(২য় পর্ব) স্রষ্টার অস্তিত্বে ঐশ্বরিক যুক্তি

78 জন পড়েছেন

এবার আসুন কুরআনের বক্তব্য ও ভাষাকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি।

আপনি যদি কোন অবিশ্বাসীকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কৃতিত্বের ব্যাখ্যা দিতে বলেন এবং  যদি তিনি মোহাম্মদ (স:) এর নবী হওয়ার দাবিতে বিশ্বাস না করেন তখন তিনি সম্ভবত আমাদের নবী মোহাম্মদ (স:) সম্পর্কে আপনাকে এরকম একটি ধারণা দিতে পারেন যে,” মোহাম্মদ (স:) নিরক্ষর হলেও তখনকার আরবে মৌখিক সংস্কৃতির সেই যুগে  যেহেতু তিনি  খুবই বুদ্ধিমান ও প্রতিভাবান একজন ব্যক্তি ছিলেন তাই তার পক্ষে কোরআন রচনা করা তেমন কঠিন কাজ ছিল না”!  তবে প্রতিভাবান ব্যক্তিদের প্রকৃতি কেমন হয় তা আমরা জানি:

এ পৃথিবীর সকল প্রতিভাবানদের শেখার,জানার এবং জ্ঞান জগতে উচ্চশিখরে পৌছার একটি সাধারণ প্যাটার্ন থাকে। তাঁরা শিখে এবং জ্ঞান অর্জন করে তাদের ধারণাগুলি উপস্থাপন করে এবং আরও চিন্তা গবেষণা করে যখন জানতে পারে যে পূর্বে যা উপস্থাপন করেছিল বা জানত তার সবকটিই সঠিক ছিল না। তাই এটি সবসময়ই দেখা যায় যে তাদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এসব Talented বা প্রতিভাশালীরা তাদের অতীতের অভিজ্ঞতাগুলি থেকে শিখছেন এবং ফলস্বরূপ নিজেকে সংশোধন করছেন। যদি কখনও এই সাধারণ শেখার ধরণটি ব্যতিক্রম হতে দেখা যায় তবে তা কেবল নবীদের ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ,শেষ নবীজীর জীবনের প্রথম চল্লিশ বছরে কেউ তার কাছ থেকে জীবন দর্শন বিষয়ে তেমন কোন বুদ্ধিদীপ্ত সাফল্য লক্ষ্য করেছে বলে জানা যায়নি অথচ জীবনরে চল্লিশতম বছরে এসে তিনি হঠাৎ এমন একটি বার্তা নিয়ে এসেছিলেন যা পরবর্তী তেইশ বছর ধরে তিনি ধারাবাহিকভাবে তা অব্যাহত রেখেছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। কুরআনে বলা হয়েছে:

“এরা কি লক্ষ্য করে না কোরআনের প্রতি? পক্ষান্তরে এটা যদি আল্লাহ ব্যতীত অপর কারও পক্ষ থেকে হত, তবে এতো অবশ্যই বহু বৈপরীত্য দেখতে পেত। [ সুরা নিসা ৪:৮২ ] …

স্বাভাবিক কারণেই মানুষের জীবনে মাঝে মধ্যে অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায় কেননা তার শিখতে এবং উন্নতি করতে সে ধারা অবিরত থাকতে হয়। তবে আপনি এমন কারও কাছ থেকে যদি কোন বার্তা পান যিনি ইতিমধ্যে চূড়ান্ত অসীম জ্ঞানী, যার জ্ঞানের তুলনা হয়না ফলে আর কোনও উন্নতির দরকার হয়না বা তার ধারণাগুলি কখনই পরিবর্তিত হবে না এবং সেটি সম্ভব এক মাত্র আল্লাহর। উপরের আয়াতটি ঠিক একথাটিই উল্লেখ করছে।

এখানে  আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে ৪০ বৎসর  যে সমাজে  বাস করেছেন সেখানে কোরআন যে বিষয়ের অবতারণা করেছে সে সম্পর্কে বা সে বিষয়ের কোন কথাবার্তা,আলোচনা বা কোন পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন বলে জানা নেই, যা কুরআন রচনায় প্রস্তুতি হিসাবে চিহ্নিত করা যায়! এর কোন বাস্তব প্রমাণ মিলে নাই এবং এরকম কোন কিছুর বিন্দুমাত্র ঐতিহাসিক গ্রহণযোগ্য তথ্য বা ভিত্তি নাই!

এ পৃথিবীর যত বড় বড় লেখক কবি সাহিত্যিক যারাই হন না কেন যখনই তারা খ্যাতির উচ্চ মার্গে পৌঁছে যান তখনই মানুষ তার অতীত ইতিহাস সামনে নিয়ে আসে তার প্রতিভা ও  জ্ঞানের  উৎস ও অনুঘটক নিরূপণে, যাতে তারা বুঝতে পারে এ সাফল্যের পিছনে কি ছিল? কোরআনের মত একটি গ্রন্থ রচনায় মোহম্মদ (স:) এর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আগে থেকে নিজের প্রচেষ্টা হতে পারে বলে সন্দেহ করলে কিছু পাওয়া যাবে ভাবলে হতাশা ছাড়া উপায় নাই কেননা এ ব্যাপারটি তার বেলায় একেবারে শূন্য!

অতএব কোরআনের মত এত বলিষ্ঠ এক অসাধারণ বর্ণ সামঞ্জস্য ও ছন্দের ঐকতান সম্বলিত একটি গ্রন্থ যা মানুষের জীবন মৃত্যু, তার সত আচরণ, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সমাজ সংস্কারের নির্দেশনা, পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য, মহাকাশ ইত্যাদি বিষয়ের তথ্যসহ কথাবার্তা,একজন নিরক্ষর ব্যক্তি ব্যক্তির কাছ থেকে আসতে পারেনা কোন ধরণের পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া। তা কখনোই সম্ভব নয় যদি তাঁর সাথে মহান স্রষ্টার সাহায্য ও পথপ্রদর্শন না থাকে ।  তাই তো বলতে হয় কোরআন একমাত্র মহান আল্লাহরই কালাম এতে কোন সন্দেহ নাই!

আসুন এ বইয়ের বার্তার আরেকটি দিক নেয়া যাক।

কুরআনের মূল বিষয় হিদায়াত বা গাইড করা,মানুষকে তার মানবিক গুণে গুণান্বিত করা, অন্যের উপকার করা ও পরমত সহিষ্ণুতা বজায় রেখে পৃথিবীতে শান্তি স্থাপন করা। তাছাড়া কুরআন প্রকৃতি, নক্ষত্র, মহাসাগর, মানবিক অস্তিত্ব, আত্মার পরিশুদ্ধি , মানব দেহ,বৃষ্টিপাত ইত্যাদির ঘটনা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে কুরআনে বর্ণিত বেশিরভাগ তথ্য বিজ্ঞানের দ্বারা সাম্প্রতিক সময়ে পুরোপুরি অনুসন্ধান করা হয়েছে নিজস্ব অভিজ্ঞতামূলক পদ্ধতির ভিত্তিতে। গত ১৪০০ বছর যাবত এই বইটিতে কোনও পরিবর্তন হয়নি, তবে পৃথিবী তখন থেকেই অনেক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। কুরআনে বর্ণিত বেশিরভাগ তথ্য বিজ্ঞানের দ্বারা নিজস্ব অভিজ্ঞতার পদ্ধতির ভিত্তিতে সাম্প্রতিক সময়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে। গত কয়েক শতাব্দী ধরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটেছে যা দুই শতাব্দী আগেও জানা ছিলনা। তাই সে সময়ের রচিত বিজ্ঞানের বইয়ের তথ্য আজ কেবল তখনকার মানুষের অজ্ঞতার স্বাক্ষী বহণ করে বলাকে উপযুক্ত বলে বিবেচিত হচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে চৌদ্দ শতাব্দীর আগে অবতীর্ণ কোরআনের ব্যাপারে এটি আশ্চর্যজনকভাবে ভিন্ন দেখা যায়! আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা আবিষ্কার করা তথ্যগুলির সাথে সামঞ্জস্যতা (বা এর অভাব) সন্ধান করার জন্য এই বইটি বেশ কয়েক জন ব্যক্তি অনুসন্ধান করেছেন।  উদাহরণস্বরূপ এই জাতীয় মাত্র দুজন গবেষকের ফলাফল নীচে দেওয়া হল:

ফরাসী বিজ্ঞানী মরিস বুকাইল তাঁর বইয়ের নাম দিয়েছেন ‘বাইবেল, কোরআন এবং বিজ্ঞান’। তিনি বিজ্ঞান দ্বারা আবিষ্কৃত সর্বশেষ প্রতিষ্ঠিত তথ্যগুলিকে (নিখুঁত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব যা এখনও অপ্রমাণিত হয়নি) ঐশ্বরিক দাবী করা প্রচলিত ধর্মীয়  বইগুলির বিষয়বস্তুর সাথে তুলনা করার চেষ্টা শুরু করেছিলেন। বুকাইল পরে স্বীকার করেন  যে একজন খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী হিসাবে তাকে  বলা হত বা বিশ্বাস করানো হত যে কুরআন মূলত বাইবেলেরই নকলকৃত সংস্করণ বা বাইবেলের তথ্য নকলকরা ধর্মপুস্তক।

কিন্তু তিনি যখন ওল্ড টেস্টামেন্টের ভিতরের বক্তব্য ও বিষয়গুলি পর্যালোচনা করলেন সেখানে দেখতে পেলেন যে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কৃত কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত তথ্যের সাথে বাইবেলের তথ্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। একিভাবে নিউ টেস্টামেন্ট সম্পর্কে একই পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন।

যাইহোক,এব্যাপারে তিনি যখন কুরআন সম্পর্কে কথা বলছিলেন তখন তিনি স্বীকার করেন যে কোআন থেকে এমন একটি আয়াতও বেছে নিতে পারেননি যা বিজ্ঞানের সর্বশেষ আবিষ্কৃত তথ্যের সাথে সাথে সাংঘর্ষিক বা তার বিরুদ্ধে পরিষ্কারভাবে কথা বলছে। প্রকৃতপক্ষে,তাঁর মতে কুরআনে জড়জগৎ সম্পর্কে এমন কিছু আয়াত রয়েছে যা তাকে আলোকিত করেছে এবং যা তিনি ইতিমধ্যে আধুনিক বিজ্ঞানের বিপুল গবেষনায় অবহিত হয়ে ছিলেন। তাই পরে যখন তিনি মুসলিম হয়ে গিয়েছিলেন স্বভাবতই সেটি আশ্চর্যের বিষয় ছিলনা ।

দ্বিতীয় যে ব্যক্তির কথা বলা যেতে পারে ইনি হচ্ছেন প্রফেসার কিথ এল মুর, একজন ভ্রূণতত্ত্ববিদ যার  লিখা বইটি উত্তর আমেরিকার কয়েকটি মেডিকেল কলেজে পাঠ্যপুস্তক হিসাবে ব্যবহৃত হয়। একদিন তিনি কুরআন পড়তে বাধ্য হয়েছিল যখন কয়েকজন আরব ছাত্র তাকে অবাক করে দিয়েছিল, এই বলে যে ভ্রূণতত্ত্ব সম্পর্কিত তাঁর সর্বশেষ আবিষ্কারগুলিতে যা তিনি বর্ণনা করছিলেন তারা সে বিষয়ে আগেই জানত! ছাত্ররা তাকে বলেছিল যে তাদের তথ্যের উৎস ছিল কোরআন – চৌদ্দশো বছরের পুরনো বই! তার পর নিজেই বইটি পড়ার পরে তিনি বলেছিলেন যে আপনি যদি কুরআন পড়ে থাকেন তবে দেখতে পাবেন এমন বেশ কিছু প্যাসেজ রয়েছে যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভ্রূণবিদ্যার সাথে জড়িত তথ্যের উল্লেখ করে থাকে। এই সমস্ত অনুচ্ছেদগুলি মানব প্রজননে জড়িত ঘটনাগুলি বর্ণনা করার ক্ষেত্রে নির্ভুল,যার বেশিরভাগই সম্প্রতি বিজ্ঞান সন্ধান পেয়েছে। এ বিষয়ের একটি সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে যখন বলা হয়েছিল যে সম্ভবত মুসলমানরা তাঁকে বোকা বানিয়েছে? জবাবে তার বক্তব্য ছিল যে কুরআনে বর্ণিত কিছু তথ্য বোঝার ক্ষেত্রে যা অন্তর্ভুক্ত তা খালি চোখে দেখা যায় না; এটি কেবল একটি মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমেই এই তথ্যগুলি উপলব্ধি করা যায়। আর তিনি বলেন,’আমাকে বলবেন না যে মুসলমানরা প্রায় ১৪০০ বছর আগে একটি মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কার করেছিল”। আমেরিকার
University of Illinois এর এক সম্মেলন কক্ষে, ১৯৯০ সালে তিনি কিছু  বক্তব্য রাখেন নিচের ভিডিওতে শুনতে পাবেন:

মানুষের পক্ষে তার বাপ দাদার ধর্ম ছেড়ে দেয়া এত সহজ নয়। তবে এ আবিস্কারের ফলে অতি উৎসাহী মুসলিমদের কাছে প্রফেসার কিথকে এখন বিভিন্ন শহরে  জবাব দিতে হয়  তিনি কেন মুসলিম হচ্ছেন না? জানিনা সে জন্যই হয়তবা ইদানিং পশ্চিমা দেশে কুরআনের  উপর প্রফেসার কিথ মুরের বক্তব্য বেশ বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে এবং বিষয়টিকে ঘোলাটে করে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে! যাক সে আরেক বিষয়।

তবে এই পুরো আলোচনায় যা বুঝতে হবে তা হ’ল কোরআন কোন  বিজ্ঞানের বই নয়। তার পরিবর্তে এটি একটি হিদায়েতের তথা গাইডেন্স বুক যেমন মানুষকে অহংকারী না হয়ে নম্র ভদ্র হওয়ার জন্য নির্দেশনা দেয়। এর কিছু অনুচ্ছেদে মানুষকে আহ্বান করে চিন্তা করার জন্য যে মানুষ কোথা থেকে জন্মলাভ করেছে এবং তার বর্তমান অস্তিত্বের রূপটিতে আসতে তাকে কি কি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়েছে। এই সমস্ত পর্যায়ের বর্ণনা দেওয়ার সময়,বইটির বিবরণ উল্লেখযোগ্যভাবে সঠিক। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানও সেটিকে সঠিক প্রমাণ করেছে।

এই নির্ভুলতার একমাত্র যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা হতে পারে যা একজন মুসলিম স্কলার যথার্থই বলেছেন, “কুরআন হ’ল আল্লাহর বাণী এবং আধুনিক বিজ্ঞান যে বাস্তবতা আবিষ্কার করেছে সে সমস্তই কিছুই আল্লাহর কাজ।

উপরে বর্ণিত আধুনিক বিজ্ঞান ভিত্তিক টেকনিক্যাল যুক্তিগুলি বাদ দিয়ে,একজন সাধারণ মানুষের জন্যই কুরআনে এমন একটি আয়াত রয়েছে যাতে অসাধারণ লক্ষণীয় কিছু প্রকাশ পায় এবং  চিন্তার খোরাক জাগায় যার ব্যাখ্যা একমাত্র ঐশ্বরিক যুক্তি ছাড়া বুঝা অসম্ভব।

কোআন আমাদেরকে জানায় যে ফেরাউন (মিশরের রাজা) যিনি মূসা (আ:) এবং যখন তাঁর সাহাবীদের অনুসরণ করেছিলেন তখন ডুবে যাওয়ার সময়, মহান আল্লাহ পাক তাকে এই ভাষায় সম্বোধন করেছিলেন:

“সুতরাং আজকের দিনে রেখে দিচ্ছি আমি তোমার দেহকে যাতে তোমার পশ্চাদবর্তীদের জন্য নিদর্শন হতে পারে। আর নিশ্চয়ই মানবজাতির অনেক লোক আমার নিদর্শনাবলীর প্রতি লক্ষ্য করে না।“ [ সুরা ইউনুস ১০:৯২ ]

এই আয়াত নাযিল হওয়ার ১৩০০ বছর পরেও ফেরাউনের লাশের কোনও চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটি কেবল সম্প্রতি (উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বা বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে) সে মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। ইউরোপ হয়ে আমেরিকা ভ্রমণ করার পরে,এটি মিশরে ফিরে এসে জনসমক্ষে প্রদর্শনের জন্য এখন সে দেশের জাদুঘরে রাখা আছে ।

এখানে কথা হচ্ছে তার দেহটির সন্ধান পেয়ে কেবল সে ভবিষ্যতবাণী প্রমাণ করেননি যে “তাঁর দেহ রক্ষা করা হবে” বরং সে কথাও প্রমাণিত হয় যে, “নিশ্চয়ই মানবজাতির অনেক লোক আমার নিদর্শনাবলীর প্রতি লক্ষ্য করে না।” বাস্তবে আমরা এ উভয় বাক্যের সত্যতা দেখতে পাচ্ছি।

সত্যি বলতে কি বাইবেল যেহেতু এই জাতীয় ঘটনা উল্লেখ সম্পূর্ণরূপে মিস করেছে, তাই সেই সমস্ত ইহুদি ও খ্রিস্টানরা যারা কুরআনকে ‘বাইবেলের চুরির সংস্করণ’বলে থাকেন তাদের এখন উচিৎ  কুরআনের দাবিকে আরও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা।

আসুন এখন তৃতীয় যুক্তি অর্থাৎ পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলির ভবিষ্যদ্বাণী গ্রহণ করি। কুরআন আমাদের অবহিত করে যে আল্লাহর নবীদের মধ্যে অনেকেই তাদের পূর্ববর্তী নবীগণের ভবিষ্যদ্বাণীর দ্বারা বর্ণিত হওয়ার পরে এসেছেন। কোন নবীরাই সাধারণত হঠাৎ আশ্চর্য এক আগুন্তক হয়ে উপস্থিত হতেন না। তারা এমন একটি পরিবেশে এসেছেন যেখানে অন্তত ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন লোকেরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। সর্বশেষ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষেত্রে এটি আলাদা ছিল না। কুরআন আমাদের বলে যে ইহুদি এবং খ্রিস্টানরা  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে (নবী হিসাবে) চিনতে পেরেছে যেমন তারা তাদের নিজস্ব সন্তানদের চিনত:

আমি যাদেরকে কিতাব দান করেছি, তারা তাকে চেনে, যেমন করে চেনে নিজেদের সন্তানদেরকে। আর নিশ্চয়ই তাদের একটি সম্প্রদায় জেনে শুনে সত্যকে গোপন করে। [ সুরা বাকারা ২:১৪৬ ]

আরেকটি সুরায় কোরআন বলে:

স্মরণ কর, যখন মরিয়ম-তনয় ঈসা (আঃ) বললঃ হে বনী ইসরাইল! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রসূল, আমার পূর্ববর্তী তওরাতের আমি সত্যায়নকারী এবং আমি এমন একজন রসূলের সুসংবাদদাতা,যিনি আমার পরে আগমন করবেন। তাঁর নাম আহমদ। অতঃপর যখন সে স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে আগমন করল, তখন তারা বললঃ এ তো এক প্রকাশ্য যাদু। [ সুরা সফ ৬১:৬ ]

অবশ্যই  এসব কথা সে ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না যে এখনও বিশ্বাসই করে না যে কোরআন আল্লাহর বাণী। সুতরাং,এটি গুরুত্বপূর্ণ যে বাইবেলকে যেহেতু ইহুদি এবং খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে আল্লাহর বাণী হিসাবে তাই বাইবেল থেকে কোরআনের সে দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা উচিত।

বাইবেল আসলে একসাথে কয়েকটি বইয়ের সংগ্রহ যা খ্রিস্টানদের দাবি ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণায় রচিত। বাইবেলের কিতাবগুলো দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রাক-যিশু বাইবেল, ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং যীশু-পরবর্তী বাইবেল নিউ টেস্টামেন্ট নামে পরিচিত। যদিও ইহুদীরা  কেবলমাত্র ওল্ড টেস্টামেন্টে বিশ্বাস করে, খ্রিস্টানরা উভয়টিতে বিশ্বাস করে। আজ অরিজিনাল বাইবেলের অনেক কিছুতে পরিবর্তন হলেও বাইবেলের কিছু বাক্য এখনও কোরআনের উপরোক্ত দাবী নিশ্চিত করে।

ওল্ড টেস্টামেন্টে ডিউটারোনমি (পঞ্চম বই) বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ রয়েছে যা এইভাবে বলে:

“আমি তাদের জন্য তাদের ভাইদের মধ্য থেকে তোমার মত একজন প্রফেটের উত্থাপন করব। আমি আমার কথা তার মুখ দিয়ে বলাব এবং তিনি তাঁর আদেশ অনুসারে সমস্ত কিছু বলবেন। যদি কেউ আমার নামে যে কথা সে বলবে তা না শুনে তবে আমি নিজেই সে হিসাব তার কাছে নিব।” (18:18)

বাইবেলের এই বিশেষ বানীতে স্পষ্টতই এমন একজনের আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী দেওয়া হচ্ছে যিনি পরে আসছেন। আমরা যদি এই বাক্যগুলোর পাঁচটি বিশেষ কথার অংশকে যত্ন সহকারে বিশ্লেষণ করি, তখন আমরা দেখতে পাই যে সেগুলি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিত্বের সাথে ঠিক মিলে গিয়েছে। (সে ব্যাখা এখানে দেখেন)

পরিশেষে এক কথা বলা যায় যে শেষ নবী মোহাম্মদ(স:)সহ সকল নবী রসুলেরা অলৌকিক সত্তা, আল্লাহর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যুগে যুগে। তাঁর সত্য গুণাবলী এবং শেষ বিচারের দিনের কথা মানব জাতীকে জানিয়েছেন। যার ফলে এমন কোন সময় অতিবাহিত হয় নাই যে স্রষ্টার ধারণা ও জ্ঞানের ব্যাপারে মানবজাতি কখনও বঞ্চিত ছিল।

কুরআন (৭: ১৭২ – ৭৪) বর্ণনা করেছে যে, পার্থিব জীবনে আসার আগে আধ্যাত্মিক জগতে আল্লাহ  সমগ্র মানবজাতিকে একত্রিত করেছিলেন এবং জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আমি কি তোমার (স্রষ্টা) প্রতিপালক নই?’ সকলেই দ্ব্যর্থহীনভাবে জবাব দিয়েছিল, ‘সত্যই, আপনি! আমরা এর সাক্ষ্য দিই।”

তবুও,পার্থিব জীবনে মানুষ কখনও কখনও তার স্রষ্টাকে তথা আল্লাহকে স্বীকার করতে চায়না! আসলে এটি তাদের একটি নিছক একগুঁয়েমি ছাড়া কিছু নয়! কেননা পার্থিব জীবনে এই মানুষ প্রতিটি অভিনয়ের জন্য একজন অভিনেতার সন্ধান করে,প্রতিটি পরিকল্পনার জন্য একজন পরিকল্পনাকারী দেখে;প্রতিটি চরিত্রের বহিঃপ্রকাশে একটি চরিত্র থাকে,প্রতিটি প্রভাবের জন্য একটি প্রভাবশালী সত্তাকে পায় এবং প্রতিটি সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনার জন্য একজন জ্ঞানবান জ্ঞানী সংগঠক যে আছেন তা বিশ্বাস করে। এভাবেই চলে জ্ঞানার্জনের ধারা যা মানুষ অনুসরণ করে।

এখানে,কেউ যুক্তি দিতে পারেন যে এটি সবসময় এভাবে হয় না। উদাহরণস্বরূপ,নাস্তিক-ডারউইনবাদীরা একটি জীবন্ত কোষের সংগঠনে কোনও জ্ঞানী সংগঠকের সন্ধান করতে চায় না! বরং তারা বলতে চায় এগুলো ঘটনাচক্রে সংগঠিত  অন্ধ, এলোমেলো, উদ্দেশ্যহীন, এবং নির্দেশনা বিহীন প্রক্রিয়াগুলির দীর্ঘ সময়ের কাজের ফল! তাদের সে চিন্তাধারা প্রকৃতপক্ষে যে কত অসঙ্গতিপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারা জীবনের আর কোথাও এমনকি অতি সাধারণ কোন কিছুতেও এ ধরণের কর্মকার বিহীন ক্রিয়ার কাজ যে হতে পারে সেটি তারা মানবে না অথচ মানব দেহের এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এ ধরনের চিন্তা যে কত অযৌক্তিক ও ভ্রান্ত সেটি তারা বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিবেচনা করতে চায়না!

তবে নাস্তিকরা হয়তবা জিজ্ঞাসা করে বসবে যে, তাহলে ‘স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করেছেন?’ এটি আসলে একটি অতি তুচ্ছ প্রশ্ন! এ প্রশ্নটির কোনও মূল্য নেই এখানে যদি মহাবিশ্বকে স্ব-বর্ণনামূলক (self-explanatory) ধরা হয় বা যার পিছনে কোন শক্তির ইঙ্গিত থাকে। যেমন একটি চেয়ার এর অস্তিত্বের পিছনে যদি প্রথম থেকেই একজন কাঠমিস্ত্রির প্রয়োজন হয় তবে সে সত্যকে অস্বীকার করা যায় না কাঠমিস্ত্রিকে কে সৃষ্টি করেছে তা জানা বা না জানার উপর। আমরা আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার পর যদি মনে হয় “তিনিও কারো সৃষ্টি” এবং তিনি (self-explanatory) স্বব্যাখ্যামূলক ও স্বশাসিত নন তখন না হয় আমরা “তাঁর স্রষ্টাকে” খুঁজব। কিন্তু সেই কাল্পনিক প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় কীভাবে আশু প্রশ্নকে এড়াতে পারি যে আমরা কি আল্লাহর সৃষ্টি নয়?

বি: দ্র: Acknowledgements:
এ লিখাটির সংকলন হয়েছে মূলত কিঞ্চিত পরিবর্তন ও সংযোজনা সহকারে “Quran Based argument of God– Insights from Javed Ahmad Ghamidi” By Junaid Hasan এর নিবন্ধের ভাষান্তরে।

Facebook Comments

78 জন পড়েছেন

Comments are closed.