মানবতার মুক্তির লক্ষ্য

987 জন পড়েছেন

ভূমিকা

এই লেখাটি মানুষের অসহায়ত্ব, দুর্বলতা ও ধর্ম-অধর্ম নিয়ে লেখা। লেখাটি ৩টি ছোট ছোট অনুচ্ছেদে বিভক্ত। প্রথম অনুচ্ছেদে সকল ধর্ম ও ধার্মিকের জীবন সাধারণী মাত্রায় এসেছে: মানুষ কেন ধর্ম-অধর্মের দিকে আকৃষ্ট হয় সেই দিকটির কথা, এবং মূল ধর্মের মহৎ উদ্দেশের কথা।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে ধর্ম গ্রন্থের পটভূমিগত কিছু সমস্যার কথা বলা হয়েছে যা অনভিজ্ঞ পাঠক ও বিশেষ করে, বিশ্বাসের উগ্রতায় প্রায়ই সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। এই সাথে ধর্মীয় কিছু জটিলতার কথাও আসবে। কোনো সমস্যা স্বীকৃত হলে সমাধানের চিন্তা আসতে পারে। আবার কিছু সমস্যা মানব প্রকৃতির সাথে জড়িত। তাই এর সার্থক ও সামগ্রিক উত্তরণ নেই।
তৃতীয় অনুচ্ছেদে মানুষের প্রকৃতিগত দুর্বলতার দিকটি উল্লেখ করে চরম পন্থা বর্জন নিয়ে কিছু আলোচনা করা হয়েছে

লেখাটি বক্তৃতার বৈশিষ্ট্যে রচিত।

-এক-

এই বিশ্বের বিভিন্ন দূরত্বে অবস্থিত মানুষের ধর্ম ও বিশ্বাস বিবেচনা করলে কিছু মৌলিক বিষয় অনুধাবন করা যাবে। অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ভারত, ইউরোপ ইত্যাদির কথা চিন্তা করা যেতে পারে। তবে এই বিবেচনার জন্য সময়-সীমাকে অন্তত দেড়-দুই হাজার বছর পর্যন্ত পিছিয়ে নিতে হবে। এসব দেশের সকল বিশ্বাসের পিছনে অশরীরী সত্তার উপর বিশ্বাস পাওয়া যাবে; আত্মায় বিশ্বাস পাওয়া যাবে; এক খোদার ধারণা পাওয়া যাবে। আবার এই জগত পরিচালনার কার্যে কিছু অধস্তন দেব-দেবীও। মানুষের জীবন দেখা যাবে খোদায়ী ধারণা ঘিরে: সুখে, দুখে, ব্যথা-বেদনায়।

মানুষ এক অসহায় সত্তা। তার অসহায়ত্বকে ঘিরেই দেখা যাবে ধর্ম ও অধর্ম সবই চালিত: কেই রোগে ভুগছে –আরোগ্য চায়; কারো বাচ্চা মরছে –বাঁচাতে চায়; কারো বিপদ –উদ্ধার পেতে চায়। এভাবে অসংখ্য প্রয়োজন। মানুষ তার দুর্বলতার সীমা বুঝে; প্রয়োজনে সেই সীমা অতিক্রম করতে চায়। আপনি একটি সুন্দরী মেয়ে দেখেছেন –বিয়ে করতে চান, কিন্তু সে আপনাকে চায় না, বা তার পরিবার রাজি হবে না। এখন তাবিজাত-পথ ধরবেন, বা যাদুর। আপনি খেলায় জয়ী হতে চান, তাই যাদু-বুড়ির কাছে যাওয়া। এসব হচ্ছে ক্ষমতার ‘সীমা’কে ঘিরে –আপনার দুর্বলতাকে লাঘব করতে। একটি দুর্বল সত্তার চাহিদা যে মিটিয়ে দেবে সে তার কাছে যাবেই –সোজা কথা। কিন্তু চাহিদা মেটানো আর চাহিদা মেটানোর “আশ্বাস” নিয়ে খেলা –এই দুটি জিনিস কখনো এক নয়। ধর্ম ও অধর্মের খেলা এখানেই। অনেক বস্তুতান্ত্রিক ব্যবসায়ও এই সূত্রে প্রথিত –দুর্বলের অসহায়ত্ব ঘিরে।

মানুষের মূল ধর্ম প্রোটো টিপিক্যাল (proto-typical) অর্থাৎ মৌলিকভাবে মানুষের কিছু মানবিক বৈশিষ্ট্য বা গুণের সমন্বয়ে গঠিত। কেউ কারও স্থাএ প্রতারণা করবে না, অপরকে ঠকাবে না; জুলুম নির্যাতন করবেনা ইত্যাদি নিয়ে। ইসলাম ধর্মের নবী (সা) বলেন, ধর্ম হচ্ছে “নসিহত”। প্রাচীন আরবিতে ‘নাসাহা’ ক্রিয়ার অর্থ হচ্ছে কোন কিছু নিষ্কলুষ হওয়া, পবিত্র হওয়া। এই শব্দটি মধু সংগ্রহ থেকে ধারিত। যখন মৌমাছি তাড়িয়ে গৃহীত মধুকে অনাঙ্ক্ষাখিত বস্তু থেকে পবিত্র করা হত তখন সেই মধুর বিশেষণ হত ‘নাসিহা’, আর কার্যটি হত ‘নাসাহা’। এই রুপকালঙ্গার থেকে গৃহীত ধারণা হল আপনি আপনার অন্তরকে পবিত্র করবেন: প্রথমে নিজেকে, তারপর যা নিজের জন্য ভাল তা অন্যের জন্য কামনা করবেন। এই উদ্দেশ্য আপনার সামগ্রিক জীবনকে বেষ্টন করবে –ব্যক্তি থেকে আর্থ-সামাজিকতা পর্যন্ত। এটাই ধর্ম। নসিহত আবার উত্তম পরামর্শ দানও –এটাও সেই কল্যাণের অর্থ থেকে আসা।

-দুই-

ধর্মের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের কল্যাণ, তাকে বাঁচানো, কিন্তু ধর্মীয় টেক্সট সময়ের বিভিন্ন ও করুণ প্রেক্ষিতে, এবং নাজুক ঘটনাসমূহের আলোকে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে, এমনভাবে সজ্জিত হয়ে গিয়েছে যা পরবর্তীতে, প্রেক্ষিত অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ায়, তার মূল ভাব ও অর্থ অনভিজ্ঞ পাঠকের কাছে অর্বাচীন হয়ে পড়েছে। সময়ের ধারায় অনেক ধর্মযাজকও ধর্মকে এমন ভাব ও আবেগে ব্যক্ত করেছেন যা কালের সাথে সম্পর্কিত হয়ে পরবর্তী কালের জন্য ‘ধর্মান্তরায়’ হয়ে গিয়েছে: অনেক কিছু মিশ্রিত হয়ে ধর্মের আহবানকে সমস্যা বহুল করেছে।

আরও কিছু জটিলতা -কোনটি ‘ধর্ম’, কোনটি ‘অধর্ম’: বাজারে নির্ভেজাল তেল থাকলেও ভেজালও আছে। জটিলতার স্বীকৃতির প্রয়োজন। আমি যদি ‘ধর্ম-ব্যবসায়’ জড়িত থাকি, তবে আমার কাছে আমার ‘অধর্ম’ কখনো প্রতিভাত হবে না, কারণ আমার অধর্ম ‘ধর্ম’ হিসেবে ‘সত্য’ হয়ে প্রতিষ্ঠিত। আমি হয়ত স্কুল খুলে আছি, বংশ ও ঘরানা পরম্পরায় পাঠ্য সিলেবাস তৈরি করে পড়িয়ে যাচ্ছি; সার্টিফিকেট বিতরণ করে সেটিকে সত্য-ধর্মের আঙ্গিকে চালিয়ে নিচ্ছি –নিষ্ঠার সাথেই। কিন্তু এখানে স্বার্থ যে সুপ্ত স্থান থেকে কাজ করে যাচ্ছে সেটি খেয়ালে আসার মত নয়: প্রায় অসম্ভব। এভাবেই চলে প্রাতিষ্ঠানিক সত্য। তবে, নিছক কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া, প্রায় সব সত্যই প্রাতিষ্ঠানিক –বস্তুবাদসহ। পরিবার, গোত্র, সহপার্টি, নির্বাচিত সাহিত্য, নির্বাচিত যোগাযোগ মাধ্যম, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সম্প্রদায় ইত্যাদিই সেই সত্যের বাহক ও স্থাপক। আস্তিক-নাস্তিক সবার। বর্ষবরণ, জন্ম দিবস, মৃত্যু দিবস, বিশেষ সংগীত, ম্যারেজ-এনিবার্সারি, মাদার্স-ডে, ফাদার্স-দে, ভ্যালেন্টাইন্স-ডে, ইত্যাদিও ‘ধর্মীয়-রূপী’ সেক্যুলার আনুষ্ঠানিকতা। সকলের সত্যের ‘আদর্শ’ রয়েছে; আদর্শ স্বপন দেখাচ্ছে, আশ্বাসের যোগান দিচ্ছে; শান্তি লাভের এহসাস সঞ্চার করছে: বৈপরীত্যও সাথে থাকছে। এইডস রোগে আক্রান্ত একজন নাস্তিককেও নানান হাতুড়ে চিকিৎসকদের দারস্ত হতেও দেখবেন, কারণ সে মানুষ, সে দুর্বল, সে ‘আশ্বাসে’ প্রভাবিত –দোষের কিছু নেই।

মানুষ যতদিন মানুষ থাকবে ততদিন ধর্ম-অধর্মের খেলাও থাকবে –এটা নিশ্চিত, কেননা, বিষয়টি হচ্ছে মানবের প্রকৃতি ঘিরে: তার অসহায়ত্ব, তার আত্মকেন্দ্রিকতা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, লোভ-লিপ্সা। বিভিন্ন বিশ্বাসের সমন্বয়ে তা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, কিন্তু একান্ত সরানো সম্ভব কীনা সন্দেহ।

-তিন-

আপনি যখন চরম নিরুপায় হবেন, তখন পতিতা হতে পারেন, পতিতার খদ্দের হতে পারেন, ‘তকদীরের’ কথা বলতে পারেন, অথবা ‘কপালের’ও। তারপরও, বিশ্বাসও করবেন, ‘আশ্বাসে’ থাকবেন, এসবে তাত্ত্বিক দোষের কিছু নেই –আছে মানবিক দুর্বলতা আর অসহায়ত্ব।

এই অসহায় মানুষকে মুক্তির “আশ্বাস” দিতে কত মিথ্যাচার হয়েছে, আরও কত যে হবে কে জানে। আপনি ১০ টাকায় সর্বরোগের মহৌষধ বিক্রি করেন –আপনি একা। চামচা-চাটুকার পেলে ধর্মীয় জোব্বায় পীরাকী চালাতে পারেন। কোম্পেনী হলে বীমা বিক্রি করবেন, রাষ্ট্রীয় স্বপ্ন হলে “এই-তন্ত্র”, সেই-তন্ত্র” করবেন। এভাবে এক প্রজন্মের প্রতারক ও প্রতারিতরা নিঃশেষ হয় বটে, কিন্তু এই ‘আশ্বাসের’ শেষ নেই: নতুন প্রতারক আসে, আর নতুন প্রজন্মে চালিয়ে নেয়। এভাবেই চলছে।

আরেকটি বিষয় দেখুন। মানুষের মানবিক দুর্বলতাকে ব্যবহার করে যারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বাণিজ্য করছে, তারা তা কেন করছে? কেন এই বাণিজ্য-লীলায় লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন অবলীলায় হারিয়ে যাচ্ছে? কেন লক্ষ কোটি বাড়ি-ঘর আধুনিক বোমার ভূমি-কম্পে ধূলিসাৎ হচ্ছে? কেন লক্ষ লক্ষ নিরীহ প্রাণ দেশান্তর হচ্ছে? যারা বন্দুক আর গোলাবারুদ তৈরি করতে জানে না, যারা জঙ্গলি দাড়ি আর আদিম-বস্ত্র পরে পাথরের ঢিল-মিরাক্কেলে আধুনিক জঙ্গি-বিমান উড়ানোর ঈমানের আস্ফালন দেখায়, তাদের হাতে যারা অস্ত্র তুলে দিয়ে যুদ্ধ-বাণিজ্য চালাচ্ছে এরা কারা? কাদের মুনাফার যুদ্ধ এটা? এই কর্মগুলোর সাথে কী মানব প্রকৃতির কোনো সম্পর্ক নেই? মোহ,পাশবিকতা নেই?

ধর্মের অঙ্গনে মূল চিন্তা কী? ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তিতে মানুষের স্বভাবজাত দুর্বলতার সমাধান খুঁজে। আমি মৌলিক ধর্মের কথা বলছি। এই মানবিক এহসাসে খোদাহীন ধর্মও থাকতে পারে। বৌদ্ধ ধর্ম খোদাকেন্দ্রিক নয়, কিন্তু সেটি একটি ভাল ধর্ম। ভাল লোক হওয়াও এক ধরণের ধার্মিকতা। এ সংসারে নৈতিকতার প্রয়োজন, ভারসাম্যের প্রয়োজন। –এটাও আমাদের মানব উদ্দেশ্যের একটি উদ্দেশ্য।

আমার পূর্বের লেখায় বলেছি যে আজ বিভিন্ন জাতি-ধর্মের লোক, যে কারণেই হোক, অনেক পাশাপাশি হয়েছে। … আজ তারা চাইলে তাদের ধর্মীয় বাণীসমূহকে, নিজ নিজ ধর্মে থেকেও, পারস্পারিক সৌহার্দে এক নতুন সমাজ গড়ার ব্যাখ্যায় আনতে পারেন। এই কাজটি জরুরি। কেননা, বিষয়টি যেন মার্টিন নীমোলারের ‘তারা প্রথমে এলো’ কবিতার মত না হয়। আজ মানব জাতির ঐতিহ্যের একটি বিশেষ দিক ধ্বংসের মুখামুখি।

Facebook Comments

987 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.