ইসলামে মুখমণ্ডল ঢাকা কি বাধ্যতামূলক?

392 জন পড়েছেন

[ডিসক্লেইমারঃ আমি জানি যে, পর্দা, হিযাব বা নেকাব নিয়ে আমার মতো লোকের কথা বলা উচিত নয় এবং সেই যোগ্যতাও নেই। আমি আপনাদের আগেই জানিয়ে রাখছি যে, আমি কোন মুফতি, ইসলামী আইন কানুন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বা কারো কারো তথাকথিত ইসলামী চিন্তাবিদও নই, তবে ইসলামি ইতিহাস নিয়ে আমার আগ্রহ থাকায় ইসলামী ইতিহাসের ছাত্র হিসাবে শুধুমাত্র ইতিহাসের তথ্য উপাত্ত থেকে তত্ত্ব নিয়ে পর্দা, হিযাব ও নিকাব নিয়ে এই ব্লগ তৈরি করেছি। সাড়ে নয় হাজার শব্দের বিশাল নোট। পর্দা হিযাব নিয়ে দুই এক ছত্রে লিখে পর্দার আসল উদ্দেশ্য কাউকে সহজে বুঝানো যাবেনা। পর্দার বিধান নিয়ে পুংখানোপুংখ ভাবে এখানে তোলে ধরার চেষ্টা করেছি।

যারা এই নোট পড়ে ইচ্ছা করবেন তাদেরকে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে অনুরোধ করছি! “বেটা কি বলবে জানি!” কিংবা এই বিষয়ে সব বলে দেয়া হয়েছে সেই ১৪ শত বছর আগে, এখন এই নিয়ে কোন আলোচনার অবকাশ নেই। এই উন্নাসিক মানসিকতা যদি আপনি ধারণ করেন তাহলে এই নোট পড়তে সময় নষ্ট করবেন না প্লিজ !

এই নোট পড়ার সময় পর্দা বা হিজাব নিয়ে আপনার বর্তমান ধারণাকে মন থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে সরিয়ে রাখতে অনুরোধ থাকলো। আপনি যদি রঙ্গিন চশমা লাগিয়ে দুনিয়াকে দেখেন তো স্বাভাবিক দুনিয়াকে রঙিন দেখাবে, কাজে আপনার চশমাকে অবশ্য স্বচ্ছ কাঁচের করে নিয়ে পড়তে বসুন। আর ভেবে দেখুন আমি কি বলতে চাচ্ছি।
যদি অনিচ্ছাকৃত কোন ভুল, কোন বেয়াদবি হয়ে যায় তাহলে আমাকে সংশোধন করে দিবেন।

এই নোটের কোন বিষয়ে দ্বিমত থাকলে আলোচনা করতে পারবেন। কিন্তু কোন লিংক এখানে পোষ্ট করবেন না। বা কোন বইয়ের নাম বলে দায়িত্ব শেষ করবেননা। আর যদি আপনার কাছে আমার এই ব্লগ স্রেফ আবর্জনা জঞ্জালের স্তূপ বলে মনে হয় তাহলে আমার এই ব্লগকে ময়লার ঝুড়ি মনে করে পরিহার করবেন।]

প্রথম অধ্যায়।
আজকের দুনিয়ায় হিযাব, পর্দা, বোরকা ব্যবহারের রীতি রেওয়াজকে ইসলামের প্রতিভূ বলে চিহ্নিত করা হলেও দুনিয়াতে এই প্রথা সর্বপ্রথম মুহাম্মদ সাঃ আবিষ্কার করেননি এবং ইসলামও প্রথম নারীদের উপর তা চাপিয়ে দেয়নি। হাজার হাজার বছর পূর্ব থেকে যে এই প্রথা দুনিয়ার জ্ঞানে বিজ্ঞানে উন্নত বিভিন্ন দেশে, সমাজে প্রচলিত ছিলো। হরপ্পা মহেঞ্জোদারো যেমন প্রাচীনতম মানব সভ্যতা ছিলো, তেমন করে মেসোপটেমিয়া নামে আরেকটি মানব সভ্যতা ছিলো, খৃষ্টপূর্ব ৫ হাজার অব্দ থেকে সূচনা হয়ে সে সভ্যতা খৃষ্টপূর্ব ৩ হাজার অব্দে পূর্ণতা লাভ করেছিলো। মেসোপটেমিয়া সভ্যতা বর্তমান উত্তর ইরাকের দজলা এবং ফোরাত নামক দুই বিষম উর্বরা নদীর মধ্য ভূখণ্ডে অবস্থিত ছিলো। এই সভ্যতা অ্যাসিরিয়া নামক জাতিদের সময়ে এসে তখনকার দুনিয়ায় জ্ঞানে বিজ্ঞানে চরম উন্নতি বিকাশ করেছিলো। সে সময়ে জ্ঞানে বিজ্ঞানে উন্নত আসিরিয়ানগণ যুদ্ধ বিগ্রহে লব্ধ পরাজিত পুরুষ মানুষকে দাস এবং নারীদের তারা দাসী বাদী রক্ষিতা করে রাখতো। দাস দাসীর এত পর্যাপ্ততা থাকায় অভিজাত নারীদের জন্য খাওয়া দাওয়া ঘুমানো আর আমোদ ফুর্তি করা ছাড়া কোন কর্ম করার দরকার ছিলোনা। এ সময় নারীদের অভিজাত শ্রেণী হিসাবে মর্যাদাবান রাখতে বাইরের চলাচলরত দাসী,বাদী,পতিতা,রক্ষিতাদের থেকে আলাদা করে রাখার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। এই প্রয়োজনীয়তা থেকে তারা নারীদের বাইরে যাবার বিষয় আইন করে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছিলো।
এই সব অভিজাত শ্রেণীর নারীরা কালে ভদ্রে বাইরে বের হওয়ার অনুমতি পেলেও- বাইরের দাসী বাদী রক্ষিতা এবং গণিকাদের থেকে পার্থক্য প্রকাশ করতে, তাদের বিশেষ পোশাক পরে মাথা এবং মুখ ঢেকে বের হতে হতো। যদি কেউ কোন কারণে মাথা মুখ না ঢেকে বাইরে বের হয়ে পড়তো তখন তাঁকে আইন অমান্য করার অপরাধে শাস্তি দেয়া হতো। এই প্রথা শুধু অ্যাসিরীয়দের মধ্যে ছিলো তা নয়, এই প্রথা সুমেরীয়, ব্যাবেলিয় পরে পার্সিদের মধ্যে প্রচলিত ছিলো।
৫৩৯ খৃষ্টপূর্ব অব্দে যখন প্রথম বারের মত পার্সি জাতি অ্যাসিরীয়দের রাজধানী মেসোপটেমিয়া দখল করে বিজয়ীর বেশে নগরে প্রবেশ করে, তখন রাস্তায় চলাচলকারী সাধারণ বেশভূষা পরিহিত নারীদের মধ্যে ২/১ জন নারীকে বিশেষ পোশাক পরা এবং মাথা, মুখ ঢেকে চলাচল করতে দেখে। তখনই তারা জানতে পারে যে, অ্যাসিরীয়দের অভিজাত নারীরা ঘরের বাইরে আসেনা, কোন কারণে আসলে তারা যে অভিজাত পরিবারের নারী তা পথচারীদেরকে জ্ঞাত করতে তারা তাদের মাথা এবং মুখ ঢেকে রাখে। পার্সিরাও আভিজাত্যের প্রতীক হিসাবে তাদের নারীদের মধ্যেও এই প্রথাকে গ্রহণ করে।
কালক্রমে পার্সি সাম্রাজ্য বিস্তার এবং বর্ধিত আকার ধারণের সাথে সাথে নব বিজিত এলাকার অভিজাত শ্রেণীর লোকেরাও এই প্রথাকে গ্রহণ করে নেয়। পরবর্তীতে পার্সিদের হাত ধরে এই প্রথা ভূমধ্য সাগরের পূর্ব পাশের দেশ সমূহ সিরিয়া, লেবানন ও উত্তর আরবে ছড়িয়ে পড়েছিলো, কিন্তু বিস্তীর্ণ মরুময় দুর্গম বালিয়াড়ি টিলা-টক্করের জন্য জাজিরাতুল আরবের এই অংশ অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্গম থাকার কারণে এই এলাকার মানুষ তখনকার সভ্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো, এই জনপদের মানুষেরা বিষণ বুনো স্বভাবের ছিলো। আংগুলে গোনা কয়েক বিত্তমান পরিবার ছাড়া আরবের সর্বত্র নারীর কোন সম্মান ছিলোনা, নারীকে পোষা জন্তু জানোয়ারদের মত হীন মনে করা হতো। কাজেই এই জনপদের অভিজাত নারীদের আলাদা করার জন্য এই পোষাক পরার প্রচলন এখানে প্রসার লাভ করতে পারেনি, যারা জাজিরাতুল আরব তথা মক্কা মদিনা এলাকা থেকে ব্যবসাবাণিজ্যের কারণে সিরিয়া বা লেবাননের মত অঞ্চলে আসা যাওয়া ছিলো, কেবল মাত্র সেই সব আরব সেখানকার অভিজাত মহিলাদেরকে এই ধরণের পোশাক পরতে দেখে থাকবে। রাসুল সাঃ মদিনায় আসার পর রাসুল সাঃএর নিজের পরিবার আপন সম্মানিত সাহাবিদের পরিবারের নারীদের প্রতি যখন হিযাব আর মুখ ঢাকার ব্যবস্থা করেছিলেন তখন প্রথম বারের মত মক্কা মদিনার মানুষ জন এই প্রথার সাথে পরিচিত হয়ে উঠে। পরবর্তিতে খলিফায়ে রাসিদুনের আমলে ইসলাম যখন পার্সি সাম্রাজ্যের অংশ বিশেষ দখল করে তখন থেকে আরবের এই এলাকার মানুষজন ব্যাপক ভাবে এই প্রথার সাথে পরিচিত লাভ করেছিলো।

২য় অধ্যায়
আপনারা জানেন যে হিযাবের আভিধানিক অর্থ: দেখতে বাধা দেয়া,আড়াল সৃষ্টি করা। পর্দার দ্বারা তা করা যায়। তাই কোন কিছুকে আড়াল করাকে হিযাব বলা হয়। যা কিছু দুটো বস্তুর মধ্যে আড়াল তৈরি করে দেয়, তাই হিযাব। নৈতিক অর্থেও শব্দটি ব্যবহার করা হয় । যেমন, অবাধ্যতা আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে হিযাব, তেমন আল্লাহর আনুগত্য বান্দাহ ও জাহান্নামের মধ্যে হিযাব।
হিযাব শব্দটি আলকোরানের যে আয়াতে দেখা যায়ঃ- আল কোরানের ৩৩ নং সুরার ৫৩ নং আয়াতে এই হিযাব শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে- হে ঈমানদারগণ! নবী গৃহে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করো না, ——– নবীর স্ত্রীদের কাছে যদি তোমাদের কিছু চাইতে হয় তাহলে পর্দার পেছন থেকে চাও ৷
উপরের আয়াতে দেখা যাচ্ছে আল্লাহ মুমিন পুরুষদেরকে নবী সাঃ এর অন্তঃপুরে তার স্ত্রীদের কাছে কিছু চাইতে গেলে পর্দার আড়াল থেকে চাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। তাই হিযাবের অর্থ শুধু নারীকে গৃহবন্দি করা এবং বিশেষ পোশাক পরতে বাধ্য করা নয় তার চেয়েও বেশী কিছু আছে।
ইসলামের হিযাব আর অ্যাসিরীয়দের অভিজাত নারীদের অন্তঃপুরবাসিনী করার মধ্যে আদর্শ এবং উদ্দেশ্যগত ব্যবধান আছে, তাদের উদ্দেশ্য ছিলো নিছক রাজপরিবারের নারীদের আভিজাত্য প্রকাশ করা আর ইসলামের উদ্দেশ্য হচ্ছে উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত সকল মুসলিম নারীকে বিশেষ আভিজাত্য মর্যাদা দান করা, সাথে সাথে নর-নারী আচার ব্যবহার এবং পোশাকে শালীনতা শোভনতা রক্ষা করা। মানব সমাজ থেকে অনিয়ন্ত্রিত যৌনাচার এবং এর থেকে উদ্ভূত না না প্রকার সামাজিক এবং আইনি সমস্যা থেকে রক্ষা করা।
অতএব মরক্কোর নারীদের জিলাবা, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর নারীদের আবাইয়া, ইরানী নারীদের চাদর এবং আফগান নারীদের বোরকার নাম হিযাব নয়। মূলতঃ পর পুরুষের চোখ থেকে নারীর শরীরকে পূর্ণ আড়াল করে রাখে, এমন পোশাক পরাকে হিযাব বলে।
যারা নিছক নিকাব আর বোরকাকে হিযাব বলে ভেবে থাকেন তাদের উদ্দেশ্যে – হিযাবের পোশাক সম্পর্কে ডঃ ইউসুফ আল কারযাভী বলেন- হিযাব নিজেই একটি উদ্দেশ্য নয়, বরং শরীরের শরীয়ত নিষিদ্ধ অংশগুলো শালীন ভাবে আবৃত করার উপায় মাত্র। এই অর্থে সময় ও স্থানভেদে এর ধরন (জিলাবা, শাড়ি, বোরকা, আবাইয়া/সেমিজের সাথে উড়নি,স্কার্ফ, রুমাল, চাদর) বিভিন্ন রকম হতে পারে।
তিনি আরো বলেন- কুরআনুল করীমে কখনো কখনো ওহী নাজিলের সমসাময়িক অবস্থার দিকে লক্ষ্য রেখে উপায়ও পদ্ধতি বাতলে দেয়া (ঐ সময়ে আজকের মত সেলাই বিজ্ঞান এত উন্নত ছিলোনা, তদুপরি সে সময়ের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব করুণ ছিলো তখন দুবেলা পেট ভরে খাবার ক্ষমতা ছিলোনা স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাঃ ঘরে)হয়েছে। ঐ সময়ের চেয়ে উত্তম বা অনুরূপ অন্য কোন উপায় উদ্ভাবিত হলে ঐ পুরানো পদ্ধতি স্থায়ী ভাবে মানতে হবে এমন ধরা বাধা তাৎপর্য ঐ আয়াতে নিহিত নেই।
আল কোরানে দু’টি সুরাতে পর্যায়ক্রমে পর্দার বিধান নিয়ে আয়াত নাজিল হয়েছিল। সে সুরা দুটি হচ্ছে ৩৩ নং সুরা আযহাব এবং ২৪ নং সুরা নুর। আল-কোরানে সুরা নুরের অবস্থান ২৪ নং এবং সুরা আযহাবের অবস্থা ৩৩নং এ সঙ্কলিত করা আছে।
আমাদের উলামায়ে কেরামদের মধ্যে অনেকে যখন হিযাবের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন তখন তারা হিযাবের প্রথম নির্দেশ হিসাবে সুরা নুরের ৩০ নং আয়াত –
হে নবী মু’মিন পুরুষদের বলে দাও তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং নিজেদের লজ্জা স্থানসমূহের হেফাজত করে ৷ এটি তাদের জন্য বেশী পবিত্র পদ্ধতি ৷ যা কিছু তারা করে আল্লাহ তা জানেন ৷- উল্লেখ করে থাকেন, যার ফলে হিযাব সংক্রান্ত সকল আয়াতের ধারাবাহিকতা উলট পালট হয়ে যায় এবং এর জন্য হিযাব বিধি বিধানের সার্বিক প্রায়োগিক মূল্যও উলটো হয়ে যায়।
আমরা যখন হিযাব সংক্রান্ত সকল আয়াতের নাজিলের ক্রমধারা অনুসারে বিচার বিশ্লেষণ করতে পারবো কেবল মাত্র তখন ঐসকল আয়াতের ঐতিহাসিক পটভূমিকার দ্বারা হিযাব বলতে কি বুঝায় তা আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠবে। তখন দেখা যাবে যে সুরা নুরের হিযাবের বিধি বিধানের আয়াত নাজিলের ২ বছর পূর্বে সুরা আযহাবে হিযাবের বিধিবিধানের আয়াত নাজিল হয়েছিলো। সুরা আযহাবের হিযাব সংক্রান্ত আয়াত নাজিল হয়েছিলো হিজরি পঞ্চম বছরে, আর সুরা নুরে বর্ণিত হিযাব সংক্রান্ত আয়াত হিজরি সপ্তম বছরে নাজিল হয়েছিল। ৩৩:৫৩ আয়াত এসেছিলো খন্দকের যুদ্ধের ঠিক পরবর্তী সময়ে । আর ২৪:৩০ আয়াত আয়েশা রাঃ এর ইকাফের ঘটনার পর পর ।

৩য় অধ্যায়
পর্দার বিধান নাজিলের পটভূমি- মদিনার মসজিদে নববীতে মুহাম্মদ সাঃ এর আলাদা কোন হুজরা ছিলোনা, তাই তিনি পালাক্রমে এক একদিন এক এক স্ত্রীর হুজরায় থাকতেন। জাজিরাতুল আরবে মদিনা রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠায়, মুহাম্মদ সাঃ এর স্ত্রীগণের হুজরা জনগণের সম্পত্তিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো। ক্রমবর্ধমান হারে লোকজন তাদের ধর্মীয়,রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত সমস্যা ইত্যাদির জন্য মুহাম্মদ সাঃ এর কাছে আসতো। এদের মধ্যে কেউ কেউ রাসুল সাঃ এর অধিকতর মনোযোগ লাভের জন্য তারা নবী পত্নীদের শরণাপন্ন হতেন। সে কারণে একদিকে নবীর পারিবারের ব্যক্তিগত জীবন যাপন দারুণ ভাবে বিঘ্নিত যেমন হচ্ছিলো, তেমন করে সব ধরনের মানুষের অবাধ প্রবেশের সুযোগে নবী-পত্নীদের পবিত্র চরিত্রের উপর মুনাফিকদের দ্বারা গুজব ছড়িয়ে দেবার সুযোগ সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা ছিলো। যা উম্মাহর মধ্যে বিভক্তির কারণ হয়ে উঠতে পারতো।
এই ধরণের সমস্যা দেখে ঘনিষ্ঠ সাহাবীয়ে কেরামদের মধ্যে কেউ কেউ এই উদ্ভূত সমস্যা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছিলেন। এইরূপ অবস্থা ঠেকানোর উদ্দেশ্যে স্বয়ং উমর রাঃ নবী পত্নী কন্যাদের প্রতি পর্দা করা প্রস্তাব মুহাম্মদ সাঃ এর কাছে উপস্থাপন করিয়েছিলেন।
হযরত উমর রাঃ থেকে বর্ণিত হাদিসে তা আমরা জানতে পারি, তিনি বলেন, আমি নিবেদন করলাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনার কাছে ভালো-মন্দ লোক আসে, আপনি যদি উম্মুল মুমিনিনদের জন্য পর্দার নির্দেশ দিতেন। এরপরই আল্লাহ তা’আলা পর্দার আয়াত নাজিল করেন। হাদিস নং ১১৪৪ বুখারী শরীফ।
উমর রাঃ এর ভাষ্য পড়ে মনে করার অবকাশ নাই যে, উমর রাঃ কথা শুনে মুহাম্মদ সাঃ হুট করে করে নারীদের প্রতি পর্দার বিধান জারী করেন। ইসলাম প্রতিষ্ঠা কালীন ইতিহাসে দেখা যায় যে যখন আল্লাহর দ্বীন প্রচারকারী নবী সাঃ এর জীবনে নতুন কোন সমস্যার উদ্ভব হয়েছে বা হবার আশংকা হয়েছে তখনই আল্লাহ তা’আলা সেই সমস্যা সমাধানের জন্য কখনো ওহী মারফত কখনও সাহাবীদের মারফতও নির্দেশনা দিতেন।
মহাজ্ঞানী আল্লাহ তা’আলা কোন কিছু করতে চাইলে সে বিষয়ে তাঁর ইচ্ছা প্রকাশ মাত্র তা স্বয়ংক্রিয় ভাবে সম্পাদন করার ক্ষমতাবান হওয়া স্বত্বেও তিনি এই ভাবে কিছু করেনি, নিয়ম নীতি এবং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি তাঁর মখলুকাত সৃষ্টি করেছেন। এক আল্লাহর উপাসনা যা দ্বীন ইসলাম, সে দ্বীনও একদিনে প্রতিষ্ঠা করেননি, আল কোরআনকেও এক মুহুর্ত্যে সকল নির্দেশনা লিপিবদ্ধ কিতাবের মতো মুহাম্মদ সাঃ হাতে ধরিয়ে দেননি, তেমন করে ইসলামের কোন হুকুম আহকাম মুসলিমদের উপর হঠাৎ করে একদিনে চাপিয়ে দেননি। ইসলামের অন্যান্য হুকুম আহকামের মত পর্দার হুকুমটি এক মুহুর্ত্যে নাজিল হয়ে যায়নি।
আল্লাহ যে কোন হুকুম প্রথমতঃ মুহাম্মদ সাঃ কে পালন করতে নির্দেশন দেন এরপর তাঁর ঘরের মানুষদেরকে সে নির্দেশের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ করেন এবং পরবর্তীতে সারা মুসলিম সমাজকে সে নির্দেশের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ করেন। সে নির্দেশ আবার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠা করেন। এর জন্য ইসলামকে মানব বান্ধব জীবন ব্যবস্থা বলা হয়ে থাকে।
নিম্নে দুই সুরার পর্দা সংক্রান্ত আয়াত নাজিল ক্রমানুযায়ী তোলে ধরছি, আশাকরি পাঠক পর্দার বিধান কি ভাবে ধাপে ধাপে নাজিল হয়েছিলো এবং ইসলামী সমাজে কার্যকর হয়েছিল বুঝতে সক্ষম হবেন।

প্রথম ধাপে পর্দা ব্যবস্থায় প্রবেশের আগে পূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে নবী সাঃ পত্নীগণকে জানিয়ে দেয়া হলো –
১। হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা সাধারণ নারীদের মতো নও ৷ যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করে থাকো, তাহলে মিহি স্বরে কথা বলো না, যাতে গলদে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে, বরং পরিষ্কার সোজা ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলো ৷ ৩৩-৩২
২য় ধাপে নবী সাঃ এর পত্নীগণের প্রতি নির্দেশ দেয়া হলো তারা যেন ঘরের মধ্যে অবস্থান করেন, এবং কোন কারণে ঘরের বাইরে যেতে হলে জাহেলী যুগের মত সাজসজ্জা না করে বের হোন।
২। নিজেদের গৃহ মধ্যে অবস্থান করো এবং পূর্বের জাহেলী যুগের মতো সাজসজ্জা দেখিয়ে বেড়িও না ৷ ৩৩-৩৩
৩য় ধাপে সাধারণ মুসলিমদেরকে চূড়ান্ত ভাবে নির্দেশ দেয়া হলো- তারা যাতে নবীর সাঃ পারিবারিক জীবন বিঘ্ন ঘটাতে বিনা অনুমতিতে ঘরে প্রবেশ না করেন।
৩। হে ঈমানদারগণ ! নবী গৃহে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করেনা না, ——– নবীর স্ত্রীদের কাছে যদি তোমাদের কিছু চাইতে হয় তাহলে পর্দার পেছন থেকে চাও ৷ (৩৩-৫৩)
এই আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আমরা হযরত আনাস ইবনে মালিক রাঃ থেকে বর্ণিত হাদিস থেকে জানতে পারি যে-
“নবী করিম সাঃ এবং জয়নাব বিনতে জাহাশের(বিবাহোত্তর) বাসর যাপনের পর কিছু গোস্তের ব্যবস্থা করে আমাকে পাঠানো হলো লোকদের দাওয়াত করার জন্য। একদল এসে খেয়ে চলে গেল, আবার অন্যদল এসে খেয়ে চলে গেল। পুনরায় ডেকে কাউকে পেলাম না। তিনি (রাসুলুল্লাহ সাঃ) বললেন, তোমাদের খাবার উঠিয়ে রেখো। তখন তিন ব্যক্তি ঘরে বসে আলাপ- আলোচনা করছিলো। নবী সাঃ বের হয়ে আয়েশা রাঃ এর ঘরে গেলেন এবং বললেন, “আসসালামু আলাইকুম আহলাল বাইতি ওয়া রাহমাতুল্লাহি উত্তরের আয়েশা রাঃ বললেন, ওয়ালাইকুমুস সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে বরকত দিন। আপনার (নব) বধূকে কেমন পেলেন? এমনি ভাবে পরপর সব স্ত্রীর(সওদা রাঃ আয়েশা রাঃ হাফসা রাঃ এবং উম্মে সালমা রাঃ) হুজরায় গেলেন এবং আয়েশা রাঃ যা বলেছিলেন, তাদেরকেও অনুরূপ বললেন এবং তারাও তাঁকে তাই বললেন,যা আয়েশা রাঃ বলেছিলেন। পুনরায় নবী সাঃ এসে সে তিন ব্যক্তিকে ঘরে কথাবার্তায় মশগুল দেখতে পেলেন। নবী সাঃ অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির ছিলেন বিধায়( তাদেরকে উঠে যাবার কথা বলতে না পেরে) আবার তিনি আয়েশা রাঃ কক্ষে চলে গেলেন। অতঃপর আমি বা অন্য কেউ তাঁকে ওদের চলে যাবার সংবাদ দিলে তিনি ফিরে এলেন এবং দুয়ারে চৌকাঠে এক’পা এবং বাইরে একপা রাখা অবস্থায় আমারও তাঁর মাঝে পর্দা টেনে দিলেন। আর এ সময়ই পর্দার আয়াতটি নাজিল হলো”। হাদিস ১১৪৬ বুখারী শরীফ।

এন্টি ইসলামিস্ট গোষ্ঠী তারা পর্দার বিধান মুহাম্মদ সাঃ এর ব্যক্তি স্বার্থে বিঘ্ন ঘটার প্রেক্ষিতে হয়েছিলো বলে তারা শুধু মাত্র সুরা আযহাবের ৫৩ নং আয়াত এবং আনাস মালিক রাঃ বর্ণিত হাদিসটি উল্লেখ করে থাকে কিন্তু একই সুরার ৩২-৩৩ আয়াত উল্লেখ করেনা। উল্লেখ করেনা পর্দার বিধান নাজিলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। কারণ ৩২-৩৩ আয়াত এবং প্রেক্ষাপট উল্লেখ করলেই যে কেউ বুঝতে পারবে যে উপরে বর্ণিত একক একটি সমস্যার জন্য আল্লাহ তা’লা হুট করে এমন বিধান জারি করে দিলেন এমন নয় ।
৩য় ধাপে ৩৩-৫৩ নং আয়াত নাজিলের মাধ্যমে হিযাব করা কার্যকর করেছিলেন যাতে নবী সাঃ পারিবারিক জীবন অসুবিধা মুক্ত হয় এবং ইসলামের শত্রুরা যেন সে সুযোগে মুহাম্মদ সাঃ এর পত্নীদের উপর অশোভন গুজব দ্বারা মুহাম্মদ সাঃকে অমর্যাদা করে পরিস্থিতিকে কাজে না লাগাতে পারে।
উপরের আয়াত গুলো দিয়ে নবী পত্নীদের পারিবারিক জীবনকে সুরক্ষিত করার পর প্রয়োজনে নবী পরিবারের নারী সদস্যদের বাইরে চলার পথ কি ভাবে সুরক্ষিত করা যাবে তাঁর পথ নির্দেশনা দিতে পরবর্তী ধাপের নির্দেশ এলো –

৪। হে নবী! তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মু’মিনদের নারীদেরকে বলে দাও তারা যেন তাদের চাদরের (জিলবাবের) প্রান্ত তাদের ওপর টেনে নেয়৷ এটি অধিকতর উপযোগী পদ্ধতি, যাতে তাদেরকে চিনে নেয়া যায় এবং কষ্ট না দেয়া হয়৷ আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷ (৩৩-৫৯)
‘হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মু’মিনদের (এখানে মু’মিন বলতে বিশেষ বিশেষ সাহাবীদের পরিবারের নারী সদস্যদের কথা বলা হয়েছে, কারণ তারা নবী সাঃ আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন।) নারীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের( পাঠক লক্ষ্য রাখবেন, এই আয়াতে জিলবাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে আর সুরা নুরের ৩১ আয়াতে খিমারের কথা বলা হয়েছে, দুই আয়াতে দুই ধরণের পোশাকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ) কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না।’

(এখানে নবী পরিবারের নারী সদস্যদের যাতে অন্যদের চেয়ে আলাদা করা যায় সে কথা বলা হয়েছে। এই ভাবে পোশাক পরে রাস্তায় বের হলে মন্দ লোকেরা নবী পরিবারের নারীদেরকে আর উত্যক্ত করতে পারবেনা।)

৪র্থ অধ্যায়
তাহলে আসুন আমরা দেখি এই আয়াত নাজিলের পটভূমি কি ছিলো?
প্রাক ইসলামি যুগে মদিনার অধিবাসীদের প্রাকৃতিক ডাকে ভারমুক্ত করার জন্য আজকের মত বাসা বাড়িতে কোন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিলোনা। কাজেই তাদেরকে শহরের উপকণ্ঠে নির্জন জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে যেতে হতো। পুরুষগণ যখন প্রয়োজন তখন সে যায়গায় গিয়ে তা সারতে পারলেও নারীগণদের শুধুমাত্র রাত্রিকালে তাদের প্রাকৃতিক কর্ম সারতে হতো।
মদিনার পতিতারাও (এই সব কাজে দাসী শ্রেণীর নারীরা নিয়োজিত থাকতো) রাত্রে তাদের খদ্দরের সন্ধানে নির্জন স্থানে ঘোরা ফেরা করতো। তখনও আরবের এই অংশের দাসী,বাদী, রক্ষিতা, যুদ্ধ-বন্দিনী, পতিতা এবং অভিজাত মহিলারা এক রকম পোশাক গায়ে চড়িয়ে বাইরে বের হতো, রাত্রির আধো অন্ধকারে কে দাসী কে বারবনিতা আর কে অভিজাত মহিলা তা শনাক্ত করা সম্ভব ছিলোনা, যার কারণে প্রাকৃতিক ডাকে বের হওয়া এই সব অভিজাত মহিলারা কোন না কোন সময় অবাঞ্ছিত অবস্থার মুখে পড়তেন।

মদিনার অন্যসব নারীদের মত নবীর পত্নীগন,কন্যাগণ রাত্রিকালে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে যেতেন, মুনাফিকগণ যাতে নবীর পত্নীগণ, কন্যাগণের উপর কোন মিথ্যা অপবাদ ছড়ানোর সুযোগ না পায় সেই জন্য আল্লাহ তা’আলা সমস্যার সমাধান কল্পে উক্ত আয়াত নাজিল করে নির্দেশনা দান করেন। (দেখুন- ১৪৭ পৃঃ)
অনেকে সুরা আহযাবের ৫৯ নং আয়াতে ‘ নবী সাঃ এর, স্ত্রীগণ, কন্যাগণের সাথে মু’মিনদের নারীগণ উল্লেখ থাকায় দাবি করেন যে এই আয়াতের নির্দেশ আপামর মুসলিম নারীদের উপর প্রযোজ্য।

এখন আমাদেরকে দেখতে হবে মুমিনদের নারীগণ বলতে কি আপামর মুসলিম নারীদের কথা বুঝানো হয়েছে? না নবী সাঃ পরিবারের সাথে সম্পর্কযুক্ত বিশেষ ব্যক্তিবর্গের নারীদের কথা বুঝানো হচ্ছে? আল কোরানে মুমিনদের বলতে কোন কোন ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি বিশেষদের বুঝানো হয়েছিলো তার দলিল স্বরূপ নিচের আয়াত উপস্থাপন করছি-

হে মু’মিনগণ! নিজেদের আওয়াজ রসূলের আওয়াজের চেয়ে উঁচু করো না এবং উচ্চস্বরে নবীর সাথে কথা বলো না, যেমন তোমরা নিজেরা পরস্পর বলে থাকো৷ (৪৯:২)
এখানে মুমিনগণ বলতে কাদের বুঝানো হয়েছে তা জানতে এই আয়াতের পটভূমি কি ছিলো জানতে হবে। নিচে উল্লেখিত হাদিস থেকে এই আয়াতের পটভূমি জেনে নেই-

১। হযরত ইবনে আবু মুলাইকা রাঃ বর্ণনা করেছেন, দু’জন শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তারা হলেন আবু বকর রাঃ ও উমর রাঃ। উভয়েই নবী করিম সাঃ এর সম্মুখে নিজদের আওয়াজ চড়া করে ফেলছিলেন। বনী তামীম গোত্রের একদল লোক যখন হযরতের কাছে এসেছিলো, তখনই এ ঘটনাটি ঘটেছিলো। নবী করিম সাঃ সেই গোত্রে একজন প্রতিনিধি পাঠানোর মনস্থ করেছিলেন। তখন উমর রাঃ বনী মাজাশে গোত্রের আকরা ইবনে হাবিসের নাম প্রস্তাব করলেন এবং আবু বকর রাঃ অন্য এক ব্যক্তির নামের প্রতি ইশারা করলেন, (নাফে বলেন, ঐ ব্যক্তিটির নামটি আমার স্মরণ নেই) আবু বকর রাঃ উমর রাঃকে বললেন, আপনার ইচ্ছাই হলো শুধু আমার বিরোধিতা করা। উমর রাঃ বললেন, আপনার বিরোধিতা করার আদৌ কোন ইচ্ছা আমার নেই। বিষয়টি নিয়ে তারা পরস্পরে বাক-বিতণ্ডা করতে লাগলেন। তখন আল্লাহ এই আয়াত নাজিল করেন।
“হে বিশ্বাসীগণ তোমরা নবীর আওয়াজের উপর তোমাদের আওয়াজকে উচ্চ করোনা”।

পাঠক, উপরের হাদিসটির ঘটনায় শুধু আবু বকর রাঃ এবং উমর রাঃ জড়িত ছিলেন কিন্তু এই আয়াতে তাদের নাম উল্লেখ না করে আল্লাহ তা’লা উভয়কে বিশ্বাসীগণ বলে উল্লেখ করেছেন।

(দুনিয়ার সব মুমিনগণ নবী সাঃ এর সান্নিধ্যে ছিলেন না এবং তাদের কারো পক্ষে নবী সাঃ কন্ঠের উপর কন্ঠ ব্যবহার করা কোন সুযোগ ছিলোনা) অতএব সুরা আহযাবের ৫৯ নং আয়াতে যে মুমিনদের নারীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তারা হচ্ছে, আবু বকর রাঃ উমর রাঃ উসমান রাঃ আলী রাঃ প্রমুখ বিশিষ্ট সাহাবীদের পরিবার পরিজন নারীদের প্রতি যা কোন সাধারণ নারীদের প্রতি ছিলোনা।

প্রকৃত পক্ষে হিযাব বা পর্দা প্রথা মুহাম্মদ সাঃ এর পত্নীদেরকে অসম্মান করার জন্য বা অন্তঃপুরবাসিনী করার জন্য চালু করা হয়নি বরং পর্দার কারণে সমাজে তাদের উচ্চতর মর্যাদাবান নারী হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। নবী পরিবারের নারী সদস্যগণ পর্দার কারণে বিশেষ মর্যাদার আসীন হওয়ায় মদিনার সম্ভ্রান্ত বংশের অন্যান্য আনসার মহিলারা তারাও নবী সাঃ পরিবারের নারীদের মত পর্দা করার অনুমতি দাবি করেন।
তাছাড়া নবী সাঃ পত্নী কন্যারা সারা মুসলিম মহিলাদের রোল মডেল ছিলেন, তাই অন্যান্য মুসলিম মহিলারা তা অনুকরন করতে পারেন।

অন্যদিকে ইসলামী সংস্কৃতি অত্যন্ত সমাজতান্ত্রিক সামাজিক ন্যায় বিচার মনোভাবাপন্ন, নবীর স্ত্রীগণ বা কুরাইশ নারীগণ এভাবে একক বা আলাদা এবং সম্মানিত হয়ে থাকবেন এইটি ইসলামের সাম্যের পরিপন্থী, তাই তখন তাদের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে সুরা নুরে আয়াত নাজিল হয়েছিল।

১। হে ঈমানদারগণ! নিজেদের গৃহ ছাড়া অন্যের গৃহে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না গৃহবাসীদের সম্মতি লাভ করো এবং তাদেরকে সালাম করো ৷ এটিই তোমাদের জন্য ভালো পদ্ধতি, আশা করা যায় তোমরা এদিকে নজর রাখবে ৷ ২৪-২৭

২। তারপর যদি সেখানে কাউকে না পাও, তাহলে তাতে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না তোমাদের অনুমতি না দেয়া হয় ৷ আর যদি তোমাদের বলা হয় , ফিরে যাও তাহলে ফিরে যাবে, এটিই তোমাদের জন্য বেশী শালীন ও পরিচ্ছন্ন পদ্ধতি এবং যা কিছু তোমরা করো আল্লাহ তা খুব ভালোভাবেই জানেন ৷ ২৪-২৮ দেখুন–  ১৩৪ পৃঃ
সুরা নুরের এর পরের দুই আয়াত ৩০ এবং ৩১ এর নাজিলের প্রেক্ষাপট জানতে অনেক খুঁজাখুঁজি করেছি কিন্তু কোথাও কিছু পাইনি।

তবে আমার মনে এই দুই আয়াতের সাথে কোন না কোন যোগ সূত্র উমর রাঃ এর সাথে থাকতে পারে। (প্রকৃত সত্য একমাত্র আল্লাহ জানেন)।

হযরত আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, পর্দার হুকুম জারীর হওয়ার পর সওদা রাঃ প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরনার্থে বাইরে যান। তিনি এমন মোটা সোটা ছিলেন যে, পরিচিতজনদের থেকে নিজেকে লুকোতে পারতেন না। উমর রাঃ তাঁকে দেখে বললেন, হে সওদা তুমি আমাদের থেকে লুকোতে পারবেনা, এখন ভেবে দেখো, কি রূপে বের হবে। তিনি(আয়েশা রাঃ) বলেন, তিনি (সওদা রাঃ) ফিরে এলেন। আর রাসুলুল্লাহ সাঃ তখন আমার ঘরে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন, তাঁর হাতে ছিল এক টুকরো হাড়। এমনি মুহূর্তে তিনি (সওদা রাঃ) ভেতরের এসে আরজ করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরের গেলে উমর রাঃ আমাকে এ কথা ও কথা বলেছেন। তিনি (আয়েশা রাঃ) বলেন, এমনি সময় আল্লাহ তা’আলা রাসুলুল্লাহ সাঃ এর কাছে ওহী নাজিল করলেন। (ওহী নাজিল) শেষ হলো। হাড্ডিখানা তখনো তাঁর হাতে ছিলো। অতঃপর তিনি বললেন, তোমাদেরকে প্রয়োজনে বাইরের (৩৩:৫৯) যাবার অনুমতি দেয়া হয়েছে। হাদিস নং ১১৪৭ বুখারী শরীফ।

৪। হে নবী মু’মিন পুরুষদের বলে দাও তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান সমূহের হেফাজত করে ৷ এটি তাদের জন্য বেশী পবিত্র পদ্ধতি ৷ যা কিছু তারা করে আল্লাহ তা জানেন ৷ (২৪:৩০ )
আয়েশা রাঃ এর বর্ণিত ঘটনার পূর্বে একজন মুসলিম পুরুষ পর নারীর দিকে তাকানো নিষেধ থাকতো তাহলে এই নির্দেশ উপেক্ষা করে উমর রাঃ এর পক্ষে সওদা রাঃ এর শরীরের দিকে তাকাতে যেতেন না।
৩০ নং আয়াতে পুরুষদেরকে নির্দেশ দেবার সাথে সাথে ৩১ নং আয়াতে মুমিন মহিলাদেরকেও তাদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদুপরি আল্লাহ তা’লা নবীপত্নীদেরকে সুরা আযহাবের ৩৩:৫৫ আয়াতে যাদের সাথে পর্দা করার দরকার নেই বলে যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন সেই সব নির্দেশনা আল্লাহ তা’লা সাধারণ মুমিন মহিলাদের জন্য এখানে পুনরাবৃত্তি করেছেন। এর অতিরিক্ত যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাতে বলা হচ্ছে- “মহিলারা যেন তাদের মাথার উড়নি বা স্কার্ফ বা রূমাল দিয়ে তাদের বক্ষ যুগল যেন ঢেকে রাখেন”।

৫। আর হে নবী! মু’মিন মহিলাদের বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান গুলোর হেফাজত করে আর তাদের সাজসজ্জা না দেখায়, যা নিজে নিজে প্রকাশ হয়ে যায় তা ছাড়া ৷ আর তারা যেন তাদের ওড়নার (খুমুরুন/ খিমার) আঁচল দিয়ে তাদের বুক ঢেকে রাখে৷ তারা যেন তাদের সাজসজ্জা প্রকাশ না করে, তবে নিম্নোক্তদের সামনে ছাড়া স্বামী,বাপ,স্বামীর বাপ, নিজের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, নিজের মেলামেশার মেয়েদের , নিজের মালিকানাধীনদের, অধীনস্থ পুরুষদের যাদের অন্য কোন রকম উদ্দেশ্য নেই এবং এমন শিশুদের সামনে ছাড়া যারা মেয়েদের গোপন বিষয় সম্পর্কে এখনো অজ্ঞ ৷ তারা যেন নিজেদের যে সৌন্দর্য তারা লুকিয়ে রেখেছে তা লোকদের সামনে প্রকাশ করে দেবার উদ্দেশ্য সজোরে পদক্ষেপ না করে৷ হে মু’মিনগণ ! তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তওবা করো আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে। (২৪:৩১)
সুরা আযহাবের ৫৯ নং আয়াতে নবী পত্নী, কন্যা এবং সম্মানিত ব্যক্তি বিশেষদের নারী সদস্যদের বেলা নির্দেশ দেয়া হচ্ছে < জিলবাব দিয়ে মুখ ঢেকে চলার জন্য > আর সুরা নুরের এই ৩১ নং আয়াতে সাধারণ মুমিন নারীদেরকে উল্লেখ করে যখন নির্দেশ দেয়া হয় তখন – < আর তারা যেন তাদের ওড়নার (খুমুরুন/ খিমার) আঁচল দিয়ে তাদের বুক ঢেকে রাখে৷ > এক আয়াতে জিলবাব দিয়ে সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে চলার অন্য আয়াতে খিমার দিয়ে বুক ঢেকে রাখার নির্দেশ থেকে বুঝা যায় সুরা আহযাবের ৫৯ নং আয়াত সর্ব সাধারণের জন্য প্রয়োগযোগ্য ছিলোনা ।

আমি উপরে হিযাব সংক্রান্ত সুরা আযহাবের ৪টি আয়াত একটি হাদিস এবং সুরা নুরের ৫টি আয়াত একটি হাদিস মোট ৯ টি আয়াত এবং ২টি হাদিস ধারাবাহিক ভাবে উদ্ধৃতি করেছি। ধারাবাহিক উদ্ধৃত আয়াতগুলো এবং হাদিস দু’টি পর্যালোচনা করলে বিষয়টি পরিষ্কার ভাবে বুঝা যায় যে –

  • প্রথম পর্যায়ের পর্দার বিধি বিধান নাজিল হয়েছিলো শুধুমাত্র নবী সাঃ এর পরিবার এবং নবী সাঃ আত্মীয় পরিবারের নারীদের উপর। তা কোন ভাবেই সাধারণ মুসলিম মহিলাদের উপর ছিলোনা।
  • দ্বিতীয় পর্যায়ের পর্দার বিধি বিধান সংক্রান্ত আয়াত নাজিল হয়েছিলো সাধারণ মুসলিম মহিলাদের জন্য।

ঐ দুই পর্যায়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আনলে বুঝতে পারা যায় যে পর্দা করা সকল স্বাধীন প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিম মহিলাদের জন্য আবশ্যকীয় পালনীয় হলেও সে সব আয়াতে মুখ বা চেহারা আড়াল করার নির্দেশ ছিলোনা। মুখ বা চেহারা আড়াল করা নির্দেশ শুধুমাত্র নবীপত্নীগণ,কন্যাগণ এবং নবী সাঃ নিকট আত্মীয় স্বজনদের নারীদের প্রতি ছিলো। যেহেতু নবীপত্নী কন্যাগণ জগতের সকল মুসলিম মহিলাদের রোল মডেল কাজেই কেউ যদি স্বেচ্ছায় সে ভাবে পালন করতে পছন্দ করেন তাহলে তা তিনি তা করতে পারেন, তাতে কেউ বাধা দিতে পারবেনা।
হিযাব সংক্রান্ত উল্লেখিত আয়াতগুলো ভালোভাবে বুঝতে হলে আমাদেরকে ঐ আয়াতে যে কয়েকটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সে কয়টি শব্দ দ্বারা কি বুঝাতো তা জানতে হবে, কাজেই আলোচনা বোধগম্য করার জন্য এখন খিমার, জিলবাব, জাইয়্যুব, জিনাত শব্দগুলো বলতে কি বুঝায় তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে যাবো।

৫ম অধ্যায়
১। খুমুর বলতে কি বোঝাচ্ছে?
খুমুর হচ্ছে খিমারের বহুবচন, খিমার হচ্ছে সেই খণ্ড কাপড় যার দ্বারা আরবের নারীরা তাদের মাথাকে ধুলো বালি শীত তাপ থেকে রক্ষা করতে ঢেকে রাখতো। দেখুন আরবি অভিধান- লিসানু ই আরব, মাজমা উল বাহরাইন অথবা আল মুঞ্জিদ।
উপমহাদেশীয়রা উড়নি, দোপাট্টা বলতে বুঝতে পারে তা হচ্ছে নারীদের মাথা এবং বক্ষ ঢাকার জন্য বিশেষ কাপড়খণ্ড। সে ভাবে জুতা শব্দ শুনলেই সবাই বুঝে যায় সেটি কি এবং সেটি কোথায় ব্যবহার করে।
ঠিক সেই ভাবে আরবরা খিমার বলতেই নারীদের মাথা ঢাকার কাপড়খন্ডকে বুঝতে পারে। যা সাধারণতঃ ভৌগলিক ভিন্নতার কারণে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া উপযোগী পরিধেয়ের সাথে মহিলারা ব্যবহার করে থাকে। উপরের আয়াত অনুযায়ী খিমার দিয়ে মাথার উপর থেকে বুকের নীচ পর্যন্ত ঢেকে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। খিমারের ঝুলন্ত দু’ প্রান্ত দিয়ে যখন বুক ঢাকা হয় তখন সাথে সাথে চুল কান গলা ফেলা হয়। আর এই প্রথা এখন হিযাবের প্রতিভূ হিসাবে গণ্য হচ্ছে।

২। জালাবিব-
সুরা আযহাবের ৫৯ আয়াতে ‘জালাবিব’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা ‘জিলবাব’ শব্দের বহুবচন। আরবি শব্দ তাজালবাবা থেকে এসেছে। আরবি অভিধানের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লিসানুল ‘আরব’ –এ লেখা হয়েছে, ‘জিলবাব’ ওই চাদরকে বলা হয় যা মহিলারা নিজেদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকার জন্য ব্যবহার করে। [১/২৭৩]
জালাবিব হচ্ছে জিলাবাবের বহুবচন। জিলাবের মানে হচ্ছে মহিলাদের ঢিলা ঢালা বহিরাবরণ। যা খিমারের চেয়ে দীর্ঘ এবং ড্রেসিং গাউনের চেয়ে ছোট মহিলাদের পোশাক বিশেষ। দেখুন লিসানু ই আরব মাজমা উল বাহরাইন অথবা আল মুঞ্জিদ। Ibid. al-Munjid, p. 96; at-Turayhi, Majma‘u ’l-Bahrayn, vol. 1, p.384.
অতএব জিলবাব এবং খিমার যে এক নয়, সেটি যে মহিলাদের স্বাভাবিক পরিধেয় সেমিজও ইজারের উপরে অতিরিক্ত পরিধেয় যা মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে সে পরিধেয়কে জিলবাব বলে।

৩। জাইয়্যুব বলতে কি বোঝাচ্ছে?
জাইয়্যুব হচ্ছে জাইবের বহুবচন, বাংলায় অনেকে সার্টের পকেটকে জেব বলে থাকে। এই বাক্যের সরল অর্থ করলে দাঁড়ায় মহিলাদের পকেটকে ঢেকে রাখার নির্দেশ। কিন্তু মহিলাদের শরীরে তো পকেট থাকেনা, পকেট থাকে জামায়! তাহলে পকেট শব্দকে কেন উলামায়ে কেরামগণ মহিলাদের বক্ষের প্রতিশব্দ হিসাবে অনুবাদ করে থাকেন?
সেই রহস্য জানতে হলে আমাদেরকে রাসুল সাঃ এর জামানায় লোকেরা যে সব পোশাক পরত সে সব পোশাকের বিভিন্ন অংশের ব্যবহৃত নাম জানতে হবে। রাসুল সাঃ এর সময় লোকেরা যে সব জামা পরতো তাতে মাথা ঢুকানোর জন্য জামার ফ্রন্টপার্টসের নেক লাইনের ঠিক মধ্যে থেকে বুকের উপর পর্যন্ত চিরে রাখা হতো, যাকে এখন সেলাই বিজ্ঞানে সেন্টার ফ্রন্ট ওপেনিং বলা হয়। এখনো টিসার্ট বা পলো সার্টে এই ভাবে রাখা হয়, তবে এখন মানুষ বুতাম বা জিপার ব্যবহার করে ইচ্ছামত খোলা বা বন্ধ করে রাখতে পারে, সেই সময় সে প্রযুক্তি ছিলোনা বিধায় তা খোলা রাখতে হতো। তখন জামার সেই সেন্টার ফ্রন্ট ওপেনিংকে জেব বলা হতো। সেই সেন্টার ফ্রন্ট ওপেনিং বুকের মধ্য বরাবর থাকতো।

আল কোরানের বাক্য প্রয়োগের রীতি দেখলে বুঝা যায় যে আল কোরানে অশ্লীল ভাব প্রকাশ করে এমন শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা পরিহার করে সে যায়গায় শ্লীল বা শোভন শব্দ এবং বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। এখনো আমরা কেউ কোন মহিলাকে এই ভাবে বলিনা যে, এই তোমার স্তন ঢেকে রাখো। শোভন ভাষায় বলা হয় বুক ঢেকে রাখো। আল কোরানেও সেই ভাবে সরাসরি স্তন ঢেকে রাখার উল্লেখ না করে শোভন ভাষায় স্তনের প্রতিশব্দ হিসাবে জাইয়্যুব উল্লেখ করেছে। তখনকার মানুষ জাইয়্যুব বলতে বুকের নির্দিষ্ট স্থান বুঝতে পারতো।

৪। যিনা বা জিনাত বলতে কি বোঝাচ্ছে?
জিনাত বলতে নারীর নারী সুলভ বিশেষ সৌন্দর্যকে যেমন বলে তেমন করে নারীর নারী সুলভ সাজগোজ করার জন্য কানে, গলায়, হাতে, বাহুতে, আঙ্গুলে, পায়ে, কোমরে মাথায় (আরব নারীরা নাকে কোন অলংকার ব্যবহার করেনা তাই নাক এখানে উল্লেখ করা যাচ্ছেনা) যে সব সোনা রূপার অলংকার ব্যবহার করা হতো এবং হাতে পায়ে মেহেন্দির আলপনা ও চোখে ব্যবহৃত সুরমাকে বলা হয়।
মুসলিম প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলাদের জন্য পর্দা করা ফরজ তা নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কোন দ্বি-মত না থাকলেও মহিলাদের মুখমণ্ডল এবং হাত ঢাকা থাকা ফরজ কিনা তা নিয়ে মত পার্থক্য দেখা যায়। কাজেই এই নিয়ে আলোচনা করার জন্য উপরে উল্লেখিত ৪টি শব্দকে বিবেচনায় রেখে আমাদের আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
যারা মুখমণ্ডল ও হাতের কিছু অংশ খোলা রাখার পক্ষে দাবী করে থাকেন, তার তাদের যুক্তি হিসাবে প্রথমে বলে থাকেন যে, যদি মুখমণ্ডল এবং হাতের কিছু অংশ আল্লাহ তা’লা ঢেকে রাখার নির্দেশ দিতেন তাহলে তা আল্লাহ তা’লা সুস্পষ্ট ভাবে মূখমণ্ডলকে ঢেকে রাখার নির্দেশ ঐ আয়াতে উল্লেখ করে দিতেন। কোন ফরজকে অস্পষ্ট ভাবে রাখা মহান আল্লাহ তা’লার ন্যায় বিচারের পরিপন্থী।
যারা মুখমণ্ডল এবং হাতকে ঢেকে রাখা ফরজ বলে দাবি করেন তারা খোলা রাখা পন্থীদের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন করেন যে, এই আয়াতে তো আল্লাহ তা’লা মাথা, চুল, কান গলা ঢেকে রাখার স্পষ্ট নির্দেশ দেননি তাহলে মুখমণ্ডল ও হাতের কিছু অংশ খোলের রাখার দাবী-কারীগণ মহিলাদের মাথা, চুল, কান গলা ঢেকে রাখাকে ফরজ বলেন কোন দলিলের ভিত্তিতে?
সুরা ২৪-এর ৩১ নং আয়াত পোশাক সংক্রান্ত নির্দেশ বুঝতে হলে আমাদেরকে চলে যেতে হবে ১৪শত বছর আগে আরবের নারীরা কি ধরনের পোশাক পরতো তা জানতে হবে।

৬ষ্ঠ অধ্যায়
ইতিহাস থেকে আমরা জানি যে, পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলের মানুষ তাঁর নিজ নিজ অঞ্চলের আবহাওয়া গত বৈশিষ্ট্যর উপর নির্ভর করে তাদের পরনের পোশাক বাস করার ঘর, খাবার ধরন নির্ধারণ করত।
আরবের মত রুক্ষ মরুভুমিময় এলাকার বসবাস কারী বেদুঈনদের মধ্যে স্বল্প কিছু সংখ্যক তাবুতে বাস করলেও বৃহত্তম সংখ্যক বেদুঈন খেজুর শাখা দিয়ে তৈরি ছাদওয়ালা এবং দরজা জানালা দেয়াল ছাড়া কুড়ে ঘরে বাস করতো। এই অবস্থায় তাদেরকে প্রকৃতির সকল বৈরিতাকে মোকাবেলা করে জীবন ধারণ করতে হতো, তারা গরম কালের সূর্যের প্রচণ্ড দাবদাহ এবং ভয়ংকর বালু ঝড় যেমন মোকাবেলা করতে হতো তেমন করে শীত কালে প্রচণ্ড শীত এবং মরার উপর খাঁড়া ঘায়ের মত প্রচণ্ড বৃষ্টিপাতকেও মোকাবেলা করতে হতো। আর প্রকৃতির সকল বৈরিতা মোকাবেলা করতো তারা তাদের পরনের কাপড় দিয়ে। সেই জন্য আবহমান কাল থেকে আরব নারী পুরুষ উভয়ে মাথায় মোটা কাপড় পেঁচিয়ে রাখতো এবং মোটা কাপড়ের লম্বা জামা শরীরে পরে থাকতো। সেই থেকে আরবের নারী পুরুষের মাথায় কাপড় রাখা তাদের সংস্কৃতির অংশ ছিলো।

এখন যদি কেউ বলেন যে, মুখ ঢাকা এবং মাথার চুল ঢাকা যেখানে অত্যাবশ্যক সেখানে সে বিষয়ে কেন কোরানের আয়াত দ্বারা সুস্পষ্ট করা হলো না। তাহলে তো এই নিয়ে ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ থাকতোনা। এখানে মুখ এবং মাথার চুল দুটি মানব দেহের ভিন্ন স্থানের অংশ বিশেষ, কাজেই দুটি স্থান নিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে আলোচনা করার প্রয়োজন।

প্রথমে মাথার চুল ঢাকা নিয়ে আলোচনা করছি- কোরানে যখন বুক ঢাকার আয়াত নাজিল হয়েছিলো তখন আলাদা করে মাথার চুল ঢাকার নির্দেশের দরকার ছিলোনা। এই মাথার চুল ঢাকার কাপড়কে তখন আরবরা খিমার বলতো আমরা যে ভাবে উড়নি বলি। উড়নি বললেই যেকোনো উপমহাদেশীয় মেয়েদের মাথার চুল এবং বুক ঢাকার কাপড় বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। ঠিক সে ভাবে খিমার বলার সাথে সাথে আরবের লোকেরা তা যে মেয়েদের মাথার চুল ঢাকার কাপড় তা বুঝে নিতো। তাই যখন খিমার দ্বারা বুক ঢাকতে নির্দেশ এলো তখন বুঝে নেয়া হলো যে খিমার দ্বারা মাথার চুল ঢেকে ঝুলে থাকা তাঁর অবশিষ্ট দুই প্রান্ত দিয়ে বুক ঢেকে রাখার কথা।
বিষয়টিকে আরো সহজ করে বুঝা জন্য একটি উদাহরণের সাহায্য চেষ্টা করছি। যিনি এই আয়াতের বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারছেন না তিনি যদি এই উদাহরণ থেকে বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেন। মনে করুণ কোন যায়গায় নারীদের মাহফিল হচ্ছে, সেখানে উপস্থিত সকল নারীদের মাথা উড়নি দিয়ে আবৃত করা, তখন যদি সে সব নারীদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়, তারা যেন তাদের উড়নি দিয়ে তাদের বুককে আবৃত করে নেয়। তখন কি উড়নি দিয়ে মাথা আবৃত্তাদেরকে কি আবার বলা যেতে পারে যে তারা যেন মাথার উড়নি দিয়ে মাথা আবৃত করে? কারণ উপরে আমি উল্লেখ করেছি যে কাপড় দিয়ে মাথা বা মাথার চুল ঢেকে রাখা আরব নারী পুরুষদের অভ্যাস ছিলো।
পাঠক, আমার এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয় যে আমি নিকাব বা মুখ ঢেকে মুসলিম নারী যারা বাইরে বের হোন তাদের বিরোধিতা করা। আমার জ্ঞান হবার পর থেকে দেখে আসছি আমার জন্মদাত্রী তিনি বাইরে বের হলে শাড়ি দিয়ে লম্বা ঘুমটা দিতেন, দূর কোথাও যেতে হলে রিক্সার হুডের চারিদিক শাড়ি দিয়ে ঘিরে তার মধ্যে বসে যেতেন। তাই যে সব মুসলিম মা বোন এবং কন্যারা মুখে নিকাব পরে বাইরে বের হোন তারা অবশ্য ভালো কাজটি করছেন। আল্লাহ তা’লা তাদের এই মহৎ কাজের প্রতিদান করুন। (আমিন!)

তারপরও বিনীত ভাবে আমি বলবো যে, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং হাদিস ও আল কোরানের পর্দা সংক্রান্ত আয়াত নাজিলের পটভূমিকা বিচার বিশ্লেষণ করে সাধারণ মুসলিম নারীদের বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মুখমণ্ডল ঢাকার নির্দেশ সম্পর্কে সুস্পষ্ট দলিল কোথাও পাওয়া যায়নি।

সুরা আহযাবের পর্দা সংক্রান্ত আয়াত নাজিলের পটভূমি আপাদ মস্তক ঢেকে রাখার নির্দেশ শুধুমাত্র নবীপত্নী এবং কন্যাগণ রাসুল সাঃ আত্মীয় এবং ঘনিষ্ঠ সাহাবীয়ে কেরামদের পরিবারের নারী ছাড়া অন্য কোন সাধারণ নারীদেরকে তা ধারণ করতে উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছেনা। তাই এই প্রথা সকল মুসলিম নারীদের উপর বাধ্যতা মূলক ভাবে চাপিয়ে দেয়া কতটুকু যুক্তিসঙ্গত সে বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে।

৭ম অধ্যায়
এবার যারা মুখ ঢাকা বা নেকাব পরাকে বাধ্যতামূলক বলে দাবি করেন এবং তাদের দাবির পক্ষে দলিল হিসাবে যে সব হাদিস উল্লেখ করেন সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখবো।
১ম হাদিস “তোমাদের কেউ কোনো নারীর প্রতি বিয়ের প্রস্তাব প্রদানের পর তাকে দেখলে কোন গুনাহ হবে না”। (মুসানদে আহমাদ)
তাদের যুক্তি হচ্ছে বিয়ের উদ্দেশ্যে নারীকে দেখা যাবে নতুবা নয়, আমি তাদের এই দাবির সাথে দ্বিমত করিনা, কিন্তু এই হাদিস থেকে নারীর মুখ ঢাকা সম্পর্কিত কিছুর দলিল পাওয়া যাচ্ছেনা । নারীকে না দেখার মানে নয় যে ঐ নারীরা মুখ ঢেকে আছেন। কারণ এই হাদিসে নারীরা মুখের নেকাব সরিয়ে পাত্রকে মুখ দেখাবেন এই রূপ কোন দলিলও প্রকাশ করেনা।
আমরা উপরের হাদিস থেকে এই সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে, এই হাদিস হচ্ছে পুরুষ নারীকে, নারী পুরুষকে তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক সিদ্ধান্ত নেবার জন্য কোরানের ২৪:৩০-৩১ এর এই মৌলিক নির্দেশকে সাময়িক ভাবে মুলতবি করার অনুমতি প্রদান মাত্র।

২য় হাদিস- রাসূলল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মহিলাদেরকে ঈদগাহে ঈদের নামায আদায় করার আদেশ প্রদান করলে জনৈকা নারী বলে উঠলেন। হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের করো কারো পরিধান করার মত চাদর-কাপড় নেই (আমরা কিভাবে জনসমাবেশে ঈদের নামায আদায় করতে যাব।) প্রত্যুত্তরে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন যার চাদর নাই তাকে যেন অন্য বোন পরার জন্যে চাদর দিয়ে দেয়। (বুখারী-মুসলিম)
রাসুল সাঃ এর জামানার প্রথমদিকের মুসলিমগণ খুব হত দরিদ্র ছিলেন তাতে এক কাপড় পরিধান করা সবার পক্ষে সম্ভব ছিলোনা তার উল্লেখ ভূরি ভূরি হাদিসে উল্লেখ পাওয়া যায়। ঘরের মধ্যে মহিলারা নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত কাপড় পরে থাকতেন। এই সব মহিলারা শরীয়তের নির্দেশ মেনে ঘরের বাইরে বের হবার ক্ষমতা ছিলোনা । তারা জানিয়েছিলেন যে তাদের বাইরে বের হওয়ার জন্য পরিধান করার মত কাপড় তাদের নেই। সেহেতু রাসুল সাঃ নির্দেশ দিয়েছিলেন যাদের কাছে চাদর আছে তারা যেন সেই চাদরের অংশ দ্বারা অন্য একজন মহিলাকে আবৃত করে ঈদগাহতে নিয়ে আসেন। এই হাদিসের মানে নয় যে যাদের কাছে একের অধিক চাদর ছিলো তার থেকে একটি অন্যকে সাময়িক ভাবে ধার দেয়ার।
এই হাদিস থেকেও এই সব নারীরা কি মুখ ঢেকে ঈদের সালাতে গিয়েছিলেন তাঁর কোন উল্লেখ নেই।

৩য় হাদিস
সহি বুখারী ও মুসলিমে উম্মত জননী আয়েশা (রা:) হতে বর্ণিত আছে: রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ফজরের সালাতে কিছু সংখ্যক মহিলা চাদর পরিহিত অবস্থায় পরিপূর্ণ পর্দা করত: তাঁর পিছনে সালাত আদায় করার উদ্দেশ্যে মসজিদে আসতেন। সালাত শেষে আপন আপন গৃহে ফেরার পথে তাদেরকে চেনা যেত না।
তাদের না চেনা যাবার কারণ উল্লেখ করায় বুঝা যাচ্ছে যে অন্ধকার না থাকলে তাদেরকে চেনা যেতো, কাজেই ঐ মহিলার যে মুখ ঢাকা ছিলেন না তা এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়। অন্য অনুবাদ দেখুন-
مُرُوْطِهِنَّ ثُمَّ يَرْجِعْنَ إِلَى بُيُوْتِهِنَّ مَا يَعْرِفُهُنَّ أَحَدٌ-
আয়েশা রাঃ বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃ ফজরের সালাত পড়াতেন। আর মুমিন মহিলাগণ সর্বাঙ্গ চাদরে ঢেকে নবী করীম সাঃ-এর সাথে ফজরের ছালাতে উপস্থিত হ’তেন। অতঃপর সালাত শেষ করে তারা যার যার বাড়িতে ফিরে যেতেন, আধারের কারণে তাদেরকে চেনা যেত না। বুখারী হা/৩৭২।

৪র্থ হাদিস
নবী পত্নী উম্মে সালামা জিজ্ঞাসা করলেন, নারীগণ চাদরের নিম্নাংশ কতটুকু পরিমাণ ঝুলিয়ে রাখবে? রাসূল বললেন, অর্ধহাত পরিমাণ। উম্মে সালামা আবারও প্রশ্ন করলেন এ অবস্থায় মহিলার পা দৃষ্টিগোচর হবে। তদুত্তরে রাসূল বললেন- তাহলে একহাত পরিমাণ ঝুলিয়ে রাখবে এর অধিক নয়।
পা ঢেকে রাখার প্রমাণ পাওয়া গেলেও এই হাদিস থেকে মুখ ঢাকার কোন ইঙ্গিত পাওয়া যায়না। কেউ কেউ যুক্তি দেখান যে, যেখানে পা ঢেকে রাখতে নির্দেশ করেন সেখানে মুখ খোলা রাখার প্রশ্ন আসতে পারেনা। মুখ খোলা রাখার প্রশ্ন আসতে পারে কারণ মানুষের মুখ দ্বারা তার পরিচয় জানা যায়। তাছাড়া কি প্রশ্ন আসে না আসে তা সম্পূর্ণ আপেক্ষিক বিষয়। আপেক্ষিক বিষয় থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁকে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে কি?

১ম থেকে ৪র্থ হাদিসের কোথাও ঘোমটা, নিকাব, মুখ ঢাকা শব্দের উল্লেখ নাই তাই এইগুলোকে মুখ ঢাকার পক্ষে দলিল হিসাবে গ্রহণ করা না করা ব্যক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।

মুখমণ্ডল ঢেকে রাখার পক্ষের দাবিকারীগণ নিচের উল্লেখিত হাদিসটিকে তাদের দাবির পক্ষে দলিল হিসাবে উল্লেখ করেন।
উম্মত জননী আয়েশা সিদ্দিকা (রা:) বলেন, كان الركبانيمرون بنا و نحن محرمات مع الرسول فإذا حاذونا سدلت إحدانا جلبابها على وجهها منرأسها فإذا جاوزنا كشفناه.
আমরা রাসুলের সাথে এহরাম অবস্থায় ছিলাম, উষ্ট্রারোহী পুরুষরা আমাদের পাশদিয়ে অতিক্রম কালে আমাদের মুখামুখি হলে আমরা মাথার উপর থেকে চাদর টেনে চেহারার উপর ঝুলিয়ে দিতাম। তারা আমাদেরকে অতিক্রম করে চলে গেলে আমরা মুখমণ্ডল খুলে দিতাম। (আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)

উপরের সুরা আযহাবের নাজিল কৃত মুখ ঢাকার আয়াত গুলো যে কেবল মাত্র নবীপত্নী, কন্যা এবং তাঁর নিকট আত্মীয় পরিবারের মহিলাদের জন্য প্রযোজ্য জেনেছি, এখন এই উল্লেখিত হাদিসকে সেই যুক্তি দিয়ে দাবি করবো যে এই হাদিসে মা আয়েশা রাঃ যে পর্দার কথা উল্লেখ করেছেন সেটি তিনি নবী পত্নী হবার কারণে করতে হয়েছিলো।

৮ম অধ্যায়
আসুন এবার দেখি ইসলামী বিশ্বের কোন কোন প্রখ্যাত ব্যক্তি-বর্গগণ “ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহা”র মানে মুখমণ্ডল এবং হাত বলে অনুমোদন করেছেন। এবং দেখি কোন কোন সাহাবীকেরামগণ এবং তাবীঈ কেরামগণ এবং প্রাথমিক যুগের ইসলামি ব্যক্তিত্ব মুখমণ্ডল খোলা রাখার পক্ষে ছিলেন।

মুখমণ্ডল ঢাকা না ঢাকা নিয়ে যে বাক্যের ব্যাখ্যা নিয়ে আমাদের উলামে কেরামগণের মধ্যে মতপার্থক্য চলে আসছে সে বাক্যটি হচ্ছে সুরা আল নুরের ৩১নং আয়াতের ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহা” বাংলায় যার অর্থ- নারীদের যে সৌন্দর্য এমনিতে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় চরম মতপার্থক্য থাকলেও অধিকাংশ ইসলামী বিশেষজ্ঞ মায় সাহাবীয়ে কেরাম রাঃ গণ মুখমণ্ডল খোলা রাখার পক্ষে যুক্তি তোলে ধরেছেন, তারা জানাচ্ছেন যে -“ ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহা” মানে হচ্ছে- নারীর মুখমণ্ডল, হাত(কব্জির নিকট থেকে বাকি অংশ বা হাতের কনুই আর কব্জির মধ্যখান থেকে নিচের অংশ) অথবা চোখের সুরমা এবং আঙ্গুলের পরা আংটি অথবা ঐ ধরণের নারীদের ব্যবহৃত অলংকার বিশেষ।

ব্লগটি অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে তারপরও তাদের দাবির পক্ষে দলিল মজবুত করতে সবার নাম উল্লেখ না করে পারছিনা। –
আনাস ইবনে মালিক রাঃ থেকে ইবনে আল মুনধীর রঃ আমাদেরকে জানাচ্ছেন যে,“ ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহা” মানে হচ্ছে- চোখের সুরমা এবং আঙ্গুলের আংটি।
ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে সা’ইদ বিন মানসুর, ইবনে জরির, আব্দবিন হুমাইদ, ইবনে আল মুনধীর এবং ইমাম বায়কী রঃ প্রমুখ জানাচ্ছেন যে,“ ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহা” মানে হচ্ছে- সুরমা, আংটি, কানের দুল গলার হার।

ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে আব্দ আল রাজ্জাক এবনফ আব্দ বিন হুমাইদ জানাচ্ছেন ,যে,“ ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহা” মানে হচ্ছে- হেন্না(মেহেদী) হাত,আংটি।
ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে ইবনে আবি শাইবা, আব্দ বিন হুমাইদ, “ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহা” মানে হচ্ছে- মুখ, হাত, আংটি।

ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে ইবনে আবি শাইবা,আব্দ বিন হুমাইদ, “ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহা” মানে হচ্ছে- মুখএবং হাতের তালু।

আয়েশা রাঃ থেকে ইবনে আবি শাইবা, আব্দ বিন হুমাইদ,ইবনে আল মুনধীর জানাচ্ছেন যে, তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো- “ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহা”র মানে কি? উত্তরে উনার জামার হাতার উপর ধরে জানান- নারীদের হাতের বালা এবং আংটি (ফাটাখ) ।

ইকরিমা রাঃ থেকে ইবনে আবি শাইবা জানাচ্ছেন “ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহা” মানেহচ্ছে- মুখ এবং গলার সামনের অংশ।

সাইদ বিন জুবায়ের রাঃ থেকে ইবনে জরির জানাচ্ছেন যে,“ইল্লা মাজাহারা/দাহারা মিনহার” মানে হচ্ছে মুখ এবং হাত।

ক্বাতাদা রাঃ থেকে আব্দ আল রাজ্জাক এবং ইবনে জরির জানাচ্ছেন যে, “ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহার” মানে হচ্ছে – বালা, আংটি সুরমা। ক্বাতাদা আরো জানিয়েছেন যে, তিনি জানতে পেরেছেন যে, রাসুল সাঃ বলেছেন- (হাতের কনুই থেকে কব্জির মধ্যখানে হাত ধরে দেখিয়ে) যে নারী আল্লাহ এবং শেষ বিচারের দিনের বিশ্বাস রাখে সে কখনও এর পরে কোন পুরুষকে দেখতে পারেনা।

মিসওয়ার বিন মাখরামা রাঃ থেকে আব্দ আল রাজ্জাক এবং ইবনে জরির রাঃ জানাচ্ছেন যে, “ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহা” মানে হচ্ছে বালা, আংটি সুরমা।
আব্বাস রাঃ থেকে সাইদ ইবনে জরির এবং ইবনে জুরাইয জানাচ্ছেন যে, এই আয়াতের মানে হচ্ছে- হাতের বালা এবং আঙ্গুলের আংটি।

আয়েশা রাঃ থেকে ইবনে জুরাইয আরো জানাচ্ছেন যে, অন্য কোথাও আয়েশা রাঃ জানিয়েছিলেন যে, একদিন তাঁর ঘরে তাঁর সৎ ভাই আব্দ আল্লাহ বিন আল তোফায়েলের কিশোর মেয়ে অলংকারাদী পরে বেড়াতে এসেছিলো, কিছুক্ষণ পর রাসুল সাঃ ঘরে প্রবেশ করে মেয়েটিকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নেন। তা দেখে আয়েশা রাঃ রাসুল সাঃ বলেন- এই মেয়েটি তো আমার ভাইয়ের মেয়ে তাছাড়া সে এখনও ছোট। এর জবাবে রাসুল সাঃ জানান- “মেয়েরা যখন ঋতুবতি হয়ে পড়ে এর পর থেকে মুখ এবং হাতের এই পর্যন্ত ছাড়া আর কিছু বেগানা পুরুষকে প্রদর্শনের অনুমতি দেয়া হয়নি” তিনি হাত দিয়ে হাতের কনুই থেকে হাতের কবজি মধ্যখান দেখিয়ে দিলেন।

এই প্রসঙ্গে আল্লামা ইউসুফ কারযাভি বলেন-
ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহা’ আয়াতের যে ব্যাখ্যা ইবনে আব্বাস রাঃ করেছেন এবং যারা তাঁর সাথে একমত পোষণ করেন আমার দৃষ্টিতে সেটাই গ্রহণ যোগ্য। কারণ এই আয়াতে একজন নারীর বেগানা পুরুষের সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শনের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার পর ব্যতিক্রমী বাক্য “ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহা’উল্লেখ করা হয়েছে, এই বাক্য একধরণের কঠোর ধর্মীয় আচার থেকে কিছুটা নিষ্কৃতির দিকে ইঙ্গিত করে, যদি জিলবাব, বোরকা বা বহিঃস্থ বস্ত্র অথবা অনুরূপ বস্ত্র কঠোর ভাবে সর্বাঙ্গ ঢেকে রাখার নির্দেশ দিতো তাহলে তা সরাসরি স্পষ্ট ভাবেই নির্দেশ আসতো। ধর্মীয় আচার থেকে কিছুটা নিষ্কৃতি কষ্ট লাঘবের যা “ইল্লা মা জাহারা/দাহারা মিনহা বাক্যটি’ প্রয়োগ করার দরকার ছিলোনা ।
আর এর জন্যই তাবারী রঃ, কুরতুবী রঃ, রাযী রঃ, বাদাওয়ী রঃ এবং অন্যরা ইবনে আব্বাস রাঃ এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন। শুধু তাই নয় ইসলামী দুনিয়ার বিশেষজ্ঞগণের মধ্যে বেশির ভাগ এই অভিমত গ্রহণ করেছেন। কুরতুবী রঃ এই অভিমত গ্রহণের যুক্তি তোলে ধরতে উল্লেখ করেছেন যে, নারীদের নিত্য কাজে কামে মুখ এবং হাতের এই অংশ এমনিতে বাইরে চলে আসে তাছাড়া ধর্মীয় হুকুম আহকাম পালন কালেও মুখ এবং হাতের এই অংশ ঢাকা থাকেনা (সালাত এবং হজ্ব ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে দুইটি অতিগুরুত্বপূর্ন স্তম্ভ)। যদি এই অংশ ঢাকার হুকুম থাকতো তাহলে এই গুরুত্বপূর্ণ হুকুম পালন কালে তা করতে হতো।

৯ম অধ্যায়
মুখমণ্ডল ঢেকে রাখা যে ফরজ নয় তার পক্ষে দলিল সমূহ –
দলিল নং এক –
আয়েশা রাঃ বর্ণনা করেন যে, আসমা বিনতে আবী বকর রাঃ পাতলা কাপড় পরিহিত অবস্থায় রাসূল সাঃ-এর নিকট প্রবেশ করলেন। রাসূল সাঃ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, হে আসমা! নারী যখন যৌবনে পদার্পণ করে তখন তার এটা ওটা ব্যতীত প্রকাশ করা বৈধ নয়। তিনি চেহারা ও দু’কব্জির দিকে ইঙ্গিত করে দেখালেন। আবু দাঊদ হা/৪১০৬; মিশকাত হা/৪৩৭২, সনদ সহীহ।
মুখমণ্ডল ঢেকে রাখার পক্ষের দাবিদারগণ এই হাদিসকে দলিল হিসাবে নাকচ করে দিবেন। তার কারণ হিসাবে জানাবেন- হাদিসটিতে বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি, আরো বলবেন- হাদিসটির বর্ণনা দাতাদের একজনের সততার বিষয়ে সন্দেহ আছে। এই ধরণের হাদিসকে হাদিস বিজ্ঞানে মুরসাল হাদিস বলে। (কেউ কেউ অবশ্য এই হাদিসকে হিযাব ফরজ হবার আগের বলে দাবি করে থাকেন। )
আসমা বিনত উমর রাঃ এর পোশাক বর্ণনার হাদিসটিকে রাসুল সাঃ পর্যন্ত সিল-সিলা না পাওয়ার কারণে, হাদিসের সাথে রাসুল সাঃ এর সংযুক্তি প্রমাণ করতে না পারলেও এই হাদিসটি যে সদ্য আবিষ্কৃত কোন হাদিস নয়, তা যে আবু দাউদ কর্তৃক সংগৃহীত তাতে কোন সন্দেহ নাই। আবু দাউদ যখন তা রেকর্ড করেন তখন মূল ঘটনা থেকে মাত্র ৫ পুরুষ কাল অতিক্রম করেছিলো। কাজেই কাছাকাছি সময়ে রেকর্ড করে যাওয়ায় এই হাদিস থেকে রাসুল সাঃ এবং সাহাবীয়ে কেরামগণ রাঃ আমলের নারীদের চলা ফেরা এবং বেশভূষা কেমন ছিলো এই হাদিসে সে সময়ের নির্ভর যোগ্য চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। সে চিত্রটি মুখমণ্ডল খোলা রাখার পক্ষে দাবিকারীদের দাবীকে শক্তিশালী করে তোলে। যে কারণে হাদিস বিশেষজ্ঞ আলবানী রঃ এই হাদিসকে হাসান হাদিসের অন্তর্ভুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন তাঁর -“জিলবাব-আল- মার’আ- আল মুসলিমা, ইরওয়া আল ঘালিল, সহি আল জামি, আল সগির এবং তাখরিজ আল হালাল ওয়া ই হারাম” নামক কিতাব গুলোতে।

ইসলামে দলিল যাচাই বাছাইয়ের সুনান হচ্ছে যে, যদি কোন এক বিষয়ে পরস্পর বিরোধী প্রামাণিক দলিল পাওয়া যায়, তাহলে ৩য় কোন দলিল দ্বারা ঐ দুই দলিলের একটিকে সমর্থন করে তখন সেই দলিলটি পালনীয় এবং যেটির সমর্থনে ৩য় কোন দলিল পাওয়া যাবেনা তখন তাঁকে বর্জন করা।
দলিল নং ২- আল্লাহ মুখমণ্ডলকে ঢেকে রাখার বদলে নারীদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আর তারা যেন তাদের ওড়নার (খুমুর/ খিমার) আঁচল দিয়ে তাদের বুক (জাইব) ঢেকে রাখে৷ ২৪-৩১

প্রাক ইসলামী যুগে নারীরা যে পোশাক পরতো সে পোশাকের সামনের গলার নিচের অংশ যেখানে মাথা প্রবেশ করানোর জন্য বিভাজিত রাখা হতো সে অংশ দিয়ে নারীদের বুকের অংশ বিশেষ প্রায়শ প্রকাশ হয়ে থাকে, সে কারণে আল্লাহ তা’লা নির্দেশ দিচ্ছেন যে, “আর তারা যেন তাদের ওড়নার (খুমুর/ খিমার) আঁচল দিয়ে তাদের বুক (জাইব) ঢেকে রাখে”৷ যাতে করে তাদের উড়নির দু’পাশের বর্ধিত অংশ দিয়ে গলা, কান, বুক আড়াল করে নেয়। তারা যেন প্রাক ইসলামী যুগের মহিলাদের মত তাদের পোশাকের বিভাজিত অংশ দিয়ে তাদের বুক প্রদর্শন করে বেড়ায় না।
কারণ আগের সময়ের নারীরা যদিও শীতকালে তাদের চাদর দিয়ে সারা শরীর ঢেকে রাখলেও গরমের সময় শুধু মাথার চুল বেধে রাখতো ফলে পোশাকের বিভাজিত অংশ দিয়ে বুকের অংশ প্রদর্শন করে চলা ফেরা করতো। এই প্রাক ইসলামী আচরণ যেন মুসলিম মহিলারা না করতে পারে এর জন্যই বক্ষের উপর কাপড় রাখতে নির্দেশ দিয়েছে । যদি মুখমণ্ডল ঢেকে রাখার নির্দেশ থাকতো তাহলে স্পষ্ট ভাবে আল্লাহ তা’লা স্পষ্ট ভাবে বুকের মতো মুখমণ্ডলের কথা উল্লেখ করতেন।

তাই এই “আর তারা যেন তাদের ওড়নার (খুমুর/ খিমার) আঁচল দিয়ে তাদের বুক (জাইব) ঢেকে রাখে” আয়াত উল্লেখ করে ইবনে হাযাম রঃ বলেন- আল্লাহ তা’লা এই আয়াত দ্বারা নারীদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা তাদের বক্ষের উপর উড়নির অংশ দিয়ে ঢেকে রাখে। তাতে প্রমাণ হয় ইসলামে কান, গলা,বুকের অংশ আওরা হওয়ায় সেগুলো ঢেকে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, এবং এই আয়াতটি একটি পাঠগত দলিল যে নারীদের মুখমণ্ডল আওরার অন্তর্গত নয় বিধায় তা প্রকাশের জন্য অনুমোদিত। কাজেই এই সহজ সরল স্পষ্ট আয়াত দিয়ে অন্য কোন মানে বের করে নেবার কোন সম্ভাবনা নেই।

দলিল নং ৩ হে নবী মু’মিন পুরুষদের বলে দাও তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং নিজেদের লজ্জা-স্থানসমূহের হেফাজত করে ৷ এটি তাদের জন্য বেশী পবিত্র পদ্ধতি ৷ যা কিছু তারা করে আল্লাহ তা জানেন ৷ ২৪-৩০
যদি রাসুল সাঃ আমলে নারীরা তাদের মুখ মণ্ডল, খামির, চাদর, উড়নি, জিলবাব,নিকাব বোরকা দিয়ে ঢেকে চলা ফেরা করতো তাহলে আল্লাহ তা’লা কেন পুরুষদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখার?
খামির, চাদর, উড়নি, জিলবাব, নিকাব বোরকা দিয়ে ঢেকে রাখার পরও কি কোন অলৌকিক উপায় থাকে যে পুরুষ নারীদের সৌন্দর্য দেখে অসংযত হয়ে পড়ার?
যদি মুখ ঢাকা থাকে তাহলে পুরুষ কেমন করে সে মুখ দেখতে পাবে এবং তা দেখে সে সেই নারীর প্রতি আকর্ষিত বোধ বা উত্তেজিত হয়ে উঠার সম্ভাবনা থাকে?
তাহলে এই আয়াতটি কি আরেকটি দলিল নয় যে, রাসুল সাঃ এর আমলে নারীরা মুখমণ্ডল ঢেকে রাখতোনা?

দলিল নং ৪ এরপর তোমার জন্য অন্য নারীরা হালাল নয় এবং এদের জায়গায় অন্য স্ত্রীদের আনবে এ অনুমতিও নেই, তাদের সৌন্দর্য তোমাকে যতই মুগ্ধ করুক না কেন । ৩৩-৫২

এই আয়াতে আল্লাহ তা’লা রাসুল সাঃকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, অন্য কোন নারীর সৌন্দর্য তাঁকে যত আকৃষ্ট করে না কেন তাঁকে আর কোন বিয়ে করতে অনুমতি দেয়া হবেনা।
যদি রাসুল সাঃ এর আমলে সব নারীরা মুখ ঢেকে চলা ফেরা করতো তাহলে কেমন করে রাসুল সাঃ এর পক্ষে মুখ ঢাকা নারীর রূপ সৌন্দর্য দেখা সম্ভব হতে পারে?
তাঁর মানে এই আয়াতটি আরেক দলিল নয় যে, রাসুল সাঃ এর আমলে নারীদের মুখ ঢাকা থাকতোনা?

দলিল নং ৫ এরপর “ যদি তোমাদের কেউ কোন নারী দেখতে পাও, যার রূপ লাবণ্য তোমার অন্তরকে মুগ্ধ করে”- এই শিরোনামের হাদিসটি দেখি-
বহু হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি সেই আমলে নারীরা কি কাপড় পরতেন এবং কি ভাবে পরে অন্যের সামনে বের হতেন। অনেকেই আসমা বিনত আবু বকর রাঃ কে নিয়ে উল্লেখিত হাদিসটিকে হিযাব বাধ্যবাধকতা হবার পূর্বে বলে চালিয়ে নেবার চেষ্টা করে থাকেন। এবার যে হাদিসটি উল্লেখ করছি এই হাদিসটির বিষয়ে কি বলবেন? এই হাদিসটি জয়নাব রাঃ যখন নবী সাঃ স্ত্রী ছিলেন সে সময়ের ঘটনা, আমরা জানি যে জয়নাব রাঃ বিয়ের রাত থেকেই হিযাবের বিধান শুরু হয়ে ছিলো। তাই এই হাদিসটি হিযাব নাজিলের পরবর্তী ঘটনার প্রমাণিত দলিল হিসাবে গণ্য হবে নয় কি?
হাদিসটি নিম্নরূপ-
ইবনে জরির থেকে আহমদ, মুসলিম এবং আবু দাউদ বর্ণনা করে গেছেন- একদা রাসুল সাঃ একজন মহিলাকে দেখতে পেয়েছিলেন। যার রূপ সৌন্দর্যে রাসুল সাঃ বিমুগ্ধ হয়েছিলেন। মানবিক স্বত্বার যে কোন কিছুর সৌন্দর্যে প্রভাবিত হওয়া স্বাভাবিক ধর্ম কিন্তু অন্য নারীর রূপে মুগ্ধতা ইসলামে নিষিদ্ধ কাজেই ঐ বিমুগ্ধতাকে মুক্তি লাভের জন্য জয়নাব রাঃ এর সান্নিধ্যে এসেছিলেন।
পরবর্তীতে রাসুল সাঃ তাঁর সাহাবীয়ে কেরামগণদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন যে, যদি কোন মহিলা তোমাদের সামনে পড়ে এবং তুমি তাঁর রূপ লাবণ্যে বিমুগ্ধ হয়ে পড়ো, তাহলে তুমি ঐ মুগ্ধতাকে বিদূরিত করতে তুমি তোমার আপন স্ত্রীর সান্নিধ্যে চলে যাবে।

এই হাদিস প্রমাণ করে যে রাসুল সাঃ এবং সাহাবীয়ে কেরামগণের আমলে নারী হিযাব করে চললেও মুখ ঢেকে চলতেন না, মুখ ঢাকা থাকলে কেমন করে রাসুল সাঃ মহিলার রূপ দেখে বিমুগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন বা ঐ সময় মহিলাদের মুখ ঢাকা থাকলে রাসুল সাঃ কেন উনার সাহাবিদেরকে ঐ ভাবে উপদেশ দিবেন ?

দলিল নং ৬
বুখারী শরীফ, কিতাবুনিক্কাহ, হাদিস/৪৭৭২
সা’হল ইবনে সা’দ রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাঃ এর নিকট লোকদের মধ্যে ছিলাম। (এমন সময়) জনৈকা মহিলা দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! সে (অর্থাৎ আমি নিজেকে) তাকে বিবাহের জন্য আপনার নিকট সোপর্দ করেছে। এখন তার সম্পর্কে আপনার মতামত দিন। রাসুল সাঃ তাকে কোন জবাব দিলেন না। সে পুনরায় দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! সে নিজেকে আপনার নিকট (বিবাহ) দিয়েছে; সুতরাং তার সম্পর্কে আপনার মতামত দিন। রাসুল সাঃ (এবারো) কোন উত্তর দিলেন না। সে তৃতীয়বার দাঁড়িয়ে বলল, সে নিজেকে আপনার নিকট বিবাহ দিয়েছে; সুতরাং তার সম্পর্কে আপনার মত দিন। (এ সময়) একব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! তাকে আমার নিকট বিবাহ দিন। রাসুলুল্লাহ সাঃ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নিকট কোন কিছু আছে কি? সে বলল না। সে লোকটিকে বলল গিয়ে খুঁজে দেখ কোন যোগাড় করতে পার কিনা। এমনকি তা যদি লোহার একটি আংটিও হয়। লোকটি গিয়ে খোজ করল এবং ফিরে এসে বলল, আমি কিছু যোগাড় করতে পারলাম না, এমনকি লোহার একটি আংটিও না।অতঃপর রাসুল সাঃ বললেন, তুমি কি কোর’আনের কিছু মুখস্থ জান? সে বলল আমি অমুক অমুক সুরা মুখস্থ জানি। রাসুল সাঃ বললেন, যাও তুমি যে পরিমাণ কোর’আন মুখস্থ জান তার বিনিময়ে আমি তোমার নিকট বিয়ে দিলাম।
————————-
সাল বিন সা’দ রাঃ বুখারী এবং মুসলিম বর্ণনা করেন- কোন এক মহিলা রাসুল সাঃ এর সামনে হাজির হয়ে নিজকে রাসুল সাঃ এর কাছে সমর্পণ (বিয়ে বসার) করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। রাসুল সাঃ মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নীরব থাকেন। তাঁর মানে তিনি মহিলাকে বিয়ে করতে অমত করে ছিলেন।
এই হাদিসের চিত্রে আমরা দেখতে পারি যে মহিলাটির মুখ খোলা ছিল বিধায় তিনি মহিলাটির মুখের দিকে তাকিয়ে পছন্দ না হওয়ার কারণে তিনি নিরুত্তর ছিলেন।

দলিল নং ৭
অন্য একটি হাদিস যেখানে বিদায় হজের সময় ক্বাথামের গোত্রের তরুণী মুখের দিকে ফজল বিন আব্বাস রাঃ তাকিয়ে থাকার বর্ণনা।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে নাসাঈ বর্ণনা করছেন যে, বিদায় হজ্জের প্রক্ষালে রাসুল সাঃ এর উটে সহযাত্রী হিসাবে (তাঁর ভাই) ফজল বিন আব্বাস রাঃ ছিলেন। এই সময় ক্বাথ’আম গোত্রের এক রূপসী তরুণী রাসুল সাঃ কে কোন এক বিষয়ে প্রশ্ন করে, এই সময় সেই রূপসী তরুণীর দিকে ফজল বিন আব্বাস রাঃ তাকাচ্ছিলেন। তখন রাসুল সাঃ তাঁর মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। বুখারী হা/১৫১৩; মুসলিম হা/১৩৩৪,আবুদাঊদ হা/১৮১১; নাসাঈ হা/২৬১৩।

এই প্রসঙ্গে আলী রাঃ বরাত দিয়ে তিরমিজি জানাচ্ছেন যে, ঐ সময় ফজল বিন আব্বাস রাঃ এর মুখ কেন ঘুরিয়ে দিচ্ছেন তা জানতে চেয়ে তাঁর বাবা আব্বা রাঃ রাসুল সাঃ কে প্রশ্ন করেন-“ইয়া রাসুলুল্লাহ আপনি কেন আপনার ভাতিজার মুখ ঘুরিয়ে দিলেন?” উত্তরে রাসুল সাঃ জানান-“ তিনি আশংকা করছেন যে, এই তরুণ তরুণীর কারো মনে শয়তানের কুভাব প্রকাশ হতে পারে, তাই তিনি ফজলের মুখ ঘুরিয়ে দিয়েছেন।
বহুবিদ্যা বিশারদ শাওক্বানী রঃ বলেন যে-
ইবনুল আল ক্বাতান রঃ উপরের ঘটনা থেকে সিদ্ধান্ত নেন যে – মহিলাদের মুখের দিকে তাকানো বৈধ হবে যদিনা যৌন আকাঙ্ক্ষার কোন সম্ভাবনা না থাকে।

১। যদি নারীদের মুখ দেখা নিষিদ্ধ হতো তাহলে এত জনসমাগমের সামনে ফজল ইবনে আব্বাস রাঃ মহিলাটির দিকে তাকাতেন না।

২। যদি নারীদের মুখ দেখা নিষিদ্ধ হতো তাহলে ফজল ইবনে আব্বাস রাঃ এর পিতা আব্বাস রাঃ রাসুল সাঃ কর্তৃক ফজল ইবনে আব্বাস রাঃ মুখ ফিরিয়ে দেয়ার কারণ কি জানার জন্য প্রশ্ন করতেন না।

৩। যদি নারীদের মুখ ঢাকার নির্দেশ থাকতো তাহলে রাসুল ঐ সময় ঐ ক্বাথ’আম গোত্রের মহিলাকে কোন কিছু দিয়ে তাঁর মুখমণ্ডল ঢাকতে নির্দেশ দিতেন।
আল্লামা শাওক্বানী তার ‘নায়লুল আওত্বার’ গ্রন্থে এই হাদিসের প্রেক্ষিতে জানাচ্ছেন যে- বিদায় হজ্জ ঘটেছিলো হিজরির ১০ম সনে, এবং হিযাবের ৩৩-৫৯ নং আয়াত — তা নাজিল হয়েছিলো হিজরির ৫ম সনে, কাজেই ৫ম সনে যদি সব নারীদের প্রতি মুখ ঢাকার নির্দেশ হতো তাহলে ১০ হিজরির বিদায় হজ্ব কালে মুখ অনাবৃত নারীর দেখা পাওয়া যেতোনা। এর থেকে প্রমাণিত হয়, হিযাবের ৩৩-৫৯ আয়াতের নির্দেশনা ছিলো শুধু মাত্র রাসুল সাঃ পরিবার পরিজনদের জন্য ।
এই চিত্রটির প্রেক্ষাপট বিদায় হজ্বের কালে তাই এর থেকে প্রমাণ হয়- হিযাবের আয়াতের পরও মহিলারা বাইরে মুখ খোলা রেখেই চলা ফেরা করতো।

দলিল নং ৮
জাবির বিন আব্দুল্লাহ রাঃ হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ঈদের দিনে রাসূল সাঃ-এর সাথে সালাতে উপস্থিত ছিলাম। তিনি খুৎবার পূর্বে আযান, ইক্বামত ব্যতীত সালাত আদায় করলেন। অতঃপর লোকদেরকে উপদেশ, নছীহত করলেন। অতঃপর মহিলাদের নিকট এসে ওয়াজ-নসিহত করে বললেন, হে মহিলারা! তোমরা সদকা কর, কেননা তোমাদের অধিকাংশই জাহান্নামের জ্বালানী হবে। লালচে দু’গালের অধিকারী একজন মহিলা নারীদের মধ্যে হ’তে দাঁড়িয়ে বলল, কেন হে আল্লাহর রাসূল সাঃ? রাসুল সাঃ জবাবে বলেন- “তোমাদের মধ্যে বেশীর অভিযোগ করে থাকে এবং তোমাদের মধ্যে বেশির ভাগ অকৃতজ্ঞ”। তখনই মহিলারা তাদের কানের দুল এবং আঙ্গুলের আংটি বিল্লাল রাঃ হাতের বস্ত্র খণ্ডে ছুড়ে ফেলতে লাগলেন। মুসলিম হা/৮৮৫।
এখানে কেমন করে জাবির রাঃ দেখতে পেলেন যে মহিলার দুই গাল লাল বর্ণের? যদিনা ঐ নারীর মুখ খোলা থাকে? যারা নেকাবের পক্ষে তারা যুক্তি হিসাবে বলবেন যে ঐ মহিলা বিগত যৌবনা বৃদ্ধা মহিলা হয়ে থাকবেন, অথবা হাদিসটি ২য় হিজরি সনের হবে যখন সবে মাত্র ঈদের সালাত আদায় করা নির্দেশ এসেছে তাই এই হাদিসটি হয়তো ৫ম হিজরি সনের পর্দা করার আয়াতের আগে।

মনে রাখবেন এই একই হাদিস কিন্তু বুখারীতে ইবনে আব্বাস রাঃ বর্ণনা করেছেন, সেখানে তিনি জাবির কর্তৃক বর্ণনার মত বর্ণনা করে সংযোগ করেন- “আমি দেখেছি, মহিলারা হাত বাড়িয়ে তাদের গহনাদি বিল্লাল রাঃ এর মেলে ধরা কাপড়ের মধ্যে নিক্ষেপ করতে”।
এর প্রেক্ষিতে ইবনে হাযম রঃ বলেন-“ এই হাদিস থেকে জানতে পারি যে ইবনে আব্বাস রাঃ ঐ সময় ঐখানে উপস্থিত ছিলেন, এবং তিনি নিজে দেখেছেন মহিলারা হাত বের করে তাদের গহনাদি বিল্লাল রাঃএর মেলে ধরা কাপড়ে নিক্ষেপ করতে। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, হাতের নিম্নের অর্ধেক এবং মুখমণ্ডল আওরার অংশ নয়”।
এই একই হাদিস জাবির রাঃ বরাতে মুসলিম এবং আবু দাউদও তাদের সংকলনে উল্লেখ করে রেখেছেন- জাবির রাঃ জানাচ্ছেন তিনি নারীদেরকে একের পর এক তাদের আঙ্গুলের ফাতাখ নিক্ষেপ করতে দেখেছেন।
ইবনে হাযাম রঃ জানাচ্ছেন যে,- ফাতাখ হচ্ছে বড় ধরণে আঙ্গুলের ব্যবহৃত আংটি এবং তাদের হাত যদি কাপড়ে মোড়ানো থাকতো তাহলে তাদের পক্ষে বিল্লাল রাঃ বাহুতে রাখা বস্ত্রখণ্ডে ছুড়ে ফেলা সম্ভব হতোনা।
এখানে কেমন করে জাবির রাঃ দেখতে পেলেন যে মহিলার দুই গাল লাল বর্ণের? এবং ইবনে আব্বাস রাঃ মহিলাদের হাত? যদিনা ঐ সব নারীর মুখ/হাত খোলা থাকে?
যারা নেকাবের পক্ষে তারা যুক্তি হিসাবে বলবেন যে ঐ মহিলা বিগত যৌবনা বৃদ্ধা মহিলা হয়ে থাকবেন, এবং দলিল হিসাবে নিচের আয়াত উল্লেখ করবেন- ‘বৃদ্ধা নারী যারা বিবাহের আশা রাখে না, তাদের জন্য অপরাধ নেই, যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে তাদের বহির্বাস (বাহ্যিক পোশাক) খুলে রাখে; তবে এটা হ’তে বিরত থাকাই তাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ (নূর ৬০)।
অথবা দাবি করবেন -হাদিসটি ২য় হিজরি সনের হবে যখন সবে মাত্র ঈদের সালাত আদায় করা নির্দেশ এসেছে তাই এই হাদিসটি হয়তো ৫ম হিজরি সনের পর্দা করার আয়াতের আগে। যারা নিকাবের বিপক্ষ তারা পালটা যুক্তি দেখিয়ে বলেন যে, এই হাদিস শুধু জাবির রাঃ বর্ণনা করে যাননি, ইবনে আব্বাস রাঃ এই হাদিস বর্ণনা করে গেছেন এবং পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি নিজ চোখে মহিলাদেরকে তাদের আঙ্গুলের ফাতাখ সদকা দিতে দেখেছেন। সকলে জানে যে রাসুল সাঃ ইন্তেকালের সময় ইবনে আব্বাস রাঃ বয়স মাত্র ১৩/১৪ বছর ছিলো, কাজেই হাদিস বর্ণনা কাল যদি ২য় হিজরি সন হয়ে থাকে তাহলে ইবনে আব্বাস সাঃ তখন নিতান্ত ৫/৬ বছরের শিশু থাকার কথা এবং ঐ বয়সে দেখা কোন ঘটনা তাঁর মনে থাকার সম্ভাবনা থাকেনা। কাজেই হিযাব ফরজ হবার আগের হাদিস বলে মেনে নেয়া যেতে পারেনা।

দলিল নং ৯
مُرُوْطِهِنَّثُمَّ يَرْجِعْنَ إِلَى بُيُوْتِهِنَّ مَا يَعْرِفُهُنَّ أَحَدٌ-
আয়েশা রাঃ বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃ ফজরের সালাত পড়াতেন। আর মুমিন মহিলাগণ সর্বাঙ্গ চাদরে ঢেকে নবী করীম সাঃ-এর সাথে ফজরের ছালাতে উপস্থিত হ’তেন। অতঃপর সালাত শেষ করে তারা যার যার বাড়িতে ফিরে যেতেন, আধারের কারণে তাদেরকে চেনা যেত না। বুখারী হা/৩৭২।
এই হাদিসে আয়েশা রাঃ স্পষ্ট জানাচ্ছেন যে, শুধুমাত্র রাতের আঁধার থাকার কারণে নামাজে আগত মহিলাদের চেনা যায়নি, যদি মুখ কাপড়ে আবৃত হতো তাহলে কি আলো কি অন্ধকারে নারীর পরিচয় পাওয়া যেতনা। অতএব আঁধারে আবৃতা মহিলাদের মুখ যে খোলা ছিলো এই হাদিস থেকে সে দাবি প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

দলিল নং ১০
মুসলিম শরীফ, তালাক অধ্যায়, হাদিস/৩৫৯৩ উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আরকাম যুহরীকে নির্দেশ দিয়ে লিখলেন যে, তিনি যেন সুবাই’য়া বিনতে হারিস আসলামীর নিকট গমন করেন। এরপর তাকে তার হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। যখন তিনি রাসুলুল্লাহ সাঃ এর নিকট ফতোয়া চেয়েছিলেন এবং তিনি তাকে যা বলেছিলেন তখন উমর ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উতবাকে লিখে পাঠালেন যে, সুবাইয়া তাকে জানিয়েছে – তিনি বনু আমির ইবনে লুঈ গোত্রের সা’দ ইবনে খাওলার স্ত্রী ছিলেন। তার স্বামীর ইন্তেকালের পরপরই তিনি সন্তান প্রসব করেন। এরপর যখন তিনি নিফাস থেকে পবিত্র হলেন, তখন বিয়ের পয়গামদাতাদের জন্য সাজসজ্জা করতে লাগলেন। তখন বনু আব্দুদ দার গোত্রের আবু সানাবিল ইবনে বা’কাক নামক জনৈক ব্যক্তির নিকট গমন করলেন। তখন তিনি তাকে বললেন মতলব কি? আমি তোমাকে সাজসজ্জা করতে দেখতে পাচ্ছি! সম্ভবত তুমি বিয়ের প্রত্যাশী? আল্লাহর শপথ! চার মাস দশ দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তুমি বিয়ে করতে পারবে না। সুবাইয়া বললেন, যখন সে লোকটি আমাকে একথা বলল, তখন কাপড় চোপড় পরিধান করে সন্ধ্যাবেলা রাসুলুল্লাহ সা. এর নিকট চলে এলাম। এরপর আমি তাঁকে সে বিষয়ে জানিয়ে দিলাম। তিনি আমাকে জানিয়ে দিলেন যে, সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথেই তোমার ইদ্দত পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। তিনি আমাকে আরো নির্দেশ দিলেন যে, আমি ইচ্ছে করলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি। ইবনে শিহার রহ. বলেন, সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই প্রসূতির জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে আমি দূষণীয় মনে করিনা, যদিও সে তখন নিফাসের ইদ্দত পালনরত থাকে। তবে নিফাস থেকে পবিত্র হওয়ার পূর্বেই স্বামী যেন স্ত্রীর সাথে সহবাস না করে।
এই হাদিসেও আমরা দেখতে পাই সুবাইয়া সন্তান প্রসবের পর অন্যত্র বিয়ে বসার জন্য নিজকে সাজ সজ্জিত করে রেখেছিলেন, এবং আবু আল সালসাবিল রাঃ তাকে চিনতে পেরেছিলেন বলেই তিনি সাজসজ্জা করতে নিষেধ করেছিলেন। এখানে স্পষ্ট যে সুবাইয়া রাঃ তিনি মুখ ঢেকে ছিলেন না। কারণ মুখ ঢাকা থাকলে আবু আল সালসাবিল রাঃ তাকে চিনতে পারার কথা নয়।
এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে রাসুল সাঃ জামানায় মেয়েরা মুখে কাপড় দিয়ে পর্দা করতেন না।

দলিল নং ১১
হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আম্মার বিন ইয়াসের, এক লোক রাস্তা দিয়ে চলার পথে একজন মহিলাকে দেখতে পায়, মহিলাটির রূপ থাকে এমন অভিভূত করেছিল যে, সে মহিলার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চলার কারণে পার্শ্ববর্তী দেয়ালের সাথে ধাক্কা খায়, সে ধাক্কার কারণে শরীরে কঠিন ভাবে আঘাত প্রাপ্ত হয় যার ফলে তার আঘাত প্রাপ্ত স্থান থেকে রক্তপাত হয়েছিলো। লোকটি রাসুল সাঃ কাছে আসে এবং সকল বৃত্তান্ত বর্ণনা করে। তখন রাসুল সাঃ তাকে জানান যে, কোন কোন বান্দার দুনিয়ার অপরাধের জন্য আল্লাহ দুনিয়াতে শাস্তি দিয়ে থাকেন যাতে করে সে পরকালের শাস্তি থেকে মুক্তি পায়। আর কাউকে দুনিয়ার অপরাধের শাস্তি না দিয়ে অবকাশ দেন যাতে করে আখিরাতে পাপের যোগ্য শাস্তি পায়।
এই হাদিসেও দেখুন রাস্তার চলা মহিলার যদি মুখ ঢাকা থাকতো তাহলে এই লোকটি মহিলাটির সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়তোনা এবং দুর্ঘটনার শিকার হতে হতোনা। এই হাদিসেও প্রমাণ করে রাসুল সাঃ জামানায় সাধারণ মহিলারা মুখ ঢেকে চলা ফেরা করতেন না।

দলিল নং ১২
إِذَا خَطَبَأَحَدُكُمُ امْرَأَةً فَلاَ جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَّنْظُرَ إِلَيْهَا إِذَا كَانَإِنَّمَا يَنْظُرُ إِلَيْهَا لِخِطْبَتِهِ وَإِنْ كَانَتْ لاَ تَعْلَمُ-
‘যখন তোমাদের কেউ কোন মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিবে, তখন তাকে দেখাতে কোন গুনাহ হবে না। তবে কেবল বিয়ে করার উদ্দেশ্যেই দেখতে হবে, যদিও মেয়ে জানতে না পারে।
মুসনাদ আহমাদ হা/২৩৬৫০-৫১; সিলসিলা সহীহাহ হা/৯৭।
পাত্র কেমন করে পাত্রীর মুখ দেখতে পারে? যদি না পাত্রীর মুখ খোলা না থাকে। এখানে মুখ দেখার উদ্দেশ্য কি? সৌন্দর্য না পরিচয়? সৌন্দর্যের চেয়ে পরিচয় ই প্রধান হবে।
ইসলাম মানুষের পরিচয় গোপন রাখতে নিষেধ করে। পালক সন্তানকে তাঁর আসল বাবার নামে পরিচিত করতে হয়, নারীকে তাঁর স্বামীর উপনাম গ্রহণ না করে পৈতৃক নাম ব্যবহার করতে হুকুম দান করে। সে প্রেক্ষিতে ইসলাম নারীকে নিকাবের আড়ালে তার পরিচয় গোপন করতে কেমন করে আদেশ দিতে পারে?
ইসলামের ইতিহাস পরিষ্কার জানাচ্ছে যে মুহাম্মদ সাঃ জীবনকালে যেমন নারীদের স্বাধীনতা খর্ব করেননি, তেমন তাদেরকে অন্তঃপুরবাসিনী করে রাখেননি। তখন নারীরা যেমন মসজিদে প্রবেশ করতে পারতো, ঈদের দিনে ঈদগাহতে সমবেত হতে পারতো, যুদ্ধেও পুরুষের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারতো।

উপরের তামাম পর্যালোচনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসুল সাঃ এবং খেলাফয়ে রাশিদুনের আমলে নারীরা চেহারা খুলে বাইরে বের হতেন। চেহারা খুলে নারীদের বাইরে বের হওয়া পরবর্তী জামানার মুসলমানদের ঐক্যমত্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো, বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবার আশংকা থাকলে।

হিযাব নিয়ে আল কোরানের যে সকল আয়াত নাজিল হয়েছে সেই সব থেকে যে নির্দেশনা পাওয়া যায় তা হচ্ছে-

১। পুরুষ, নারী উভয়কে তাদের তাদের বিপরীত লিঙ্গএর প্রতি দৃষ্টিপাত না করা এবং একান্ত প্রয়োজন পড়লে দৃষ্টি নিচু করে রেখে কথা বলা।

২। তাদের উভয়ের বিশেষ অঙ্গকে বিপরীত লিঙ্গের দৃষ্টি থেকে সুরক্ষিত করে রাখা।

৩। এমনিতে যে সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়ে যায় সে সৌন্দর্য ছাড়া নারী তাঁর দৈহিক সৌন্দর্য এবং অলংকারাদির সৌন্দর্যকে প্রদর্শন না করা।

৪। মাথার উড়নি দিয়ে চুল, কান, গলা বুক ঢেকে রাখা।

উপরের ৪টি নির্দেশনা থেকে যে মৌলিক সারমর্ম পাওয়া যায় তাহচ্ছে-

১। পুরুষ এবং নারী উভয় তাদের মন, চক্ষু,জবান এবং দেহকে নিয়ন্ত্রণে রাখার।

২। নারীদের এমন পরিবেশে অবস্থান নিতে এবং পুরুষদেরকে সে পরিবেশে অবস্থান না নিতে নির্দেশ দেয় যেখানে নারীর হিযাব করা প্রয়োজন না পড়ে।

৩। নারী যদি প্রয়োজনে বাইরে বের হয় তখন সে এমন পোশাক পরিধান করে যাবে তাতে তাঁকে যেন শালীন এবং শোভন দেখায়।

পরিশেষে বলব, কোন নারী যদি মনে করেন, কিংবা তার পরিবার পিতা মাতা গুরুজন মনে করেন যে, এই নারী মুখ খোলা রেখে বাইরে চলাচল করলে নারীটি বিড়ম্বনায় পড়তে পারেন বা ফিতনা সৃষ্টি আশংকা থাকলে নারী তার মূখ ঢেকে বাইরে চলাচল করতে পারবে। বাস্তব পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়েই আইন কানুন করতে হয়। তবে নির্দৃষ্ট কারণ এবং নারীর ইচ্ছা ছাড়া মুখ ঢাকাকে বাধ্যতামূলক করা যাবেনা।

[বিঃদ্রঃ এই নোটে বেশীরভাগ তথ্য আমি বর্তমান যুগের প্রখ্যাত আলেম জনাব ড. ইউসুফ আল কারযাভী সাহেবের ভিন্ন লেখা থেকে সংগ্রহ করেছি।]

***লিখাটি লেখকের ফেইসবুকে পূর্ব প্রকাশিত হয়েছে । ***

 

392 জন পড়েছেন

মুনিম সিদ্দিকী

About মুনিম সিদ্দিকী

ব্লগে দেখছি অন্য সহ ব্লগাররা তাদের আত্মপরিচয় তুলে ধরেছেন নিজ নিজ ব্লগে! কুঁজো লোকের যেমন চিৎ হয়ে শোয়ার ইচ্ছা জাগে তেমন করে আমারও ইচ্ছা জাগে আমি আমার আত্মপরিচয় তুলে ধরি! কিন্তু সত্য যে কথা তা হচ্ছে শুধু জন্মদাতা পিতা কর্তৃক আমার নাম আর পরিবারের পদবী ছাড়া আমার পরিচয় দেবার মত কিছু নেই! আমি এক বন্ধ্যা মাটি যেখানে কোন চাষবাস হয় নাই। যাক আমি একটি গান শুনিয়ে আত্মপ্রতারণা বর্ণনা শেষ করছি-
কত শহর বন্দরও পেরিয়ে চলেছি অজানা পথে – কালেরও নিঠুর টানে- আমার চলার শেষ কোন সাগরে তা তো জানা নাই! ধন্যবাদ।

Comments are closed.