ধর্মীয় বাণী পাঠে কেবল আক্ষরিক ব্যাখ্যার প্রভাব

169 জন পড়েছেন

সেদিন টরন্টো ডাউন টাউন থেকে কাজের শেষে ঘরে ফেরার পথে যখন ট্রেনে বসে আছি হঠাৎ সামনে এক টিভি চ্যনালের  বিজ্ঞাপন নজরে পড়ল। যাতে লিখা ছিল “You do not know what people are going through. Park your judgements and just listen.

টিভি কোম্পানি তাদের দর্শক বাড়াবার জন্য সে কথাগুলো বলে থাকলেও আমি মনে করি এ কথাগুলো একটু বিস্তারিত করে এভাবেও বলা যায় আপনি কি জানেন মানুষের মনে বা তার চিন্তার জগতে কি বয়ে যাচ্ছে? তাই  কাউকে আপনার পূর্ব নির্ধারিত বিশ্বাস বা দর্শন দিয়ে বিচার করা বন্ধ করুন আগে তার কথাটি শুনুন, তাকে বুঝতে চেষ্টা করুন। আসলেই মানুষ তাদের সমাজে চলে আসা দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও ধর্মীয় সংস্কৃতির যে  ধারণা ও ব্যাখ্যা মনে ধারণ করে আসছে তার বাহিরে কোন কিছু চিন্তা করতে চায়না।

দেশ ছেড়েছি আজ অনেক বছর হয়। ইতিমধ্যে এশিয়া ও ইউরোপ ও নর্থ আমেরিকায়  থাকার কারণে অনেক জাতী ধর্মে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী মানুষের সাথে কাজ করার ও আলাপ আলোচনার সুযোগ হয়েছে। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় যে ব্যাপারটি এক জন বিশ্বাসী মুসলিম হিসাবে প্রকাশ পেয়েছে তা হল বিচিত্র এ পৃথিবীতে কত বিচিত্র মানুষ কত ভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাস নিয়ে তাদেরমত জীবন যাপন করছে বা সুখে শান্তিতে বাস করছে। আবার এই পৃথিবীতে ধর্মে বিশ্বাসী দাবী করেও অনেক জনপদে নেমে আসছে প্রবল অশান্তি ও যুদ্ধ বিগ্রহ এবং চলছে মানুষ হত্যা ও ধ্বংস যজ্ঞ । কিন্তু এরা সবাই তো আল্লার সৃষ্টি আর কেউ তো এখানে চিরদিন থাকবে না। তাহলে কেন এখানে হতে হবে এত অন্যায় অত্যাচার এত মানুষ হত্যা ও ধ্বংস যজ্ঞ? বলা হয় এটাই নাকি দুনিয়ার নিয়ম যা চলে আসেছে যুগ যুগ ধরে এটি চলতে থাকবে। তাহলে মানুষ জাতীর এটি কি চরম ব্যর্থতা নয় যে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের এত  উন্নতী করেও সে সভ্য হতে পারল না?

প্রাক আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় তথা মধ্য যুগীয় সমাজ ব্যবস্থার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় তখন বিশ্বের সর্বত্র প্রায় সকল মানুষ স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করত এবং স্রষ্টাকে উপাসনা করা হত বিভিন্ন ধর্ম পদ্ধতীতে । আর দ্বিতীয় যে বিষয়টি আলোচিত হত তা হচ্ছে মৃত্যুর পরের জীবন তথা স্বর্গ ও নরক। তৃতীয় যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা হচ্ছে নৈতিকতার উৎকর্ষে আত্মার পরিশুদ্ধতা অর্জন। এই তিনটি বিষয় মোটামুটি সকল ধর্ম বিশ্বাসীদের কাছে গুরুত্বপূর্ন বিষয় ছিল। সে তুলনায় আজকের আধুনিক সমাজ অনেকটা ভিন্ন বলা যায়। এখানে ধর্মের গুরুত্ব বা ধর্ম বিশ্বাসকে খাটো করে দেখা হয়। যারা ধার্মিকতার কথা বলেন তাদেরকে বোকা ও মৌলবাদী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। সমাজ বিজ্ঞানীরা এর বিভিন্ন কারণ বর্ননা করেছেন। বিশেষ করে ইসলামী মৌলবাদকেও বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার সাথে অনুপযোগী মনে করা হয়। এ দিকে ইউরোপের এনলাইটমেন্ট বা  আলোকায়ন আন্দোলনের  প্রভাবে মানুষ গণিত, ভূগোল ও পদার্থবিদ্যা, সাহিত্য , দর্শন , চিত্রশিল্প , রাষ্ট্র ও সমাজ চেতনায় বিশেষ করে মধ্যযুগীয় ইসলামী সভ্যতার ক্লাসিকাল বিদ্যা চর্চার অনুসরণে বৈজ্ঞানিক মনোবৃত্তির উন্মেষ ঘটে যার ফলে মানুষের কল্পনা প্রেরনা ও কর্মশক্তির উদ্বোধন, শিল্প বিপ্লব ইত্যাদি সৃজনশীল কার্য্যকলাপ পশ্চিমা দেশকে বৈষয়িক উন্নয়নে এগিয়ে নিয়ে যায়। এনলাইটমেন্ট ইউরোপের মানুষকে ধর্ম নিয়ে চিন্তাভাবনা ছেড়ে বস্তুতান্ত্রিক জীবন নিয়ে ব্যস্ত হতে শিক্ষা দেয়।

প্রখ্যাত মার্কিন ভূতাত্ত্বিক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক কৌশলবিদ জর্জ ফ্রিডম্যানের  মতে,”দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নিজেকে ঢেলে সাজিয়েছে ইউরোপ। এক সময় তারা ছিল খ্রিষ্টান,এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সেকুলার। এ কারণে মুসলিম ধর্মভাবের সাথে ইউরোপিয়ান সেকুলারবাদের সঙ্ঘাত বাধছে। আর এটাই সঙ্ঘাতের অন্তর্নিহিত শক্তিকে ভিন্ন করে তুলেছে।

“ফরাসি এনলাইটমেন্টের” নীতিমালা ইউরোপ গ্রহণ করার ফলে ধর্মকে তারা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়ে পরিণত করে ফেলেছে। ফলে ধর্ম এখন আর সামাজিক জীবনের অংশ নয় এবং অন্যদের সামাজিক জীবনকে প্রভাবিত করে না। ইসলাম, অভিবাসন ও সন্ত্রাসবাদকে একই জিনিস হিসেবে সমালোচনা করার দৃষ্টিভঙ্গির মূলে রয়েছে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবন এবং সামষ্টিক ও ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্বের ব্যাপারে ইউরোপিয়ান এনলাইটমেন্ট-ভিত্তিক চিন্তাভাবনার প্রভাব।”

আমি মনে করি পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ আবেগ ছেড়ে বাস্তব মানসিকতার লালন করে আর মুসলিম বিশ্বের জনগণ হচ্ছে আবেগ প্রবণ অর্থাৎ তাদের কাছে আবেগ প্রথম অগ্রাধিকার পায়।

তবে একথা বুঝতে হবে পশ্চিমা বিশ্বের রেনেসা যুগের নতুন চিন্তাধারা আর বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের অবদানের সুযোগে সামরিক শক্তি অর্জনের কারণে সেসব দেশের ডাকাতরা উপনিবেশবাদের জন্ম দিতে পেরেছে । যা এখনও চলছে অন্যভাবে। তাই অনেকে বলতে পারেন যে “কোনো সমাজে যেমন কিছু এনলাইটেড (আলোকিত)  লোক থাকে, তেমনি কিছু চোর-ডাকাতও থাকে। ইউরোপিয়ান এনলাইটেড লোকেরা জ্ঞান নিয়েই পড়েছিল, রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল ডাকাতদেরই হাতে। এনলাইটমেন্টের সুবিধা ঐ ডাকাতরাই দখল করেছে।” এটি করতে পেরেছে কারণ তারা ধর্মকে ধর্মের বিশ্বজনীন কল্যাণ থেকে বিদায় দিয়েছে আর সেটি ছিল তাদের বড় ভুল। তাই আজ পশ্চিমাদের অবদান পুনর্বিবেচনা করতে হবে। এটা মানতে হবে এনলাইটনম্যান্ট আধুনিক বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন করেছে, টেকনোলোজি বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, চিকিৎসা শাস্ত্রকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে, মেডিসিনেও, কমিউনিকেশনে এবং তথ্য প্রযুক্তিতে অপরিসীম অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু অমানবিকতার দিকে তাকালে সবকিছু ম্লান হয়ে যায়। বিষয়টির বিবেচনার জন্য মজলুম ভায়ের এই লেখাটি দেখা যেতে পারে: এনলাইটমেন্ট পৃথিবীকে কি দিয়েছে? এবং এই এনলাইটনম্যান্টের ধারণা ও সংক্ষিপ্ত পটভূমি দেখতে এম_আহমদ ভায়ের এই লেখাটিও দেখা যেতে পারে: এনলাইটনম্যান্ট।

অবশ্য কোন ঔষধের যেমন সাইড এফেক্ট থাকে তেমনি এনলাইটমেন্টও। বস্তুকেন্দ্রিকতা মানবতাকে “এক-চোখা” করে ফেলেছে। বস্তুর বাইরে কিছুই থাকছে না: শুধু স্বার্থ,আর পার্থিব উন্নতি। এই উন্নতির জন্য লক্ষ-কোটি হত্যা করা যেতে পারে। এইখানেই এনলাইটনম্যান্ট আটকে গিয়েছে। এটাকে দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত করা দরকার।

কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হল ইউরোপ আমেরিকায় এনলাইটনম্যান্টের ভাল-মন্দ উভয় দিক বিস্তার লাভ করলেও মুসলিম বিশ্বে নিছক মন্দটাই প্রসারিত হয়েছে। কারণ সেখানে স্বাধীন চিন্তায়, গণতন্ত্রে ও আধুনিকতায় “কুফরি” আবিষ্কার করে সবকিছু উড়িয়ে দেয়া হয়।

আজ মুসলিমদের কাছে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল যে আমাদের সমাজে এনলাইটমেন্ট কবে আসবে? এ প্রশ্নের উত্তর যদি  “কেবল কোরআন আর সুন্নাহর অনুসরণ বুঝাই যথেষ্ট”, তাও আবার একেবারে সপ্তম শতাব্দীর আলোকে আলোকিত হয়ে কট্টর সালাফি-মার্কা চিন্তায়,কিংবা পাক-ভারত উপমহাদেশের লম্বা-কোর্তার হুজুরদের কথাবার্তায়, আর আবেগী কিচ্ছা কাহিনীর সম্বলিত ওয়াজে, তাহলে  এনলাইটমেন্ট আসবে কিনা ভেবে দেখতে হবে। ধর্মীয় বানী পাঠে আক্ষরিক ব্যাখ্যা যে মানুষকে কত উন্মাদ করতে পারে তার অন্যতম একটি উদাহরণ পাই ১৯৭৯ সনে জুহাইমান আল হুতাইবি সন্ত্রাসীদের হাতে, মক্কা অবরোধের ঘটনায়। সৌদি আরবের ইতিহাসে নাটকীয় এবং অপ্রকাশিত কাহিনীগুলোর একটি হচ্ছে এই ১৯৭৯ সালের পবিত্র মক্কা অবরোধের ঘটনা।  আমি তখন সৌদি আরবে ইষ্টার্ন প্রদেশে চাকুরী করতাম। সম্পূর্ণ ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পিছনের কারণ বুঝতে নিচের ডিডিওটি দয়া করে শুনুন।

 

169 জন পড়েছেন

Comments are closed.