড়বে কিন্তু উচ্চ বা নিম্ন-স্বরে তকবির দেবে না। চতুর্থ দল বলেন, ইমাম যদি (মাঠে/ঈদগাহের মত] নামাজের স্থানে জামাত পড়িয়ে থাকেন, তবে সে ২ রাকাত পড়বে, অন্যতায় ৪ রাকাত পড়বে [এই পয়েন্টে অস্পষ্টতা রয়েছে]। পঞ্চম দল বলেন, সে এই নামাজ আর পড়তে হবে না, অর্থাৎ কাযা করতে হবে না, কেননা এক্ষেত্রে তার কোন কাযা নেই। এটাই ইমাম মালিক ও তার অনুসারীদের মত। ইবন মুনযির এই মত প্রকাশ করেন যা ইমাম শাফেয়ীর মতই।

যারা ৪ রাকাতের কথা বলেন, তারা এই বিষয়কে জুমার নামাজের কিয়াসে বলে থাকেন, কিন্তু এটি একটি দুর্বল তুলনা। যারা ২ রাকাতের কথা বলেন, তারা এই কাযাকে পালনীয় দায়িত্ব (আদা’) হিসেবে দেখেন, এবং ইমামের (পিছনে) ২ রাকাতের মতই গ্রহণ করেন। যারা এই নামাজের কাযা আদায়ের প্রয়োজন দেখেন না, তারা ঈদ-জুমার শর্তসমূহের বিবেচনায় করেন, এবং [এজন্য তারা] কারও একা বা দু-চার জনের নামাজকে সেই শর্তসাপেক্ষ নামাজের প্রতিস্থাপন (substitute) করতে চান না, কেননা এই নামাজ (অন্য) কোনভাবে প্রতিস্থাপিত হয় না।

এই দুই মত ঘিরেই আলোচনা কেন্দ্রীভূত হয়। এখানে ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম মালিকের মতামত রয়েছে। (এক্ষেত্রে) অন্যান্য যেসব অভিমত রয়েছে সেগুলো দুর্বল ও অর্থহীন, কেননা জুমার নামাজ যোহরের নামাজেরই প্রতিস্থাপক (যোহরের পরিবর্তে গৃহীত নামাজ), কিন্তু এই ঈদের নামাজ কোন কিছুর [কোন নামাজের পরিবর্তের বা] প্রতিস্থাপক নয়। যখন বিষয়টি এমন, তখন আমরা কিভাবে এখানে কাযার কিয়াস গ্রহণ করব? কেউ যদি যোহরের নামাজ জামাতে পড়তে ব্যর্থ হয়, তবে সেখানে কাযা করার কথা আসে না, বরং পালনীয় দায়িত্ব (আদা’) আদায়ের কথা আসে। সে যোহরের প্রতিস্থাপিত  ২ রাকাত মিস করার কারণে যোহরেরই ফরজ ৪ রাকাত পড়ে থাকে ((Ibn Rushd, (1994), BIDĀYAT AL-MUJTAHID WA NIHĀYAT AL-MUQTAṢID, Reading: Garnet Publishing, pp. 250-251))।

এ ব্যাপারে ইবন কুদামা বলেন, যে ব্যক্তি ঈদের জামাত পড়তে পারেনি, তাকে সেই নামাজ কাযা করতে হবে না, কেননা এই নামাজ হচ্ছে ফরজে কেফায়া। কিছু লোক সেটা পড়ে নেয়ার ফলে কেফায়া হাসিল হয়ে গিয়েছে। তবে কেউ পড়তে চাইলে সে ৪ রাকাত পড়ে নিতে পারে (আল-মুগনী, ২য় খণ্ড, ইন্টারনেট-পিডিএফ, পৃ.৭৯, লিঙ্ক এখানে)। আবু হানিফা বলেন, ঘরে ঈদের নামাজ পড়াতে  ইখতিয়ার রয়েছে। কেউ চাইলে পড়তে পারে, আবার চাইলে ছেড়ে দিতেও পারে, দুই রাকাতও পড়তে পারে, আবার চার রাকাতও পড়তে পারে’ (ইবন হাযর আল-আসকালানী, ‘ফাতহুল বারী’, ইন্টারনেট-পিডিএফ, পৃ. ৫৫০, লিঙ্ক এখানে)। কভিড-১৯কে ভিত্তি করে, হানাফি এহসাসে, ভারতের নিজামিয়া ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠান বলেছেন: [If] “one person from each area performs the Eid prayer in a neighbourhood mosque – then the prayer is deemed to have been performed, otherwise they have to pray two ‘rakats’ of thanksgiving at home.” জামেয়া নিজামিয়া প্রতিষ্ঠানের ফাতোয়ার লিঙ্ক দেখতে এখানে ক্লিক করুন। [Thanksgiving prayer এর অর্থ  শুকরানা নামাজ]।

উপরে কয়েকবার ‘কাযা’ (قضاء কাদা) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এটা সেই ফৌত-হওয়া নামাজ একাকীত্বে বা দু-চার জন নিয়ে পাঠ করার ক্ষেত্রে। এটা সময় ফৌত হওয়া অর্থের নয়, বরং জামাত ফৌত হওয়ার অর্থের কাযা।

কিয়াসের বিষয় দেখাতে আমাদের উপস্থাপনা এতটুকুই। এখন আপনিও হয়ত এ নিয়ে চিন্তা করতে পারেন। এই চিন্তার উপাদান ও ভিত্তি যদি এখানে কিছুটা দাড় হয়ে থাকে, তবে এই প্রয়াস সার্থক মনে করব।

প্রথমে, প্রশ্নের স্থানকে স্পষ্ট বা প্রশস্ত করার কথা বলেছিলাম। এবারে কিয়াসের আলোচনা সামনে রেখে ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্নটি আবার ফিরিয়ে আনি। যেহেতু ঈদের নামাজ প্রতিষ্ঠায় শর্ত সাপেক্ষতা রয়েছে, এবং শর্ত পূরণেই তা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাই উল্লেখিত অভিমতসমূহের আলোকে এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে যে কভিড-জনিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মানুষ ঘরে ঘরে যে নামাজ পড়বে এই নামাজের ক্যাটাগরি কি হবে: এটা কি ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব, মোয়াক্কাদা, না নফল?

Facebook Comments

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.