কোন আলোচনা কী আক্রোশবিহীন ও কুফুরি-বিবর্জিত হতে পারে না?

69 জন পড়েছেন

লেখক ও ফেসবুকার মাসুদ রানা ২৪/০৪/২০২০ তারিখে একটি স্ট্যাটাস দেন। লেখাটির বেশ কয়েকটি স্থানে চুম্বক অংশ পাওয়া যায়। আমার দৃষ্টিতে এর একটি চুম্বক অংশ হচ্ছে এই:

“মুসলমানেরা ‘জানেন’ যে, ‘কুরআনই হচ্ছে সমস্ত জ্ঞানের আধার’ এবং ‘সর্বশ্রেষ্ঠ পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা’র নির্দেশনা। যে-মুসলমান কুরআন পড়তে পারেন ও বুঝতে পারেন, তিনিও ‘জানেন’; যিনি পড়তে পারেন কিন্তু বুঝতে পারেন না, তিনিও ‘জানেন’; এবং যিনি পড়তেও পারেন না, বুঝতেও পারেন না, তিনিও ‘জানেন’। তাদের এই ‘জানা’ বা ‘জ্ঞান’ আসলে তাদের বিশ্বাস। আর, এ-বিশ্বাস এতোই সংবেদনশীল যে, এখানে ন্যুনতম সংস্কার কিংবা ভিন্ন কোনো মত একেবারেই সহনীয় নয়। আমি যদি প্রশ্ন করি, ‘কুরআন নিয়ে যারা দিনরাত গবেষণা করেন, মুখস্থ করেন, আবৃত্তি করেন, ব্যাখ্যা করেন, তা থেকে তারা বর্তমান বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখাসমূহে কী অবদান রাখছেন?’, আমার ধারণা, কুরআন-চর্চাকারীগণ উত্থিত প্রশ্নটি নিয়ে ভাবার চেয়েও ভাবতে বেশি পছন্দ করবেন আমি নাস্তিক কিনা, এবং তার উত্তর খোঁজার চেয়ে বেশি খুঁজবেন আমাকে কষে একটা গাল দেওয়া যায় কিনা। অথচ দেখুন, আমি শুধু প্রশ্ন করেছি” [প্যারাগ্রাফ একত্রিকরণ আমাদের]। রানা সাহেবের স্ট্যাটাস লিঙ্ক।

আমার এ আলোচনার স্থান হচ্ছে তৃতীয় বাক্যে: “আমার ধারণা, কুরআন-চর্চাকারীগণ উত্থিত প্রশ্নটি নিয়ে ভাবার চেয়েও ভাবতে বেশি পছন্দ করবেন আমি নাস্তিক কিনা, এবং তার উত্তর খোঁজার চেয়ে বেশি খুঁজবেন আমাকে কষে একটা গাল দেওয়া যায় কিনা।”
 
আমার এক যুগের ঊর্ধ্বের আন্তর্জালিক অভিজ্ঞতায় রানা সাহেবের কথার যথার্থতা দেখেছি। তিনি যা বলেছেন তার চেয়েও বেশি কঠোর ও হীনমন্য মন্তব্য দেখেছি। কাউকে কাউকে বলতে দেখেছি, ‘আপনি তো অমুক নাস্তিকের মত কথা বলছেন, আপনি প্রকাশ্যে আবার কলিমা পাঠ করুন’, আরও কতকিছু। কিন্তু তাদেরকে কখনও আলোচনা বুঝতে, বা অংশ গ্রহণ করতে দেখিনি।
 
এখানে মজার বিষয় হল কিছু মুসলমান নিজেদেরকে বিশ্ব মুসলিম ও ইসলামের “রিপ্রেজেন্টটেটিভ” হিসেবে দাঁড় করিয়ে তাদের প্রতিপক্ষের মোকাবেলায় আস্তিন আটিয়ে ভাষিক আক্রমণে অবতীর্ণ হন। তারা কোথায় কোন নাস্তিক, কোন হিন্দু, ইসলাম নিয়ে কথা বলেছে, সেটা খুঁজে খুঁজে বের করেন, এবং তাদের বক্তবের স্ক্রিন-শট নেন। তারপর নিজেদের কোন প্লাটফর্মে গিয়ে তাদেরকে ইসলাম বিদ্বেষী, অজ্ঞ-মূর্খ, এবং কখনো গালাগালিসহ নিজেদের বিদ্বেষ ও মনের আক্রোশ উজাড় করেন। আমি অনেক বক্তব্য এমন দেখেছি যে ওখানে আদপে কোন ইসলাম বিদ্বেষ নেই, বরং যা আছে তা হল ইসলাম সমালোচনা। এখন প্রশ্ন হল সারা দুনিয়ার মানুষ কী কেবল ইসলামের প্রশংসা বাণী কীর্তন করতে হবে? প্রশংসার বাইরে যা, তার সবই কী বিদ্বেষ বলে বিবেচিত হবে?
 
মুসলিম বিশ্ব অসংখ্য দলে বিভক্ত। তাদের এক দল আরেক দলকে বিষদগার করেন, কেউ কেউ কুফরি ফতোয়াও দেন। মুসলিম বিশ্বে অস্ত্রধারীরাও রয়েছেন, এবং একে অন্যের বিপক্ষে অস্ত্রও ব্যবহার করেন। ধর্মীয় দলসমূহের অনেক অবস্থান পারস্পারিকভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে কারা কীভাবে মুসলিম বিশ্বের রিপ্রেজেন্টেটিভ হন? তারপর বাস্তবতা সামনে রাখলে ইসলাম ধর্ম বলতে একক কোন বাস্তবতা প্রতিভাত হয় না, বরং ৭৩ দলে বিভক্ত বাস্তবতার  বহিঃপ্রকাশ অর্থাৎ অসংখ্য ইসলাম। এক্ষেত্রে তারা কোন ইসলামের রিপ্রেজেটেন্টিভ হন এবং কে বা কারা তাদেরকে সেই রিপ্রেজেন্টেশনের দায়িত্ব দেন?  সেটাই প্রশ্ন।
 
তারপর তারা যে গালাগালি, উষ্মা, পালটা-বিদ্বেষ প্রকাশ করেন, সেটা ৭৩ দলের কোন পক্ষের রিপ্রেজেন্টেশন? তারা যাদেরকে নিয়ে পালটা-প্রচারণা চালান, যাদেরকে ইসলাম বিদ্বেষী বলে উল্লেখ করেন, তাদেরকে যদি কেউ হত্যা করে বসে, তবে এর দায়-দায়িত্ব কার হবে? ইসলাম ধর্মের ইতিহাসে এমন হত্যার নজির কি কম রয়েছে?
 
হ্যাঁ, এটা সত্য যে এই মানব সমাজে বিদ্বেষী রয়েছে: হিন্দু, খৃষ্টিয়ান, ইয়াহুদী, নাস্তিকদের মধ্যে যেমন বিদ্বেষ পাওয়া যায়, তেমনি মুসলিমদের মধ্যেও হিন্দু, খৃষ্টিয়ান, ইয়াহুদী, নাস্তিক বিদ্বেষ পাওয়া যায়, বরং মাত্রার দিক দিয়ে হয়ত দুই চামচ বেশিও পাওয়া যেতে পারে। এমতাবস্তায় পাল্টাপাল্টি বিদ্বেষ, আক্রোশ, তির্যা বা গালমন্দ করার কারণে কি সেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? 
 
তারপর স্ব-প্রণোদিত এই রিপ্রেজেন্টেটিভদের অনেকই বিরল প্রকৃতির মানুষ। তারা যে সাইটে বা যেখানে তথাকথিত বিদ্বেষ পান, সেখানে কোন আলোচনা না করে স্ক্রিন-শট নিয়ে নিজেদের সাইটে গিয়ে বিশদগার করেন। এখানে কী যুক্তি প্রকাশ পায়? হ্যাঁ, যে সাইটে প্রতিপক্ষ কথা বলতে দেন না, সেটা আলাদা, কিন্তু সবাই এমন নয় যে কথা বলতে দেন না। তারপর ফেসবুকে প্রতিপক্ষ হলেও প্রায়ই কথা বলার অবকাশ থাকে।
 
আমার মনে হয় মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত আবেগের ঊর্ধ্বে না উঠবে, বস্তুনিষ্ঠভাবে চিন্তা না করবে, যতদিন পর্যন্ত নিজেদের ধর্মের কুয়োর ব্যাঙ হয়ে থাকবে এবং অপরের কোন যুক্তি, কোন উপস্থাপনা, অন্যদের জ্ঞান-বিজ্ঞান শান্ত-মাথায় বিবেচনা না করবে, ততদিন পর্যন্ত এই ধর্মীয় বিদ্বেষের সমাধান নেই।
Facebook Comments

69 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.