বায়াজীদ পন্নীর দলটি সঠিক পথে নয়

1997 জন পড়েছেন

20170114 bayazid ponni

প্রাথমিক কথা

বাংলাদেশে হেজবুত তাওহীদ নামে একটি নতুন দল মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী নামক এক ব্যক্তি শুরু করেছেন। ধর্মজ্ঞান নেহায়েত কম থাকলেও তার দাবী তিনি সরাসরি আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত এই জামানার “এমাম”। এটা নাকি আল্লাহ মোজেজার মাধ্যমে তাকে জানিয়ে দিয়েছেন! এই বিশ্ব মুসলিমের আকিদা অনুযায়ী মো’জেজা কেবল নবী-রাসূলদের ক্ষেত্রেই ঘটে। সুতরাং আখেরি নবীর পরে যখন আর কোন নবী-রাসূল নেই তাই এই মো’জেজার মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিমের ইমামতির দাবী সর্বতই একটি মিথ্যা কথা।

ধর্মীয় অভিজ্ঞতা (religious experience) এক বড় ব্যাপার। এই অভিজ্ঞতার কিছু কিছু বিষয় কারো কারো কাছে হয়ত নতুন রূপে দেখা দিতে পারে। কারো ব্যাপারে যদি এমনটি  হয়ে গিয়ে থাকে এবং যদি তার পর্যাপ্ত ধর্মজ্ঞানও থাকে তবে তিনি  সেই দেখাকে ধর্মীয় গৃহীত ভাষায় ব্যক্ত করতে পারেন। কিন্তু ধর্মজ্ঞানের অভাবে তা ফিতনায় পর্যবশিত হতে পারে।

কেউ যদি দাবী করেন যে আল্লাহ তার সাথে সরাসরি কথা বলেছেন, বা যোগাযোগ করেছেন এবং এই বিষয়টি তার ব্যক্তি সীমা অতিক্রম করে অন্যের আমলের বিষয় হয়ে গিয়েছে, তাহলে তিনি নবুয়ত ‘দাবী’ করেন অথবা না’ই করেন, এতে ‘নবুয়ত’ এসে গিয়েছে। ঠিক এভাবে মো’জেজার দাবীতেও।

কেউ তার নতুন ধর্মীয় চিন্তাকে প্রতিষ্ঠিত ধর্মের ব্যানারে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করলেও সেটা হয়ে উঠার মত নয়। তিনি যদি বলেন যে আমি নবী এবং মুহাম্মদের (সা) ধর্মের ‘পতাকায়’, তাকে মেনে এবং কোরানকে মেনে, যেমন কাদিয়ানীরা করে, তাতেও কাজ হবে না। পন্নী সাহেবের ব্যাপারটি হয়েছে এমন। তার এতটুকু ধর্মীয় জ্ঞান ছিল না যে মো’জেজার দাবী করার পর এই ধর্মে তার স্থান থাকবে না -তা বুঝার। (তবে তার ফিতনার সাথে বিদেশিদের সরাসরি হাত রয়েছে বলে নিচের ভিডিওতে ধারণা পাওয়া যায়)।

পন্নী সাহেব একটি নতুন ফিরকা বা দল তৈরি করার সাথে সাথে ‘মুসলমানের মধ্যে অনেক ফিরকা রয়েছে’ -এই  অভিযোগ তুলেছেন। এটাই বিড়ম্বনা (irony)। প্রতিষ্ঠিত পীর প্রথায় যেখানে আল্লাহর তরফ থেকে ‘ইলহাম’ দাবী করা হয় যা ধর্মে গৃহীত, তিনি সেই প্রথার বিপক্ষ নিয়েছেন অথচ তিনি নিজেই মো’জেজার দাবীদার! ঘটনা আরও জটিল যেখানে তার দাবী তিনি এই জামানার ‘ইমাম’। তার অনুসরণ এখন সকলের জন্য ওয়াজিব। তার অনুগমনেই ঐক্য আসতে পারে। অর্থাৎ তার ফিরকাকে বড় ফিরকায় পরিণত করতে পারলেই শান্তি, ঐক্য, ইসলাম ইত্যাদি। কেননা তিনি মো’জেজায় প্রাপ্ত, সরাসরি আল্লাহ নির্বাচিত ইমাম! ঘটনা এখানেও শেষ নয়।

পন্নী সাহেবের, বা বর্ধিত অর্থে, তার দলের দাবী বিশ্ব মুসলিম এখন ‘বিকৃত’ ইসলামের অনুসারী, তারা ‘পথভ্রষ্ট’ এবং কেবল তার ইমামত-সম্বলিত নতুন ফিরকাটিই ‘সত্য এছলাম’। তিনি একখানা ‘কেতাব’ রচনা করেছেন। শিরোনাম: ‘এই এছলাম সেই এছলাম নয়’। এখন ঘটনা কী ঘটছে তা যে কেউই সহজে আঁচ করতে পারেন। (পন্নী সাহেব নাকি ‘ইসলামের’ পরিবর্তে ‘এছলাম’ বানানকে সঠিক মনে করতেন তাই এখানে ‘ছ’ দিয়ে “সত্য এছলামের” রঙটা আনা হচ্ছে। কেননা এটাও এই ফিরকায় এক নতুন মাত্রা সংযোগ করে)।

এই এছলাম সেই এছলাম নয়

মুক্তমনার প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়ের ‘বিশ্বাসের ভায়ারাস’ নামের একটি কৌশল ছিল। কোথাও কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনায় কোনো মুসলিম জড়িত পাওয়া গেলেই ‘বিশ্বাসের ভায়ারাস’ প্রমাণিত হয়েছে বলে ব্লগ লিখে থাকতেন। পন্নী সাহবের ছেলেপুলেরা অভিজিৎ রায়ের মত মুসলিম অধ্যুষিত বা মুসলিম দেশে কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনায় ‘মুসলিম সংযোগ’ পেলেই ‘এই এছলাম সেই এছলাম নয়’ প্রমাণিত বলে শোরগোল তুলেন। অমুসলমানদের মত তারাও বিশ্বের আধুনিক ‘সন্ত্রাস’ ও ‘জঙ্গিবাদ’কে এই ধাঁচে মুসলিমদের উপর প্রক্ষেপণ করেন।

কেউ যদি ইসলাম ধর্মের নামে সন্ত্রাস করে তবে এর জন্য গোটা বিশ্ব মুসলিম দায়ী হয়ে পড়ে না।  এজন্য এই জাতির “এছলাম” ভ্রষ্ট হয়ে যায় না। এটা এমন ব্যাখ্যার বিষয় নয়। যদিও মুসলিম বিশ্ব নানান জটিল শক্তির যাতাকলে কাল অতিক্রম করছে যে বাস্তবতা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেবার মত নয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা সন্ত্রাসকে জোরালোভাবে অস্বীকার ও তিরস্কার করেছে। এর বিপক্ষে কথা বলেছে, লেখালেখি করেছে, দমনের চেষ্টা করেছে।  মুসলিম রাষ্ট্র প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহার করেছে। দোষীদের ধরতে পেলে শাস্তির বিধান করেছে। তবুও বুঝি “এই এছলাম সেই এছলাম নয়”? এরা সন্ত্রাসী?

সদালাপ

পন্নী সাহেবের কিছু যুবক সদালাপে লেখালেখি করেন। গত দেড় বছর আগে এই দলের একজনের লেখার প্রেক্ষিতে একটি মন্তব্য-ব্লগ লিখেছিলাম। শিরোনাম ছিল, ‘হেজবুত তাওহীদ ও নন-পলিটিক্যাল খিলাফত’। ইদানীং পন্নী সাহেবের আরেকজন ‘অত্যুৎসাহী’ লেখক মুসলমানদেরকে জঙ্গি-সন্ত্রাসী বক্তব্যের আওতাভুক্ত করে পন্নী সাহেবের মোজেজা হাজির করেছেন। তার দৃষ্টিতে, বিকৃত ইসলামের অনুসারীদের শ্রম ও মেধার ব্যবহারের মাধ্যমে, অমুসলমানদের মুসলমান করার কাজ বৃথা। কেন এটা বৃথা, এটা দেখাতেই “ইসলাম গ্রহণের খবরে যারা খুশিতে বাকবাকুম হন” -এই শিরনামে একটি ব্লগ ছেপেছেন।

প্রথমে “আমরা” শব্দের ব্যবহার দেখি। “আমরা” (মুসলমানরা) পন্নী সাহেবের ফিরকায় নেই এবং পন্নী সাহেবের দৃষ্টিতে আমরা ‘বিকৃত’ ইসলামের লোক। আমরা তাকে, আমাদের ধর্মীয় দৃষ্টিতে, তার দাবী সত্য মনে করি না, সুতরাং পন্নী সাহেবের লোকজন আমাদের সবাইকে তাদের দলের মনে করে সকলে সংযুক্ত করে “আমরা” সর্বনাম ব্যবহার করা ঠিক মনে হয় না। “আমরা” দুধে ধোয়া হই, অথবা তুলসী পাতা, সেটা আমাদের ব্যাপার। সুতরাং এই এছলাম সেই এছলাম নয় –এই কৌশল এখানে না দেখালেই বরং ভাল।

এবারে আমরা ইসলাম গ্রহণের খবরে যারা খুশিতে বাকবাকুম হন  -এই ব্লগটি সম্পর্কে আলোচনা করতে যাই।

ইসলাম গ্রহণের খবরে যারা খুশিতে বাকবাকুম হন 

প্রথমে শিরোনাম থেকে শুরু করা যাক। তারপর ধারাবাহিকভাবে ‘এই এছলাম সেই এছলাম নয়’ এমন ধারায় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের সমন্বয় দেখা যাবে। তাপর ভিন্ন মতের কারণে অন্যদেরকে ‘খুন’ করার এলজাম দেয়া; তারপর, প্রকারান্তরে এই এছলামের লোক অমুসলমানদের তুলনায় দুনিয়ার দোযখে আছে; তারপর তারা ‘অন্যদের মুসলিম বানিয়ে যে ঢেকুর তুলছে তা অযৌক্তিক’; তারপর যারা দুনিয়ার দোযখের বাস্তবতায় আছে এবং ইঙ্গিতবাহিতায় তারা পরকাল না পাবার যুক্তি; এই সব কাজ ও ধারণা প্রচার করা আমাদের দৃষ্টিতে ভাল নয়।

আমরা কি এতে অপমানিত হই? ইসলাম অপমানিত হয়? না। তবে এমন প্রশ্ন যৌক্তিক মনে হয় না। আমাদের মতে ‘বাকবাকুম’ ব্লগের শিরোনামে গলদ রয়েছে। ধারণাতেও তাই। উপস্থাপনা ও যুক্তির প্রয়োগেও তাই।

বাকবাকুম তারপর

“ইসলাম গ্রহণের খবরে যারা খুশিতে বাকবাকুম হন” আমিও তাদের একজন এবং আমার ধারণায় এই বিশ্বের মুসলমানরাও বাকবাকুম হন। কেননা মুসলিম সংখ্যা বৃদ্ধিতে তাদের খুশির বিষয় রয়েছে। সুতরাং এই লেখাটি পন্নী সাহেবের দলের কোন আত্মসমালোচনা নয় বরং অমুসলিমরা বৃহত্তর মুসলিম ধারায় ধর্মান্তরিত হওয়াতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ।

লেখকের অন্যান্য লেখাতেও পন্নী-ধর্মের প্রচারের কৌশল দেখে থাকি কিন্তু ব্লগে যার যার কথা বলবে সেই বিবেচনায় কিছু বলতে যাই না। এখন প্রয়োজনে বলছি। কোনো কোনো উদ্ধৃতির পাশেই স্কয়ার বন্ধনীর ভিতরে আমার মন্তব্যও থাকবে।
শিরোনাম অতিক্রম করে গোটা লেখাটাতেই আমাদের দৃষ্টিতে অনেক কিছু আপত্তিকর রয়েছে।

এখন কি ইসলাম গ্রহণ স্থগিত হতে হবে? এর মূল্য নেই?

লেখাটিতে প্রথমেই নতুন মুসলমান হওয়ার বিপক্ষে যুক্তি এসেছে। কারণ নাকি এতে সম্মান, প্রতিপত্তি বাড়ছে না, মানব জাতীর কোন লাভ হচ্ছে না। বরং “সংখ্যার সাথে সাথে কেবল একটা জিনিসই বাড়ছে- সেটা হচ্ছে মুসলিমদের প্রতি নির্যাতন, নিপীড়ন, লাঞ্ছনা আর অপমানের মাত্রা।” এই ধরণের কথাবার্তা সঠিক নয়।

সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে ‘নিপীড়নের মাত্রা’ বৃদ্ধি হয় কীভাবে? এর উপর কী কোনো জরিপ ও গবেষণা রয়েছে? থাকলে সেই সমন্বয় কীভাবে হয়েছে? যদি নিপীড়ন বেড়েও থাকে তবে কি মুসলমান হওয়া বন্ধ হতে হবে?

তারপর বর্তমানে মুসলিমদের অবস্থা শক্তিশালী নয় তাই বাইরের কেউ মুসলমান হওয়ার মূল্য নেই –এমনটি কী অর্থবহ কথা? এমন ধরণের কথা কী “আমাদের” মুসলিম সমাজের কথা ও যুক্তি হতে পারে? যদি না হয় তাহলে এটা কোন মুসলমানের কথা? মুসলিম হওয়ার সাথে সম্মান, প্রতিপত্তি তথা দুনিয়ার সাফল্য কীভাবে প্রধান হয়?

দুনিয়ার উন্নতি না পেলে আখেরাত অশুদ্ধ হবে এমন যুক্তি সত্য নয়। আজ যারা ইসলাম গ্রহণ করছেন তাদের জীবন কি বরবাদ হয়ে যাচ্ছে? এই অভিযোগ তারা কী পন্নী সাহেবের কাছে করেছেন? আমাদের মনে হয় এটা পন্নী সাহেবের বিভ্রান্তির বিস্তার করতে বিশ্ব মুসলিমকে এমনভাবে দেখানো হচ্ছে।

এবারে কিছু উদ্ধৃতি দেখে নেয়া যাক: </em>

[এক] পৃথিবীর ৬৫০ কোটি অমুসলিম কি খুব অশান্তিতে আছে, আর ১৫০ কোটি মুসলমান জান্নাতের বাগানে অবস্থান করছে? যদি তা না হয়, যদি দেখা যায় বাস্তব অবস্থা তার ঠিক উল্টো [অমুসলিমরা জান্নাতে আর মুসলিমরা জাহান্নামে?] তাহলে আপনি এই যে এত সাধনা করে, অতুলনীয় মেধা খাটিয়ে অমুসলিমকে মুসলিম বানিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন- তার যৌক্তিকতা কোথায়? [অমুসলিমদেরকে জান্নাত থেকে জাহান্নামে আনা?]

[দুই] বর্তমান বিশ্বে আপনার ধর্মের দোহাই দিয়ে শুরু হওয়া সন্ত্রাসবাদ সারা পৃথিবীর মানুষকে যতটা আতঙ্কিত করে রেখেছে, আপনার ধর্ম সাম্রাজ্যবাদীদের যতটা পারপার্স সার্ভ করছে, অন্য ধর্ম কিন্তু তার কাছেধারেও নাই [ইসলাম ধর্মই এখানে সমস্যা, এই এছলাম সেই এছলাম নয়! সন্ত্রাস ভালই ব্যবহৃত হচ্ছে তাই না?] অন্য ধর্মের মানুষ তাদের নিজের ধর্মের মানুষকে কেবল ভিন্নমতের কারণে “খুন” করে বেহেশতে যাবার আশা করে না, কিন্তু আপনার ধর্মে সেটা ১৩০০ বছর ধরে চলে আসছে [১৩০০ বছর ধরে এই “খুন” করে আসছে? ভিন্নমতের কারণে? । অন্য ধর্মের মানুষ তাদের উপাসনলায়ে বোমা মারে না, আপনার ধর্মের মানুষ প্রায়ই মারে। এমন উদাহরণের শেষ নাই। [এই কাজ “বিকৃত ইসলামের” লোকেরা করছে –তাই না? এরা পন্নী সাহেবের ইমামতিতে দাখিল হলে আর কখনো অন্যের উপাসনালয়ে বোমা বিস্ফোরণ করবে না। ব্যাপারটা কী এমন? ]

[তিন] সবচেয়ে বড় কথাটি হচ্ছে- আজকে মুসলিম বিশ্ব বেশি শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে আছে নাকি পশ্চিমা বিশ্ব? নিশ্চয়ই পশ্চিমা বিশ্ব। তাহলে কেন তারা ইসলাম গ্রহণ করবে? [তা’ইত কথা। তারা কেন মুসলমান হবে? কিন্তু তারা তো  মুসলমান হচ্ছেই! আর এজন্যই তো এই ব্লগ লেখা -তাই না? এখানে যুক্তির অতিসার হয়েছে!  কিন্তু ব্যাপার অন্যত্র। তারা  ‘বিকৃত  এছলাম’ গ্রহণ করছে এজন্য পন্নীর চান্দুদের গায়ে জ্বালা !] আপনি বলবেন পারলৌকিক মুক্তির জন্য, তাই তো? [পারলৈকিক তো হতেই হবে, এটাই তো ইসলাম। এখানে পন্নী ধর্মের সমস্যা হবে কেন?] কিন্তু বিশ্বনবী তো বলেছেন, ‘দুনিয়া হলো আখেরাতের শস্যক্ষেত্র।’ [এজন্যই তারা মুসলমান হচ্ছে, আল্লাহর ইবাদত করছে, নেক আমল করছে, সওয়াব নিয়ে আখেরাতে যেতে। এটাই তো হাদিসের ভাষ্য -আখেরাতের শস্যক্ষেত্র, দুনিয়ার সাফল্য নয়] যারা দুনিয়াতে অশান্তিতে জ্বলছে, তাদের পরকাল কি শান্তিপূর্ণ হবার কথা? আপনার যুক্তিবিদ্যা কী বলে? [যুক্তিবিদ্যার অতিসার হয়েছে!]

অতি সহজেই লক্ষ্য করা যাবে যে এখানে পক্ষান্তরে পন্নি সাহেবের “এই এছলাম সেই এসলাম নয়” কায়দায় মুসলমানদেরকে আক্রমণ করে বিশ্ব মুসলিমকে আতঙ্কের কারণ দেখানো হয়েছে। তারপর অমুসলিম জগত শান্তিতে আছে আর মুসলিমরা অশান্তিতে –এমন অপরিপূর্ণ বালখিল্য দৃষ্টিভঙ্গি। তারপর দেখানো হয়েছে (‘এই এছলামধারীদের’) ইসলামের শান্তির দাবী মিথ্যা। অন্যান্য ধর্মের তুলনায় এই ধর্ম সন্ত্রাসবাদ সার্ভ করছে!! এখানে তাদের মূল কথা “এই এছলাম সেই এছলাম নয়”, এরা সন্ত্রাসী, বিশ্বের আতঙ্ক। এরা তাদের মেধা খাটিয়ে অমুসলিমকে মুসলিম বানিয়ে তৃপ্তির যে ঢেকুর তুলছে -তার যৌক্তিকতা নাই।        

পন্নী সাহেবের লোকেরা অন্যান্য ধর্মের তুলনায় বিশ্ব মুসলিমকে ‘খুনি’ হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন “অন্য ধর্মের মানুষ তাদের নিজের ধর্মের মানুষকে কেবল ভিন্নমতের কারণে খুন করে বেহেশতে যাবার আশা করে না” –এতে কোন সত্য প্রতিভাত হয়? –কেবল মুসলমানরাই তা করে। এমন কথা বলা কী ঠিক? এই ধর্মের মুসলমান? অধিকন্তু একটু সজাগ হলেই দেখা যাবে পন্নী সাহেবের সেই ফ্রেম, “এই এছলাম সেই এসলাম নয়”। এই এছলামের লোক ভিন্ন মতের কারণে অন্যদেরকে খুন করে বেহেস্তে যাবার আশা করে!!

এবারে আরেকটা উদ্ধৃতি নেয়া যাক:

ধরুন, এই মুহূর্তে আপনার কথায় মুগ্ধ হয়ে, ‘ইসলামই সেরা ধর্ম’ এর পক্ষে আপনার অকাট্য যুক্তি মেনে নিয়ে, আপনার দাওয়াত গ্রহণ করে দুনিয়ার আটশ’ কোটি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়ে গেল। তাতে মানবজাতি আসন্ন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ চলমান সমস্ত যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে মুক্তি পাবে কি? সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতার যখম শুকিয়ে যাবে কি? অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে কি? রাজনীতির নামে হানাহানি, রক্তারক্তি বন্ধ হবে কি? মুসলিম হবার কারণে স্বৈরশাসকরা গদি ছেড়ে সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে যাবে কি? মানবজাতি ঐক্যবদ্ধ হবে কি? আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও প্রযুক্তির অগ্রগতি বাধাহীনভাবে সামনে এগোতে পারবে কি? ধর্মব্যবসা বন্ধ হবে কি? রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ হবে কি? মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে ব্যবহার করে হুজুগ আর গুজবপ্রবণতা থেমে যাবে কি?

উপরে যুক্তি হাস্যকরভাবে কনফিউজড হয়েছে। এতে লেখকের যুক্তি সবল হয়ে এসেছে বলে মনে হয় না। ইসলাম গ্রহণ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, স্বৈরশাসন, সন্ত্রাস ইত্যাদির সকল কিছুকে শান্তির সাথে ঘুলিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এদের প্রত্যেকটি বিষয় আলাদা আলাদা এবং এগুলোর বিচার-বিবেচনা আপন আপন স্থানে। স্বৈরশাসন থাকলে কি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করবে না? ধর্মব্যবসা আছে বলে মুসলমান হতে পারবে না? পন্নী সাহেব ও তার ছেলেরা বিষয়টি না বুঝলে কী বাকীরা ইসলাম গ্রহণ করতে পারবে না? দেওয়ানবাগী আছে বলে ধর্মান্তর স্থগিত থাকতে হবে? নবীগণ কি প্রথমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে, ইসলামের শান্তি কায়েম করে, তবেই মানুষকে দ্বীনের দিকে আহবান করেছিলেন? পন্নী সাহেবের যুক্তিতে গোঁজামিল। তাদের দলীয় কথাবার্তা যৌক্তিক মনে হয় না। মানুষ ইসলাম গ্রহণ করবে এবং ধর্মব্যবসা দমনের ‘চেষ্টা’ও করবে। তারা ইসলাম গ্রহণ করবে এবং স্বৈরাচার পতনের চেষ্টাও করবে, এভাবেই গোটা তারতিব। আল্লাহ শুধু চেষ্টা করার কথাই বলেছেন। এর বাইরে কিছু নয়। পন্নী সাহেবের দল এপর্যন্ত কি করতে পেরেছেন?

আজ বিশ্বে মুসলমানদের মধ্যে দ্বিমত আছে, অনেক সমস্যা আছে। দ্বিমত ও সমস্যা জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সব জাতিতে এগুলো আছে এবং থাকবেও। এগুলোর মূল স্থান মানব প্রকৃতিকে স্পর্ষ করে আছে। মুসলিমগণ প্রয়োজনীয় ঐক্যের কথা বলছেন। কিন্তু এসবের কোনো ম্যাজিক সমাধান নেই। পন্নী সাহেবের বিশদগার বাদ দিলে তাদের হাতে কোন ম্যাজিক থিওরি রয়েছে যা মুসলিম সমাজের আলেমগণ এখনো বলতে পারেন নি, বা বুঝতে পারেন নি? পন্নী সাহেবকে “এমামুজ্জামান” মানলেই বুঝি কিল্লা ফতেহ?

এবারে ফাইল্যাল উদ্ধৃতি দিয়ে লেখাটি শেষ করি:

সুতরাং এই মুহূর্তে অমুসলিমকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করানোর দাওয়াতের চেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আল্লাহ-রসুলের প্রকৃত ইসলাম ও বর্তমানের বিকৃত ইসলামের মধ্যে বিভেদরেখা টেনে দেওয়া।

তাহলে এখন কাউকে আর মুসলমান করা যাবে না? এতে কোনো গুরুত্ব নেই? এখন তা স্থগিত হতে হবে? এটা কোথায় পাওয়া গেল? পন্নী সাহেবের সুন্নাহতে? এটা ভুল। পন্নী সাহেবের যুবক দল ইচ্ছা মাফিক বয়ান দিচ্ছেন। পন্নী সাহেবের নামাজটি পর্যন্ত শুদ্ধ নয়, আরবির উচ্চারণ শুদ্ধ নয়, নামাজ হয়ে পড়েছে মিলিটারি প্যারেড! তাও হাস্যকর দেখায়!

আজ ইসলামের প্রচার কাজ বদ্ধ করে “আসল এছলাম” বুঝা ও প্রতিষ্ঠা করার যে আহবান করা হচ্ছে সেই “এছলাম” কোনটি? তাদের কাছে এই স্পষ্টতা নেই। প্রশ্ন করলেই তারা “লিঙ্ক মারবেন”। কিন্তু লিঙ্কে কিছুই নেই। তাদের বক্তব্য জাতি নাকি “অভিভাবকত্ব” হারিয়েছে, তাই এখানেই বিভেদরেখা টানতে হবে, পন্নী সাহেবকে “এমামুজ্জামান” মানতে হবে, অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এই বড়িটা গলধকরণ হচ্ছে প্রথম পদক্ষেপ। তারপর? তারপর মিলিটারি প্যারেড, অশুদ্ধভাবে ‘আল্লাহু আকবাআআর’!

এমামুজ্জানকে বাদ দিয়ে ইসলাম নেই, ইসলাম গ্রহণও নেই। পন্নী সাহেবের দরজা দিয়ে ইসলামে প্রবেশ, অর্থাৎ তার প্রতিষ্ঠিত মোজেজায় প্রাপ্ত ইমামতি-ধারার অনুগমন -এই নতুন ধর্ম! এখানেই ফিরকা।

First published date 14/01/2017

Archived date 14/01/2014 

Facebook Comments

1997 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.