মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে যেভাবে বিশ্বের মহানায়ক এরদোগান

246 জন পড়েছেন

১৫ জুলাই ২০১৬, শুক্রবার রাতের কথা। তুরস্কের সেনাবাহিনীর ক্ষুদ্র একটি অংশ অভ্যুত্থানের চেষ্টাকালে দেশের ক্ষমতা গ্রহণের কথাও ঘোষণা দেয়। ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দখলে নেয় তারা। বিপদগামী সেনা সদস্যদের হঠাৎ এমন ঘোষণায় হতভম্ব গোটা তুরস্কবাসী। তারা তখন বুঝে উঠতে পারছিলেন না তাদের কী করা উচিত।

এ সময় প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান ছিলেন রাজধানী থেকে অনেক দূরে দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন স্থান মারমারিসের একটি রিসোর্টে। সেখানেও তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে খুঁজতে যায় বিপদগামী সেনারা। কিন্তু তাদের আঘাত লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কেননা, বিপদগামী সেনাদের টেলিভশনে ঘোষণা শোনার পরপরই তিনি সেখান থেকে বের হয়ে যান এবং হয়ে উঠেন জাতির অন্ধকারের আলোর দিশারী। তিনি মোবাইল ফোনে ভিডিও বার্তায় জনগণকে রাস্তায় নেমে আসার আহবান জানান।

তিনি জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা যে যেভাবে আছেন রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। যড়যন্ত্রকারীরা ব্যর্থ হবে। দেশের জনগণ যাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছিল, তিনিই দায়িত্বে আছেন। আমরা যতক্ষণ সবকিছু বিসর্জন দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হয়ে দাঁড়াব, ততক্ষণ তারা সফল হতে পারবে না।’

এরদোগানের এই আহবান শোনার পরপরই লাখ লাখ জনতা রাস্তায় নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যেই পাল্টে যেতে শুরু করে তুরস্কের পরিস্থিতি। এরই মধ্যে মারমারিস থেকে ইস্তাম্বুল এসে জনতার কাতারে যোগ দেন এরদোগান।

শনিবার সকালে ইস্তাম্বুলে কামাল আতাতুর্ক বিমানবন্দর থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তিনি। এতে জনতা আরো নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এরফলে দুপুরের মধ্যেই গোটা তুরস্কের সবকিছুই চলে আসে জনতার নিয়ন্ত্রণে। শুধু তাই নয়, দলমত নির্বিশেষে গোটা জাতি এরদোগানের নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ায়। এ যেন বিরাট চক্রান্তের বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় সৈনিকের তেজস্বী নেতৃত্ব।

শুধু তাই নয়, গত এপ্রিলে দেশের অভ্যন্তরে বিরোধী শক্তি এবং ইউরোপের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে তুর্কি জনগণ। জনগণের এই রায় তুরস্কের ইতিহাসে আরেকটি অনন্য অধ্যায়। এরফলে তিনি সাংবিধানিকভাবে তুরস্কের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান। গত এক দশকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবেও তুরস্ককে নিয়ে গিয়েছেন বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর কাতারে।

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি-কাতার সঙ্কটেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে বিশ্বব্যাপী ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সবমিলেই এরদোগান এখন শুধু তুরস্কের রাষ্ট্রনায়ক নয়, তিনি এখন বিশ্বে মহানায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

তিনি তো সেই ব্যক্তি যিনি অতীতে নায়ক-মহানায়ক কিছুই ছিলেন না। জীবন-জীবিকার তাগিদে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় রাস্তায় লেবু বিক্রি করতেন। বাবাও আহামরি কিছু ছিলেন না, ছিলেন তুর্কি কোস্টগার্ডের সদস্য। এমনই এক অবস্থা থেকে মহাকব্যিক উত্থান, যা ইতিহাসে কদাচিৎও লক্ষ্য করা যায় না। এখন তিনি তুরস্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্যারিশম্যাটিক নেতা।

পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সেই রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। ৬২ বছর বয়সী এই মানুষটি এবার তুরস্কের রাষ্ট্রক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে আরো একধাপ এগিয়ে গেলেন। আগামী দিনগুলো আরো কুসুমাস্তীর্ণই হবে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক বোদ্ধা মহল।

তার দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) নির্বাচনে বারবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়ায় ১৪ বছরের শাসনকে আরো প্রলম্বিত করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি, যা কোনো রাজনৈতিক বোদ্ধাই কল্পনা করতে পারেননি।

ধারণা করা হয়েছিল যে, গেল জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে ক্ষমতাসীন একে পার্টি স্বাভাবিকভাবেই হোচট খেতে পারে। কিন্তু সব হিসাব-নিকাশকে ভুল প্রমাণ করে এরদোগানের দল আবারো স্বমহিমায় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে।

তাই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বোদ্ধাদের ধারণা, জনপ্রিয়তায় নির্বাচনে এরদোগান অপ্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় ষড়যন্ত্রকারীরা ভিন্ন পথে তার বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত হয়। সেখানেও তারা পরাজিত হলো।

প্রকৃতপক্ষে এ ঘটনার ফলে এরদোগান তুরস্কে আরো বেশি জনপ্রিয় হলেন। কেননা, দেশের বিরোধী দলগুলোও তাকে সমর্থন দিয়েছেন। পার্লামেন্টে সবাই জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন।

জানা যায়, ১৯৫৪ সালে তুরস্কের কাসিমপাসায় জন্মগ্রহণ করেন এই ক্ষণজন্মা মহানায়ক। শৈশব কেটেছে কৃষ্ণসাগরের পাড়ে, অতিসাধারণভাবে। ১৩ বছর বয়সে আসেন ইস্তাম্বুলে। জীবিকার তাগিদে তিনি রাস্তায় বিক্রি করতেন লেবু, তিল ও ঝুটি। কিন্তু তিনি জীবনযুদ্ধে থেমে যাননি। চলেছেন অপ্রতিরোধ গতিতে। পড়ালেখায় মনোনিবেশ করলেন তিনি।

তিনি উচ্চশিক্ষা নিলেন ব্যবসায় প্রশাসনে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে যোগ দেন ইসলামী আন্দোলনে। তিনি দ্বীন প্রতিষ্ঠাকে জীবনোদ্দেশ্য হিসাবেই গ্রহণ করেন। খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অগ্রসেনানির ভূমিকা গ্রহণ করেন। ফলে তার জীবনের গতিধারা পাল্টাতে শুরু করে।

অনেক বাধা-প্রতিবন্ধকতা তাকে অতিক্রম করতে হয়। কিন্তু তিনি তার লক্ষ্যে অবিচল-বিরামহীন। এক সময়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তার ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা, মেধা, যোগ্যতা, প্রত্যুতপন্নমতিত্ব ও দূরদর্শিতার কারণে ক্রমেই মহীরূহে পরিণত হন, যা গোটা বিশ্বকেই তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

তিনি অবতীর্ণ হন নির্বাচন যুদ্ধে। আসে এক সময়োচিত ও বিরোচিত বিজয়। ১৯৯৪ সালে তিনি ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন। আবির্ভূত হন এক তরিৎকর্মা ও সব্যসাচী মেয়র হিসাবে। তখন ইস্তাম্বুল নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। নগরবাসীর জীবনযাত্রার ছিল খুবই নিম্নমানের।

কিন্তু এরদোগানের সোনার কাঠি-রূপোর কাঠির জাদুকরী ছোঁয়ায় সবকিছু পাল্টাতে শুরু করে। দেড় কোটি মানুষের শহর ইস্তাম্বুলে তখন তিনি যানজট, বিশুদ্ধ পানীয় জলের সংকট ও বায়ুদূষণ রোধ করে নগরের চেহারা পাল্টে দেন। নাগরিক সেবার পরসির বৃদ্ধি করা হয়। ইস্তাম্বুল পরিণত হয় এক সর্বাধুনিক মহানগরীতে, যা বর্তমান বিশ্বের জন্য রোল মডেল।

শুরু হয় এরদোগানের জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়। তার দীর্ঘদিনের মিত্র আব্দুল্লাহ গুল ও অন্যদের সঙ্গে মিলে ২০০১ সালে একেপি পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। অতি অল্পসময়ের মধ্যেই নতুন প্রতিষ্ঠিত দলটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। দেশের মানুষ একে পার্টিকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে নেয়। ২০০২ সাল থেকে দলটি প্রতিটি নির্বাচনে জয়লাভ করে আসছে।

একে পার্টি ২০০২ সালে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে প্রথমবার ক্ষমতাসীন হয়। ২০০২ সালে একে পার্টি আসন পেয়েছিল ৩৬৩টি, ২০০৭ সালে ৩৪১, ২০১১ সালে ৩২৭ এবং ২০১৫ সালের জুন মাসের নির্বাচনে ২৫৮টি আসন। জুন মাসের নির্বাচনে সরকারের গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন না পাওয়ায় কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হওয়ায় নভেম্বরে নতুন নির্বাচনের আবশ্যকতা দেখা দেয়।

সেখানেও ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় একে পার্টি। অপরদিকে প্রধান বিরোধী দল বামপন্থী রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি) ২০০২ সালে ১৭৮টি, ২০০৭ সালে ১১২, ২০১১ সালে ১৩৫, ২০১৫ সালের জুনের নির্বাচনে ১৩২টি আর সর্বশেষ নভেম্বরের নির্বাচনে ১৩৪টি আসনে বিজয়ী হয়।

প্রসঙ্গত, ২০০২ সালের নির্বাচনে একে পার্টি পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও কারাদণ্ডের অতীত থাকায় প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি দলনেতা এরদোগান। পার্লামেন্টে নতুন আইন পাসের মাধ্যমে ২০০৩ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। পরে তিনি প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে তুরস্কের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন।

লম্বা স্লিম মধ্যবয়স্ক এরদোগান রাজনীতিতে এক ভিন্নধর্মী ইমেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার ব্যতিক্রমী চরিত্র মাধুর্য ও বিরল ব্যক্তিত্ব তাকে জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছতে সাহায্য করে। তিনি বিরল প্রতিভা ও অসাধারণ সাংগঠনিক প্রজ্ঞার অধিকারী।

এরদোগানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নিজেও। বছর তিনেক আগে তুরস্কে সফরে গিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন, একজন নেতা কীভাবে একইসঙ্গে ইসলামিক, গণতান্ত্রিক ও সহিষ্ণু হতে পারেন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এরদোগান।

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ইসলাম, অর্থনীতি ও গণতন্ত্রকে সমন্বিত করে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি রোল মডেল সৃষ্টি করেছেন তিনি। কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের জনগণের ধর্মপালনের অধিকার কেড়ে নিয়ে কথিত ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামী ঐতিহ্য, তাহজিব-তমুদ্দুন ও চেতনা মুছে ফেলেছিলেন।

এরদোগান সেই ক্ষত সারিয়ে তোলার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার বক্তব্য হলো, ধর্ম পালনে কাউকে যেমন বাধ্য করবেন না, তেমনি ধর্ম পালনে কেউ যেন বাধা দিতে না পারে সে ব্যবস্থা তিনি করবেন। এমন বক্তব্য একজন আদর্শ রাষ্ট্রনায়কের পক্ষেই দেয়া সম্ভব।

সৌজন্যে: আরটিএনএন নেট

246 জন পড়েছেন

উড়ন্ত পাখি

About উড়ন্ত পাখি

আমি কোন লেখক বা সাংবাদিক নই।
অর্ন্তজালে ঘুরে বেড়াই
আর যখন যা ভাল লাগে
তা সবার সাথে শেয়ার করতে চাই।

Comments are closed.