ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা

23 জন পড়েছেন

ধর্ম যে কোন লোক চালু করতে পারে, যদি তার সে সাহস ও প্যাচপুচ জানা থাকে (গুগল সার্চে ধর্মের সংখ্যা ৪,২০০টি পাওয়া যায়)। আর সে যদি তা করতে পারে, তবে তার ওখানেও আধ্যাত্মিকতা থাকতে পারে। হিটলারও যদি একটি ধর্ম শুরু করত, তবে সেখানেও আলিম-উলামা গড়ে উঠত; তারা হিটলারাইট আধ্যাত্মিকতার অপরূপ সৌন্দর্যের বয়ান দিত, এবং আমি আপনি সেইসব বয়ান শুনে বিমুগ্ধ হতাম। (মুরিদ্গণ তার জীবনী ভিন্নভাবে লিখতেন, তার মন্দ কাজকে সুন্দর সুন্দর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করতেন। সকল মন্দের ‘আসল’ উদ্দেশ্য তারা খোঁজে খোঁজে আবিষ্কার করতেন, এবং তাকে শুধু নির্দোষই নয় বরং একজন মহান ব্যক্তি হিসাবে দেখাতে ব্যাখ্যা-বয়ানের পাহাড় গড়ে তুলতেন। তারপর বিশ্বাসী মহলে ইহাই সত্য বলে পরিগণিত হত এবং অবিশ্বাসীদেরকে হিটলার বিদ্বেষী, খোদার দুশমন দেখানো হত)।

আধ্যাত্মিকতা হচ্ছে আমাদের অস্তিত্বের রহস্য ঘিরে চিন্তা ও কর্মের সমন্বিত কিছু রূপায়ন। তারপর কীভাবে উত্তমরূপে জীবন যাপন করা হবে সে বিষয়েও চিন্তা কর্মের সমন্বয়। এই জিনিসটি আরবি ভাষায় ‘হেদায়াত’। এর মধ্যে অতিরিক্ত রহস্য টানাটানির দরকার নেই। মানুষ আবহমান কাল থেকে, সব দেশে সব জাতিতে, হেদায়াত নিয়ে চিন্তা করেছে। দার্শনিকগণও how to live a better life – এ নিয়ে চিন্তা করে আসছেন। এই সে-কালে সক্রেটিসের পূর্ব পর্যন্ত সফিস্টদের (Sophists) লেখাতেও তা পাওয়া যায়।

বিষয়টির আরেকটি দিক দেখা যাক। ধর্মের মধ্যে অনেক স্তর থাকে, এবং সেই স্তরসমূহের মধ্যে আধ্যাত্মিকতা একটি বড় স্তর, কিন্তু এই স্তরটি কোন এক ধর্মের একান্ত বিষয় নয়। প্রত্যেক ধর্মই সেই স্তরে নিজেদের কিছু রঙ দেয় এই যা। তারা সেই রঙ দিতে গিয়ে নিজেদের অনেক আলতু-ফালতু কথা জড়িত করে, কিন্তু সেই কথাগুলো এমন ভাষায় ও এমন প্যাচালোভাবে করে যে আপনার চৌদ্দ-গোষ্ঠী একত্রিত হলেও সেসবের কিছুই প্রমাণ করতে পারবেন না, বরং মাথা নেড়ে নেড়ে বা আবেগ বিজড়িত গদগদ গলায় বলতে হবে, ‘শুনিলাম, মানিলাম ও বিশ্বাস করিলাম’।

আপনি যদি ঢাকার দেওয়ানবাগীর নবুয়তিতে বিশ্বাস করেন, বা ধরুন কাদিয়ানীর নবুয়তিতে, বা অন্য কারো, তাতে কিছুই যায় আসে না। তারা প্রকৃতপক্ষে নবী কী নবী না তাতেও কিছুই যায় আসে না, আপনার আধ্যাত্মিকতা ও চর্চা ঠিকই থাকবে, কেননা আধ্যাত্মিকতা মূলত একটি আলাদা বিষয়, এটি অস্তিত্বের রহস্য-ঘেরা চিন্তা ও কর্মের সমন্বয়, এটা আপনি একা একাও করতে পারতেন, দেওয়ানবাগীর দরকার হত না, কিন্তু আপনি দেওয়ানবাগীর প্রথায় জন্ম গ্রহণ করে থাকলে, এটিই আপনার পৈতৃক ধর্মের আধ্যাত্মিকতা এবং এটি আপনার জন্য চরম সত্য – দুনিয়ার সব প্রথা হয় মিথ্যা অথবা সন্দেহজনক।

বলতে পারেন ধর্মের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এই আধ্যাত্মিকতা। এই স্তরটি আলাদা হলেও সব প্রতিষ্ঠিত ধর্ম এটিকে তাদের নিজেদের ধর্মে সংযুক্ত করে নেয়। এজন্য কোন ধর্মে ফ্যাসিবাদী উপাদান থাকলেও তা সর্বসাধারণে তার আধ্যাত্মিক আবেদনের কারণে বেঁচে যায় বা চোখের আড়াল হয়ে থাকে। সাধারণ মানুষ সেই উপাদানের দিকে তাকায় না, তাকায় আধ্যাত্মিক আবেদনের দিকে। বিশ্বাসীর মনকে ফ্যাসিবাদও এমনভাবে প্রাচীরবিদ্ধ করতে পারে যে সে এর ঊর্ধ্বে উঠে চিন্তাই করতে পারবে না।

পীর যদি মুরিদকে এমনভাবে গড়ে তুলে যে সে পীরের কোন ভুল-ভ্রান্তি মাথায়ই নেবে না, তবেই সে তার কাল্টিজমকে সার্থকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে ভাবতে হবে।

—অন্যান্য—

প্রোটো ধর্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম

দেওয়ানবাগী ও সামাজিক সত্যের এপিঠ ওপিঠ

স্রষ্টা ও সৃষ্টির একক সম্পর্ক

কোন আলোচনা কী আক্রোশবিহীন ও কুফুরি-বিবর্জিত হতে পারে না?

মানবাধিকার ও সভ্যতা

দোয়া ও ধর্ম

ধর্মীয় সত্য প্রচারে কী মিথ্যার সংমিশ্রণ হতে পারে?

এনলাইটনমেন্ট: গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা

বস্তু জগত তার আপন নিয়মে চলে

সভ্যতা কী?

মানুষ মানুষের জন্য

Facebook Comments

23 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.