ইসলামে নারী নেতৃত্ব

322 জন পড়েছেন

ভুমিকা:

ইসলাম অতি যুক্তিসঙ্গত একটি জীবন ব্যবস্থা কিন্তু এ ধর্মকে যারা তাদের পেশা বা রুটি রোজগারের পন্থা হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন সেই দীর্ঘদিন থেকে এবং  যারা  বাস্তব জগতের পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতা, বিজ্ঞান, রাষ্ট্র নীতি বা ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান চর্চায় আগ্রহ ছিলেন না তারা সমাজের কোন পরিবর্তন দেখলে শুধু আবেগী প্রতিক্রিয়া বা রিয়েকশন করা ছাড়া তেমন কিছু করতে পারেননা! কিভাবে বুদ্ধি-ভিত্তিক ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এসবের মোকাবিলা করা যায় সে কৌশল অর্জনে তারা ব্যর্থ। তাই আগের দিনের কোন উস্তাদের ভাবনা বা বিবেচনার যোগ্যতায় যে দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে সেটি বুঝার ক্ষমতা হারিয়ে যায়। ফলে তাদের সব কথা কেউ চূড়ান্ত সঠিক  বলে না মানলে তখন তাঁকে ইসলাম থেকে খারিজ বলা ছাড়া তাদের মাথায় কিছু আসে না! তবে কেউ নিজেকে আধুনিক জ্ঞাণের পন্ডিত ভেবে আগের দিনের জ্ঞাণি গুনিদের অবদানকে তুচ্ছজ্ঞান করা যেমন হবে মস্তবড় মূর্খতা তেমনি তাদের সব কথা সময়ের সাথে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কতটুকু প্রযোয্য সেটি বিবেচনার অক্ষমতাও  হবে চুড়ান্ত ধর্মান্ধতা। আর এসব ধর্মান্ধকে ধর্মীয় অঙ্গনে অবাধ বিচরণের সুযোগ দিয়েই কিন্তু ধর্মের বিষয়ে আজ দেখা দিয়েছে এত বিড়ম্বনা। সেই সুদূর অতীতের কোন বিশেষ প্রেক্ষিতে বলা কোন বানীকে সর্বকালের ও সর্বযুগের ঔষধ হিসাবে ব্যবহার করতে গেলে যে অধিকাংশ মানুষের পক্ষে তা গ্রহনযোগ্য হয় না এবং কেন হয় না তা বুঝার ক্ষমতা তাদের নাই। আর সে জন্য কোরআন থেকে অপ্রাসঙ্গিক দু একটা কোটেশন দিয়ে বা হাদিস উল্লেখ করে কাউকে ভিলেন বানাবার চেষ্টা করলেই  সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না।

প্রতিটি যুগে সমাজের একটি  সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো এবং কালচারাল ধারা থাকে যা থেকে মানুষ প্রভাব মুক্ত হতে পারেনা। এমনকি নবী রসুলদেরকে তাদের সমাজের প্রচলিত অনেক কালচার যা পৌত্তলিকতার সাথে সংঘর্ষিক নয় তা গ্রহণ করতে দেখা যায় যদিও সেটি বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় গ্রহনযোগ্য নয়।  পুরানো যুগের মানুষের কাছে গণতন্ত্র ও দাসপ্রথা মুক্ত কোন সমাজের ধারণা ছিলনা বলে বর্তমান মানব সভ্যতায় গণতন্ত্রের প্রবর্তন ও বিকাশকে ধর্মবিরোধী প্রবণতা বলা ঠিক হবে না। তাছাড়া ধর্মকে বিদাতমুক্ত ও বিশুদ্ধ করার নামে মানুষকে আগের যুগীয় সামাজিক প্রথা বা চিন্তাধারার গণ্ডীতে আবদ্ধ রাখতে চাইলে ধর্ম নিয়ে বাড়বে বিড়ম্বনা।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীগণ বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে নারীদের ব্যাপারে যে সব কথাবার্তা এসেছে তাতে নারীদের প্রতি তেমন কোন সম্মান দেখানো হয় নাই। অবশ্য ইসলাম বলে সে সকল গ্রন্থসমূহ বিকৃত হয়ে যাওয়ার ফলেই নারীদের উপর আসে এ অবিচার।  পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থার শিকার হয়ে আজকাল নিজেকে তথাকথিত “অতি ধার্মিক” মুসলিম দাবী করা কিছু পুরুষেরাই এক মাত্র (নারীরা নয়) বলতে চান যে কোন নারী যতই উপযুক্ত বা প্রতিভাশালী হন না কেন তিনি সমাজে কোন কর্তৃত্ব বা শাসন ক্ষমতার দায়িত্বে বা সর্বোচ্চ পদে বসতে পারবেননা কারণ তাদের কথায় “ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম তাই নারীরা যে দেশের শাসনে সর্বোচ্চ পদে বসবেন দেশের পতন হবে! কিন্তু ইতিহাস ঘাটলে বাস্তবে সেটি সত্যি বলে প্রমাণ করা যায়না!
আজ যদি কেউ বলেন,

“রাণী ভিক্টোরিয়ার অধীনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য চালিত ছিল এবং তিনি একজন সফলকাম সম্রাজ্ঞী ছিলেন। মুসলমানরা তার “গোলামী” করেছে। এখনো ব্রিটেনের রাণী এলিজাবেথ এবং এর প্রধানমন্ত্রী একজন নারী। ইউরোপের অনেক অনেক দেশ এবং বড় বড় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নারীরা দিচ্ছে। ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর অধীনে ভারত সফলকাম ছিল। মুসলমানদেরকে ইন্দিরা গান্ধী নাকানী-চোবানি খাইয়ে তাদের দেশকে দুইভাগে ভাগ করে পরাজিত করেছে। সুতরাং নারী বিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক বাণী বাস্তবতা “মিথ্যা” প্রমাণ করেছে। সুদূর অতীতের রাণী বিলকিসও একজন সফলকাম রাণী ছিলেন যা কোরআনে পাওয়া যায়। তার দেশ নিছক পৌত্তলিক ছিল বলে সুলাইমান তার দেশকে আক্রমণের হুমকি দেন। রাণী যুদ্ধের মোকাবেলায় সন্ধি বেছে নিয়েছিলেন। এখানেই স্পষ্টই দেখা যায় কে ভাল,কে প্রকৃত মহান।”
– Dara Mansur

নারী নেতৃত্ব ইসলামে নাজায়েয বলে রাসুল (স:) যে হাদিসটি যারা উপস্থাপন করেন তারা সে হাদিসটি যে আসলে একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে অর্থাৎ যখন বলা হয়েছিল তখনকার একটি বিশেষ দেশের উদ্দেশ্য রাসুল (স:)সে কথা বলেছিলেন তা বিবেচনা না করে ও অগ্রাহ্য করে সে বক্তব্যকে সর্বজনীন (generalize)করতে গেলে যে নবীর বাণীর শুদ্ধতা ও  ত্রুটিমুক্ততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে বা ভুল বলার সুযোগ সৃষ্টি করছেন সেটি এই তথাকথিত “ইসলামপন্থী পুরুষদের” মাথায় ঢুকতে চায় না। এ দলে কট্টর সৌদি সালাফিদের সাথে গোঁড়ামিতে ডুবন্ত পাক ভারতীয় কিছু তথাকথিত আলেমরাও আছেন।

সেই হাদিসটি বুঝতে করতে একজন ইসলামী স্কলারের মাত্র কয়েক মিনিটের নিচের ভিডিওটি শুনতে পারেন বক্তব্যে

ইসলামের দৃষ্টিতে নারী বা পুরুষ যে কেহ নেতৃত্ব দেন না কেন তাতে কোন আপত্তি থাকার কথা নয় তবে সে নেতৃত্ব কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে অর্থাৎ সেটি কি ন্যায় নীতির ভিত্তিতে দক্ষতার সহিত হচ্ছে কি না সেটি হচ্ছে দেখার বিষয়। আর সেটি  কোন দেশের নোংরা রাজনীতির পরিবারতন্ত্র বজায় রাখতে বা দলীয় কোন্দল এড়াতে কোন বিধবা নারীকে এনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়ার রীতি চালু করতে হবে তেমনটিও নয়।

উপসংহার
আসলে পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থার মানসিকতা যারা লালন করেন এবং নিজেদেরকে তথাকথিত “অতি ধার্মিক পুরুষ”  বলে দাবী করেন তাদের অনেকই এখনও যে সেই আইয়ামে জাহেলিয়াতের লোকদের আচরণ করতে চান নিজের অজান্তে সেটি মানতে রাজি নন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ এখনও পরিবর্তন করতে পারেন নাই। কুরআনে বলা হয়েছে, যখন তাদের কাছে কোন কন্যা সন্তানের খবর দেওয়া হত তখন তাদের মুখ কালো হয়ে যেত। এ সব লোকদের অবস্থা অনেকটা তাই হয়েছে। আজ প্রয়োজন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ পরিবর্তন করার।

রেফারেন্স :
Can women be leaders in Islam?
ইসলামে নারী নেতৃত্ব কি জায়ায না নাজায়েয তা যুক্তিসহকারে আলোচনা কর।
Women’s Leadership in the Mosque & Society | Dr. Shabir Ally

322 জন পড়েছেন

Comments are closed.