ইবাদতের উদ্দেশ্য

467 জন পড়েছেন

অনেকে ইবাদতের purpose বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রায়ই এরূপ প্রশ্ন করেন:- মানুষকে কেন ইবাদত করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং তা ঠিকমত না করলে কেন শাস্তি দেয়ার কথা বলা হয়েছে?

এ বিষয়ে আমি যৎসামান্য যতটুকু জানি ও বুঝি সেই অনুযায়ী কিছু বলার চেষ্টা করছি।

ইবাদতের purpose (উদ্দশ্য) হলো- স্রষ্টার আনুগত্য করার মাধ্যমে আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জন এবং সেই সঙ্গে শান্তি প্রাপ্তি কল্যাণ সাধন। পূর্ণ ঈমান ছাড়া ইবাদতের এই purpose (উদ্দেশ্য) বোঝা সম্ভব নয়। মহান স্রষ্টা এক আল্লাহতায়ালার উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন ও ভরসা করা এবং সম্পূর্ণরূপে নিজেকে সমর্পণ করাই হলো ঈমানের মূল ভিত্তি। তাই শুধুমাত্র যুক্তি নয় বরং জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেকের সহায়তায় আপনাকে প্রথমতঃ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে যে, এই মহাবিশ্বের অবশ্যই একজন স্রষ্টা আছেন এবং যিনি মানুষেরও স্রষ্টা। এটি ঈমানের মূল অংশ। এরপর আপনাকে ঈমানের বাকী অংশগুলোকে জানার ও বোঝার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। তাহলেই আপনি পূর্ণ ঈমানদার হওয়ার সাথে সাথে ইবাদতের purpose অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন, ইনশাল্লাহ্।

আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, উপাসনা অর্থাৎ ইবাদত হলো শুধুই এক আল্লাহর জন্য, অন্য কারো উপাসনা বা ইবাদত নয়। তাই মহান স্রষ্টা আল্লাহতায়ালাকে একমাত্র ইলাহ (114:3:1-ilāhi / 6:19:32 ilāhun) মেনে কেবলমাত্র তাঁরই ইবাদতের শর্তে এবং তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্যই ইসলামের ছায়াতলে আসার অঙ্গিকার (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) গ্রহণ করতে হয়। সুতরাং উপাস্য হিসেবে একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করতে হবে এবং তাঁর প্রেরিত বিধি বিধান মেনে চলার মাধ্যমে আনুগত্যও করতে হবে। একজন প্রকৃত মুসলিম কখনই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না। এমনকি রাসূলকেও (সাঃ) যদি কেউ অতিরঞ্জিত ভক্তিভরে  উপাস্যের স্থানে বসাতে চান, তাহলে তিনি আর মুসলিম থাকতে পারবেন না বরং অংশিবাদীদের অন্তর্ভূক্ত বলে বিবেচিত হবেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন-

সূরা কাহফ (মক্কায় অবতীর্ণ)

(১৮:১১০) বল (হে মুহাম্মদ), আমি তো কেবলি তোমাদের মতই একজন মানুষ, আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের ইলাহ (উপাস্য) হলো একমাত্র ইলাহ (উপাস্য-আল্লাহ)। অতএব, যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরীক না করে।

সূরা আন নিসা (মদীনায় অবতীর্ণ)

(০৪:৬৪) আমরা কোন রাসূল পাঠিইনি এ (উদ্দেশ্য) ছাড়া- যেন তাকে অনুসরণ করা হয় কেবলমাত্র আল্লাহর আদেশ/ অনুমতি/ অনুমোদনক্রমে। (বস্তুতঃ আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তার অনুসরণ করা হয়।) যখন তারা নিজেদের উপর জুলুম করেছিল, তখন যদি তোমার কাছে আসত এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রসূলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইত, তবে অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও পরম-দয়ালু রূপেই পেত।

আল্লাহর (4:80:5-aṭāʿa) আনুগত্য করার মানে হলো জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করা, স্রষ্টার ইবাদতে কাউকে শরীক না করা এবং তাঁরই প্রেরিত বিধান বাস্তবায়ন করার জন্য সচেষ্ট থাকা। আর রাসূলের (সাঃ) (yuṭāʿa) অনুসরণ ও আনুগত্য করার মানে হলো (০৪:৬৪) আল্লাহর প্রেরিত বিধানের মৌলিক আদেশ ও অনুমতি অর্থাৎ অনুমোদনের সীমানার মধ্যে থেকে রাসূলের (সাঃ) নির্দেশ মেনে চলা। তেমনি ধর্মগুরু কিংবা নেতার অনুসরণ ও আনুগত্য করার ব্যাপারেও আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সাঃ) প্রদর্শিত সীমানার মধ্যে থেকেই তা করতে হবে। একইভাবে পিতামাতা, শিক্ষক ও গুরুজনদের অনুসরণ ও আনুগত্য করার ক্ষেত্রেও একই শর্ত প্রযোজ্য হবে। সর্বপ্রথমে (3:32:2-aṭīʿū) স্রষ্টা ও বিধানদাতা মহান আল্লাহর আনুগত্য, তারপর ক্ষেত্র ও পাত্র ভেদে যার জন্য যতটা আনুগত্য করার প্রয়োজন সেটাই প্রযোজ্য হবে। সুতরাং একমাত্র ইলাহি/ ইলাহুন অর্থাৎ উপাস্য মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত নয় এবং তাঁর নির্দেশনাকে উপেক্ষা করে অন্য কারো অনুসরণ ও আনুগত্য গ্রহণযোগ্য নয়।

যেহেতু ঈমান ও ইবাদতের সম্পর্ক সরাসরি আত্মার সাথে। তাই শুধুমাত্র যুক্তির উপর নির্ভর করে এর নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। তবে আল্লাহতায়ালার হেদায়েত পেলে দেখবেন, ঈমানের ছোঁয়ায় আপনি অবর্ণনীয় এক আত্মিক শক্তিতে বলিয়ান হয়ে উঠছেন। এর ফলে অন্তরে এমন বোধ ও যুক্তির উদয় হচ্ছে যা ধীরে ধীরে আপনার বিশ্বাসকে অনেক অনেক শক্ত ও পোক্ত করে দিচ্ছে।

একজন ছাত্র স্কুলে ভর্তি হবার কিছুদিনের মধ্যেই স্কুলের নিয়ম-কানুন শিখে ফেলে। এরপর থেকে তাকে সেই সব নিয়ম যথাসম্ভব মেনে চলতে হয়। যেমন শিক্ষক ক্লাশ নেয়ার সময় ছাত্র-ছাত্রীদেরকে নীরব থেকে মন দিয়ে তা শুনতে ও বোঝার চেষ্টা করতে হয়। কিন্তু কোন ছাত্র যদি সে সময় অনবরত কথা বলতে থাকে ও বুঝিয়ে চুপ করতে বলার পরও একই কাজ করতে থাকে, তাহলে তো তাকে বকুনি খেতে বা শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু কোন নিয়ম ভঙ্গকারী ছাত্র যদি পাল্টা প্রশ্ন করে- স্কুলের নিয়ম-কানুন ভংগ করলে শাস্তি দেয়া হবে কেন? তখন এই প্রশ্নের যুক্তিসঙ্গত উত্তর কি হতে পারে? আপনিই ভেবে দেখুন। তেমনি মহান আল্লাহতায়ালা, তাঁর প্রেরিত নবী-রসূল ও কিতাবের উপর যখন আমরা ঈমান আনব, তখন তো সেই কিতাব ও নবী-রসূলের শিক্ষা ও বিধি-বিধান আমাদেরকে মেনে চলতেই হবে। আর এগুলো মেনে চলাই হলো ইবাদত। ঈমান আনার পর অহংকার বশত বা ইচ্ছাকৃত এগুলো অবহেলা করলে তো শাস্তি পেতেই হবে।

    এবার ইবাদত সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই

ইবাদতের পূর্ণতা প্রাপ্তি নির্ভর করে দুই ধরণের হক আদায়ের উপর-

/ হক্কুল্লাহ্ অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার হক আদায়।

২/ হক্কুলইবাদ অর্থাৎ বান্দার হক আদায়।

দেখা যায় যে, ২ নং হক আদায়ের প্রতি নাস্তিকদের সাধারণত কোন আপত্তি থাকে না। তাদের এই মানবিক গুণটিকে আমি খুবই শ্রদ্ধার চোখে দেখি। তবে যারা আস্তিক ও নাস্তিক- এই দুটোর মাঝামাঝি অবস্থানে থাকেন, তারা সাধারণত সঠিক পথটি বেছে নেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন এবং কর্মের ক্ষেত্রেও ভাল ও মন্দের মাঝে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন।

অপরদিকে একজন খাঁটি আস্তিককে কিন্তু (১নং ও ২নং) উভয় প্রকার হক আদায়ের প্রতিই যত্নবান হতে হয়। কারণ এ দুটোর যে কোন একটিকে অবহেলা করলে সে বিপথগামী হতে বাধ্য। নামে থাকলেও প্রকৃত অর্থে তখন তিনি আর মুসলিম থাকতে পারেন না। তাই প্রকৃত মুসলিম হতে হলে যে কাজগুলো অবশ্যই পালন করতে হবে তা হলো:-

১/ ঈমান (অর্থাৎ মহান স্রষ্টা এক আল্লাহতায়ালা, তাঁর ফেরেশতাগণ, প্রেরিত নবী-রসূলগণ, আসমানী কিতাব সমূহ ও পরকালে বিশ্বাস) আনার পাশাপাশি যথাযথভাবে নামাজ, যাকাত, রোজা ও হজ আদায় করতে হবে ।

২/ সেইসাথে আল-কোরআনের বিধি-বিধান ও রাসূলের (সাঃ) শিক্ষা অনুসারে বান্দার (পিতামাতা, স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, গৃহকর্মী, এতীম, মিসকীন, ভিক্ষুক, মেহমান, শত্রু ইত্যাদির) হক আদায় করতে হবে এবং প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি কাজকর্ম এমনভাবে সমাধা করতে হবে যেন এর মাধ্যমে সৃষ্টিকুলের সামগ্রিক কল্যাণ ছাড়া অকল্যাণ বা ক্ষতির কারণ না হয়।

২নং কর্তব্যটি একজন নাস্তিক অর্থাৎ যিনি স্রষ্টা কিংবা ধর্মে বিশ্বাসী নন তিনি তার নিজের পছন্দমত যে কোন পন্থায় পালন করতে পারেন। একজন প্রকৃত মুসলিম কিন্তু আল-কোরআন ও সুন্নাহ বিরোধী কোন পন্থায় এটি পালন করলে তা আর ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে না। বরং গড়মিল করলে তার জন্য তাকে ইহকাল বা পরকালে শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে। যেমন একজন নাস্তিক যদি মদের ব্যবসা করেন এবং তার লাভের কিছু অংশ অসুস্থ মানুষের সেবায় খরচ করেন কিংবা কেউ যদি মহাজনি সুদ-খুরি কোরে গরীবের কাছ থেকে জুলুম কোরে টাকা কামিয়ে কিংবা ঘুষ খেয়ে তা এতিম খানায় দান করেন, তাহলে সেটা হয়ত তার বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু একজন মুসলিম এরূপ কাজ করলে তাকে অবশ্যই দোষী সাব্যস্ত করা হবে এবং ইহকালে ও পরকালে শাস্তি পেতে হবে। কোনভাবেই বাঁকা পথে নয়, আল-কোরআন ও সুন্নাহর প্রদর্শিত পথে থেকে ন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ থেকে সাধ্যমত সৃষ্টিকূলের কল্যাণে খরচ করতে হবে। আর এভাবে চলতে পারলে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপই ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে বলে প্রকৃত মুসলিমগণ বিশ্বাস করেন।

ইহকালে একজন নাস্তিক বা আস্তিক সৎকর্মের জন্য পুরষ্কৃত হতে পারেন এবং অসৎ কর্মের জন্য ধরা পড়লে আইনের মাধ্যমে তার বিচার ও শাস্তি হতে পারে অথবা আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেঁচেও যেতে পারেন। যেহেতু নাস্তিকদের মধ্যে পরকালে সৎকর্মের জন্য পুরস্কৃত হবার বাসনা বা অসৎ কর্মের জন্য জবাবদিহিতার বা শাস্তি ভোগের ভয় থাকেনা। তাই তিনি পৃথিবীটাকেই সকল প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তির সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে ভাবতে শেখেন। যুক্তির মাধ্যমে নিজেকে কোন অসৎ কর্মের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারলেই নির্দ্বিধায় তা চালিয়ে যেতে থাকেন। পূর্ণ ঈমানদার নয় এরূপ কোন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রায়শই একই ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। বিশেষ করে এমন কিছু ব্যক্তি আছেন, যারা নিজেদেরকে ইসলাম অর্থাৎ শান্তির অনুসারী হিসেবে দাবি করেন, অথচ ২নং হক আদায়ের প্রতি তারা মোটেই যত্নশীল নন। ঈমানের ঘাটতি থাকায় নিজেদের মত করে ব্যাখ্যা দেয়ার কারণে নুতন ইজমের উদ্ভব ঘটে এবং অজ্ঞরা যখন অন্ধভাবে এর অনুসরণ করতে শুরু করেন, তখন শান্তি বিনষ্টকারী ফেতনা-ফাসাদ ঘটতে দেখা যায়। রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যও এই অন্ধ-অনুসারিদেরকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ইহকালে সৎ কর্মের জন্য পুরষ্কার না মিললেও বা পাপ কর্মের শাস্তি থেকে রেহাই পেলেও একজন প্রকৃত মুসলিমের অন্তরে কিন্তু পরকালে পুরষ্কৃত হবার বাসনা বা শাস্তি ভোগের ভয় থাকে। তাই হঠাৎ কোন পাপ কর্মে জড়িয়ে পড়ার পর একজন মুসলিমের জন্য একটি পথই খোলা থাকে। আর তা হলো- যত দ্রুত সম্ভব পাপ কর্মটির জন্য খাঁটি অন্তরে তওবা করে আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত পথে ফিরে আসা। এক্ষেত্রে আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরোধী বা বহির্ভুত কোন যুক্তি প্রদর্শনের কোন অবকাশ নেই।

লোকদেখানো অঙ্গভঙ্গি নয়, প্রশান্তচিত্তে উপাসনা করা চাই

যে কোন ইবাদত/ উপাসনাই হোক না কেন তা প্রশান্তচিত্তে ও একাগ্রতার সাথে পালন না করলে কামিয়াব হওয়া দুষ্কর বৈকি। ফরজ সালাত কায়েম করা ছাড়াও মহান স্রষ্টা প্রেরিত ঐশীবাণী চর্চা ও অনুধাবন করাও একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ উপাসনা। তাই এই ইবাদত/ উপাসনার যোগ্য সময় ও উত্তম পদ্ধতিও স্বয়ং আল্লাহতায়ালাই বাতলে দিয়েছেন।

সূরা মুয্যাম্মিল (মক্কায় অবতীর্ণ)

(৭৩:১ – ৮) ০১. ওহে! যে নিজেকে বস্ত্রাবৃত রেখেছ ০২. দণ্ডায়মান হও রাতে- কিছু অংশ পর্যন্ত, ০৩. এর (রাতের) মধ্যভাগের অথবা তার কিছু আগের ০৪. অথবা তার কিছু পরের এবং কোরআন আবৃত্তি কর ধীরস্থির স্পষ্টভাবে; ০৫. আমরা তোমার প্রতি প্রেরণ করব গুরুত্বপূর্ণ বাণী। ০৬. নিশ্চয় উপাসনার জন্যে রাত্রি জাগরণ- গভীর অভিনিবেশ ও হৃদয়ঙ্গম করার পক্ষে অতিশয় অনুকূল। ০৭. নিশ্চয় দিবাভাগে রয়েছে তোমার দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। ০৮. তুমি তোমার পালনকর্তার নাম স্মরণ কর এবং একাগ্রচিত্তে তাতে মগ্ন হও।

সূরা আয-যারিয়াত (মক্কায় অবতীর্ণ)

(৫১:১৫) নিঃসন্দেহে (মুত্তাকীনা) ধর্মপরায়ণরা থাকবে জান্নাতে ও প্রস্রবণে-

(৫১:১৬) তারা গ্রহণ করবে যা তাদের প্রভু তাদেরকে দেবেন। নিশ্চয় ইতিপূর্বে তারা ছিল (মুহসিনীনা) সৎকর্মপরায়ণ,

(৫১:১৭) তারা রাত হতে কিছু অংশ (আল্লাহর স্মরণে) ঘুমাত না,       

(৫১:১৮) আর নিশিভারে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করত,  

(৫১:১৯) এবং তাদের ধন-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক ছিল।

সূরা বনী ইসরাঈল (মক্কায় অবতীর্ণ)

(১৭:৭৯) এবং রাত হতে (কিছু অংশ আল্লাহর স্মরণে) জাগ্রত থাকুন। এটা তোমার জন্যে অতিরিক্ত। এমনটি হতে পারে যে, তোমার প্রভু তোমাকে উন্নীত করবেন (মোকামে মাহমুদে) এক সুপ্রসংশিত গন্তব্যে।

মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের জন্য যে গুরুত্বপূর্ণ বাণী ‘আল-কোররআন’ অবতীর্ণ করেছেন তা হৃদয়ঙ্গম করার জন্যে সুললিত কন্ঠে পাঠ করা ও শোনার সাথে সাথে একাগ্রচিত্তে মগ্ন হওয়াও জরুরী। যেহেতু দিনের বেলায় মানুষকে সাধারণত জীবিকার সন্ধানে কর্মব্যস্ত থাকতে হয়। তাই বাসস্থানে ফিরে এসে সময়মত রাতের খাবার খেয়ে ও এশার নামাজ শেষে অযথা সময় নষ্ট না করে সারাদিনের ক্লান্তি দূর করার জন্য ঘুমিয়ে নিতে হবে। সারারাত বেঘোর নিদ্রায় কাটিয়ে দেয়া নয় কিংবা নিজের উপরে জুলুম করে সারারাত জেগে নয় বরং সুবিধামতো রাতের কিছু অংশ সময় বেছে নিয়ে মহান আল্লাহর বাণী পবিত্র কোরআন পাঠ করার কথা বলা হয়েছে। ঘুম থেকে জেগে মধ্যরাতে অথবা তার কিছু আগে বা পরের কিছু অংশ সময় বেছে নিয়ে গভীর মনোনিবেশের সাথে স্রষ্টা প্রেরিত বাণী পাঠ ও অনুধ্যান করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সেই সাথে ক্ষমা চাওয়ার জন্য রাতের শেষ অংশে অর্থাৎ ভোরের কিছু আগে প্রার্থণা করার গুরুত্বের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

আমাদের এটাও মনে রাখা উচিত, শুধুমাত্র যন্ত্রমানবের মত আত্মকেন্দ্রিক অন্তরে পাঁচ বেলা কেন, মখমলের জায়নামাজে পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে পঞ্চাশ বেলা মাথা ঠেকালেও প্রকৃত পুণ্য, শান্তি ও মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন-

সূরা আল বাক্বারাহ (মদীনায় অবতীর্ণ)-

(০২:১৭৭) সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিমদিকে মুখ করবে, বরং বড় সৎকাজ হল এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর উপর কিয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাদের উপর এবং সমস্ত নবী-রাসূলগণের উপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্নীয়-স্বজন, এতিম-মিসকীন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্যে। আর যারা সালাত (নামায) প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত (পবিত্রতা অর্জনের জন্য পবিত্র জিনিস) দান করে এবং যারা কৃত অঙ্গিকার রক্ষা করে এবং ধৈর্য্য ধারণ করে (الْبَأْسَاءِ) দারিদ্র্যক্লিষ্ট অবস্থায় এবং (وَالضَّرَّاءِ) কঠিন দুঃসময়, জান-মালের ক্ষতি, রোগগ্রস্ত পঙ্গুদশায় আর (وَحِينَ الْبَأْسِ) ভীতি, আজাব, যুদ্ধের সময়; এরাই তো তারা যারা সত্যাশ্রয়ী এবং এরাই তো ন্যায়নিষ্ঠ/ ধর্মীষ্ঠ।

সূরা মাউন (মক্কায় অবতীর্ণ)

(১০৭:০১) তুমি কি দেখেছ তাকে, যে কর্মফলকে/ বিচার-দিবসকে/ ধর্মকে অস্বীকার করে?

(১০৭:০২) সুতরাং সে তো সেই ব্যক্তি, যে এতিমকে বিতাড়িত করে/ গলা ধাক্কা দেয়

(১০৭:০৩) এবং মিসকীনকে অন্ন দিতে উৎসাহ বোধ করে না।

(১০৭:০৪) অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাজির,

(১০৭:০৫) যারা তাদের নামাজ সম্বন্ধে বে-খবর;

(১০৭:০৬) যারা তা লোক দেখানোর জন্য করে

(১০৭:০৭) এবং অস্বীকার করে সামান্যতম দয়াপরবশ হতে (নিত্য ব্যবহার্য্য সামগ্রী অন্যকে দিতে)।

    হাদিস গ্রন্থ থেকে

    সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অধ্যায়ঃ ৬৫/ আচার ব্যবহার

    হাদিস নম্বরঃ ৫৫৬৫ মুহাম্মাদ ইবনু কাসীর (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাবী সুফিয়ান বলেন, আমরা এ হাদীস মারফুরুপে বর্ণনা করেননি। অবশ্য হাসান ইবনু আমর) ও ফিতর (রহঃ) একে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মারফূ হিসেবে বর্ননা করেছেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রতিদানকারী আত্মীয়তার হক আদায়কারী নয়। বরং আত্মীয়তার হক আদায়কারী সে ব্যাক্তি, যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পরও তা বজায় রাখে।

   হাদিস নম্বরঃ ৫৫৮০ ইসমাঈল ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) সাফওয়ান ইবনু সুলায়ম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মারফু রুপে বর্ণনা করেছেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যাক্তি বিধবা ও মিসকীনদের ভরণপোষণের চেষ্টা করে, সে আল্লাহর পথের জিহাদকারীর ন্যায়। অথবা সে ঐ ব্যাক্তির ন্যায় যে দিনে সিয়াম পালন করে ও রাতে (নফল ইবাদতে) দাড়িয়ে থাকে।

    হাদিস নম্বরঃ ৫৫৮২ আবদুল্লাহ ইবনু মাসালামা (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বিধবা ও মিসকীনদের অভাব দুর করার চেষ্টারত ব্যাক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর তুল্য। ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেনঃ) আমার ধারণা যে কানাবী (বুখারীর উস্তাদ আবদুল্লাহ) সন্দেহ প্রকাশ করেছেনঃ সে সারারাত দণ্ডায়মান ব্যাক্তির ন্যায় যে (ইবাদতে) ক্লান্ত হয় না এবং এমন সিয়াম পালনকারীর ন্যায় যে সিয়াম ভাঙ্গে না।

    হাদিস নম্বরঃ ৫৫৮৪ ইসমাঈল (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একদা একব্যাক্তি পথে হেঁটে যাচ্ছিল। তার তীব্র পিপাসা লাগে। সে একটি কুপ পেয়ে যায়। সে তাতে অবতরণ করলো এবং পানি পান করলো, তারপরে উঠে এলো। হঠাৎ দেখলো একটি কুকুর হাপাচ্ছে। পিপাসায় কাতর হয়ে কাদা চাটছে। লোকটি ভাবলো এ কুকুরটি পিপাসায় সেরুপ কষ্ট পাচ্ছে যেরুপ কষ্ট আমার হয়েছিল। তখন সে কুপে অবতরণ করলো এবং তার মোজার মধ্যে পানি ভরলো, তারপর মুখদিয়ে তা (কামড়িয়ে) ধরে উপরে উঠে এলো। তাহাপর সে কুকুরটিকে পানি পান করালো। আল্লাহ তাকে এর প্রতিদান দিলেন এবং তাকে মাফ করে দিলেন। সাহাবীগন জিজ্ঞাসা করলেনঃ ইয়া রাসুলুল্লাহ -জন্তুর জন্যও কি আমাদের পূরষ্কার আছে? তিনি বললেনঃ হ্যা। প্রত্যেক দয়ার্ত হৃদয়ের অধিকারীদের জন্য পূরস্কার আছে।

    হাদিস নম্বরঃ ৫৫৮৭ আবূল ওয়ালীদ (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মুসলমান যদি কোন গাছ লাগায়, তা থেকে কোন মানুষ বা জানোয়ার যদি কিছু খায় তবে তা তার জন্য সাদাকা হিসেবে গণ্য হবে।

    হাদিস নম্বরঃ ৫৫৯১ আসিম ইবনু আলী (রহঃ) আবূ সুরাইয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা বলছিলেনঃ আল্লাহর কসম! সে ব্যাক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর কসম! সে লোক মুমিন নয়! আল্লাহর কসম। সে ব্যাক্তি মুঁমিন নয়। জিজ্ঞাসা করা হলঃ ইয়া রাসুলুল্লাহ কে সে লোক? তিনি বললেনঃ যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না।

    হাদিস নম্বরঃ ৫৫৯২ আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেনঃ হে মুসলিম মহিলাগণ। কোন প্রতিবেশী নারী যেন তার অপর প্রতিবেশী নারীকে (তার পাঠানো হাদিয়া ফেরত দিয়ে) হেয় প্রতিপন্ন না করে। যদিও তা বকরীর পায়ের ক্ষুর হোক না কেন।

    হাদিস নম্বরঃ ৫৫৯৩ কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যাক্তি আল্লাহতে ও আখিরাতের দিনে ঈমান রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। যে আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। যে লোক আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস করে, সে যেন ভাল কথা বলে- অথবা চুপ করে থাকে।

    হাদিস নম্বরঃ ৫৫৯৫ হাজ্জাজ ইবনু মিনহাল (রহঃ) আয়িশা বলেনঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি বললামঃ ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমার দু-জন প্রতিবেশী আছে। আমি তাদের কার নিকট হাদিয়া পাঠাব? তিনি বললেনঃ যার দরজা (ঘর) তোমার নিকটবর্তী, তার কাছে (পাঠাবে)।

[সূত্র- http://hadithbd.com/show.php?pageNum_RsHadith=5&BookID=1&SectionID=70]

বান্দার হক ঠিকমত আদায় না করে পরম দয়ালু মহান আল্লাহতায়ালাকে পাওয়ার কথা চিন্তা করা আর মরীচিকার পেছনে ছুটে চলা একই কথা। যারা লোক দেখানোর জন্য নামাজ পড়েন, তাদের সেই নামাজ কোন উপকারেই আসেনা। এ ধরনের নামাজির পরিচয় হলো যে, তারা ধর্মের মৌল বিষয় যেমন কিয়ামতে অবিশ্বাস করেন, তারা এতিমকে তাদের হক থেকে শুধু বঞ্চিতই করেন না বরং গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেন, মিসকীন অর্থাৎ দিনদরীদ্র, ভিক্ষুককে অন্ন দিতে চান না এবং দয়াপরবশ হয়ে সামন্যতম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেও কুন্ঠাবোধ করেন। এ ধরনের লোকদেখানো নামাজির নামাজ তাদের জন্য দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনবে না। প্রকৃত অর্থে আল্লাহতায়ালার হক আদায় এবং বান্দার হক আদায়- এই দুটি কর্ম পরিচ্ছন্ন ভাবে পালনের মধ্য দিয়েই স্রষ্টার সান্নিধ্য ও প্রকৃত শান্তি মেলে।

ইসলামের বিধানের কোন বিষয়ই যেমন অযৌক্তিক নয়, তেমনি কেবলমাত্র যুক্তি নির্ভরও নয়। ইবাদতের মাধ্যমে দৈহিক ও মানসিক পরিশুদ্ধতা অর্জন এবং আত্মিক শান্তি প্রাপ্তিই এর মূল উদ্দেশ্য। আর এভাবে ব্যক্তিগত তথা সামষ্টিক পরিশুদ্ধতা অর্জনের মধ্য দিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণময় সমাজ গঠন করাই মুসলিমদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া চাই।

 

 

467 জন পড়েছেন

Comments are closed.