আর আই এস সম্মেলন – ২০১৭

438 জন পড়েছেন

পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিম যুব সমাজের এক অনন্য আয়োজন আর আই এস সম্মেলন।  প্রতি বছরের মত এবারও ২০১৭ সালের আর আই এস সম্মেলন হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে  ডিসেম্বর ২২, ২৩ ও ২৪ তারিখ পর্যন্ত  অনুষ্ঠিত হয়েছিল মেট্রো টরন্টো কনভেনশন সেন্টারে। এ কনভেনশন ছিল ১৬তম বাৎসরিক সম্মেলন।
মাইনাস তাপমাত্রার আবহাওয়া তথা প্রচণ্ড শীত এবং বরফ বর্ষণ স্বত্বেও হাজার হাজার লোকের সমাগম হয়েছিল।

এবারের সম্মেলনের থিম ছিল ‘Finding Stability in a World Out of Balance,’ অর্থাৎ ‘ ভারসাম্যহীন এ বিশ্বে স্থিতিশীলতার সন্ধানে’  সম্মেলন আয়োজকরা বলেন, “ইসলামি স্পিরিট পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে পশ্চিমা মুসলিম তরুণ তরুণীরা যাতে বৃহত্তর সমাজের সাথে যুগোপযোগী যোগাযোগ স্থাপন ও সহ অবস্থানের নতুন চ্যালেঞ্জ দূর করতে পারে সে চেষ্টা করা। সম্মেলনটি লক্ষ্য রাখে, ইসলামিক সহনশীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা এবং শ্রদ্ধার ঐতিহ্যকে পুনর্বাসন করা বা চর্চা করা যাতে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উত্তর আমেরিকার সমাজের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখা যায়”।

কানাডার ফেডারেল ও অন্টারিও প্রাদেশিক সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এবং  বিভিন্ন বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সম্মেলন হলে এসে দর্শকদের উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা বার্তা দেন।

কানাডার প্রধান মন্ত্রী জাষ্টিন ট্রুডো একটি ভিডিও বার্তা প্রেরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোয়ের মতে, কানাডায় মুসলমানরা কানাডার জন্য একটি বিরাট সম্পদ।

 তিনি আরো বলেন,

“Canada is fortunate to have a vibrant Muslim Community in Canada,” said Prime Minister Trudeau in his special video message to the gathering. “Over the years, Muslim Canadians have thrived and greatly contributed to Canadian society, all the while maintaining important traditional connections to their homelands that have uniquely shaped the community’s rich cultural heritage. As we gather here this weekend, we celebrate and reflect on the diversity that is a source of strength for Canadians. Our ethnic, religious and racial diversity is part of what makes us uniquely Canadian and allows us all to prosper in our open and inclusive society.”

আসলেই আর আই এস  কনভেনশন অন্যতম নেতৃস্থানীয় মুসলিম ব্যক্তিত্বদের একটি প্রধান প্লাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত  হচ্ছে বলা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নেতৃস্থানীয় ইসলামিক পণ্ডিত, শিক্ষাবিদেরা তাদের মূল্যবান বক্তৃতায় বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসলামে বিশ্বাসীরা কিভাবে পশ্চিমা সমাজে নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে সমাজে রোল মডেল হিসাবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন সে বিষয়ে সবাইকে দিক নির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা দেয়া হয়। বক্তাদের আলোচনায় ইসলাম ভীতি তথা “ইসলামোফভিয়ার” মিথ্যা প্রচারণা সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে। তবে এবিষয়ে ইসলাম বিদ্বেষীদের জন্য কিন্তু অনেক রসদ মুসলিম কমিউনিটির আভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকেও যে সরবরাহ হচ্ছে সে ব্যাপারে সতর্ক হতে বলা হয়েছে।  উদাহরণ স্বরূপ পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থার বৈষম্যের শিকার হওয়া থেকে মহিলারা এখনও মুক্ত নয়! আর সেটি প্রাচ্যের মুসলিম বিশ্বে যেমন দেখা যায় তেমনি ইউরোপ আমেরিকার মুসলিম সমাজে দেখা যায়। যেমন মসজিদ ও ইসলামী সেন্টারসহ বিভিন্ন ইসলামী প্রতিষ্ঠানে মহিলাদের জায়গা নাই বললেই চলে। ইমামতী করতে হবে সেটি কেউ বলছে না কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিষদে খুব কমই মহিলাদেরকে রাখা হয়।

আবেগ ও চিৎকার আর ভিকটিম মানসিকতা ছেড়ে নিজেদেরকে বৃহত্তর সমাজ থেকে আলাদা না করে অন্যান্য ধর্মের ভাল মানুষের সাথে মিলে মিশে তথা সেতু বন্ধন সৃষ্টি করে সমাজের অন্যান্য জন গুষ্টির বঞ্চনা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এক সাথে কাজ করার অপরিসীম গুরুত্বের কথা সবাইকে জানান হয়।

“ইসলামে মহিলার সম্মান একটি ভুলে যাওয়া সুন্নাহ” শীর্ষক বিষয়ে আফ্রিকান আমেরিকান বোন উস্তাদা আইয়েশা প্রাইম প্রদত্ত ভাষণটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন ও হাদিসের আলোকে এবং ইসলামের ঐতিহ্যে মহিলাদের যে সম্মান ছিল তা ভুলে গিয়ে নারীদেরকে তাদের উপযুক্ত মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বর্তমান মুসলিম সমাজে!  তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে মায়ের গর্ভের সাথে সরাসরি ঈশ্বরীয় তথা আল্লাহর আরশ বা সিংহাসনের সংযোগ থাকে। সময়ের অভাবে আমার পক্ষে তার সম্পূর্ন  ভাষণটির অনুবাদ করা সম্ভব হচ্ছেনা। যদি কখনও সেটি ইউটুভে আপলোড হয় তখন লিংক দেয়ার চেষ্টা করব। তবে আমি মনে করি ইসলামে মেয়েদের অধিকার ও মর্যাদা বিষয়ে একজন মহিলার কাছ থেকে এভাবে ব্যাখ্যা আসলে মানুষের সাইকোলজিতে বিশেষ করে মেয়েদের মানসিক চিন্তাধারায় ইসলাম সম্পর্কে যে পজিটিভ প্রভাব পড়ে তা পুরুষের লেকচারে সম্ভব হয় না। সে বিবেচনায় তার ভাষণটি আমার কাছে অনন্য মনে হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বলতে চাই ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানের পর ওয়াশিংটনে ট্রাম্প বিরোধী মিলিয়ন মহিলার ঐতিহাসিক র‍্যলিতেও আয়েশা প্রাইম ভাষণ দেয়ার সুযোগ পান। সে বক্তৃতার কিছুটা শুনতে পাবেন এখানে।

আল জাজিরার “আপ ফ্রন্ট” অনুষ্ঠানের প্রখ্যাত উপস্থাপক মেহদী হাসান ও বক্তব্য রাখেন। মেহদী এখন আমেরিকায় থাকেন তার মতে

পশ্চিমা দেশের মুসলিমরা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার লড়াই ও রাজনীতির পক্ষে বিপক্ষের কোন শিবিরে যুগ দেয়ার দরকার নাই এবং এসব নিয়ে নিজেদের সময় নষ্ট না করে পশ্চিমা বিশ্বে কিভাবে নিজেদের ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে পারেন সে প্রচেষ্টা করা দরকার। তার মতে শিয়া সুন্নির হিংসা বিদ্বেষ এখানে ছড়াতে দেয়া যাবেনা। মধ্যপ্রাচ্যের সে সব দেশে যা হচ্ছে সে গুলো নিছক তাদের ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। তদের কাছে বিশ্বের মুসলিমদের কোন স্বার্থ রক্ষা, কল্যাণ বা ঐক্যের কোন গুরুত্ব নাই! এমন কি ইউরোপ আমেরিকার মুসলিম জনগুষ্টির স্বার্থ বা অধিকার আদায়ে তাদের কোন দরদ না্‌ই! তিনি বলেন বর্নবাদী একজন ইসলাম বিদ্ধেষী সন্ত্রাসী যখন কোন মুসলিম মহিলাকে আক্রমন করে বা তির্যক মন্তব্য করে তখন কি সে জিজ্ঞাসা করে হিজাবি সেই বোনটিকে যে তিনি শিয়া না সুন্নি? অতএব ইউরোপ আমেরিকার মুসলিমদেরকে নিজেদের মাঝে ঐক্য গড়তে হবে।

ড: হাতেম বাজিয়ান তার বক্তব্যে সবাইকে মার্টিন লিথার কিং এর ১৯৬৮ সনের একটি ভাষণের কথা সবাইকে স্মরন করিয়ে দেন। যখন তিনি বলেছিলেন আমেরিকান সমজের অশুভ শক্তির উৎপত্তিতর  (evil force) লক্ষ্য হচ্ছে তিনটি বিষয়। ১) মিলিটারিজম, ২) মেটেরিয়েলিজম ও ৩) রেইসইজম। বস্তুত আমেরিকার রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা যে উপরোক্ত লক্ষ্য অর্জনে দাবিত হচ্ছে তা অস্বীকার করা যায় না।

ড: হাতেম বাজিয়ানের মতে ইসলামোফবিয়ার কারণ  ইসলাম সম্পর্কে  শুধু মাত্র কারো অজ্ঞতাকে দায়ী করলে চলবে না যদিও   ব্যক্তি বিশেষ ক্ষেত্রে সেটি সত্যি হতে পারে কিন্তু ইসলামোফবিয়াকে সামাজিক রূপ দিতে কাঠামোগত প্রকৌশলী অপচেষ্টা কারা করছে এবং কেন করছে সেটি জানতে হবে। এরা হচ্ছে এক ঝাড় অভিজাত শ্রেণীর লোক বিশেষ করে পলিটিক্যল ইলিট যারা ইসলামোফবিয়ার মাঝে  একটি সুবিধা ও সুযোগ খুঁজে পায় এবং সেই সুযোগকে কৌশলগত স্থাপনার মাধ্যামে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধি বাস্তবায়ন করতে পারে।

ড: হাতেম বাজিয়ানের লেকচারটি  শুনে আমার মনে হল “ইসলাম একটি ভায়লেন্ট ধর্ম” বলে যে অপপ্রচার ইসলামোফবিয়ারা করে তার জবাব শুধু হুজুরদের ওয়াজে আর মিম্বারের খুতবায় দিয়ে বন্ধ হবে না।  প্রতিটি মুসলিমদেরকে নিজেদের সৎ আচরণে প্রকাশ করতে হবে প্রমাণ দিতে হবে । নিজেদেরকে ইতিহাস জানতে হবে ইসলাম প্রচারে রাসুল (স:) বিজয়ের ইতিহাস জানতে হবে। কাফিরদের সাথে কেন কোথায় যুদ্ধ হয়েছে হতাহতের সংখ্যা কত ছিল এবং বর্তমান সেকুলার সভ্যতার যুদ্ধের হতাহতের সংখ্যার তুলনা করতে হবে,  তথ্য প্রমাণ দিয়ে লিখতে হবে এবং তা বিশ্বে প্রচার করতে হবে সেই সাথে ইসলামোফবিয়াকে সামাজিক রূপ দিতে কাঠামোগত প্রকৌশলী অপচেষ্টায় যারা জড়িত তাদের মুখোশ তুলে ধরতে হবে সাধারণ মানুষের সামনে।

তবে ইসলাম ভীতি ও ইসলাম বিদ্বেষ শুধু পশ্চিমা দেশে বাড়ছে বলা ঠিক নয় বরং এখন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও তা বিদ্যমান। এক কথায় ইসলামফোবিয়া এখন একটি গ্লোবাল তথা বিশ্বব্যাপী ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। মানব জাতীকে এ রোগ থেকে রক্ষা করতে না পারলে সভ্যতার ধ্বংস অত্যাসন্ন।

পশ্চিমা বিশ্বে আমাদেরকে সম্মানের সাথে ঠিকে থাকতে চাইলে সবাইকে শুধু ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার নিশানা না করে আমাদের মাঝে ভাল গল্প ও কবিতা লেখক হতে হবে, সাংবাদিকতায় যেতে হবে, দেশের রাজনীতিতে ঢুকতে হবে এক কথায় সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম এরকম  সকল পেশায় মুসলিম চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে।

উপরোক্ত স্কলার ছাড়াও বক্তব্য রাখেন শেখ যায়েদ শাকের, শেখ ইয়েসির ক্বাদি, তাবলিক জামাতের মৌ তারিক জামিল ও সাউথ আফ্রিকার সুলেমান মুল্লা সহ আরো অনেকে।

আমেরিকা থেকে আগত প্রখ্যাত  লেখক, অ্যাটর্নি ,ও কলামিস্ট ,  দ্য ডোমেস্টিক ক্রুসেডার্স নাটকের রচয়িতা  এবং অনুসন্ধানী রিপোর্টার রুটস অব ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্ক ইন আমেরিকার লেখক ওয়াজাহাত আলী সামাজিক মিডিয়ার ফেইক নিউজ সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন এবং সামাজিক মিডিয়ার সঠিক ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

নিচের ভিডিও লিংকটি দেখতে হলে  ফেইসবুকে লগইন হতে হবে।

Between the Lines: Framing the Other – Muslims in Everyday Discourse

Framing the Other – Muslims in Everyday Discourse by Wajahat Ali / Salma Yaqoob

Posted by RIS – Reviving the Islamic Spirit on Sunday, December 24, 2017

 

438 জন পড়েছেন

Comments are closed.