প্রোটো ধর্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম

325 জন পড়েছেন

আপনি যদি কোন মাল্টি-নেশনাল কোম্পেনীতে কিছুদিন কাটান সেখানে দেখতে পাবেন নানান সমাজের, নানান ধর্মের, নানান জাতির লোক কাজ করছে। বড় বড় আন্তর্জাতিক শহরগুলোতেও সেই একই অবস্থা। সকলের সার্বিক জীবন ও নৈতিকতার দিকে তাকান। দেখবেন সবাই মন্দ কাজকে মন্দই মনে করে, অন্যায়কে অন্যায় মনে করে। চুরি, ডাকাতি, বদমায়েশি ইত্যাদিকে সবাই অপছন্দ করে। এই ধরণের নৈতিকতা সকলের মধ্যে পাবেন। স্কুলে গিয়ে দেখুন সকলের বাচ্চারা পড়াশুনা ও খেলাধুলা করছে –তারা একে অন্যের বন্ধু। হাসপাতালে গিয়ে দেখুন ওখানে সবাই একে অন্যকে সেবা দিচ্ছে।

এখানে এই যে নৈতিকতা যা সবাই সমানভাবে শেয়ার করছে, যার মাধ্যমে তাদের পারস্পারিক মানবতাবোধ প্রকাশ পাচ্ছে, ভালবাসা প্রকাশ পাচ্ছে এটাই হচ্ছে মানুষের প্রোটো ধর্ম বা আদিম কাল থেকে চলে আসা ধর্মীয় অনুভূতি। এখানে তারা যে এক জাতি, মানব জাতি, এই বাস্তবতাই প্রকাশিত।

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম হচ্ছে সমাজে কালের ধারায় প্রোটো ধর্ম থেকে আলাদা করে যেসব নতুন নতুন ধর্মীয় ব্রান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেগুলো যেমন ইসলাম, খৃষ্টিয়ানিটি, ইয়াহুদী, বৌদ্ধ, হিন্দু, জৈন ইত্যাদি। এদের মধ্যে কিছু ধর্ম অহিংস এবং কিছু সহিংস। জৈন ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম এগুলো অহিংস অর্থাৎ এই ধর্মগুলোর প্রচারকদের মুখ দিয়ে হিংসা, মারামারির বাণী প্রকাশ পায় নি।

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের রূপ আবার তিন ভাগে বিভক্ত বা রূপায়িত। সামাজিক, গ্রন্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক। সামাজিক রূপটি হচ্ছে এই যে সমাজের মানুষ সামাজিকভাবেই ধর্মের সাথে সংযুক্ত। তারা গ্রন্থে কী আছে, কী নাই তার কোন গভীরে নেই। গ্রন্থে কোথাও পরধর্ম হিংসা, মানবিকতার অভাব ও যৌক্তিক বেমিল থাকলেও  সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করে না। সকলের সাথে মিলে-ঝোলে চলার চেষ্টা করে এবং তাদের ধর্মে হিংসা-বিদ্বেষ থাকলেও সেগুলো বেমালুম অস্বীকার করে যায়। বলে আমাদের ধর্মে এগুলো নাই। বিশ্বাসের একটি শক্ত স্থান হল এই যে বিশ্বাসী যা বিশ্বাস করে তার উল্টোটা সে মানবেই না। আপনি তার গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে দেখালেও না। এই জিনিসটা আবার ভাল। প্রাচীন ধর্মগুলোতে হিংসা-বিদ্বেষের কথা থাকলেও সেগুলো গ্রন্থেই থেকে যাচ্ছে, সাধারণ সমাজে বিস্তৃতি কম পাচ্ছে।

ধর্মের গ্রন্থিক রূপে হিংসা বিদ্বেষ পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষ গ্রন্থ-কালীন  অর্থ অধ্যয়নে যায় না, কেননা সেটা দীর্ঘ কালের বিষয় এবং অনেক টেকনিক্যালিটি থাকে। গ্রন্থকে গ্রন্থিকগণ পাঠ করেন, তারা গ্রন্থের শিক্ষা লাভ করেন, শিক্ষা দেন এবং তারাই ধর্মের প্রচারক হন। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রতিষ্ঠা লগ্নে সেগুলো সেদিনের রাজনীতির সাথেও জড়িত ছিল। কিছু ধর্ম সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয়। রাষ্ট্রীয় আদর্শকে ধর্মযাজক এমনভাবে প্রচার করেছেন যেখানে সাম্প্রদায়িকতা, হিংসা-বিদ্বেষ, কাল্টিজম সবই রাষ্ট্রধারায় প্রকাশ পেয়েছে এবং সেই আদর্শকে গ্রন্থিকগণ তাদের শিক্ষা ও ব্যাখ্যা ধারায় চালিয়ে নেন। কোন কোন ধর্মযাজক উপাস্য হয়ে বসে আছেন, তাদের গ্রন্থও কখনো উপাস্য হয়ে থাকে। এগুলো দেখতে অন্য ধরণের পাঠের প্রয়োজন, অন্য দৃষ্টিতে দেখার প্রয়োজন হয়।

আজকের হিন্দু ধর্ম, ইসলাম ধর্ম, খৃষ্টিয়ান ধর্ম এগুলো থেকে আসা মানবমন্ডলী ‘সমাজ-ধর্মের’ লোক। একজন সাধারণ মুসলিম কোরানে কী আছে বা নাই সেসবের পুঙ্খানুপুঙ্খরূপ জানে না। সে পৈতৃকসূত্রে বিশ্বাসী। মা-বাপ ও সমাজ বলে কোরান আল্লাহর কালাম, তাই সেও স্বীকার করে এটা আল্লাহর কালাম – ১৪০০ বছর ধরে তার সমাজ এটাকে এভাবেই মেনে আসছে তাই সামাজিক দৃষ্টিতেও এটা আল্লাহর কালাম। সাংস্কৃতিক দৃষ্টিতেও। সমাজের অনেক সত্য এভাবেই চলে। ধরুন আমি বললাম, ‘আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয় এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।’ কিন্তু যে সত্যের সাক্ষ্য দিলাম, আমি কি দেখে, জেনে, বুঝে বা পঞ্চেন্দ্রিয়ে সনাক্ত করণের মাধ্যমে এই ‘সাক্ষ্য’ দিলাম? যদি না হয়ে থাকে, তবে আমার মনের দিক থেকে তা সত্যের সাক্ষ্য হয় কীভাবে? কিন্তু ধর্মীয় বাস্তবতায় সেসবের এত চুলচেরা হিসাবের দরকার নেই। সবাই যা বলে আমিও তা বলি। সমাজের দশ জনও তাই বলে। এই হচ্ছে সামাজিক ধর্ম। এই ধর্মই ব্যাপকভাবে প্রচলিত ধর্ম এবং এটিই পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত –’পৈতৃক ধর্ম’।

পৈতৃক ধর্মই আমাদের পরিচিতির অংশ। এটা জন্মগতসূত্রে প্রাপ্ত যেমন আপনার নাগরিক অধিকার, ভাষিক অধিকার। আপনি ইচ্ছে করে কোন ধর্মে জন্ম গ্রহণ করেননি, কোন জাতিতে বা ভাষায় বা ভূখণ্ডে জন্মেননি। তাই এই পরিচিতিগুলো কেউ কেড়ে নেবার অধিকার রাখে না। আপনি পৈতৃক সূত্রে যা কিছু প্রাপ্ত হন, তার মধ্যে ভাল-মন্দ, ভুল-শুদ্ধ, সুন্দর-অসুন্দর সবই থাকতে পারে। আপনার পিতার সূত্রে প্রাপ্ত বাড়িটিতে অনেক সমস্যা আছে বললে অন্যরা আপনাকে বাড়ী থেকে বের করে দেওয়ার অধিকার রাখে না। ঠিক তেমনি কেউ আপনার নাগরিকত্ব কেড়ে নেবার অধিকার রাখে না। এগুলো আন্তর্জাতিক আইনে প্রতিষ্ঠিত।

আজকের মানুষ ধীরে ধীরে প্রোটো ধর্মের দিকে এগুচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। যেসব ধর্মের মধ্যে মৌলবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠে এবং সন্ত্রাস দেখায়, এককালে সেগুলো হয়ত ঝিমিয়ে যাবে। মানুষ আবার সেই পুরাকালের মানবতায় ফিরে যাবে, যদিও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলোও থাকবে। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের আগেও মানুষ খোদাতে বিশ্বাস করত, খোদার পথে চিন্তা সাধনা করত, এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের পরও সেটা এখনো চলে আসছে এবং চলবেও। খোদা হচ্ছেন এমন এক সত্তা যিনি সকলের। তিনি সাম্প্রদায়িক হবেন, এক দল দিয়ে আরেক দলের রক্ত ঝরাবেন, পাক্ষিকতা দেখাবেন, দলীয় খোদা হয়ে হিংস্রতা দেখাবেন –এসব প্রোটো ধর্মের যুক্তিতে নেই। তাই মানুষ নানান ধর্মীয় হয়েও শান্তিকামী হোক,  জগতের খোদার চিন্তা করুক, তার ও খোদার মধ্যে আধ্যাত্মিক সূত্র খুঁজুক –এটাই যেন হয় একবিংশ শতাব্দীর মানবসভ্যতার ধর্মীয় প্রেরণা।

নোট: প্রোটো ধর্ম বলতে যা বলার চেষ্টা করা হয়েছে তা হল প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা  মানুষের মানবিক অনুভূতি ও এটিটিউড। মানুষ নানান জাতি গোষ্ঠীতে বিভক্ত থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন অনুভূতি সর্বত্র পাওয়া যায়। প্রোটো ধর্ম বলতে এই বাস্তবতাকে বুঝানো হচ্ছে, আলাদাভাবে ব্রান্ডিং-করা কোন ধর্মের কথা নয়।

—অন্যান্য —

দেওয়ানবাগী ও সামাজিক সত্যের এপিঠ ওপিঠ

স্রষ্টা ও সৃষ্টির একক সম্পর্ক

কোন আলোচনা কী আক্রোশবিহীন ও কুফুরি-বিবর্জিত হতে পারে না?

মানবাধিকার ও সভ্যতা

দোয়া ও ধর্ম

ধর্মীয় সত্য প্রচারে কী মিথ্যার সংমিশ্রণ হতে পারে?

এনলাইটনমেন্ট: গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা

Facebook Comments

325 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.