মুসলিম নারী নেতৃত্বের অগ্রগতি বিশ্ব ব্যাপী অপ্রতিরুদ্ধ

22 জন পড়েছেন

গত বৎসর ইসলামে নারী নেতৃত্ব নিয়ে একটি পোস্ট করেছিলাম। চলতি মাসের ৫ তারিখে আমরা কানাডায় ইসলামিক হ্যারিটেজ মাস নিয়ে একটি বড় অনুষ্ঠান করি Islamic Institute of Toronto বিল্ডিংয়ে, এবং উদ্যোক্তাদের অন্যতম একজন হিসেবে আমার শ্রম, উদ্যম ও সামর্থ্য নিয়োগ করি (ফেইসবুকে এই লিংকে দেখতে পারেন)।
 এই অনুষ্ঠানে প্রমিন্যান্ট আলেমদের সাথে সাথে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয়া কয়েকজন নারীও বক্তব্য রাখেন। কানাডায় প্রতি বৎসর ডিসেম্বর মাসে Reviving the Islamic Spirit (RIS Convention) নামক যে আন্তর্জাতিক মুসলিম সম্মেলন হয় সেখানে নেতৃ-স্থানীয় অনেক নারী উপস্থিত হোন ও বক্তৃতা দেন। আজ মাশাল্লাহ মুসলিম বিশ্বে নারী-নেতৃত্বের অগ্রগতি লক্ষণীয়। তারা নানান অবিচার ও বৈষম্যের বন্ধন ছিন্ন করেই অগ্রসর হচ্ছেন। 

তবে একথাও সত্য যে মুসলিম বিশ্বের মধ্যযুগে পড়ে-থাকা একটি দল বা দলসমষ্ঠি আছেন যারা নারীদেরকে আবার গৃহবন্দী, আবৃত-মুখ, নেট-সম্বলিত পর্দায় চোখ ও কালো বোরখার বেষ্টনীতে আবদ্ধ করে সেই অগ্রগতিকে রোধ করতে প্রয়াস চালাচ্ছেন, এবং এই কাজ ধর্মীয় নানান বাণীকে কেটে-ছেঁটে সেলাই করে ফতোয়া ও ধার্মিকতার নামেই করছেন, কিন্তু বৈশ্বিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে নারীরা তাদের ফতোয়া ও ব্যাখ্যা অগ্রাহ্য করেই অগ্রসর হচ্ছেন, এবং এটা সততই প্রতীয়মান হয় যে এই দল তাদের আপন ব্যাখ্যার স্থানেই পড়ে থাকবেন, এবং নারীরা তাদের অভিলক্ষ্য সামনে রেখে এগিয়েই যাবেন।

আজকের বৈশ্বিক সামাজিক বাস্তবতা ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিত সামনে রেখে আমি আরেকটি ছোট্ট লেখা পোস্ট করতে যাচ্ছি। এখানে প্রচলিত কিছু প্রতিবন্ধকতার উল্লেখ ও ব্যাখ্যা সামনে আনতে চেষ্টা করবো। যেহেতু বাস্তবতার মুখে একদিকে নারী নেতৃত্ব দেখা যাচ্ছে এবং অন্যদিকে এর বিপক্ষের অবস্থান পাওয়া যাচ্ছে, তাই আমার অবস্থানটি প্রথমটির পক্ষে। মুসলিম সমাজের বাস্তবতাই প্রমাণ করবে কোনটি  ধর্ম ও সমাজের জন্য অনুকূল  — কোন তর্কবিতর্ক নয়, কেননা তা কিছুই প্রতিষ্ঠা করে না।

এবারে নারী নেতৃত্বকে উড়িয়ে দিতে যে কয়টি হাদিস উল্লেখ করা হয় আমি এগুলো দেখতে যাব। আমাদের প্রথম হাদিস নিম্নরূপ:

হাদিস: আবু বাকরা বর্ণীত। আমি যখন জমল-যুদ্ধে প্রায় অংশ গ্রহণ করতেই যাচ্ছিলাম তখন আল্লাহ আমাকে এমন একটি কথা দিয়ে ফায়দা দান করেছেন যে কথাটি আমি রাসূলুল্লাহর (সা) কাছ থেকে শুনেছিলাম। যখন রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে এই খবরটি এলো যে পারস্যবাসীরা খসরু-কন্যাকে তাদের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, তখন তিনি বললেন, ‘একটি কাওম কখনো সফল হবে না, যদি তারা কোন নারীকে (তাদের) নেতৃত্বে বসায় (অর্থাৎ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। আরবি টেক্সট: لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ وَلَّوْا أَمْرَهُمُ امْرَأَةً)। হাদিসটির লিঙ্ক এখানে

এই হাদিসের ‘কাওম’ শব্দের অর্থ, তার ব্যবহারিক প্রেক্ষিত, স্থান-কাল বিবেচনা সাপেক্ষ। এই সাথে হাদিসটির ভাষ্যও লক্ষণীয়: এটি কি কোনো নির্দেশ বাক্য, কোনো একটি স্থান-কালীন কথা সাধারণী মাত্রায় বর্ণীত, কোনো প্রমাণিত বাস্তবতা নির্দেশক, স্বতঃসিদ্ধ চিরন্তনী কথা, না এর অপর কোনো প্রায়োগিক সর্বকালীন অর্থ নিহিত অর্থ রয়েছে যা এখনো কারো নজরে আসে নি? এসব বিবেচনা ছাড়া, তা কী কোনো অতীতের সংস্কৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট করে সকলের উপর আরোপ করে দেয়া হবে?

কাওম শব্দের অর্থ হচ্ছে কিছু পুরুষ লোকের একটি গ্রুপ – এতে নারী নিহিত নয়। এমন অর্থ কোরানের এই আয়াতে রয়েছে: ৪৯:১১। শব্দের ব্যবহারে বিভিন্ন অর্থ পাওয়া যায়। অন্যত্র কাওম শব্দে নারীরাও সংযুক্ত পাওয়া যায়। আল্লাহ বিভিন্ন কাওমে নবী প্রেরণ করেছেন এবং প্রেক্ষিতগতভাবে সেই কাওমে নারী-পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধ সবাই সার্বিকভাবে অন্তর্ভুক্ত। কাওম ছোট হতে পারে, আবার বড়ও হতে পারে। যুল-কারনাইনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কাওম (১৮:৮৬) বড়ই বুঝায়। আবার ২:২৩০ আয়াতের কাওম গোটা জাতি নয় শুধু জ্ঞানী সম্প্রদায়, আর ৫:১০২ আয়াতের কাওম সততই কিছু লোক। সেদিন রাজা-রাণীকে পারিবারিক শক্তিধররাই (অথবা সশস্ত্র শক্তিধরগণ) ক্ষমতায় বসাত, এই অর্থের কাওম — গোটা জাতি নয়। পারস্যের রাণীর ব্যাপারেও তাই।  মূল কথা, ছোট বড় বিবেচনা করলে নেতৃত্বের পরিসর অনেক ব্যাপক হয়। এটাকে আজকে স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি (সরকারি-বেসরকারি), দল, সংগঠন,  সরকারি-বেসরকারি ডিপার্টম্যান্টসমূহ, ব্যবসায় কোম্পেনী ইত্যাদিতে পরিব্যাপ্ত পাওয়া যাবে।

‘কাওম’ যেখানে সংখ্যা ও সাইজের দিক দিয়ে ছোট-বড় হয়, এবং যেখানে এই ধারণা নিছক রাষ্ট্রীয় কাওমে সীমিত থাকে না, তখন এর সার্বিক অর্থ আর্থ-সামাজিক ও কালীন প্রভাবের আওতায় দেখতে হবে। চিন্তা করতে হবে, এই হাদিসটি কী ইসলামের সাম্য ও সুনীতির সাথে সামঞ্জস্যশীল, না তা গোটা নারী জাতীর নেতৃত্বের অধিকার ও প্রয়োজনকে অস্বীকার করে বৈষম্য প্রতিষ্ঠা করে যায়। তারপর, এই হাদিসকে ব্যাখ্যা করার অধিকার কী আজকের যুগের আছে, না তা কোন এক অতীত কালে শেষ হয়ে গিয়েছে, এখন শুধু চোখ বন্ধ নারীদেরকে নেতৃত্বের সকল পরিসর থেকে বঞ্চিত করতে হবে?

আধুনিক ব্যাখ্যাকারগণ বলছেন: না, আমাদেরও ব্যাখ্যা করার অধিকার আছে। কাওমের ক্লাসিক্যাল পুরুষতান্ত্রিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে দেখা যায়, সেখানে, সে কালে, কিছু কিছু পরিসর পুরুষতান্ত্রিকভাবে এমন একচেটিয়া (exclusive) ছিল যেখানে পুরুষের আবেষ্টনীতে একজন নারীর পক্ষে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সফল হওয়া কঠিন ছিল। এই হাদিসটি পুরুষতান্ত্রিক সেই কাওমকেন্দ্রিক, সেই কালীন ও প্রেক্ষিতের। এর ভাষ্য এমন নয় যে এটিকে লেবুর মত কচলিয়ে স্বতঃসিদ্ধ ও চিরন্তন করে ফেলতে হবে। এই হাদিস কোন নির্দেশবাচক কোন অর্থ বহন করে না।

আমরা আবু বাকরার (রা) এই হাদিসটির অন্যান্য দিকও দেখতে পারি। তার এই হাদিসে সার্চ দিলে আমরা এটিকে  আহাদ হাদিস হিসেবে দেখতে পাই। অর্থাৎ আবু বাকরাহ ব্যতীত লক্ষাধিক সাহাবির আর কেউ ‘এই বিশেষ’ বর্ণনাটি অন্য কেউ করেন নি। জঙ্গে জমলে আয়েশার (রা) পক্ষে-বিপক্ষে অনেক সাহাবি ছিলেন –যুদ্ধও করেছেন। এই যুদ্ধের প্রেক্ষিতে আবু বাকরার (রা) অবস্থান কোথায়? তার অভিমত/অবস্থান কী? এই ভাষ্য তাকে কি উক্ত যুদ্ধে অংশ না নেয়ার জাস্টিফিকেশন দিচ্ছে না? তবে তিনি যুদ্ধে শরিক না হলেও আয়েশার (রা) নেতৃত্বে হাজার হাজার লোক অংশ নিয়েছেন, এবং তার হাদিস ও অবস্থান সেখানে আমল করা করা হয় নি।

আবার একক হাদিসের উপর আলেমদের বিভিন্ন মত রয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে কোন কর্মই বিশ্বাসের বাইরে নয়। নারীকে যদি বৈষম্য করা হয় তবে এই কর্মের পিছনে এই বিশ্বাস কাজ করে থাকবে যে নারীর নেতৃত্ব ব্যর্থ নেতৃত্ব এবং জাতির সাফল্যের জন্য তার প্রতি বৈষম্য করতে হবে। ড. ইয়াসির কাজি বোখারীর ভাষ্যকার ইবন হাজর আল-আসকালানি থেকে উদ্ধৃত করে বলেন: ‘This is not a fiqhi (legal) ruling that can be applied to every scenario and circumstance –অর্থাৎ এটা (আবু বাকরার হাদিসের ভাষ্য) এমন কোন ফিকহি অনুজ্ঞা নয় যা সকল প্রেক্ষিত ও পরিস্থিতিতে আরোপ করা যেতে পারে (ভিডিও লিঙ্ক এই ব্লগে আছে)।’ এমন মত আরও অনেকের রয়েছে। একজন স্কলার তার বিবেক বিবেচনা মোতাবেক অর্থ গ্রহণ করবেন। বিষয়টা এমন নয় যে অতীতের ফুলান বিন ফুলানের অভিমত বর্তমানের ফুলান বিন ফুলানের চাইতে উত্তম হতেই হবে, কেননা তিনি অতীতের।

এখানে আবু বাকরার (রা) হাদিসটি -এবং পরে মুসলিম শরীফ থেকে উল্লেখিত আব্দুল্লাহ বিন ওমরের (রা) হাদিস, বর্তমান কাল ও সমাজের বাস্ততা, ও এগুলোর এবারতের (মতনের) সামাজিক যুক্তি ও মুসলিম বিশ্বের নারী-নেত্বেত্বের পক্ষের গ্রহণীয়তার যুক্তি/অযুক্তি আলোচিত হয়েছে  — বোখারী/মুসলিম শরীফে হাদিসদ্বয় থাকা বা বর্ণনার-চেইনগত স্ট্যাটাস নিয়ে নয়।

এবারে আরেকটি হাদিস উল্লেখ করা যাক। এটাও নারী নেতৃত্বের অধিকার উড়িয়ে দিতে আনা হয়। এটি আবু হুরাইরাহ (রা) বর্ণীত।

হাদিস: “… যখন তোমাদের নেতাগণ তোমাদের মন্দ-লোকগুলো হবে, আর তোমাদের বিত্তশালীরা  তোমাদের ব্যয়কুণ্ঠ লোকগুলো হবে, আর তোমাদের নেতৃত্বের দায়িত্ব নারীদের উপর দেয়া হবে, তখন মাটির উপর ভাগের চাইতে নিম্নভাগই তোমাদের জন্য হবে।” [হাদিসের লিঙ্ক]

সূত্রের লিঙ্কে গেলেই দেখবেন হাদিসটির স্ট্যাটাস ‘দুর্বল’। শাইখ আলবানীও এটিকে দুর্বলের ক্যাটাগরিতে রেখেছেন। আরেকটি অতি দুর্বল হাদিসের উল্লেখ করা হয়। এটিও আবু বাকরা (রা) বর্ণীত। এর এবারত হচ্ছে এই: “যখন পুরুষেরা নারীর আনুগত্য করে তখন ধ্বংস হয় (هلكت الرجال حين أطاعت النساء)”। শাইখ আলবানী বলেন, এর কোন ভিত্তি নেই (لا أصل له । আস-সিলসিলাহ আদ-দায়িফাহ)। এই ধরণের হাদিস নারী-অধিকার খর্ব করা অথবা বৈষম্যে স্থাপন করার দলিল হতে পারে না।

নারীদের আক্কেল-বুদ্ধি ও ধর্ম অপরিপূর্ণ দেখিয়ে একটি “সহীহ” হাদিস টানা হয়। এটি আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রা) থেকে বর্ণীত। (এক ঈদের দিনে দান খয়রাতের ব্যাপারে নারীদেরকে উৎসাহিত করতে) নবী (সা) বললেন:

“হে নারীগণ, তোমরা দান-সদকা করো ও বেশি বেশি তওবা-ইস্তেগফার করো। আমি অবশ্যই তোমাদের বেশির ভাগকে দোযখের অধিবাসী হিসেবে দেখেছি। তখন তাদের মধ্য থেকে একজন বিচক্ষণ মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কেন দোযখের অধিকাংশ অধিবাসী (হবো)?’ তিনি বললেন, ‘তোমরা বেশি বেশি লা‘নত (অভিশাপ) করো, এবং তোমরা স্বামীদের প্রতি অকৃতঘ্ন। আমি বুদ্ধিমত্তার অধিকারীদের তুলনায় বুদ্ধি ও দীনের কমতি তোমাদের চাইতে অধিক দেখি নি।’ সে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল, বুদ্ধি ও দীনের কমতিটা কি?’ তিনি বললেন, ‘বুদ্ধির কমতি হল দুই নারীর সাক্ষ্য এক পুরুষের সমান হওয়া। আর তোমরা কিছু রাত্রি-দিন নামাজ পড়ো না [মাসিক-ঋতুর জন্য] ও রমজান মাসে (কিছু দিন) খাওয়া-দাওয়া করো [একই কারণে] –এটা হল দীনের কমতি’ (মুসলিম শরিফ, হাদিসের লিঙ্ক)।

হাদিস সাহিত্যে বর্ণনাগত দুর্বলতা, ভেজাল, বানোয়াট ইত্যাদি যেসব সমস্যা প্রবেশ করেছিল আজ পর্যন্ত যেসব সমস্যার পূর্ণ সমাধান হয়নি, এবং যে কারণে একদল লোক হাদিস বর্জন করে চলেছে (কোরান অনলি এবং তাদের সাথে আরও ছোট-অনেক গ্রুপ) সেই ধরণের একটি বিষয় এই হাদিসেও লক্ষণীয়। এখানে নারীদের ধর্মের অপরিপূর্ণতা কি? তা হল তাদের প্রকৃতিগত ঋতুকালীন অবস্থা। তাদের বুদ্ধিমত্তা কীভাবে পুরুষের চাইতে অর্ধেক মর্মের? কারণ, তাদের সাক্ষ্য পুরুষের অর্ধেক।

কিন্তু তারা যে ঋতুবতী অবস্থায় নামাজ পড়বে না – এটা তো ধর্মেরই অনুজ্ঞায়। ধর্ম যদি অনুমোদন দিত তবে তারা নিশ্চয় নামাজ পড়তো। ঋতুকালীন যে কয়দিন রোজা রাখে না, সেটাও ধর্মের অনুজ্ঞায়। ঋতু শেষ হলে সেগুলো রেখে নেয়, তাও ধর্ম নির্দেশিত। তাহলে, তাদের ব্যত্যয় কোথায় ও কমতি কোথায় ও কীভাবে? এগুলো তাদের ধর্মকে কীভাবে অপরিপূর্ণ করে? এই ধরণের হাদিস অবশ্যই বিশ্লেষণ সাপেক্ষ হতে হবে, কেননা এমন হাদিস ধর্মের জ্ঞানতাত্ত্বিকতাকে প্রশ্নের মুখামুখি করে।  নারী সমাজ ও আধুনিক স্কলারগণ এই ধরণের হাদিসকে সমস্যা এড়ানোর জন্য পার্শ্বস্থ করে রাখেন, কেননা এতে ‘অপ্রামাণিকভাবে’ বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সাম্যের ভিত্তিও নড়েবড়ে হয়।

তারপর, নারীর জ্ঞান-বুদ্ধি কি পুরুষের চাইতে কম? নেতৃত্বের ক্যাপাসিটি কি কম? আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে এর কি কোন প্রামাণিকতা রয়েছে? সুদূর অতীত থেকে আজ পর্যন্ত কী এমন কিছু দেখা যায়? আমরা তো দেখি রাণী বিলকিস সফল রাণী ছিলেন, রাণী ভিক্টোরিয়াও সফল ছিলেন, অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, ভারতের ইন্দিরা গান্ধী, জার্মানের এঙ্গোলা মার্কেল, আধুনিক কালের কালের শিক্ষাঙ্গনের নারী নেতৃত্ব, নানান প্রতিষ্ঠান সমূহের নেতৃত্ব পুরুষের চাইতে মোটেই কম নয়। অপ্রামাণিকভাবে নারী জাতির উপর বৈষম্য আরোপণ কীভাবে হতে পারে?

আজকের সমাজ ক্লাসিক্যাল ও মধ্যযুগের সমাজ থেকে ভিন্ন। রাষ্ট্রব্যবস্থাও ভিন্ন। প্রাতিষ্ঠানিকতাও ভিন্ন। জীবন যাপনের রীতি-নীতি ও পদ্ধতি ভিন্ন। আজ যদি মুসলিম বিশ্বে আলেমদের অভিমত যাচাই করতে যাওয়া হয় তবে দুটি মতের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে: একটি হচ্ছে নারী নেতৃত্বের পক্ষে, এবং অন্যটি বিপক্ষে। কিন্তু বিপক্ষ দল কি মুসলিম বিশ্বের যেসব নারী রাজনীতি, শিক্ষা, ব্যবসা, বিজ্ঞান, কলা ইত্যাদি যাবতীয় ক্ষেত্রে নেতৃত্বের স্থানে আছেন এবং নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করছেন তাদেরকে ঘরে ফিরিয়ে দিতে পারবেন?  না, কারণ তারা কেউই মধ্যযুগীয় বৈষম্য-ভিত্তিক ব্যাখ্যার দিকে তাকাবে না। এখানেই বলতে পারেন তাদেরও একটি ‘ইজমার স্থান’ –এই অর্থে যে তারাও ইসলামী জ্ঞানে জ্ঞানী এবং তাদের পক্ষের আলেমগণও ইসলামী জ্ঞানে জ্ঞানী, এবং তারা এটাও জানেন যে ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগটিও সংস্কৃতি বহির্ভূত কোন বাস্তবতা ছিল না।

ইজমা নিয়ে কথা বলতে গেলে দীর্ঘ ব্লগের দরকার। তবে দুটি কথা এভাবে বলা যেতে পারে যে ‘ইজমা’ হচ্ছে অভিমতের ঐক্য বা সহমত স্থান (consensus of opinion)। এটি আল্লাহর বাণী নয়, রাসূলের বাণী নয়, বরং শিক্ষিত মানুষের অভিমত। এটাকে যদি মুজতাহিদদের বা আল্লামাহ ধরমের লোকদের ইজমা ধরেন, তবে এটা আরও কঠিন হয়ে পড়ে, কেননা কারা কাদের দৃষ্টিতে মুজতাহিদ বা আল্লামাহ?  এর সাথে এই ধারণাও সংযুক্ত যে ইজমা হচ্ছে অভিমতের যৌক্তিক দলিল (rational proof)। এর যাবতীয় সমস্যা সম্পর্কে আলেমরা অবগত। কেউ কোথায় ‘ইজমা’ শব্দ উল্লেখ করলেই পণ্ডিতগণ মাথা নত করে কুঁকড়ে যান না। তারা জানেন এখানে কি হয়। বিষয়টি সব সময়ই চিরন্তনতা লাভ করতে ব্যর্থ হয় (falls short of universality of ijma)। তাই পণ্ডিতরা দেখতে চাইবেন কোন পক্ষ থেকে শব্দটি উচ্চারিত হচ্ছে, কেননা নানান ধরনের পীরাকি, সালাফি, মাযহাবি, শিয়া ইত্যাদি দল ও ফিরকাগত আলেমদের পক্ষ থেকে ইজমার দাবী উঠে থাকে। এখন, আজকের যুগে, নারী নেতৃত্বের পক্ষের আলেম ও নারী-আলেমদের কি অভাব রয়েছে? তাদের অভিমতের ঐক্যের কি কোন মূল্য থাকবে না? তাদের মোকাবেলায় অন্য কোন পক্ষের অভিমত কি এই অর্থের হয়ে পড়বে যে তারা রাত্রি-নিশিতে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করে তাদের অভিমতের মর্যাদা কোরান-হাদিসের মাত্রায় (divine) করে নিয়েছেন?

তবে এটাও পাওয়া যায় বৃহত্তর দলের আলেমদের কিছু সংখ্যকের ঐক্যমত দেখা যায় এবং তার অধিক্রমণও লক্ষিত হয়। এই অধিক্রমণ এদিকেও হতে পারে সেটিকেও। সুতরাং যারা ‘ইজমা’ শব্দের ব্যবহার দেখিয়ে নারী নেতৃত্ব ‘হারাম’ করছেন তারা ধোঁয়ার মধ্যে শুঁটকি শুকাচ্ছেন। এই ধরণের ইজমার ফাতোয়া আদালতের বিচারক মহিলা, অঙ্কশাস্ত্র বিভাগের পরিচালক মহিলা, রাষ্ট্রপ্রধান মহিলা বা দর্শন ও ভাষা-শাস্ত্রের পণ্ডিত মহিলা এবং নারী নেতৃত্বের পক্ষের স্কলারগণ মেনে নেবেন না। যারা ফতোয়া দিচ্ছেন তারা সেই ক্যালিবারের মহিলাদের সাথে আলোচনায় বসে তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি ওদের তুলনায় অধিক বলে প্রমাণ করে আসতে পারেন।

আমাদের শেষ কথা হল নারীর আক্কেল-জ্ঞানের কমতির হাদিস, অপর দুটি দুর্বল হাদিস ও খসরু-কন্যার হাদিস –এগুলো ইসলামের সুনীতি, সাম্য ও ন্যায়ের ধারণাগত প্রেক্ষিতে বসে বলে দেখা যায় না, অধিকন্তু আধুনিক শিক্ষিত নারীদের কাছে এমন বক্তব্য তাদের অবমাননা হিসেবে অনুভূত হবে। এগুলো, এবং অপরাপর অপ্রমাণিত, অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক কথাবার্তা দিয়ে তাদের অধিকার খর্ব-করণ ও তাদেরকে বৈষম্যে স্থাপন করা সামাজিক কল্যাণের পক্ষে হবে না। অধিকন্তু ছোট-বড় ক্ষেত্রে নেতৃত্বে-থাকা হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ নারীকে ফতোয়ার মাধ্যমে হারাম কর্মে নিবিষ্ট দেখানোও কোনো সঠিক বিষয় বলে আমাদের মনে হয় না।

রেফারেন্স:
Sheik Yasir Qadhi  Seerah of Prophet Muhammed (S) Lecture
Women and Islam
ইসলামে নারী নেতৃত্ব

22 জন পড়েছেন

Comments are closed.