বিজ্ঞান, সৃষ্টি ও বিবর্তন – “ঘামিদি” টিভি অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা পর্ব

51 জন পড়েছেন

ভূমিকা:

পৃথিবীর এ জীবন সফরে একজন মুসাফির  দিনের আলোতে ও রাতের অন্ধকারে ভাবতেই পারে সে কি কখনও সন্ধান পাবে নিচের প্রশ্নগূলোর:

  • মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য যদি হয় সৌন্দর্যের মাধুর্য উপলব্ধি ও পরিতৃপ্তি তাহলে ধর্মও তো তাই হবার কথা সেটি কি সত্যি না মিথ্যা?
  • যদি সব কিছু ঘটে এ প্রকৃতির পরিকল্পিত সাধারণ নিয়মে তা হলে মহাবিশ্বের উদ্ঘাটন কে নিয়ন্ত্রণ করেন? সত্যিই কি কোন স্রষ্টা আছেন না নাই? এ বাস্তবতাটি অনুসন্ধান এবং আবিষ্কার করতে আরও কত বেশি প্রচেষ্টার প্রয়োজন?
  • যদি দৃঢ় বিশ্বাস পরিবর্তন হয়না তাহলে সর্বশক্তিমানের কোন বাস্তবতা আছে কি না?
  • যদি আল্লাহর আদেশ এবং দুনিয়ার জীবনযাপন কেবল কেয়ামতের দিনে মৃত্যুর পরে স্বর্গ লাভ করাই হয়,তবে আজকের বাস্তব জীবনের এসমস্ত ঘটনার কোন  প্রভাব আছে কি নাই?

পাকিস্তানের জিও টিভির জনৈক উপস্থাপক উপরের কথাগুলো দিয়ে শুরু করেছিলেন প্রখ্যাত ইসলামী রিচার্স স্কলার জনাব জাভেদ আহমেদ ঘামিদীর সাথের বিজ্ঞান,সৃষ্টি ও বিবর্তন বিষয়ের প্রশ্ন উত্তরের উর্দূ অনুষ্ঠান।

তাদের প্রশ্নগুলোর জবাব কুরআনের দৃষ্টিতে কি হবে তা জানার জন্য কুরআন নিয়ে দীর্ঘ ৩০ বছরের গবেষণাকারী একজন রিচার্স স্কলার হিসাবে খ্যাত  জাভেদ আহমেদ ঘামিদীর বক্তব্য গুরুত্ব বহন করে ভেবেই হয়তোবা এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। যারা উর্দু বুঝেন না তাদের খেদমতে সে অনুষ্ঠানের আলাপচারীতার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করব আমার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায়। এসব অভিমত আমার নয় আমি শুধু সবার সাথে শেয়ার করলাম যাতে একজন স্কলারের ভিউ পয়েন্ট কি তা পাঠকদেরকে জানাবার জন্য। আপনাদের মন্তব্য  বা এ বিষয়ে সম্পুরক তথ্য থাকলে জানাতে পারেন।

উপস্থাপক:
“আস সালামু আলাইকুম,

“গামিদি” শোতে স্বাগতম। দর্শকগণ,আজ আমরা একটি ইস্যু তুলে ধরব যা বিশ্বাসী এবং বিদ্বানদের মধ্যে অনেক দিনের বিবাদের বিষয় হয়ে উঠেছে তা হল বিবর্তন তত্ত্ব।

  • আমরা দেখতে যাব যে বিবর্তন তত্ত্ব কি সত্যিই ইসলামের বিরোধী কি না?
  • ইসলাম কি সৃষ্টির প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যার সেই প্রাথমিক পর্যায়ে পড়ে আছে?
  • সেমেটিক জাতির ধর্মগুলিতে কি সৃষ্টি তত্ত্বটি পুরানো গ্রীক দর্শন থেকে উদ্ভূত?
  • আল্লাহর সৃষ্টি যদি নিখুঁতভাবে নিখুঁত হয় তবে কিছু শিশু কেন বিশেষভাবে (পঙ্গু হয়ে) জন্মগ্রহণ করে?
  • পৃথিবী কি সত্যই ছয় দিনে তৈরি হয়েছিল নাকি কোটি কোটি বছরের পুরো বিবর্তন প্রক্রিয়াটি নিয়েছিল?
  • মানব চিন্তা ও মানব সমাজ যদি বিবর্তনমূলক পর্যায়ে বা প্রক্রিয়ায় যেতে পারে তবে মানব দেহ কেন নয়?
  • এই বিষয়গুলি আজকের আলোচনার মূল বিষয় হবে।”

উপস্থাপকের  প্রশ্ন : গামিদি সাহেব,মানুষ ও পৃথিবী সৃষ্টি সম্পর্কে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি কী?

ঘামিদি সাহেবের জবাব:
কুরআন পৃথিবী সৃষ্টির এ বিষয়টিকে বিশেষ ইস্যু বা যুক্তিতর্কের বিষয় হিসাবে উপস্থাপন করার প্রাধান্য দেয় নাই। কারণ কুরআন মূলত মানব জাতীর হেদায়েত বা পথ প্রদর্শনের গ্রন্থ  সে লক্ষ্যে কুরআনের প্রধান ফোকস হচ্ছে এটি দুনিয়ার জিবনে সঠিক পথে চলার নির্দেশনা, নৈতিকতা, অদৃশ্য  স্রষ্টাকে বিশ্বস করা, মৃত্যুর বা পরকালের বিষয় নিয়ে আলোচনা, শেষ বিচার দিনে কি হবে ইত্যাদি বিষয়ের তথ্য নিয়ে আলোচনা। তবে যেহেতু এটি আল্লাহর কিতাব তাই সমস্যা জড়িত এ পৃথিবীর জীবন হতে পরকালের জীবনের মুক্তি পেতে ও দুনিয়ার জিবনে সচেনতা জাগাতে কুরআনে এ জাতীয় কিছু তথ্য স্পর্শ করতে আমরা দেখতে পাই। সৃষ্টি সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা না করে শুধু প্রথমিক কিছু ধারণা দিয়েছে। কুরআন সংক্ষেপে মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে কয়েকটি তথ্য উল্লেখ করেছে। যেহেতু এটি একটি মৌলিক আলোচনা নয়,সেখানে কোন মহান বিবরণ আশা করা যায় না। তবুও,এটি সংক্ষেপে কিছু তথ্য উল্লেখ করেছে।
যেমন,

উদাহরণস্বরূপ,কুরান এটি আমাদের বলে যে পৃথিবীর সৃষ্টি  হয়েছে আল্লাহর হুকুমে যখন তিনি বলেছিলেন “كُنْ /Kun (be -হয়ে যাও)” যদিও মহাবিশ্বটি كُنْ – “হয়ে যাও  হুকুম দ্বারা তৈরি হয়েছে তবুও এটি বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বর্তমান রূপে পৌঁছেছে। (আর আমার কথা, সেটি যে একটি বিবর্তন প্রক্রিয়া পেরিয়ে অস্তিত লাভ করে নাই তাও কিন্তু কুরান বলে নাই)

কুরআন আমাদের জানিয়েছে যে আল্লাহ ছয়টি ফেইজে বা দফায় পৃথিবী ও আসমান সৃষ্টি করেছেন সে গুলোকে দিন হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। “তিনি মহাকাশ ও পৃথিবীকে  পর্যায়ক্রমে ছয়টি দিনে তৈরি করেছেন।“ তবে মানুষ এই ৬ দিনটি আসলে কি তা  অনেকে ভুল  বুঝে! অবশ্য আল্লাহ কুরআনের আরেক জায়গায়  “ يَوْم‎ /youm – দিন (day)” বলতে কি বুঝায়  সেটিও  জানিয়ে দিয়েছেন।  আল্লাহর দিন আমাদের  দিন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের দিনগুলি ২৪ ঘন্টা দিয়ে হয় তবে সে হিসাবে আল্লাহ তায়ালার এক দিন,আমাদের গণনা অনুসারে এটি ৫০,০০০ বছরের সমান। একিভাবে ফেরেস্তারা আল্লাহর কাছে এক দিনে পৌছান মানে ৫০,০০০ হাজার বছরের সমতূল্য। এ সব উদাহরণ থেকে আমরা অনুমান করতে পারি  যে  মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে কালক্রমে ছয়টি পর্যায়ে।

وَهُوَ الَّذِي خَلَق السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاء لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً وَلَئِن قُلْتَ إِنَّكُم مَّبْعُوثُونَ مِن بَعْدِ الْمَوْتِ لَيَقُولَنَّ الَّذِينَ كَفَرُواْ إِنْ هَـذَا إِلاَّ سِحْرٌ مُّبِينٌ

তিনিই আসমান ও যমীন ছয় দিনে তৈরী করেছেন, তাঁর আরশ ছিল পানির উপরে, তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান যে, তোমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে ভাল কাজ করে। আর যদি আপনি তাদেরকে বলেন যে, “নিশ্চয় তোমাদেরকে মৃত্যুর পরে জীবিত ওঠানো হবে, তখন কাফেরেরা অবশ্য বলে এটা তো স্পষ্ট যাদু!”; [ সুরা হুদ ১১:৭ ]

এর অর্থ হচ্ছে  কুরআন আমাদেরকে এটিও বলেছে যে এই সৃষ্টি প্রক্রিয়াটির প্রথম পর্যায়ে ছিল শুধু পানি ( কানা আরশু হু আলা আল মা’আ) এবং সেই সময় থেকেই জীবন শুরু হয়েছিল। এর অর্থ পৃথিবীতে সর্বত্র পানি ছিল এবং জীবন প্রথম সেই অবস্থায় সৃষ্টি হয়েছিল, আরও দেখানো হয়েছে যে মানব জীবনের সৃষ্টিটি দুটি পর্যায় হয়েছিল।

❖ প্রথম পর্বে পৃথিবীর উদর (পার্থিব উপাদান) থেকে মানুষের দেহের সঞ্চার হয়েছে)

❖ দ্বিতীয় পর্ব:  পুনরায় সৃষ্টি প্রক্রিয়াটি গৃহীত হয়েছিল মানুষের নিজের সন্তান প্রজন্মের তৈরির স্ব-ক্ষমতা (পুরুষ ও মহিলা দ্বারা মায়ের পেট থেকে )

এটিই হচ্ছে সৃষ্টি বিষয়ে কুরআনের প্রদত্ত সত্যিকার তথ্য যা কুরআন ইঙ্গিত দেয়।

এ  আলোচনার সামনে চললে  আমি এ বিষয়ে আল্লাহ যা বলেছেন তার আরো বিবরণ দিব সময় থাকলে। তার পর আদম (আঃ) ও ইবলিসের কাহিনী নিয়ে আলোচনার সময় কুরআন আমাদেরকে আরও কিছু বাস্তবতার দিকে মনোনিবেশ করতে স্মরণ করিয়ে দেয়। সেখানে মানুষের প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত এবং সৃষ্টির পরবর্তী পর্যায় বাস্তবায়িত করতে আল্লাহ তায়ালার  পরিকল্পনার বিষয়ে অবহিত করে।  তাছাড়া কুরআন বারবার  সৃষ্টির বৈচিত্র্য,রূপান্তর এবং সভ্যতার বিচ্যুতি মানব সংস্কৃতির অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা করেছে।  কুরআন আমাদেরকে মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কেও বর্ণনা দেয়। আমি এই মুহূর্তে এই সমস্ত বিষয়গুলি বিস্তারিত আলোচনা করছিনা কারণ আমরা কেবল আলোচনাটি শুরু করেছি মাত্র। আলোচনা যত এগিয়ে যাবে  আমি এই বিষয়গুলির আরও বিশদ ব্যাখ্যা দিব।

উপস্থাপকের  প্রশ্ন  গামিদি সাহেব, আপনি বলছেন মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে সবই ছিল পানি । কুরআন আমাদের আরও বলেছে যে,পৃথিবী ও আসমান এসব কিছু সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহর “আরশ” – সিংহাসন পানির উপরে ছিল। ঘামিদি সাহেব, এটা বোঝা মুশকিল। তখন পানিকে তাহলে কিসে ধারন করছিল? What held the water then?

গামিদি: দেখুন,এখানে এটি বলা হয়নি যে পৃথিবী সৃষ্টির আগেই এই পরিস্থিতি ছিল। বরং বলা হয়েছে যে যখন সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এ পৃথিবীতে যেখানে শুধু পানি ছিল ,যার মধ্যে জীবন অস্তিত্ব নিয়েছিল,তখন তাঁর শাসন পানির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখানে পৃথিবীর রেফারেন্স বা প্রসঙ্গে এ কথা বলা হচ্ছে  যার উপর আমরা এখন আছি।

কুরানে মজিদ আসমান বা আকাশের ব্যাপারে,কুরআন তাদের সৃষ্টিকে অন্য স্টাইলে বোঝায়। আর পৃথিবী বা জমিনের উপরের  জীবনের সৃষ্টি বর্ণনা করে ভিন্নভাবে । কুরআন আমাদেরকে জানায় যে এটি কতটা সময় নিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ কুরআন আমাদেরকে বলে যে আকাশ ও পৃথিবীর মূল কাঠামো দুটি দিনে অস্তিত্ব লাভ করেছিল;অথবা আমরা বলতে পারি যে দুটি পর্বে তা হয়েছে।

তারপর আমাদেরকে আরও বলে যে পরবর্তীকালে পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্বের রূপগুলি যা আমরা এখন পর্যবেক্ষণ করি তা চারটি পর্যায়ে এসেছিল।

যার অর্থ হচ্ছে আমরা জানতে পারছি যে পৃথিবীতে আল্লাহর সৃষ্টির যে নেয়ামত,রূপবৈচিত্রতা,এর আবির্ভাব কিভাবে পর্যায়ক্রমে এসেছে। সুতরাং এটির অর্থ হ’ল বর্তমানে আমরা সৃষ্টির যে রূপগুলি (present form of things)দেখি সেটি  মৌলিক সৃষ্টির অবস্থা থেকে পর্যায়ক্রমে বর্তমান অবস্থায় আসতে প্রায় দ্বিগুণ সময় নিয়েছিল।

উপস্থাপকের  প্রশ্ন  :

আল্লাহ কি  আকাশ ও পৃথিবীকে এক মুহুর্তে সৃষ্টি করতে পারেন না যখন তিনি বলেন,   كُنْ   “হয়ে যাও” হুকুম দিয়ে? আল্লাহ  নিজেই কি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করতে ছয় দিন সময় নিয়েছিলেন?

ঘামিদি:
দেখুন,প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ যখন বিশেষ কিছু সৃষ্টির শুরু করেন তখন এটি শেষ হওয়ার আগে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে। এটি তাঁর নিয়ম। শুধু বলার জন্য একটি আমের গাছ তাত্ক্ষণিকভাবে তো তৈরি করা যায়। তবে এটি যে সম্ভাবনা বহন করে সেটি পরিপক্বতায় পৌছাতে, ফল ধরতে, সেটি সুস্বাদু পাকা হতে বিভিন্ন পর্যায় ও ঋতু অতিক্রম করতে হয়।

অবশ্যই,  “কুন বা হয়ে যাও” আদেশের মাধ্যমে আল্লাহ  যেকোন কিছু তৈরি করতে পারেন। শেষ বিচারের প্রাক্কালে এরকম একটি শিঙ্গা বা তূরী বাজানো হবে। বিশ্ব পুনর্নির্মাণ করা হবে।

يَوْمَ تُبَدَّلُ الأَرْضُ غَيْرَ الأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ وَبَرَزُواْ للّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ

যেদিন পরিবর্তিত করা হবে এ পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে এবং পরিবর্তিত করা হবে আকাশ সমূহকে………। [ সুরা ইবরাহীম ১৪:৪৮ ]

এই ইভেন্ট সম্পর্কে,আল্লাহ বলেছেন যে তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে পুরো মানবব্যবস্থা সমাপ্ত করবেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁর কাজগুলিতে উভয় পদ্ধতিই গ্রহণ করেন। অনেক সময় তিনি নির্দিষ্ট কিছু জ্ঞানের কারণে কোনও জিনিসকে বিভিন্ন পর্যায়ে যেতে দেন। উদাহরণস্বরূপ একটি শিশু কথাই ধরেন। আল্লাহর জন্য এটা সম্ভবপর ছিল ২০ বছরের এক যুবককে আকাশ থেকে অবতীর্ণ করা  যেত। কিন্তু তার বিপরীতে তাকে বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সে মায়ের গর্ভে বহু পর্যায় আতিক্রম করতে হয়। এমনকি এই পৃথিবীতে আসার পরেও সে শিশু অবস্থায় এক অত্যন্ত দুর্বল সত্তা। তারপরে  শৈশব, কিশোর,যৌবনের মধ্য দিয়ে পেরিয়ে বার্ধক্যের দ্বারে পৌঁছে। আল্লাহ যে বিবর্তন প্রক্রিয়াটি প্রতিষ্ঠা  করেছেন তার দ্বারাই তিনি এই পর্যায়গুলি অতিক্রম করেছেন। মহাবিশ্ব বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে। সৃষ্টি প্রক্রিয়া বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এটি প্রজ্ঞার জন্ম দেয়, অর্থবোধকতা জন্মায় যা মানুষকে চিন্তাভাবনা করার সুযোগ দেয়।

উপস্থাপকের  প্রশ্ন  :

এর অর্থ আপনি বিবর্তনকে অস্বীকার করেন না?

ঘামিদি:

দেখুন, বিবর্তন এই মহাবিশ্বের প্রতিটি পরমাণুতে কার্যক্ষম। তবে বিবর্তনের প্রকৃতি নিয়ে অর্থাৎ কিভাবে বিবর্তন হয়েছে সেটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিবর্তনের একটি ধারণা ডারউইন উপস্থাপনা করেছিলেন। বিবর্তনবাদীরা এটিকে বিবর্তন তত্ত্বকে বলেন এবং প্রচার করেন। সহজ কথায় আমরা এটিকে নিম্নে এভাবে বর্ণনা করতে পারি:

জৈব অণু (organic molecules) থেকে একটি কোষ (cell ) তৈরি হয়েছিল। তারপরে নতুন এই সরল সৃষ্টিটি ধীরে ধীরে জীবন রূপে রূপ নিয়েছে। প্রথমদিকে সেটি টিকটিকি ধরণের কিছু প্রাণীর মত অস্তিত্ব নিয়ে আসে। পরবর্তীকালে পাখির জগৎ অস্তিত্ব লাভ করে। যদিও এই ধারণার কোনও ভিত্তি নেই!

তবে কুরআনেও বিবর্তনের কথা আছে তবে এ বিবর্তনের ধারণা আলাদা। এ বিবর্তন আপনি মানব সৃষ্টিতেই দেখতে পাবেন। এটি এমন যা একটি মানুষের শুক্রাণুর সাথে জড়িত। এটি মানুষের  ভ্রূণের জন্মের সাথে জড়িত। এখানে মানব দেহের বিবর্তন হয় তার শৈশব,কৈশোর, যৌবন এবং বার্ধক্যের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে যায়। মানব দেহের এ পরিবর্তন ও অনেক ক্ষমতা সময়ের সাথে দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, পনেরো বা ষোল বছর বয়সে পৌঁছানোর আগে যৌন প্রবৃত্তিটি সক্রিয় হয় না।

উপস্থাপক :

ফ্রয়েড আপনার কথা অস্বীকার করেন ।

ঘামিদি:

ফ্রয়েড যা বলেন তা হ’ল অবচেতন মন। অবশ্যই এটি মানুষের মধ্যে আছে। তবে এটি প্রদর্শিত হয় এবং পরে একটি সময় সচেতনভাবে মানুষ তা উপলব্ধি করে। সময়ের সাথে এ জাতীয় অনেক বিষয় স্থায়ী হয়।  আমি বলেছি,  যে কোন শিশুর জন্মের পরে সে একটি সম্পূর্ণ মানুষ। এটি অনেক কিছুই সনাক্ত করে। আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলে একটি  শিশু তার জন্ম প্রক্রিয়া যখন অনুভব করে  তখন সে সচেতন থাকে।

উপস্থাপক :
বিবর্তবাদের সমর্থকরা বলছেন যে মানুষ একটি হোমোসাপিয়েন (Homosapien)জিব এবং শিম্পাঞ্জি (apes)পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।

তার প্রজনন ব্যবস্থা, তার দাঁত গঠন, তার মনের কাঠামো,এমনকি মানুষের ডিএনএ প্যাটার্নটি ৯৮% এইপস বা শিম্পাঞ্জির মত।

সুতরাং,গামিদি সাহেব, এখানে দেখা যায় মাত্র দুই শতাংশ পরিবর্তনের কারণে মানুষ অস্তিত্ব নিয়ে এসেছিল। এই সমস্ত সৃষ্টি যদি স্বতন্ত্রভাবে সৃষ্টি করা হয়েছিল তবে আল্লাহ  কি প্রতিটি সৃষ্টিতে একটি অনন্য শারীরবৃত্ত তৈরি করতে সক্ষম নন যাতে এই বিভ্রান্তি রোধ করা যেত?

ঘামিদি:
আসল বিষয়টি হ’ল আল্লাহ যখন এই পৃথিবীটি সৃষ্টি করেছিলেন তখন তিনি এ জাতীয় বিভিন্নতা,নতুনত্ব,সৌন্দর্য এবং  অনেক কিছুতে এই জাতীয় মিল সৃষ্টি করেছিলেন। এই সমস্ত জিনিস তাদের স্রষ্টার স্রষ্টার দিকেই নির্দেশ করে। এটি কেবল একজন মানুষের নিজশ্ব দৃষ্টিকোণ। মানুষ চাইলে এই মিলগুলিতে  স্রষ্টা সম্পর্কে সে সন্দেহে পড়তে পারে আবার যদি ইচ্ছা করে তবে নিজের মাঝেই বিশ্বজগতের একক সৃষ্টিকর্তার কাজ দেখতে পাবে। আমি বলতে চাই এটি কেবলমাত্র একটি দৃষ্টিভঙ্গি।

ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব অন্যান্য আরো অনেক ধাপে এগিয়েছে। ডারউইন তার তত্বের যে জায়গায় ছিলেন বর্তমান জীববিজ্ঞানীরা সেখানে  আর নেই। তারা সে তত্ত্বটির সমস্যাগুলি দূর করার জন্য অন্যান্য আরো তত্ত্বের প্রস্তাব এসেছে। উদাহরন  “লাফানোর” – saltation ( “leap”) তত্ত্বের একটি ধারণা চালু হয়েছিল। একইভাবে,প্রাকৃতিক নির্বাচনের বিভিন্ন ধাপগুলি (stages of natural selection) আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

উপস্থাপক :
তার মানে কেউ কি বিবর্তন প্রত্যাখ্যান করেনি?

ঘামিদি:
হ্যাঁ. এমন অনেক লোক আছেন যারা এটিকে প্রত্যাখ্যান করেন।

তবে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের নূন্যতম প্রমাণও উপস্থাপন করতে পারেননি কেউ। অতএব আমার কথা হচ্ছে যে এ তত্ত্বের প্রবক্তারা বা বর্তমানে অন্যান্য যে বিবর্তন তত্ত্ব বিদ্যমান রয়েছে, তা আমাদেরকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণিত তথ্য হিসাবে বিশ্বাস করানো হচ্ছে। সেখানে বলা হচ্ছে  পৃথিবীর সব কিছু একটি একক কোষ (cell ) থেকেই অস্তিত্ব নিয়েছে! এটি বিজ্ঞানের এক কল্পকাহিনী ছাড়া আর কিছু নয়। কেননা এর কোন প্রমাণ নাই অথচ সেটি এক ধরণের ধর্মীয় বিশ্বাসে পরিণত হয়ে গিয়েছে অনেক মহলে।

  উপস্থাপক :
গামিদি সাহেব, এমন একটিও প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক জার্নাল বিবর্তন তত্ত্বকে ভূল বলে কোনও প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। হার্ভার্ড, এমআইটি, কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড এবং অন্যান্য সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় বিবর্তনীয় তত্ত্বে স্নাতক কোর্স পড়ায় এবং আমরা জানি যে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলি আন্ডারগ্র্যাডদের প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তথ্য শেখায়। বিতর্কিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলি কেবলমাত্র মাস্টার্স এবং পিএইচডি পর্যায়ে দেওয়া হয়।

ঘামিদি:
আমি এটিকে বিজ্ঞানের এক ট্রাজেডি মনে করি  যে একটি তত্ত্ব যা নিজেকে সমর্থন করার পক্ষে এমনকি একটি দুর্বল যুক্তিও দিতে পারেনি এবং যাকে জীবাশ্মের রেকর্ড (fossil records) দ্বারা বারবার অস্বীকার করা হয়েছে কিন্তু তা বৈজ্ঞানিক সত্য হিসাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। এ তত্ত্ব  প্রতিষ্ঠার জন্য উত্থাপিত গল্পগুলি ভুল প্রমাণিত হয়েছে এবং তত্ত্বের সমর্থকরাও বিভিন্ন সময় নকল প্রমাণ চাপানোর চেষ্টা করেছিলেন।

 উপস্থাপক :
সত্যি? জীবাশ্ম রেকর্ড (fossil records) কীভাবে বিবর্তনকে অস্বীকার করে?

ঘামিদি:

আমাদের বলা হয়েছিল যে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্বে একটি ফসিল (fossil) একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় থাকা উচিত ছিল।

কিন্তু বিষয়টি যখন তদন্ত করা হয়েছিল তখন দেখা গেল কিন্তু বিষয়টি  যখন বিষয়টি তদন্ত করা হয়েছিল তখন জানা গেল যে এরকম দুটি জিনিসের দুটি জীবাশ্ম  (fossil records) আবিষ্কার করে দেখা গেল উভয়টিই সেই  সময়কালে একই রূপে প্রকাশ পায়! Such two fossils of the same thing were discovered which reveal the same form in that time period as well.

ঘোড়া ব্যাপরে যে ব্যাখা দেয়ার চেস্টা হয়েছে আপনি জানেন? কিছু সাদৃশ্যের মিল খুঁজে তার ভিত্তিতে একটি গল্প তৈরি করা হয়েছিল। একটি হাড় নেওয়া হয়েছিল এবং এটিতে একটি কল্পিত কাঠামো নির্মিত হয়েছিল। এই কাল্পনিক কাঠামো তৈরি করা হল যেভাবে একজন চিত্রশিল্পী একটি অপরাধের দৃশ্য চিত্রিত করে বাস্তব জীবন থেকে । এই জাতীয় কাল্পনিক কাঠামো তখন বিজ্ঞানের পাঠ্য বইয়ে রাখা হয় এবং তাকে বাস্তবতারূপে উপস্থাপন করা হয়। আসলে কথাটি  খুবই সাধারণ বিষয়। যে কোন দুটো জিনিসে অনেক মিল থাকতেই পারে। এই সাদৃশ্যগুলি ব্যাখ্যা করার উচিত ছিল। এখনে বিদ্বানীরা প্রতারিত হয়েছেন!  এই সাদৃশ্যের ভিত্তিতে তারা ধরে নিয়েছিল যে একটি অন্যটি থেকে এসেছে।

যা করা উচিত ছিল  আজ যেমন লক্ষ লক্ষ ধরণের প্রাণী রয়েছে তাদের নিখুঁত রূপে ঠিক তেমনি বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে সেটি  লক্ষ লক্ষ থাকতে হবে। এটিকে কখনই অবহেলা করা যায় না! বিবর্তন তত্ত্ব নিজেই দাবি করে যে জীবগুলি তাদের বিবর্তনের পর্যায়ে, অসম্পূর্ণ আকারে থাকা অবস্থার শক্তি অবশ্যই একি থাকবে আজ তাদের চূড়ান্ত আকারে অবস্থার।

উপস্থাপক

গামিদি সাহেব, ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে গেল। তারা অসম্পূর্ণ প্রাণী ছিল যারা পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি। ছোট গলার জিরাফ বিলুপ্ত হয়ে গেল। কেবল দীর্ঘ গলারটা রয়ে গেছে।

ঘামিদি:

এগুলি অপূর্ণ প্রাণী ছিল না। একটি অসম্পূর্ণ সত্তা এমন প্রাণীর মতো হবে যা অর্ধেক মাছ এবং অর্ধেক টিকটিকি। এটি একটি সত্তার অপূর্ণতা। ডাইনোসর নিজেই একটি নিখুঁত প্রাণী ছিল। অনেক প্রাণী বিলুপ্তির ব্যাপার  মহাবিশ্বে এখনও অব্যাহত রয়েছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত জনৈক  অংশগ্রহণকারী:
এরিস্টটল বলছিলেন যে মানুষ রক্তের জমাট থেকে তৈরি হয়েছে। কুরআনে ও  এরিস্টটলের এই তত্ত্বের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

ঘামিদি:
কুরআন এ জাতীয় কোন কথা বলে না। কুরআন কেবলমাত্র মানুষ তার জীবনের যে পর্যায়গুলি অতিক্রম করে সংক্ষেপে তা বর্ণনা করেছে। স্পষ্টতই মানুষের জীবন শুক্রাণু কোষ থেকে শুরু হয় যা পরে  রক্ত জমাট বেঁধে এটি জোঁকের মতো জিনিসে পরিণত হয়।

বিভিন্ন পর্যায়ে যাওয়ার পরে মাংস হাড়কে আবৃত করতে শুরু করে। তারপরে এমন সময় আসে যখন ভ্রূণটি সমস্ত দিক দিয়ে একটি নিখুঁত রূপ ধারণ করে।  কুরআনে এই উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি মাটিতে থাকা যে উপাদান থেকে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষের সৃষ্টিতে যে উপাদানগুলি ব্যবহৃত হয় তা পৃথিবীতে বিদ্যমান। এই উপাদানগুলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে যা আজ আমদের কাছে প্রকাশিত হয়েছে।

মানুষের ব্যক্তিত্বের দুটি দিক রয়েছে।

একটি হচ্ছে তার দেহের উপস্থিতি এবং অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত। কুরআন এটিকে দুটি পর্যায়ে উল্লেখ করেছে।

  • প্রথম পর্যায়ে মানুষ পৃথিবীর পেট থেকে সৃষ্টি হয়েছিল
  • দ্বিতীয় পর্যায় হচ্ছে তার বর্তমান  পুরুষ ও নারী প্রজনন তন্ত্রের মাঝে পারস্পারিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ফলে নারীর ডিম্বাণু পুরুষের শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হয় এবং তার অস্তিত্ব লাভ করে। সুতরাং মানুষ সৃষ্টির দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্যাখ্যার সময় কুরআন মায়ের গর্ভে থাকার সময় যে পর্যায়গুলি অতিক্রম করে সে ধাপগুলিকে বোঝায়। কুরআন মানব সৃষ্টির বর্তমান বিকাশের এই স্তরের একটি স্তর উল্লেখ করে বলেছে যে এক সময় মানুষ জমাট বাঁধা রক্ত  আকারে ছিল মায়ের পেটে।

বাস্তবতাটা কী? অবশ্যই আপনি বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করবেন। আমরা বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের মনে ধারণা প্রকাশ করতে অবিরত বিভিন্ন শব্দ রচনা করি। সুতরাং এই শব্দটি মানুষেকে  বিষয়টি বোঝাবার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে তাই বলা হয়েছে যে সেই পর্যায়ে মানুষ ​জমাট বাঁধা রক্তের মতো।

উপস্থাপক
অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে বললেন: ” দয়া করে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করুন”

অংশগ্রহণকারীর একজন প্রশ্ন করলেন:
স্যার, বিজ্ঞানীরা বলেন এ পৃথিবী ৪,৫৫০,০০০,০০০ বছর পুরানো,যখন মানুষ জীবের বয়স মাত্র দুই লক্ষ হাজার বছর। আমার প্রশ্ন: ৪,৫৪৯.৮০০,০০০ এর এই ব্যবধানটি কি কোনও নিখুঁত সৃষ্টির ধারণাটি কাঁপায় না?

ঘামিদি:
নিখুঁত সৃষ্টি বলতে আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন? সর্বশক্তিমান আল্লাহ  কি একমাত্র মানুষকে সৃষ্টি করেছেন? মহা বিশ্বের সমস্ত সৃষ্টিই তাঁর কাছে সমান আর এসব তারই সৃষ্টি। কোটি কোটি বছর আগে এই পৃথিবীর আবির্ভাব হয়েছে কিন্তু তখন তার আগেও আল্লাহর অনেক সৃষ্টি হয়েছিল। মানুষের মতো একটি সৃষ্টি তৈরির সময়ের আগেও ঐ  সমস্ত সৃষ্টি প্রক্রিয়া একটি দীর্ঘ সময় অতিক্রম করেছে। এমন অনেকগুলি সৃষ্টি রয়েছে যা যা এখনও অদৃশ্য, আমাদের মাইক্রোস্কোপগুলি দিয়েও আবিষ্কার করা যায় নি।  আরও অনেক সৃষ্টি রয়েছে যা সম্পর্কে ঐশ্বরিক গ্রন্থ আমাদের কাছে প্রকাশ করেছে যেগুলো আমাদের সৃষ্টির অনেক আগে থেকেই আছে এবং বিদ্যমান ছিল। যেমন ফেরেশতারা আছেন,যেমন অন্যান্য জিনস। আল্লাহর  আল্লাহর  বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কখনই কোন কিছু ছাড়া বা খালি ছিল না।

তবে বিবর্তন প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে আমরা অস্তিত্ব লাভ করেছি। এরপর আমাদের সম্পর্কে আল্লাহ তার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করেছেন। এই মহাবিশ্বের সবকিছু এবং সমগ্র সৃষ্টি প্রক্রিয়াটি কেবল আমাদের নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা বা বিবেচনা করা অবশ্যই সঠিক নয়।

অতি সম্প্রতি একটি দ্বীপ আবিষ্কৃত হয়েছে যার মধ্যে প্রায় দশ হাজার প্রজাতি রয়েছে যা বিশ্বের অন্য কোনও অংশে পাওয়া যায় না। আমরা জানি না যে আল্লাহর কত সৃষ্টি আছে এবং তিনি কীভাবে তাদের সাথে কাজ করছেন। মানুষের নিজের জ্ঞানের সদৃশতায় আল্লাহকে মূল্যায়ন করা উচিত নয় যা খুবই সীমাবদ্ধ।

উপস্থাপক

প্রাচীন গ্রীকরা বলেছিল যে মহাবিশ্ব চারটি উপাদান থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল; আগুন, পৃথিবী, বাতাস এবং জল।

এখন কুরআনও পৃথিবী ও জলের মতো সৃষ্ট উপাদানগুলির রূপককে বোঝায়। এর অর্থ কি এই যে সেমেটিক ধর্মগুলির সৃষ্টি তত্ত্বটি প্রাচীন গ্রীকদের দেওয়া সৃষ্টির তত্ত্বের কেবল একটি বর্ধন (extension )?

 ঘামিদি:
মহাবিশ্বের উপাদানগুলি কী কী? এটি আলাদা একটি আলোচনা। আমরা এখানে  মানুষের সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে আলোচনা করছি। এ প্রশ্নটি একেবারেই আলাদা। এই দুটিই আলাদা বিষয়। কুরআনে সৃষ্টির উপাদানগুলি নিয়ে কোন ব্যাখা দিতে যায়নি বা মানুষ সৃষ্টিতে তার তালিকা  উল্লেখ করেনি। প্রকৃতপক্ষে কুরআন আমাদের যা জানায় তা হচ্ছে মানুষের সৃষ্টি সমুদ্রের তীরে পাওয়া এক ধরণের স্টিকি মাটির থেকে শুরু হয়েছিল যা আমরা কাদা বলতে পারি।

আমরা এটি বর্তমান প্রক্রিয়ার মতোই নিতে পারি। সেই প্রক্রিয়াটি কী? পৃথিবীতে বিভিন্ন উপাদান রয়েছে যা খাদ্য হিসাবে আমাদের দেহের অভ্যন্তরে যায়। এই “মেশিন” এ বিভিন্ন প্রক্রিয়া চলছে। তারপরে একটি ফোঁটা জল তৈরি হয় এবং একটি ডিমও। উভয়ই এক বিশেষ পদ্ধতিতে একত্রিত হয়। দুজনের মধ্যে এই মিলনে একটি ভ্রূণ অস্তিত্ব নিয়ে আসে। এটি বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে এবং একটি জীবিত মানুষের মধ্যে বৃদ্ধি পায়। শরীর সম্পর্কে এই প্রক্রিয়াটি শেষ হতে প্রায় ১২০ দিন সময় নেয়। এখন এটিই আজ প্রজনন প্রক্রিয়া। একই প্রক্রিয়া একবার পৃথিবীর “গর্ভ “তে স্থান পেয়েছিল। অর্থাৎ একই পার্থিব উপাদান যা আমরা আজকে খাবার আকারে দেহের মেশিনে নিয়ে যাই পৃথিবীর মিশ্রণে একসময় উপস্থিত হতে শুরু করে। তারপরে পৃথিবীতে নিজেই তারা আস্তে আস্তে বিভিন্ন পর্যায়ে গিয়েছিল এবং আজকের মতোই একটি সম্পূর্ণ মানুষের রূপে পরিণত হয়েছে এক সময়।

( আমার কথা: এখানে মাটি দিয়ে পুতুল বানিয়ে রুহ ঢুকিয়ে দেয়ার কোন কথা কি আছে কুরআনে?)

অংশগ্রহণকারীর একজনের প্রশ্ন:

তিনটি ভিন্ন জিনিস যা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সাথে মিলিত হয়। প্রথমত, মহাবিশ্বের শুরু (initiation)। দ্বিতীয়ত,পৃথিবীর সূচনা। তৃতীয়ত, পৃথিবীতে জীবনের সূচনা। এগুলি সম্পর্কে আমি বিভিন্ন স্কেলে আপনাকে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করব।

বিজ্ঞান বলে যে মহাবিশ্বটি পঞ্চাশ হাজার কোটি বছর পূর্বে বিশাল মাত্রার এক বিস্ফোরণ থেকে শুরু হয়েছিল। টেকনিকেলি বা প্রযুক্তিগত দিক থেকে আমরা এটিকে “বিগ ব্যাং তত্ত্ব”  হিসাবে উল্লেখ করি। তারপরে ধারণা করা হয় যে এই পৃথিবীটি পাঁচ বিলিয়ন বছর আগে অস্তিত্ব নিয়ে এসেছিল। তার পরে এখানে সরল জীবন অস্তিত্ব লাভ করে। এখন শারীরিক তত্ত্বগুলিও বিবর্তনের তত্ত্ব দেয়। “দ্য বিগ ব্যাং থিওরি” ধারণ করে যে মহাবিশ্ব শূন্যতা থেকে শুরু হয়েছিল। প্রথম একটি দুর্দান্ত বিস্ফোরণ ছোট ছোট কণাকে জন্ম দিয়েছে। তারপরে নিউট্রনগুলি কোয়ার্কের বাইরে এসেছিল, সেগুলি থেকে তাদের এবং তার পরে মহাবিশ্বে পদার্থ বা matter তৈরি হয়।  সুতরাং দৈহিক বিশ্বে বিবর্তনের ধারণাটির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। আপনি কি শারীরিক তথা জীবদেহের বিবর্তনের ধারণাটিকে প্রত্যাখ্যান করবেন?

ঘামিদি:

না আমি বলতে চাই যে কুরআন বিবর্তনকে প্রত্যাখ্যান করে না। যুক্তিবাদী মানুষ বিবর্তনকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। বিবর্তন অব্যাহত আছে। কিন্তু কি ধরণের বিবর্তন ? বিবর্তনের একটি ব্যাখা বা রূপ হল ডারউইন প্রবর্তিত।  কুরআন প্রদত্ত বিবর্তনের ধারণাটি ভিন্ন।

আমি আপনাদেরকেএকটি উদাহরণ দিয়েছি এবং বলেছি যে পঁচিশ বছরের এক যুবক স্বর্গ থেকে নেমে আসে তা নয়। মানুষ তার অস্তিত্বের সময় বিভিন্ন ধাপে অতিক্রম করে। একটি মানুষ তার পরে অস্তিত্ব মধ্যে আসে। প্রশ্নটি হল: বিবর্তনের সঠিক ধারণাটি কী?

আমি বলেছি যে কুরআন আমাদেরকে বলে যে মানুষের সৃষ্টির দুটি ধাপে হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে পৃথিবী একটি মাতৃগর্ভের কাজ করেছিল।

যে প্রক্রিয়াটি বর্তমানে সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায়ে পরিচালিত হচ্ছে তা শুরু হয়েছিল পৃথিবীর কাদা মাটির জমিনে প্রথম। পরে সেটি এমন হয়েছে যেন  আল্লাহ মানুষের দেহে একটি কারখানা স্থাপন করেছেন। সেটি কেবল সেই উপাদান কণাগুলিকেই ব্যবহার করছে যা আমরা খাদ্য হিসাবে পাচ্ছি। এই উপাদানগুলির মধ্যেই সমস্ত রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে যা একটি পানির ফোটা তৈরির দিকে নিয়ে যায় যা থেকে মানুষের সৃষ্টির সূচনা হয়েছিল। পৃথিবী দ্বারা উত্পাদিত খাদ্য ও জল হিসাবে আমরা যে জিনিসগুলি গ্রহণ করি সেগুলি নিয়ে কেন এই পদক্ষেপ পৃথিবীর গর্ভে স্থান নিতে পারে না? কেন এটি মাটির জায়গায় স্থান নিতে পারে না? সেটি এই একই ক্রিয়া ছিল যা পৃথিবীতে প্রথম দিকে হয়েছিল। এটি একই ক্রিয়া। আজ তা ঘটে মায়ের গর্ভে।

এটি পৃথিবীতে সংঘটিত হওয়ার পরে বিবর্তন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল এবং এখন পর্যন্ত একই বিবর্তন প্রক্রিয়াটির মধ্য দিয়ে যায় মানব দেহে। কিন্তু বিবর্তনের এই ধারণাটি আমাদের বিজ্ঞানের বইগুলিতে উল্লিখিত বিবর্তনের চেয়ে পৃথক, যা বিশ্বাস করুন, বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমি দেখছি এটি প্রমাণের জন্য সামন্যতম প্রমাণ সরবরাহ করা হয়নি। যেহেতু এটি একটি মতবাদে পরিণত হয়েছে এবং নাস্তিকতার পুরো ধারণাটি গ্রহন করে বহু লোক আবেগের সাথে এটির সাথে যুক্ত রয়েছে। সুতরাং,এখন এমনকি যখন এটির বিরোধী শক্তিশালী প্রমাণগুলি প্রকাশ্যে আসলে তারা এটিকে গ্রহণ করতে এবং উপযুক্ত পর্যায়ে উপস্থাপন করতে নারাজ থাকে। তবে প্রচলিত ধারণার বাহিরে এসে এই ইস্যুটি নিয়ে অধ্যয়ন করলে আপনাকে চিন্তার খোরাক দিবে। সঠিক বিষয়গুলির কাছে নিয়ে আসবে। আপনি তখন জানতে পারবেন যে এ বিষয়ে কতগুলি ধারণা উপস্থাপন করা হয়েছিল, কতগুলি কাল্পনিক কাঠামো নির্মিত হয়েছিল এবং কতগুলি কাল্পনিক পরিকল্পনা লোকেদের দেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া একটি হাড়ের উপর ভিত্তি করে কত ধরণের যে অসাধারণ কাঠামো তৈরির গল্প হয়েছে আল্লাহ জানেন। পরিশেষে দেখা গেল যে সমস্ত কিছুই বাস্তবের সন্ধান ছাড়াই একটি মিথ ছিল।

এই মুহুর্ত পর্যন্ত পাওয়া জীবাশ্মের সমস্ত (fossil ) রেকর্ড মিসং লিংক বা মাঝাখানের প্রকৃতির সৃষ্টির অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারেনি এমনকি একটি দুর্বল প্রমাণও দেয়া যায়নি। অতএব, যুক্তি দাবী করে যে  যদি এরকম কোনও বিবর্তন হত তবে হাজার হাজার এবং লক্ষ লক্ষ জীবাশ্ম  fossils পাওয়ার কথা ছিল।

রেফারেন্স:
Al-Mawrid –   Theory of Evolution
English Rendition of an episode of the TV Program “Ghamidi”    

 

Facebook Comments

51 জন পড়েছেন

উড়ন্ত পাখি

About উড়ন্ত পাখি

আমি কোন লেখক বা সাংবাদিক নই। অর্ন্তজালে ঘুরে বেড়াই আর যখন যা ভাল লাগে তা সবার সাথে শেয়ার করতে চাই।

Comments are closed.