এনলাইটনমেন্ট: গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা

62 জন পড়েছেন

ভূমিকা

আমাদের এই আধুনিক গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এবং আরও কিছু ‘বাদ’-কেন্দ্রিক  ধারণা (ism related concepts) আছে যেগুলোর আলোচনা-পর্যালোচনার  মূল উৎস হচ্ছে সুদূর এক অতীতে: দুই-আড়াই শো বছর পিছনে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ধীরে-ধীরে-গড়ে-ওঠা কিছু ধারণার সমন্বিত শক্তি যা সপ্তম শতাব্দীর শেষাংশের  ‘এনলাইটনমেন্ট’ (enlightenment) নামক একটি আন্দোলনের  ধারাবাহিকতা।

শাব্দিক অর্থে এনলাইটন (enlighten) হচ্ছে ‘আলোক প্রাপ্তি’ বা ‘জ্ঞান লাভ’। এই শব্দ থেকে যখন এনলাইটনমেন্ট (enlightenment) হয়, তখন এর অর্থ দাঁড়ায় ‘আলোক প্রাপ্তির কর্ম’ বা ‘জ্ঞান লাভের অবস্থা অর্জন’। হয়তবা জ্ঞানগতভাবে ‘আলোকায়ন’ বলা যেতে পারে। কিন্তু এনলাইটনমেন্ট বলতে শুধু একটি ধারণাই নয়, বরং একটি যুগ বা কালকে বুঝানো হয় যখন এই ‘আলোকায়নের’ চর্চা হচ্ছিল। এই কালটিতে যুক্তিজ্ঞান ও আধুনিক বিজ্ঞানের মৌলিক কিছু বিকাশ ঘটেছিল। এই দুটি উপাদানের বিকাশকে সামনে রেখেই কালটিকে ‘এনলাইটনমেন্ট’ আখ্যায়িত করা হয়েছে।

তারপর, অষ্টাদশ শতাব্দীতে ঘটা ফরাসী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এনলাইটনমেন্টের ধারণা বলিষ্ঠ ও ক্ষেত্র-ভেদে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উল্লেখিত যে ‘বাদগুলোর’ (isms) সেই সময় থেকে বিকশিত হতে থাকে।

এনলাইটনমেন্ট (Enlightenment)

অন্তর্নিহিতভাবে এনলাইটনমেন্ট হচ্ছে যুক্তি ও বিজ্ঞানের প্রাধান্যে একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা। সংক্ষেপে, ধারণাটি হল এই যে মানুষ তার নিজের যুক্তিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের উন্নতি সাধন করতে পারে। যুগ যুগ ধরে মানুষ নানান ধর্মে বিভক্ত হয়ে উত্তম জীবনের প্রত্যাশায় কেবল দ্বিমত, কোন্দল, উপদল, ব্যাখ্যা, পাল্টা-ব্যাখ্যা ইত্যাদির মাধ্যমে পথ-প্রাপ্তির ঝগড়া করলেও পথ-প্রাপ্তি হয়নি, বরং নানান কুংসষ্কারে আচ্ছন্ন ছিল। তারা খোদার নামে ধর্মীয় বাণী চালালেও খোদা এসব থেকে মুক্ত। তাছাড়া, খোদার নামে আসমানী নির্দেশনা চালানোর আদপে কোন প্রয়োজনই নেই, কেননা মানুষ তাদের বিবেক, যুক্তিজ্ঞান, ভাল-মন্দ বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেদের পথ নিজেরাই খুঁজে বের করতে সমর্থ এবং এই পথ ধর্মীয় হিংসা-বিদ্বেষ, অযুক্তি-কুযুক্তি ও কুসংষ্কারাচ্ছন্ন পথ থেকে উত্তম।

সতেরশো শতাব্দীতে যুক্তির ব্যবহার ও বৈজ্ঞানিক কিছু মূলনীতির আবিষ্কার এমন হয় যা বিশ্ব জগত সম্পর্কিত মানুষের ধর্মীয় মৌলিক ধারণাকে পালটে দেয়। ধর্মীয় গ্রন্থে খোদার নামে জগত সম্পর্কে অনেক জ্ঞানতত্ত্ব লিপিবদ্ধ ছিল যা তখন মিথ্যা হয়ে ধরা দেয়, এবং এতে এই যুক্তিই প্রতিষ্ঠিত হয় যে খোদা আসমান থেকে কিছুই নাজিল করেন নি। যদি সত্যিই তা আসমানী জ্ঞান হয়ে থাকত, তবে এতে ভুল থাকত না, উল্টা-পাল্টা থাকত না, অসঙ্গতি থাকত না, আর ব্যাখ্যার কসরত ও ঝগড়া-বিতণ্ডায় টানা-টানি করতে হত না।

ধারাবাহিকভাবে, বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার এনলাইটনমেন্ট আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তুলে। স্মর্তব্য যে তখন গেলেলিওর (Galileo Galilei, 1564-1642) কোপার্নিকাসের থিওরি প্রমাণ করেছে পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, আইজাক নিউটন (Isaac Newton, 1642-1727) -এর laws of gravity and motion আবিষ্কার হয়েছে, রেনে ডেকার্ট (René Descartes, 1596-1650) এর Cartesian coordinate system, laws of reflection প্রকাশ পেয়েছে, এবং  অধিবিদ্যাগত (metaphysical) অনেক বলিষ্ঠ ধ্যান-ধারণা ছড়িয়ে যা পূর্বজ্ঞানকে খণ্ডিত করে। এই আন্দোলনটি নতুন বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক ধারায় ধর্মীয় ধারণার দুর্বল স্থানগুলো দেখিয়ে যেতে থাকে।

এনলাইটনমেন্ট আন্দোলনের পশ্চাৎ-পটভূমি

তবে একথাও সামনে রাখা দরকার যে যেসব ধ্যান-ধারণা এনলাইটনমেন্ট আন্দোলন ও ফরাসী বিপ্লবের পিছনে কাজ করছিল তা হঠাৎ করে জেগে উঠেনি, বরং এ ধরনের বিপ্লবী ধারণা ইউরোপে বেশ কিছুকাল আগ থেকে শিকড় গেড়ে উঠছিল। এর মধ্যে ইউরোপিয়ান ধনতান্ত্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ক্রমশ এক সুবিধাজনক পর্যায়ে উপনীত হওয়া এবং ব্যবসায়ে সামুদ্রিক দিগন্ত উন্মোচিত হওয়া ছিল অন্যতম উপাদান।

ইউরোপিয়ান সামুদ্রিক ব্যবসায়িক অভিযান পনেরশো শতাব্দীতে পর্তুগিজ নাবিকদের মাধ্যমে সম্প্রসার শুরু করে। এই নাবিকগণ প্রিন্স হেনরির অধীনে ছিলেন। হেনরি পর্তুগীজ বাদশাহ ফারডিনেণ্ডের পুত্র ১ম জন-এর (John I, 1385-1433) সন্তান অর্থাৎ ফারডিনেণ্ডের নাতি [১] । যদিও হেনরি নাবিক ছিলেন না, কিন্তু তার সামুদ্রিক ব্যবসা, তৎপরতা ও নানাবিধ উদ্যোগের কারণে তিনি ইতিহাসে রাজপুত্র ‘নাবিক হেনরি’ হিসেবে পরিচিত। পনেরশো শতাব্দীতে সামুদ্রিক ব্যবসায় সম্প্রসারণ ও কোম্পেনী গঠন করে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে কিছু পরিবার বিত্তশালী হয়ে আত্মপ্রকাশ করতে থাকেন। বিশ্বায়নের ইতিহাসে এই সময়কে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়, (বিশেষ করে ওয়ালারস্টেইনের [Wallerstein] বিশ্বায়নের থিওরিতে) এবং এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয় পরবর্তী শতাব্দী অর্থাৎ ষোলশো শতাব্দী, যখন ধনতন্ত্রের বিকাশ লক্ষণীয় হয়ে উঠে [২]। ষোলশো শতাব্দীতে একটি শ্রেণী এমন হয়ে উঠেন যে তারা একদিকে রাজকীয় সম্পর্কে সম্পর্কিত ছিলেন না,  কিন্তু অপরদিকে বিত্তের বিবেচনায়, ব্যাপক শক্তিশালী সম্প্রদায় ও ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আবার আরেকটি শ্রেণীর অস্তিত্ব ছিল যারা রাজ-রক্তের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় জড়িত ছিলেন না, যারা নিজেদের ধনে-জনে ছিলেন শক্তিশালী এবং প্রতিষ্ঠিত রাজকীয় সিস্টেমের প্রতি আস্থাহীন। এই উপাদানগুলোর ক্রমবিকাশ পরবর্তী শতাব্দীতে রাজতন্ত্র, গির্জা-শক্তি ও প্রচলিত নানাবিধ প্রথার বিপক্ষের আন্দোলনে শক্তি সঞ্চার করে, অর্থাৎ যৌক্তিক জীবন দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে গঠিত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ‘ইনলাইটনমেন্ট’ আন্দোলনের সহযোগী হয়।

ব্যবসায়ের আয়-ব্যয়,হিসেব নিকাশ, প্লান-পরিকল্পনা যৌক্তিকতায় নির্ভরশীল। পণ্য প্রস্তুতি, বাজারজাতকরণ ইত্যাদিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার আসে। প্রাচীন অনেক বিশ্বাস যুক্তি ও বিজ্ঞানের মোকাবেলায় ‘কুসংস্কার’ হয়ে দেখা দেয়। আবার ব্যবসায় লাভ অর্জনে জাতি-ধর্ম বিদ্বেষ ব্যবসায় নীতি-বিরোধ হয়ে দেখা দেয়। ধর্ম যাদেরকে অমানুষ বলে উল্লেখ করেছিল তাদেরকে বাস্তবতায় অমানুষ দেখা যায় নি। যুক্তিজ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ইত্যাদির নির্ভরশীলতা ধর্মীয় বিশ্বাসে নির্ভরশীলতার উপর প্রাধান্য পেতে থাকে। ব্যবসা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ নীতি বাস্তব ক্ষেত্র উত্তম ও অধিক যুক্তিসংগত হয়ে প্রমাণিত হতে থাকে।

এনলাইটনমেন্ট আন্দোলনটি ছিল ধর্ম ও ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিকতার সম্পর্ণ বিপক্ষে। এই আন্দোলনের কর্ণধারগণ তাদের ধর্মীয় অবস্থানের কারণে রাজদরবার ও গির্জীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের আস্থা হারান, কিন্তু এতে তাদের কোন ক্ষতি হয়নি, বরং তাদের অনেকেই ধনতান্ত্রিক উপায়ে অর্জিত আর্থিক শক্তিতে এমন অবস্থানে উপনীত হন যে রাজকীয় শক্তিও ক্ষেত্র বিশেষে তাদের মোকাবেলায় হিমশিম খেতে হয়। প্রেস ও প্রিন্টিং এর মাধ্যমে সংযোগ ও যোগাযোগের (communication) ব্যবস্থাপনা তাদের আয়ত্তাধীন ছিল। তাই তারা নিজেদের  চিন্তা-চেতনার প্রকাশ ও প্রচার দ্রুতই ছড়িয়ে দিতে থাকেন।

ফরাসী এনলাইটনমেন্ট ও তাদের এনসাইক্লোপিডিয়া

সবচেয়ে বড় যে কাজটি এই আন্দোলনের লোকজন করতে সমর্থ হয়েছিল তা ছিল তাদের চিন্তাধারার অনুকূলে সর্বপ্রথম এনসাইক্লোপিডিয়া প্রণয়ন। ১৭৫১ সাল থেকে শুরু করে ১৭৭২ সাল পর্যন্ত এই পাবলিকেশন চলতে থাকে। ২৮ খণ্ডের এই এনসাইক্লোপিডিয়ায় ৭২ হাজার প্রবন্ধ স্থান পায় এবং অত্যন্ত কৌশলে এগুলো রাজকীয় প্রথা, ক্যাথলিক ধর্ম ও প্রচলিত সমাজের অনেক cherished ও মৌলিক নৈতিকতার ভিত্তিমূলে ছুরিকা চালায় [৩]। এর প্রধান প্রধান লেখকেরা ছিলেন ধর্মের প্রতি আস্থাহীন, আর অনেক ছিলেন ধর্মের প্রতি নিছক সন্দিহান। এই আন্দোলনের সাথে ডিডারো (Diderot), ভল্টেয়ার (Voltaire) ও রুসোর (Rousseau) নাম বড় আকারে স্মরণ করা হয়।

[নোট: লেখাটি ১৫/০৯/২০১২ ব্লগ হিসেবে অন্যত্র ছেপেছিলাম]।

____________________

References:

[১] History World. History of Portugal: Timeline. [online] Available at: http://www.historyworld.net/wrldhis/PlainTextHistories.asp?gtrack=pthc&ParagraphID=gox#gox [accessed 03/12/2011]

[২] Waters, M. (1995). GLOBALIZATION.  London: Routledge, p.160.

[৩] openlearn, 2007. OpenLearn: History Unit — The Enlightenment #1

________________

অন্যান্য:

প্রোটো ধর্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম

দেওয়ানবাগী ও সামাজিক সত্যের এপিঠ ওপিঠ

মানবাধিকার ও সভ্যতা

স্রষ্টা ও সৃষ্টির একক সম্পর্ক

সভ্যতা কী?

কোন আলোচনা কী আক্রোশবিহীন ও কুফুরি-বিবর্জিত হতে পারে না?

দোয়া ও ধর্ম

মানুষ মানুষের জন্য

ধর্মীয় সত্য প্রচারে কী মিথ্যার সংমিশ্রণ হতে পারে?

এনলাইটনমেন্ট: গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা

বস্তু জগত তার আপন নিয়মে চলে

করোনা এক সময় চলে যাবে

কালি-জিরার-তেল (black seed oil) ও মধু

Facebook Comments

62 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.