বৃষ্টি বিলাস ( দরিদ্র ভার্সন

2632 জন পড়েছেন

সালাম সাব, আমারে চিনছেন ? চিনবার পারেন নাই, আমি কাশেম সাব, আপনের এই বাড়ী কাজের সময় আমি ইট বালু টানছিলাম। সাব মনে কিছু নিয়ে না, বৃষ্টি পড়তাছে তাই একটু খারাইলাম। এহ কি বৃষ্টি মাঝে মাঝে গালি চইল্লা আহে । এমন বৃষ্টি বাদলার দিনে আমাগো খুব কষ্ট ।কোন কাম থাকে না, যারা নিয়মিত কাম করায় তারাও বেবাকতে কাম কাইজ বন্ধ কইরা দেয়।

বাপে আছিল ঘাটের মাঝি, অল্প বয়স থাইক্কা বাপেরে জিরান দেওনের লাইগ্গা দুপুরে নিজেই বৈঠা হাতে লইতাম, সন্ধ্যা পর্যন্ত নৌকা বাইয়া যখন খুব কষ্ট লাগতো তহন বাপে আইসা হাজির হইত। আমার বাপে নৌকা বাইত হেই মইধ্য রাইত পর্যন্ত । ভালাই চলতাম, এক দুপুর জমিনে কামলা দিলে দুপুরের খাওনডা মাঝে মইধ্যে  অন্যের বাড়িতে হইয়া যাইত। ঘরে আমার বড় দু’ইডা বুবু আছিল । বাপে কত দেনা কর্য কইরা তাগোরে বিয়া দিল। বিয়ার পর আবু অয়নের সময় বড় বুবুডা মারা গেলো, হগলে কয় হের জামাই নাকি বজ্জাত কিসিমের আছিল, বুবুরে ডাক্তরের কাছে লইয়া যায় নাই । আহা কত ভালা আছিল বড় বুবু, আমারে কত আদর করছে । ছুডু বুবুটা আমার চান্দের লাহান আছিল, গঞ্জের এক বইড়া বজ্জাত তারে জোর কইরা বিয়া কইরা লইয়া গেছিল। মায় কত কান্দছে,  বুইড়ার নাকি আগের ঘরে আরও তিনখান বউ আছে । ছুডু বুবু আমার সতীনের ঘর করতাছে । সতীনের ঘর যে কি যন্ত্রণার এইডা কইত মেনু চাচার বউ । আহা হের কতা হুনলে আমার চক্ষু দিয়া কান্দন চইলা আইত। বাপ আমারে স্কুলে দিবার পারে নাই, মাঝে মাঝে আফসোস কইরা কইত ” বাপরে তোর লাইগ্গা আমি কিছুই কইরা যাইতে পারলাম না, কয়দিন আর বৈঠা কাম করবি, সামনের দিন যে বড় আচানক দিন আইতাছে ” । বাপ আমার হাছাই কইছে, কয়দিন পর দেখলাম ইঞ্জিনওয়ালা নৌকা  আইলো, ঘাট পারের লোকজন সবাই তাড়াতাড়ি যাইবার চায়, তাই আমাগো নায়ে আর লোকজন উঠবার চায় না, যারা উঠে হেরা অইল বাকি কিসিমের, গরীব পয়সা নাই ওয়ালার দল। শুধু বাপেরে ভালবাইসা কয়েকজন উঠে তার মধ্যে একজন অইল আইজু মাষ্টার । মাষ্টরে একদিন নৌকায় উঠ্যা কইল হাশেম সবাই খালি ঐ পারে আগে যাইবার চায় কিন্তু এই দুনিয়ার ঐ পারে কি হেরা  যাইবার লাইগ্গা কি এত তাড়াহুড়া করব। মাষ্টরের কথাডা আমার মাঝে মইধ্যে মনে অয় । একখান সাড় কথা কইয়া গেছিল মাষ্টার সাব। এক এক কইরা ইঞ্জিন নৌকায় বইড়া গেলো এরপর এহন ঘাট পুরা ঠান্ডা এহন নদীর উপরে ব্রীজ বানাইছে সবার নৌকার কাম সারছে । জমি নাই জিরাত নাই কি কইরা খামু, পরের জমিনে কামলা দিলে নিজের পেটটা কুনু মতে চলে, ঘরে যে আমার বুড়া মা-বাপ আছে, হেগোরে খাওয়াইব কেড। চইলা আইলাম ঢাহা । ঢাহা আহনের সময় মায় অনেক কান্দছে, আমারে কইছে বাপরে ঢাহা যাইতাছো কামে লাইগ্গা কই থাকবি ? কই খাবি ? আমারে কি তুই আর ফিরা আইসা দেখবি ? মায় তো কান্দবই এতগুলা দিন মায়ের লগে থাকছি এহন ঢাহা যাইতাছি কামের লাইগ্গা । মারে জড়াইয়া ধইরা কইলাম মাগো কাইন্দ না আল্লায় আমাগোরে এই এখন পেট দিছে, যার ভিতরে দিনরাইত খালি আগুন জ্বলে, এই আগুন নিবানের লাইগ্গা আমাগড়ে কাম কইরা খাওন লাগবো, যেহানে কাম আছে ঐ হানে খাওয়ন আছে, তুমি কুনু চিন্তা কইরা না ।

হেই থাইক্কা আমি কাশেম ঢাহায় । সকাল বেলা বড় রাস্তার পাশে দাড়াই, মেলা কিসিমের লোকজন আহে হেরা আমাগোরে দিন চুক্তি লইয়া যায়। আমার পুজি অইল  এই শরীরডা, মাথার গামছা একখান  পাতি আর কোদাল । সাবেরা আমাগো লইয়া যায়, কোন দিন একলা কোন দিন তিন চাইরজন যাই । হারা দিন মাডি কাডি, ইট মাথায় কইরা উঠাই, বস্তা উঠাই । একটু দম নিবার গেলেই শুদ্ধ শুদ্ধ কতায় কি যেন গাইল পারে। আমার মনে অয় আমাগো জিরান দেওনের নিয়ম নাই। দুপুরে হাত মুখ দুইয়্যা ছাপড়া হোডেলে কয়ডা ভাত খাই । প্রতম আইয়া বুঝি নাই এহানে যে কত মাইর প্যাচ দালালরা আমাগো ঘাম লইয়া দালালি করে । ট্যাহা দেওয়নের সময় কম দেয় । আবার অনেকে বাকিতে কাম করায় ।সাব গো কাছে ট্যাহার লাইগ্গা গেলে আমাগো একবার সন্ধ্যায় একবার সকালে আইতে কয়। আমাগো ঘামের পয়সা মাইরা দেয় হেরা ।কয়দিন প্রতম আইসা আছিলাম মার্কেটের সামনে, ফুটপাতে ঘুমাইতাম, আহারে রইতে পুলিশ আর কত কিসিমের মানুষ আইয়া লাথি গুতা দিছে । কিছু কইবার পারি নাই, আমরা জাতে গরীব। একবার খুব শীত পড়ছে, ঠান্ডায় বাহিরে থাকন যায় না, আমার লাহান একজনে কইল ঐ মিয়া লও যাই মার্কেটের ভিতরে ঘমামু । গেলাম ঐহানে দাড়োয়ান কইল মাথা পিছে ৫ ট্যাহা লাগবো । কি করুম এই মাঘ মাসের শীতের রাইতে একটু কাইত না অইলে হকালে উঠ্যা কাম করুম কেমনে।

এহন আর এই কষ্ট নাই, ডোবার উপরে বাঁশের মাচার উপর এই ছাপড়া ঘর লইছি কুনু মতে খাওনের  থালাবাসন রাইখ্যা এট্টু চিত কাইত অয়ন যায় । এহানে তেমন শান্তি নাই রাইতে অইলে বাড়িওয়লা মদ গিল্লা চিল্লাপাল্লা করে, মাঝে মইধ্যে রাইতের বেলায় পুলিশ আহে । এলাকার মাস্তানরা মাঝে মইধ্যে ছেমড়ী লইয়া আহে, লাগে কাইজ্জা, মারামারি গালাগালি আর কত কি । আমি খালি হুনি কুনু দিন জবাব দেই না । বাপ আমরে কইছিল বাজান কারো লগে ঝগড়া কইরা না ।

আইজ তিন দিন ধইরা খালি বৃষ্টি পড়তাছে ।  সাহস কইরা গত কাইল বাজারে গেছিলাম কামের আশায় । নাহ মেলা বেলা পর্যন্ত বইয়্যা থাইক্কা কুনু কাম পাইলাম না । বৃষ্টি মাথা লইয়া ঘরে ফিরা আইছি।  গামছায় কয়ডা চাইল আছিল, চুলায় কেরাসিন  দিয়া চুলা ধরাইয়া রান্ধন শুরু করলাম। এর মইধ্যে মফিজ চাচায় আইল, হের নাকি খুব খারাপ অবস্থা, হের ছুডু পোলার পেট নামছে, তারে ডাক্তরের কাছে লইয়া যাইতে অইব ট্যাহা চাইল ২০০। কি করি শত হউক জাত ভাই, হের চোখে পানি দেইহা জমাইন্যা ট্যাহার থাইক্কা ২০০ দিয়া দিলাম। রান্না আমার প্রায় শেষ আমার ছাপড়া ঘরে ভাঙ্গা দরজায় একখান ছুডু হাতের বাড়ির শব্দ হুনলাম, দরজা খুল্লা দেহি ৩ বছরের ময়না খাড়াইয়া আছে, হেয় কইল চাচা ঘরে খাওয় নাই, কয়ডা ভাত দিবেন। ময়নার মার কয়দিন আগে আবু অইছে পুয়াতি মানুষ, বজ্জাত ময়নার বাপ রিকশা চালায় আর খানে খানে বিয়া করে হেয় কখন কই থাহে কেউ কইতে পারে না । এরুম ছুডু বাচ্চা গুলা ফালাইয়া মানুষ গুলা কেন যে এমুন করে জানি না । আমার ভাত খাওয়া আর অইলা  আমার রান্না করা খাওন ২জনের খাইতে কষ্ট অইব, পেট ভরবো না, খালি ভাত দিলে অইব সালুন লাগবো না, আর আমিই বা ভাত ছাড়া সালুন দিয়া কি করুম, সব দিয়া দিলাম ময়নারে ।বৃষ্টি বাড়তাছে চারদিক থাইক্কা ঠান্ডা বাতাস বেড়ার ফাঁক দিয়া ঢুকতাছে কি আর করন এক মগ পানি খাইয়া ঘুম দেই।

আইজ তিন দিন হইয়া গেল বৃষ্টি থামবার কুনু লক্ষণ নাই, কাম নাই ট্যাহাও নাই। চাচার দোকান থাইক্কা বাকিতে রুটি চা খাইয়া আর কয়দিন কাডামু জাননি । মাঝে মইধ্যে মনে মনে বৃষ্টিরে গালি পাড়ি। বৃষ্টিরে লইয়া নাকি অনেকে গান অয়, অনেক কবিতা বড় লোকরা নাকি বৃষ্টিরে নিয়া বিলাসিতা করে । আর আমাগো বৃষ্টি অইল কষ্ট, বৃষ্টি অইল ক্ষুধা । বৃষ্টির পানি আমাগো কুনু সুখ দিবার পারে না । এর লইগ্গাইত হুনি কারও পৌষ মাস কারও সর্বনাশ।

2632 জন পড়েছেন

Comments

বৃষ্টি বিলাস ( দরিদ্র ভার্সন — ৬ Comments

  1. সংলাপব্লগে স্বাগতম! পড়ে ভাল লাগলো! চালিয়ে যান! সাথে আছি।

  2. একটানা বৃষ্টি যেমন সব কিছু ভিজিয়ে ভাসিয়ে দেয়, তেমনই এ গল্প পড়ে মনটা ভিজে উঠলো। বিলাসিতা করার সময় বৃষ্টির এই সর্বনাশা দিকটির কথা কেউ মাথায় রাখে না। সখের বৃষ্টি স্বস্তির বৃষ্টি যে এমন করে কত মানুষকে নিত্যদিন হাহাকারের মাঝে ডুবিয়ে মারে সে হিসাব কে রাখে?
    কিছু টাইপো আছে, সেগুলো ঠিক করলে গল্পটি পাঠে পাঠক আরও বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করবে।
    চমৎকার একটা গল্প উপহার দেবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ, ভাই তানিম হক।

  3. তানিম আপনাকে আমাদের মাঝে দেখতে পেয়ে খুশি হলাম।
    গল্পটি প্রাণ ছুঁয়ে গেল। আরও আসবে এই আসা থাকলো। ধন্যবাদ।