আনাস বিন মালিক ও ঘরে ঘরে ঈদের নামাজ

আনাস বিন মালিক ও ঘরে ঘরে ঈদের নামাজ

এটি হচ্ছে কভিড-১৯ প্রসঙ্গে ঈদ নিয়ে যা আলোচিত হচ্ছে সে বিষয়ে একটি মন্তব্য যা ব্লগ আকারে দিচ্ছি। এই দুদিন ধরে ঘরে ঘরে ঈদের নামাজ নিয়ে আনাস বিন মালিক (রা) কথা বার বার আসছে, তাই প্রথমে আনাস বিন মালিকের একটু পরিচিতি দেই।

আনাস বিন মালিক একজন সাহাবি, (জন্ম মদিনায়, ৬১২ খৃষ্টাব্দে, নবীর মদিনা হিজরতের ১০ বছর পূর্বে); তার পিতা মালিক বিন নাদর অমুসলিম থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি খাজরাজ গোত্রের উপগোত্র নাজ্জার গোত্রের লোক। এই নাজ্জার উপগোত্রের এক মেয়ে সালমা বিনতে আমরকে রাসূলুল্লার (সা) প্রপিতা হাশিম বিন আব্দ মান্নাফ বিবাহ করেছিলেন, এবং তার ঔরসে আব্দুল মুত্তালিব (রাসূলুল্লার দাদা) জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। এই দিক থেকে নাজ্জার ও খাজরাজ বংশ ছিল রাসূলুল্লার মাতুলালয়।  আনাসের পিতার মৃত্যুর পর তার মা রুমাইসা বিনতে মিলহান, উম্মে সুলাইম নামে পরিচিত, আবু তালহাকে বিয়ে করেন। নবীর হিজরতের পরে উম্মে সুলাইম তার পুত্র আনাসকে নবীর খেদমতে পাঠিয়ে দেন, এবং নবীর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি তা’ই করে যান।

পরবর্তী কালে ইসলামের রাজ্য যখন বৃদ্ধি হল এবং সাহাবিগণ বিপুল ধনমালের অধিকারী হলেন, আনাসও অনেক সয়-সম্পত্তির মালিক হলেন। তিনি বসরায় (ইরাকের এক শহর) স্থানান্তরিত হয়ে বেশির ভাগ সময়ই সেখানে বসবাস করতেন। সেখানে তার প্রাসাদ ছিল, জমি-জমা ছিল (ইবন মাসউদ আল বাগায়ী, ‘শারহুস সুন্নাহ’, ইন্টারনেট পিডিএফ, পৃ.৩১২ ফুটনোট ১, লিঙ্ক এখানে) এবং সেখানেই ৭১২ সালে, ১০৩ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন।

এই হচ্ছেন আনাস (সা)। এবারে ঘরে ঘরে ঈদের নামাজ পড়া নিয়ে দুটি কথা বলি। প্রথমে ধর্মীয় নীতির একটি কথা আসুক। ইসলামে চারটি মাযহাব আছে (আগে আরও ছোট ছোট মাযহাব ছিল যেগুলো এখন নেই)। মাযহাব হচ্ছে কিছু নিয়ম-নীতি ও পদ্ধতি সামনে রেখে কোরান-সুন্নাহর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্বলিত অভিমত ও অভিমতের সমষ্টি। প্রত্যেক মযহাবই কোরান সুন্নাহর পাঠকে কিছু বিশেষ নিয়ম নীতির আওতায় ব্যাখ্যা করে, তারপর, আচরণ গ্রহণ করে থাকেন, অভিমত গঠন করেন। এটা এমন নয় যে একজন সাহাবি একটি কাজ করেছেন, বা একটি মত প্রকাশ করেছেন, আর অমনি সকল সাহাবি, বা পরবর্তী উলামাদের কাছে একটি গৃহীত আচরণ হয়ে পড়েছে, বা কোন মাযহাবে স্থান পেয়ে গিয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের (একজন বড় মাপের সাহাবি) কাছ থেকে এই মর্মে বর্ণনা পাওয়া যায় যে কোরানের সুরা ফালাক ও সুরা নাস কোরানের অংশ নয়, কিন্তু এতদসত্ত্বেও বাকি সাহাবি ও পরবর্তী স্কলারগণ সেই অভিমত মেনে নেননি, বরং তার অভিমতের বিভিন্ন কারণ ব্যাখ্যা করে সেই মত বর্জন করেছেন। বিবেচনার বিষয় হল যে কোন একটি বর্ণনা পেয়ে গেলেই সেটা নির্দিষ্ট নিয়মনীতির আলোকে বিচার-বিশ্লেষণ ব্যতীত গৃহীত হতে পারে না।

নিজ বাসায় ঈদের নামাজ পড়ার কথা যদিও আনাস বিন মালিকের বর্ণনায় পাওয়া যায়, তবে হযরত আলীর (রা) বর্ণনায় পাওয়া যায় যে জুমার নামাজ ও দুই ঈদের নামাজ শহর (বা বড় শহর) ব্যতীত আদায় করা ঠিক নয়। দ্বিতীয় এই প্রসঙ্গের ভিত্তি ছিল এই যে শহরের জামে মসজিদে রাষ্ট্রের খলিফা নিযুক্ত গবর্নর নামাজের ইমামতি করবেন। এই প্রথা মুসলিম বিশ্বে ইউরোপিয়ান কলোনাইজেশনের আগ পর্যন্ত চলতে থাকে। ভারতে যখন ইংরেজদের হাতে মুসলিম শাসনের অবসান হল, তখন রাষ্ট্র প্রধান যেখানে মুসলিমই নন, তখন জুমার নামাজ নিয়ে একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়, এবং তা এই মর্মে নিষ্পন্ন হয় যে জুমার নামাজ অমুসলিমদের আধিপত্যের অধীনে বাদ দিয়ে দিলে, এক সময়, প্রজন্ম পরম্পরায়, মানুষ তা ভুলে যাবে। তাই ধর্মীয় মাসলাহাতের খাতিরে ভিন্ন ফাতোয়া গ্রহণ করা হয় যা আলীর বক্তব্যের পরিপন্থী, এবং সেই অর্থে ইউরোপ আমেরিকায় আজও জুমআ-ঈদ হচ্ছে।

ঈদের নামাজ বাসায় পড়া যায় –একা বা বাসার লোক নিয়ে জামাতেও, এটা অনুমোদন মাত্র। তবে এই প্রেক্ষিতের নামাজ কারো দৃষ্টিতে চার রাকাত, কারো দৃষ্টিতে দুই রাকাত। তবে কভিড-১৯  প্রেক্ষিত সামনে রেখে ভারতের প্রাচীন প্রতিষ্ঠান জামেয়া নিজামিয়া যে ফতোয়া দিয়েছেন তা বেশ প্রণিধানযোগ্য। তাদের বিচার-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে গৃহীত মত হল এই:  [If] “one person from each area performs the Eid prayer in a neighbourhood mosque – then the prayer is deemed to have been performed, otherwise they have to pray two ‘rakats’ of thanksgiving at home. [Thanksgiving prayer is শুকরানা নামাজ]।  জামেয়া নিজামিয়া প্রতিষ্ঠানের ফাতোয়ার লিঙ্ক দেখতে এখানে ক্লিক করুন।

তবে এ বিষয়ে নানান তর্ক বা ঝগড়ায় না গিয়ে নিজ নিজ মাযহাবের মুফতিদের পরামর্শ অনুযায়ী আমল করাটাই ভাল। বাংলাদেশি অনেক যুবক আলেম হানাফি মাযহাবের লোক হলেও তারা বিদেশে গিয়ে কম্পারটিভ মাযহাবে পড়াশুনা করে অনেকেই একান্তভাবে হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন না। এই প্রেক্ষিতে আমাদের কোনো সমালোচনা নেই, তবে যারা নিজেদের বাপ-দাদার পৈতৃক প্রথায় থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, এবং, (আমাদের দৃষ্টিতে ধর্মে সামাজিক ও সামষ্টিক পরিচিতগত একটি উপাদান থেকে থাকে যা প্রথাগতভাবে মূল্যবান), তারা তাদের আপন মাযহাবের মুফতিদের অভিমত গ্রহণ করলেই সমস্যার সমাধান হয়।

Facebook Comments

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.