জিন্দাবাদ ও এলার্জি

200 জন পড়েছেন

“জিন্দাবাদ শব্দের অর্থ হয় দীর্ঘজীবী হোক। এই কথাটি হিন্দু মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টিয়ান সবাই বলতে পারে, কোন বাঁধা নেই। জিন্দাবাদ শ্লোগান এই ভূখণ্ডে নতুন কিছুও নয়। এর দীর্ঘ সূত্রিতা আছে। এদিক থেকে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলাতে এই দেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম সত্তা অটুক থাকুক এবং দীর্ঘায়ত হোক –এই ইচ্ছা ও আগ্রহ প্রকাশ পায়। যারা এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঠিকিয়ে রাখতে চায় এবং এই প্রবল আগ্রহ ধারণ করে, তাদের জন্য জিন্দাবাদ কোন আপত্তির কথা হতে পারে না।
জিন্দাবাদ শব্দটি অর্থগতভাবে ‘জয়’ শব্দের মোকাবেলায় আসে না বা আসতেও পারে না। কোন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিছক জয়ের শ্লোগান হিসেবে দ্বিতীয়টি কণ্ঠে কণ্ঠে উচ্চারিত হতে পারে, যেভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতালগ্নে এসেছিল। কিন্তু বিজয়ের পর তা জয়ের বাস্তবতাকে দীর্ঘায়ত করার কামনা ও প্রত্যয়ে আসা ভাল। আর জিন্দাবাদ তা’ই প্রকাশ করে।
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ –বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক, এটা সাক্ষাতভাবে এবং স্পষ্টত তাৎপর্যপূর্ণ। এই ধারণায় কোন খাদ নেই। জয় বাংলাতে এই তাৎপর্য নেই বরং তাতে অনেক প্রশ্নই থেকে যায় –কোন বাংলা? জয় মা কালী বললে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের অনুভূতি পাওয়া যায়। দেশকে দেবী ধরে যদি জয় বাংলা বলা হয় তবে যারা দেশকে দেবী ভাবতে পারবে না তারা এতে একাত্ম হতে পারবে না। তবে এই জয়ের ধারণা আরও কিছু অর্থে ভাবা যেতে পারে তবে তা জিন্দাবাদের মত নয়। আগের প্রশ্নে এসেছে, জয় বাংলা কোন বাংলাকে নির্দেশ করে, পূর্ব, পশ্চিম -না উভয় বাংলা? অথবা এটা কি মার্ক্সবাদী শ্রেণী সংগ্রামের ধারণা সম্বলিত মন্ত্র যা বুর্জোদের টাকায় রাজপথে মুহুর্মুহু হয়? হাস্যকর বটে? চিন্তাজাগানিয়াও -তাই না? এই মন্ত্রে (যদি তা মন্ত্র হয় তবে তাতে) কীসের ধারণা নিহিত? খামাখা জেদ করে অথবা অন্য কোন কারণে যে শব্দ যে ধারণা প্রকাশ না সেই ধারণা জুড়ে দিয়ে অন্যদেরকে বকাবকি করে কী কোন লাভ আছে? জিন্দাবাদ বলে কী বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু কারও আত্মপরিচয় নষ্ট হয়ে যায়? এটা কেউ ভাবতে পারে? জয় বাংলা বললেই কী তা প্রগতির (progress) কথা হয়ে যায়? জিন্দাবাদ বললে কী সেই প্রগতি অধোগতিতে পর্যবসিত হয়? জয় বাংলার উচ্চারণের সাথে সাথে কী অলৌকিকতা কাজ করে? এই উচ্চারণে আত্মপরিচয় লাভ হয়? (এই উচ্চারণ না হলে আত্মবিস্মৃতি ঘটে?), ইতিহাস আত্মায় আলোর মত উদ্ভাসিত হয়? মস্কো-পিকিং এর রাজনৈতিক বিপ্লব লম্ফ মেরে জাগ্রত হয়? শ্রেণী সংগ্রাম তীব্র, বলিষ্ঠ হয় –তাই নাকি? ওরে বিনোদন! বুর্জোয়াদের দাসগুলো যখন রাস্তায় চিল্লাচিল্লি করে, আর জয় বাংলায় তাদের সমাজতান্ত্রিক অর্থ আবিষ্কার করে তখন বুর্জোয়াগুলো আনন্দে জয় জয় করে মিসিলে একাত্মতা অনুভব করে। আহারে জয় নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে কত কিছু বানানো হয়েছে –এগুলো অনেকটা কমেডির মত। কেউ কেউ আবেগে ঝলসে উঠে প্রশ্ন করেন, আমরা কেন জয় বাংলা বলতে পারব না? বলুন, দাদা ভায়েরা বলুন। কে বাঁধা দেয়? একটি স্বাধীন দেশে যার ইচ্ছা তাই প্রকাশ করবে। জয় বাংলায় যারা ‘মিরাক্কেল’ (মিরাকল) খোঁজে পায়, তারা তাতে আত্মহারা হোক, বাঁধা কীসের? জয় বাংলার মন্ত্র পড়ে পানিতে ফুঁৎকার করুক, তারপর সেই মন্ত্র-প্রভাবিত পানি পানও করুক, তাতেও বাঁধার কিছু থাকতে পারে না। এটি স্বাধীন দেশ। তবে কোন দল যখন তাদের দলীয় নামে উর্দু শব্দ রেখে জিন্দাবাদে উর্দু ও পাকিস্তানী গন্ধ খোঁজে তখন কী যে বলা হবে সেটা খোঁজে পাওয়া ভার” এম_আহমদ।

200 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক। বসবাস: বার্মিংহাম, ইউকে। দেশের বাড়ী: দেউলগ্রাম (উত্তর), বিয়ানী বাজার। Monawwarahmed@aol.com

Comments are closed.