সবাই তো সুখী হতে চায়

205 জন পড়েছেন

ভূমিকা:

মনে পড়ে সেই গানটির কথা “সবাই তো সুখী হতে চায় তবু কেউ সুখী হয় কেউ হয় না …”  মানুষ মাত্রই সুখের প্রত্যাশী। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সুখের সন্ধান কিভাবে মিলবে?

জ্ঞানীরা বলেন:

“For every minute you are angry you lose sixty seconds of happiness.”
― Ralph Waldo Emerson

“Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
― Mahatma Gandhi

সুখের সন্ধানে ইতিবাচক চিন্তা মানুষকে  বদলে দিতে পারে। এ প্রসঙ্গে আমি চেষ্টা করব ইসলামী জীবন দর্শন ও আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণালব্ধ তথ্য  সমন্বয়ে  কিছু বক্তব্য রাখতে। আশা করি যারা নিগেটিভ চিন্তা থেকে মুক্ত হতে পারছেননা তাদের জন্য  নিজেকে বদলে দিতে কিছুটা কাজে লাগবে।

ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

একজন বিশ্বাসীর ঈমানী দায়িত্ব হচ্ছে তার জীবনে প্রাপ্ত ছোট বড় প্রতিটি অর্জনে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। প্রতিটি প্রাপ্তি ,সমৃদ্ধি,সৌভাগ্য,নিয়ামত যা আল্লাহ দিয়েছেন সে জন্য  শোকর আদায় করা এবং যা দেননি সেজন্যও  আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ দেয়া।

একজন বিশ্বাসীর পার্থিব জীবনে যে তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকতে হয় তা হচ্ছে : “তাকওয়া” (আল্লাহর আনুগত্যতা), শোকরিয়া (কৃতজ্ঞতা) ও “ছবর” (ধৈর্য)। আসলে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ গড়ে উঠেছে এই তিন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে। যেমন রোজা আমাদেরকে “তাকওয়া” অর্জনে সহায়তা করে তবে সে জন্য ধৈর্য দরকার এবং আমরা যখন ইসলামের পথে পরিচালিত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করি তখন আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা জানাই।

কেন তা  করতে হবে?

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে একটি ঐশ্বরিক আদেশ হিসাবে  উপস্থাপন করা হয়েছে পবিত্র কোরানে:

“বরং আল্লাহরই এবাদত করুন এবং কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত থাকুন।“ [ সুরা যুমার ৩৯:৬৬]

আসলে একজন মুমিন যখন আন্তরিকভাবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে তখন স্বাভাবতই তার মাঝে সন্তুষ্ট চিত্তের মানসিকতার জন্ম নেয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে।  যার ফলে তার মনে ইতিবাচক ধারণার বিকাশ ঘটবে। আর এই মনোবৃত্তি বাস্তবে যিনি মনের অভ্যন্তরে স্থাপন করতে পারবেন তাঁর পক্ষে সুখী  থাকা বা সুখ অনুভব করা কঠিন নয়।

এক প্রবাসী দম্পতির কথোপকথন।

এক মুসলিম  দম্পতি  তাদের মাতৃভূমির দেশ ছেড়ে ক্যানাডায় বসবাস  করছেন প্রায় দশ বছর হয়। সে দিন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে  কথা হচ্ছিল প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে অর্থাৎ এদেশে এসে লাভ লোকসান কি হলো সে বিষয়ে।

আত্মীয়স্বজন, বর্ধিত পরিবার বিচ্ছিন্নতা, ঈদের দিনে আপনজনদের সাথে থাকার অভাব,তাদের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং প্রবাসী জীবনের চাপ তথা এক দিকে চাকুরী করার চাপ অন্যদিকে সংসারের কাজ কর্মের ব্যস্ততা ইত্যাদি অভিযোগ ছিল স্ত্রীর কণ্ঠে।
স্বামী  তখন স্ত্রীকে এখানকার গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও অহিংস রাজনৈতিক কালচার,স্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা, বৈচিত্র্যময় বহু-সংস্কৃতির মানুষের সাথে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, জীবনে সফলতার বিস্তৃত দিগন্ত, শিক্ষিত সমাজ, নিজেদের একাডেমিক আপগ্রেড ইত্যাদির কথা ভেবে উত্তর আমেরিকায় বসবাসের ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলি  মনে করিয়ে দেন।

স্ত্রী মজা করে বলেন, “তুমি যত কিছুই বলনা কেন আমি কিন্তু আগামী দশ বছর পরও এই বিষয়ে অভিযোগ করে যাব” তখন স্বামী বলেন, ” তা না করে যদি তুমি আগামী দশ বছরে অভিযোগের বদলে  এদেশে এসে আমরা যা অর্জন করেছি যা দেশে পাওয়া সম্ভব ছিল না সে চিন্তা করে ধন্যবাদ দিতে থাকো মহান আল্লাহকে, তাহলে সেটি আমাদের অভ্যাসে পরিণত হবে। আর তা করতে পারলে আমাদের ব্যক্তি জীবনে ও আমাদের সন্তানদের জীবনে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম নিবে  ফলে  আমরা সুখী এবং সন্তুষ্ট জীবনের সফলতা অর্জনে  সক্ষম হব।“

সন্তুষ্ট চিত্তের  মানসিকতা মানুষকে সব সময় মন খারাপ অনুভব করা থেকে বিরত রাখে এবং  পজিটিভ বা ইতিবাচক চিন্তা করতে সাহায্য করে যার ফলে সে আরো সফলতা অর্জনে  সক্ষম হয়। কারণ  আল্লাহর প্রতি যে বেশী শুকরিয়া আদায় করবে তাকে তিনি আরো বেশী নিয়ামত প্রদান করবেন যা আল্লাহর ওয়াদা। ইসলামী স্কলাররা এ ব্যাপারে অনেক জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য দিয়ে থাকেন রেফারেন্স  লিংক নিম্নে দেয়া হয়েছে।

মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণার ফল

মানুষের সুখী হওয়ার প্রচলিত ধারনা হচ্ছে যে আমরা যদি কঠোর পরিশ্রম করি তবে আমরা  সফল হব এবং  যত বেশী পরিশ্রম করব আরও সফল হব এবং তত বেশী আমরা খুশি হতে পারব। তাই  মানুষ ভাবতে থাকে আমি যদি  সেই বড় কাজটি ধরতে পারি  বা চাকুরীতে এ প্রমোশনটা পেয়ে যাই কিংবা এই প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে যাই অথবা শরীরের আরো সেই পাঁচ পাউন্ড ওজন কমাতে পারি আমার  প্রত্যাশিত সুখ আমাকে অনুসরণ করতে পারবে এবং আমি খুশী হব। কিন্তু সাম্প্রতিক  বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে সে ধারণা সঠিক নয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানের প্রখ্যাত গবেষক শন এখর কতৃক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় যে সুখী হওয়ার  প্রচলিত জ্ঞানের ধারনাটি অর্থাৎ সুখী হওয়ার ক্ষেত্রে এই সূত্রটি আসলে সেকেলে বা পশ্চাৎপদ হয়ে গিয়েছে!

এখন দেখা যায় মানুষের প্রফুল্ল চিত্ত বা ইতিবাচক মানসিকতায় থাকার অবস্থানটিই আসলে খুশী থাকার বা সুখী হওয়ার জ্বালানি হিসাবে কাজ করে এবং জীবনে সাফল্য আনতে সহায়ক হয়। অধুনিক মনোবিজ্ঞানের আবিষ্কার বলছে আমরা যখন ইতিবাচক থাকি  তখন আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলি আরো নিযুক্ত, সৃজনশীল, প্রেরিত, উদ্যমী, স্থিতিশীল এবং কার্যক্ষেত্রে উৎপাদনশীল হয়ে ওঠে। এটি শুধু একটি থিওরি নয় বরং এই আবিষ্কারটি  মনোবিজ্ঞান এবং স্নায়ুবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা অধ্যয়ন এবং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংগঠনের কঠোর গবেষণার মাধ্যমে বারবার উদ্ভূত হয়েছে।

 ইতিবাচক মানসিকতা কিভাবে গড়া যায়?

প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী, “শন এখর”,  হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক দশক ধরে পৃথিবীর ৪২টি দেশের বড় বড় কোম্পানীর অর্থাৎ ফরচুন ফাইভ হান্ড্রেড  কোম্পানীর নির্বাহী কর্মকর্তাদের সাথে তাদের কাজ কর্মের কাহিনী এবং বিভিন্ন কেস স্টাডিজ ব্যবহার করে, তিনি  ব্যাখ্যা দিয়ে প্রমান করার চেষ্টা করেছেন কিভাবে আমরা আমাদের মস্তিষ্ককে পুনরায় প্রোগ্রাম করে আমাদের কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে দক্ষতা ও সফলতা অর্জনে আরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে আমাদের ব্রেইনকে বদলে দিতে পারি । এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তার প্রকাশিত বইটি পড়তে পারেন।

শন এখরের মতে সবসময় ইতিবাচক মানসিকতায় থাকতে হলে আমাদের ব্রেইনকেও সেভাবে প্রশিক্ষন দিয়ে বদলে দিতে হবে। তার উত্তম পন্থা হল,একটি ডাইরিতে প্রতিদিন তিনটি ইতিবাচক বিষয় লিখে রাখতে হবে। এভাবে কমপক্ষে ২১ দিন নিয়মিত প্রতিদিন নতুন তিনটি ইতিবাচক বিষয় লিপিবদ্ধ করতে থাকলে ইতিবাচক চিন্তা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হবে। আর তখন সে অভ্যাসটি  আমাদের ব্যক্তি জীবনে সুখী থাকা ও সফলতা অর্জনে বিরাট ভূমিকা রাখবে।

আল্লাহর প্রতিদান
একজন মুসলিমদের জন্য এখানে শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, যদি প্রতিদিন এভাবে তিনটি ইতিবাচক বিষয় লিখে রাখা এবং সেই সাথে মহান আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা নিজেদের অভ্যাসে  পরিণত করা যায় তাহলে তার  আধ্যাত্মিক ও বৈষয়িক উভয় ক্ষেত্রে যে কত উপকার হতে পারে তা বলাই বাহুল্য।  তবে সে জন্য কম পক্ষে ২১ দিন সেটি নিয়মিত করতে হবে।

অতএব, ইতিবাচক মানসিকতায় পৌছার অন্যতম উপায় হচ্ছে জীবনের সব ক্ষেত্রে আল্লাহ রাবাবুল আ’লামিনের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

অল্লাহ বলেন,   وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ  ۖ  — ” এবং স্মরণ কর ! তোমাদের প্রভু [সর্ব সমক্ষে] ঘোষণা করেন যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও তবে তোমাদের প্রতি আরও [অনুগ্রহ] বৃদ্ধি করবো এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর। [ সুরা ইবরাহীম ১৪:৭ ]

এক কথায়, সুখী থাকার প্রধান উপাদান হচ্ছে আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করার অভ্যাস তৈরি করা এবং সবসময় ইতিবাচক চিন্তার মানসিকতা নিজের মনে প্রতিষ্ঠিত করা এবং কিভাবে তা করতে হবে তা উপরের আলোচনায় বর্ণনা করা হয়েছে।

– ধন্যবাদ

রেফারেন্স লিংক:
১) Gratitude = Increase in Blessings – Hamza Yusuf
২) Giving Thanks and Being Grateful to Allah – Sh. Dr. Yasir Qadhi
৩) সুখী থাকার ৭টি প্রদক্ষেপ Shawn Achor | 7 Super Tips
৪) Khutba delivered by Imam Irshad Osman ( at 73 Simcoe on Feb 22, 2019)

205 জন পড়েছেন

Comments are closed.