বাংলাদেশে সভ্যতার সঙ্ঘাত?

355 জন পড়েছেন

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সেফ এক্সিট

জানুয়ারি ২০০৭ এবং ডিসেম্বর ২০০৮ সালের কথা বলছি। যেহেতু ওয়ান-ইলেভেন সরকার ক্ষমতায় এসেছিল বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতির কেয়ারটেকার গভর্নমেন্টকে অপসারিত করে। সেহেতু তারা অঘোষিতভাবে হয়ে উঠেছিল বিএনপির শত্রু বা বিএনপির প্রতিপক্ষ। শত্রু শব্দটি যদি অপছন্দনীয় হয়, তাহলে আমি এটি প্রত্যাহার করতে রাজি আছি এবং তার বিকল্প হিসেবে বলব এ রকম যে, তারা বিএনপিকে মনে করত তাদের ভবিষ্যতের জন্য একটি থ্রেট, আতঙ্ক বা বিপদ-আপদ। অতএব তাদের নিরাপদ প্রস্থান বা সেফ এক্সিট দেয়ার জন্য বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে অবশ্যই আওয়ামী লীগ অধিকতর নির্ভরযোগ্য ও কাম্য ছিল। সেফ এক্সিট দেয়ার ব্যাপারে অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অতীতেও অভিজ্ঞতা ছিল। ১৯৮৬ সালে তারা তখনকার আমলের জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অধীনে নির্বাচনে গিয়ে সেই সরকারকে বৈধতা দেয়।

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সমীকরণ

কথাটি প্রচলিত আছে এ রকম যে, ওয়ান-ইলেভেন সরকার বিদায়ের বেশ কয়েক মাস আগ থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তারা উভয় বৃহৎ দলের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করে। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের কিছু বক্তব্য ছিল এবং উভয় বৃহৎ দলেরও কিছু বক্তব্য ছিল। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের বক্তব্য এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগের বক্তব্যের মধ্যে সমীকরণ সহজলভ্য ছিল এবং সেই সমীকরণ বাস্তবায়নের কাজটিও সহজতর ছিল। কথাটি প্রচলিত আছে এ রকম যে, পর্দার অন্তরালে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তি এবং পর্দার প্রকাশ্যে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আওতাভুক্ত সব শক্তি একত্রভাবে সেই সমীকরণ বাস্তবায়ন করে। ফলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় কোনো-না-কোনো একটি বড় দলকে আসতেই হতো, অতএব আওয়ামী লীগ এসেছিল এবং বাস্তবতার নিরিখে পৃথিবী এবং বাংলাদেশ সেটি মেনে নিয়েছিল।
আওয়ামী লীগের প্রস্তুতি
বিপত্তি বাধে আওয়ামী লীগের পাঁচ বছর মেয়াদান্তে পার্লামেন্ট নির্বাচনের সময়। কেন, সেই প্রসঙ্গে দু’টি কথা বলছি। ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে, তখন আওয়ামী লীগের সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ ছিল। তারা ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসেছিল। তারা নিজেদের ভিত্তি মজবুত করতে প্রস্তুতি নেয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে তারা জিতলেও জিততে পারত; কিন্তু জিততে পারেনি। আওয়ামী লীগের মতে, ২০০১ সালের অক্টোবরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতাভুক্ত সব শক্তি আওয়ামী লীগকে পরাজিত করার জন্য নিবেদিতভাবে চেষ্টা করে। ২০০১ সালের বিপর্যয় থেকে আওয়ামী লীগ শিক্ষা নেয়। অতএব ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেই আওয়ামী লীগ দূরদর্শী পরিকল্পনা শুরু করে। এই কলামে পরিকল্পনার সব আঙ্গিক বা সব পদক্ষেপ বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তবে রাজনীতির ময়দানকে যদি দাবা খেলার বোর্ড মনে করি এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে যদি পারস্পরিক মুখোমুখি খেলোয়াড় মনে করি, তাহলে ২০০৯ থেকে ওই দাবা খেলায় আওয়ামী লীগ এগিয়ে আছে। আওয়ামী লীগ খেলার নিয়ম-কানুন ভঙ্গ করেছে; কিন্তু তার লক্ষ্যবস্তু থেকে এক পা-ও পিছপা হয়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যেই লক্ষ্যবস্তু স্থির করেছিল, সেটি ছিল অনেকটা এ রকমÑ ছলেবলে-কৌশলে বা ইংরেজি পরিভাষায় ‘বাই হুক অর ক্রুক’, ২০১৪ সালে পুনরায় ক্ষমতায় থাকতে হবে এবং ২০১৯ সালেও থাকতে হবে। ছলবল বা কৌশল বলতে কী বোঝায়, সেটি পাঠক গত আট বছরের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে চোখ দিলেই বুঝবেন। রাজনীতিও একটি যুদ্ধক্ষেত্র, বৈশিষ্ট্য হলোÑ এখানে অস্ত্র ব্যবহৃত হয় না; বরং কৌশল, বুদ্ধি, ছল, চাতুর্য, মুখোরোচক ওয়াদা, প্রতারণা প্রভৃতি সব কিছুই ব্যবহৃত হয়। আমি সমর্থন করি আর না করি সেটি গৌণ; মুখ্য হলোÑ বাংলাদেশের বেশির ভাগ ভোটার এটি সমর্থন করছেন এবং পৃথিবী এটি সমর্থন করছে। ইংরেজিতে প্রবাদ বাক্য আছে, ‘ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার এভরিথিং ইজ ফেয়ার’ অর্থাৎ যুদ্ধে এবং ভালোবাসায় জয়ী হওয়ার জন্য সব কিছুই বৈধ। পাঠক মেহেরবানি করে গত আট বছরকে এই নিয়মে মূল্যায়ন করতে পারেন।

লেফট-রাইট-লেফট

১৯৬২ সালে ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার পর ‘মার্চ’ করা ভালোমতো শিখি। লেফট-রাইট-লেফট বলে বলে, বাম হাত ও ডান হাতকে পায়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নেড়ে নেড়ে, কদমে কদমে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াকে ফরোয়ার্ড মার্চ বলে। ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে যখন পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলে গেলাম, তখন আবার ড্রিল করা শিখতে হলো। একাডেমির প্রশিক্ষকদের কথাবার্তা শুনে এটিই মনে হতো যে, ফৌজদারহাটের ছয় বছরে কিছুই শিখিনি। প্রশিক্ষকেরা বলতেন, দৃষ্টি সামনে-দূরের দিকে থাকবে, যেখানে কদম ফেলব সেখানে কোনোমতেই দৃষ্টি দেয়া যাবে না। একই কথা রাজনীতিতেও বলা যায়। আগামী সপ্তাহে কী করব বা আগামী মাসে কী করব এরূপ পরিকল্পনার প্রয়োজন আছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু আগামী বছর কী করব বা পাঁচ বছর পর কী করব, সেইরূপ পরিকল্পনারও প্রয়োজন আছে। নিজ পক্ষের পরিকল্পনা কোনো দিনই প্রতিপক্ষের পরিকল্পনার প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে না। অর্থাৎ আমার একটি পদক্ষেপে প্রতিপক্ষ কী প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করবে, আমাকে সেটিও হিসাব করতে হবে। রাজনীতির মাঠে যদি এটি করা না হয়, তাহলে সঙ্কট অনিবার্য।

দাঁতের মর্যাদা ও ক্ষমতার সুব্যবহার

মানুষে বলে যে, দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দিতে হয়। এই প্রবাদ বাক্যটিকে রূপান্তরিত করে আমি বলতে চাই, ক্ষমতায় থাকতে ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে জানতে হয়; কোনোমতেই অপব্যবহার নয়, সুব্যবহারও জানতে হয়। যেই রাজনৈতিক দল তাদের ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সুব্যবহার করতে পারে তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকে। পাঠক নিজেই কল্পনা করবেন ১৯৯১ থেকে নিয়ে আজ অবধি কোনো রাজনৈতিক দলের সরকার কতটুকু নিজেদের ক্ষমতাকে সুব্যবহার করেছেন ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য। ১৯৯১ সালকে যদি পেছনের দিকে অনেক দূরবর্তী সময় মনে হয়, তাহলে ২০০১ সাল থেকে মূল্যায়ন করুন। ২০০১ সাল থেকে নিয়ে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে কোন কোন জায়গায় কী রকম কী রকম রিক্রুটমেন্ট বা লোকবল ভর্তি হয়েছে, সেটি মেহেরবানি করে কল্পনা করুন বা ২০০১ সাল থেকে নিয়ে ২০০৬ সালে যেসব সরকারি কর্মকর্তা বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন এবং প্রমোশন পেয়েছিলেন, তারা ২০০৯-এর পরে বিগত আট বছরে কী অবস্থায় আছেন সেটি চিন্তা করুন। ২০০৯ সাল থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বেশির ভাগই ইচ্ছায় হোক, বা অনিচ্ছায় হোক, অবশ্যই সরকারের মুখাপেক্ষী এবং সরকারের সুবিধাভোগী। অতএব মন না চাইলেও অবচেতন মনেই বহুসংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রতি দুর্বলতা পোষণ করেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী মানেই নিরাপত্তার ভিখারি। ভিখারি শব্দটিকে নেগেটিভ অর্থে নেবেন না। অর্থাৎ তাদের ভবিষ্যৎ যদি নিরাপদ না থাকে, তারা কোনো অবস্থাতেই স্ট্যাটাসকে ভাঙবেন না বা বিদ্যমান অবস্থা বা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে ভাঙবেন না। তারা ভাঙবেন, এরূপ কল্পনা করাও বৃথা। এত লম্বা-চওড়া কথা বলার পর আমি এক বাক্যের একটি উপসংহার টানছি। উপসংহারটি হলো- এটি ১৯৯৬ সাল না, এটি ২০০১ সাল না, এটি ২০০৮ সাল না, এমনকি এটি ২০১৩ সালও না; এটি ২০১৭ সাল। এতক্ষণ যা বললাম, তার ওপর ভিত্তি করে পরের অংশ পড়ার আবেদন রাখছি পাঠকের কাছে।

মাহাথিরের বইয়ের বাংলা অনুবাদ

এখন থেকে বেশ কিছু দিন আগে আমি আমারই একাধিক কলামে সিঙ্গাপুরের ঐতিহ্যবাহী সফল (বর্তমানে মৃত) প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ কর্তৃক লেখা বইয়ের কথা উল্লেখ করেছিলাম। একই সাথে মালয়েশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ও সফল ২২ বছরের দীর্ঘ মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের লেখা বইয়ের কথা উল্লেখ করেছিলাম। উভয়ের ক্ষেত্রেই বইটি ছিল আত্মজীবনীমূলক ইতিহাস বা ইতিহাসভিত্তিক আত্মজীবনী। মাহাথির মোহাম্মদের লেখা বইটির নাম ছিল ‘এ ডক্টর ইন দ্য হাউজ : দি মেমোয়েরস অফ তুন ডাক্তার মাহাথির মোহাম্মদ’। কলামের মধ্যে ওই বইয়ের রেফারেন্স পেয়ে এবং বইয়ের বর্ণনা পেয়ে অনেক পাঠকই বইটি কষ্ট করে সংগ্রহ করেছেন। একজন পাঠক শুধু বইটি সংগ্রহ করে ক্ষান্ত হননি। মূল বইটি ৮০০ পৃষ্ঠার বেশি। এই বইয়ের চুম্বক অংশ বা বাংলাদেশী বা বাংলাভাষী পাঠকের জন্য প্রাসঙ্গিক ও উপকারী যতটুকু, ততটুকু অংশ অনুবাদ করেছেন ওই বিদগ্ধ কলাম-পাঠক। চট্টগ্রাম মহানগরের দেওয়ানহাট ওভারব্রিজের কাছে ধনিয়ালা পাড়া (চট্টগ্রাম-৪১০০) নামক স্থানে অবস্থিত আছে একটি জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানের সদর দফতর বা মূল কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটির নাম বাইতুশ শরফ। ওই বায়তুশ শরফের একজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ বইটির অনুবাদক। বাংলায় বইটি হুবহু ৪০০ পৃষ্ঠা। এই বইটি বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে জড়িত বা উন্নয়ন রাজনীতির সাথে জড়িত বা জাতিগঠনমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত বা জাতীয়তাভিত্তিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত এরূপ ব্যক্তিদের জন্য উপকারী বলে আমার অনুভূতি। এ রকমই আরেকটি অত্যন্ত সুপরিচিত বইয়ের কথা এখন উল্লেখ করছি। উল্লেখ করার পেছনে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা বা সেই রাজনৈতিক অবস্থার অপ্রকাশিত গন্তব্য কী হতে পারে, তার সম্পর্ক আছে।

হান্টিংটন ও সভ্যতার সঙ্ঘাত

পাঠকদের মধ্যে যারা তুলনামূলকভাবে অধিকতর চিন্তাশীল তাদের বিবেচনার জন্যই এই অনুচ্ছেদে ওই পুস্তকের প্রসঙ্গটি আনছি। আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য, আলোচিত-সমালোচিত চিন্তাবিদ ও অধ্যাপকের নাম হলো স্যামুয়েল হান্টিংটন। তিনি অনেক বই লিখেছেন। তবে আমরা একটি সুনির্দিষ্ট বইয়ের প্রসঙ্গে আলোচনা করছি। আমেরিকার অন্যতম একটি প্রেস্টিজিয়াস জার্নালের (ম্যাগাজিন) নাম ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’। ১৯৯৩ সালে এই জার্নালে অধ্যাপক হান্টিংটনের একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, নাম- ‘দি ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন্স?’ প্রবন্ধের শিরোনামের বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়াবে সভ্যতাগুলোর সঙ্ঘাত বা সভ্যতাগুলোর পারস্পরিক সঙ্ঘাত। অধ্যাপক হান্টিংটন ওই প্রবন্ধটিকে আরো বড় আকারে তথা কলেবর ও বক্তব্য বৃদ্ধি করে বই আকারে প্রকাশ করেন ১৯৯৬ সালে। বইটির নাম দেয়া হয় ‘দি ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন্স অ্যান্ড দ্য রিমেইকিং অফ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’। বইয়ের শিরোনামের বাংলা অনুবাদ অনেকটা এ রকম হতে পারেÑসভ্যতাগুলোর সঙ্ঘাত এবং বিশ্বব্যবস্থা পুনর্গঠন বা পুনর্নির্মাণ। প্রকাশের পর থেকেই বইটির বক্তব্য বা হান্টিংটনের মূল প্রতিপাদ্য প্রসঙ্গে প্রচুর আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। বহু ব্যক্তি এটিকে প্রশ্ন করেছেন। আমিও ব্যক্তিগতভাবে প্রশ্ন করি। কিন্তু আজ ২০১৭ সালে এসে আমার মনে অতি ক্ষুদ্র্র একটি প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী সভ্যতাগুলোর সঙ্ঘাত হচ্ছে কি হচ্ছে না সেই আলোচনা বিশ্বের পণ্ডিতরা করুক। আমি অপণ্ডিত; আমার প্রশ্ন, বাংলাদেশের মাটিতে কি সভ্যতাগুলোর সঙ্ঘাত হচ্ছে? বাংলাদেশ নিয়ে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নিয়ে, বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে, ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে যেসব জ্ঞানী ব্যক্তির আগ্রহ আছে, তাদের বিবেচনার জন্যই এই প্রশ্নটি উত্থাপন করলাম। বইটি ছাড়াও আমার লেখা সহজতর এবং দ্রুততর করার জন্য আমি ইন্টারনেটে মওজুদ তথ্যের সাহায্য নিয়েছি।

সভ্যতাগুলো এবং সঙ্ঘাতের কারণগুলো

অধ্যাপক হান্টিংটন ‘সভ্যতাগুলো’ বলতে সাত-আটটি সভ্যতার নাম উল্লেখ করেছিলেন। আমি হুবহু ইংরেজি শব্দগুলো ব্যবহার করছি এবং সাথে সম্ভাব্য বাংলা প্রতিশব্দ দিচ্ছি। ১. ওয়েস্টার্ন বা পাশ্চাত্য, ২. ল্যাটিন আমেরিকান বা ল্যাটিন ভাষাভিত্তিক মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকান, ৩. ইসলামিক বা ইসলাম ধর্মভিত্তিক, ৪. সিনিক বা চাইনিজ বা চীনা বা চৈনিক, ৫. হিন্দু, ৬. অর্থডক্স বা রক্ষণবাদী খ্রিষ্টান ধর্মভিত্তিক, ৭. জাপানিজ এবং ৮. আফ্রিকান। অধ্যাপক হান্টিংটন ব্যাখ্যা করেছেন- কেন সভ্যতাগুলোর মধ্যে সঙ্ঘাত হওয়াটি অবশ্যম্ভাবী। তার ব্যাখ্যা থেকে অন্তত ছয়টি কারণ নির্ণয় করা যায়। ওই কারণগুলো উপলব্ধি বা অনুভব করা প্রয়োজন। আমার মতো আমি ব্যাখ্যা করছি; ইচ্ছাকৃতভাবে অপব্যাখ্যা দিচ্ছি না, ভুলভ্রান্তি গুরুত্বপূর্ণ মনে করবেন না। প্রথম কারণ : সভ্যতাগুলোর মধ্যে যে পার্থক্য সেগুলো খুবই মৌলিক। যেমন কিনা পার্থক্যের উপাত্তগুলো হচ্ছে ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ঐতিহ্য এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বিশ্বাস। এই গুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রস্ফুটিত হয়, অতএব চাইলেই এগুলোকে উপেক্ষা করা যায় না। দ্বিতীয় কারণ : পৃথিবীর ভৌগোলিক আয়তন সমান থাকলেও চেতনায় এবং আয়ত্তের হিসেবে পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে। ফলে পৃথিবীব্যাপী এক গোষ্ঠীর সাথে আরেক গোষ্ঠীর, এক সম্প্রদায়ের সাথে আরেক সম্প্রদায়ের, এক জাতির সাথে আরেক জাতির, এক প্রকারের পেশাজীবীর সাথে আরেক প্রকারের পেশাজীবীর ইন্টার-অ্যাকশন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অধিকতর ফল, এক সভ্যতার মানুষ আরেক সভ্যতার সবলতা ও দুর্বলতা প্রসঙ্গে সচেতন হচ্ছে। তৃতীয় কারণ : অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের কারণে মানুষ তাদের স্থানীয় পরিচয়কে গৌণ মনে করতে শুরু করেছে। এর বিকল্প হিসেবে ধর্মীয় বিশ্বাস বা ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি আকর্ষণ মানুষের মধ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে মানুষের মধ্যে মিল ভৌগোলিক সীমারেখা বা রাজনৈতিক সীমারেখা অতিক্রম করে অথবা অন্য ভাষায় এগুলোর ওপর নির্ভর না করেই বিশ্বাসীদের একত্র করে। চতুর্থ কারণ : পাশ্চাত্য সভ্যতা এখন তুঙ্গে। এটি একটি উৎসাহের কারণ। অন্য সভ্যতাগুলোর অনুসারীরা উৎসাহিত হয়ে চেষ্টা করছে তাদের নিজস্ব সভ্যতাকেও তুঙ্গে নিতে। ফলে পাশ্চাত্য সভ্যতার চাহিদার কাছে সহজে নতিস্বীকার করতে অন্যরা প্রস্তুত নয়। পঞ্চম কারণ : সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো এবং সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্যগুলো খুব সহজেই অবলোপন বা মুছে ফেলা যায় না; যেমন কিনা রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক মুছে ফেলা যায়। ষষ্ঠ কারণ : অর্থনৈতিক আঞ্চলিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতএব মনের বা অনুভূতির বা আবেগের স্বাদ বাড়ছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে মনের বা অনুভূতির বা আবেগের সেই স্বাদ পূরণ করার সাধ্য, হাতের মুঠোর মধ্যে আসছে।

বাংলাদেশে সভ্যতার সঙ্ঘাত?

অধ্যাপক হান্টিংটন চূড়ান্ত পর্যায়ে মনে করেছিলেন, মূল সঙ্ঘাতটি হবে পাশ্চাত্যের সাথে অবশিষ্ট বিশ্বের তথা পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে অন্য সব সভ্যতার। আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়নে, হান্টিংটনের মূল্যায়ন এ ক্ষেত্রে ভুল। আমরা বাংলাদেশের মাটি, বাংলাদেশের আকাশ, বাংলাদেশের বাতাস, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আবহাওয়া, বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ, বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক মূল্যবোধ ইত্যাদি সব কিছু বিচার করলে, সম্ভবত এ রকম একটি উপসংহার টানা যায়। উপসংসারটি এরূপ : পাশ্চাত্য সভ্যতা বা সংস্কৃতি আমাদের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; আরো প্রতিদ্বন্দ্বী আছে। প্রতিদ্বন্দ্বী থাকাটাই যেকোনো ময়দানে স্বাভাবিক। এটিই চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের কী করণীয়? ১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধু হত্যা, ১৯৮১ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যা, ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে ওয়ান-ইলেভেন মঞ্চায়ন বা ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের ঢাকা সফরের সাথে ওই সভ্যতার সঙ্কটকে কোনো একটি পক্ষ কর্তৃক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টার সাথে কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটি আবিষ্কার করাও চ্যালেঞ্জ।

বি:দ্র:এ লিখাটি পূর্বে প্রকাশিত হয়েছে লেখকের ফেইসবুকে “যে যা বোঝার বুঝে নিন” শিরনামে ।

355 জন পড়েছেন

Comments are closed.