বিএনপিতে সবাই নেতা, কর্মীরই অভাব

677 জন পড়েছেন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর গানটির কথা অনেকেরই জানা— আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে। দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির চিত্রটাও যেন প্রায় অভিন্ন।

দেশের তিন মেয়াদের শাসক দল বিএনপিতে রাজা না থাকলেও আছেন অসংখ্য নেতা। অভাব শুধু কর্মীর। কর্মী সংকটে ভোগা বিএনপি কোনদিকে ধাবিত হচ্ছে তা নিয়ে উদ্বেগে আছেন তার সুহৃদরা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, দলে ক্লান্ত নেতার সংখ্যা বাড়লেও মাঠের কর্মী কমছে দ্রুত। যা নিয়ে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও হতাশ। বিষয়টি প্রথমবারের মতো প্রকট হয়ে অনেকেরই নজর কেড়েছে ক্যান্টনমেন্টের মইনুল হোসেন রোডের বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়ার দিন। সেদিন তিনি এতই আবেগপ্রবণ ছিলেন যে, ক্যামেরার সামনে জীবনে প্রথমবারের মতো মেকআপ ছাড়া এসেছিলেন। কিন্তু তার এই আবেগ ও কৌশল জাহাঙ্গীর গেটে দলের নেতা-কর্মীদের জড়ো করতে পরেনি বা পারেনি রাজপথে নামাতে। এরপর শাপলা চত্বরে হেফাজতের জমায়েতে উপস্থিত হওয়ার জন্য তার আহ্বানে ঢাকাবাসী তো দূরে কথা, নিজ দলের কর্মীদেরও সাড়া মেলেনি। এ বিষয়ে তার দলের কতিপয় নেতা-কর্মীর মন্তব্য হচ্ছে, নেত্রীকে ঘিরে থাকা বেঈমান, সরকার ও র-এর এজেন্ট গংদের জন্যই এ অবস্থা হচ্ছে। তাদের মতে, নেত্রীর গুলশান অফিস কাশিমবাজার কুঠির হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।এক সময়ের শাসকদল বিএনপি সাধারণত এক দাবিকেন্দ্রিক বক্তব্য এবং সীমান্তের বাইরের প্রত্যাশা নিয়েই থাকে। ভারতে কংগ্রেসের পরাজয় প্রত্যাশা এবং আমেরিকায় হিলারির বিজয়ের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে ছিল সামরিক শাসনের টেস্টটিউব বেবি দলটি। কিন্তু হিলারির বিজয়ের প্রত্যাশা ভূলুণ্ঠিত এবং ভারতের মুদি সরকারকেন্দ্রিক আশা দুরাশায় পরিণত হয়েছে বিএনপির জন্য। দলটি স্বপ্নবিলাসে ছিল, হিলারি ক্লিনটন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবেন; আর ড. ইউনূসের লবিং ব্যবহার করে হাসিনা সরকারকে এক ফুঁতকারে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে গদিতে আসীন হবে বিএনপি। এই ভরসায়ই হয়তো বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘আন্দোলন কি তা নভেম্বরে দেখানো হবে। ’ একই মেজাজে ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলে কি হয়, তা বলা যায় না!’ কিন্তু হিলারি বিজয়ী হতে না পারায় রবিঠাকুরের তাল গাছের মতো অবস্থা হয়েছে বিএনপির। এটি হচ্ছে বিদেশনির্ভরতার অন্যতম খেসারত।

বিদেশ ও কূটনীতিক নির্ভরতার বিষয়ে বার বার সীমা লঙ্ঘন করলেও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের ক্ষেত্রে বিএনপি চরম দৈন্যতার পরিচয় ২০১৩ সালের ৩ মার্চ বাংলাদেশ সফররত ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে পূর্ব নির্ধারিত সৌজন্য সাক্ষাৎ না করা। এ সিডিউল তিনি শেষ মুহূর্তে বাতিল করেন জামায়াত আহূত হরতালের দোহাই দিয়ে। বালখিল্য এ আচরণের বিষয়  বেগম খালেদা জিয়া প্রায় চার বছর মুখে কুলুপ এঁটে থাকার পর জবান খুললেন ৮ নভেম্বর বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তার বক্তব্য হচ্ছে, ‘ওই সময় বিশ্বস্ত সূত্রে আমাদের কাছে খবর আসে, আমি সাক্ষাৎ করতে গেলে আমাদের গাড়িবহরের ওপর হামলা চালিয়ে তার দায় জামায়াতের ওপর চাপানো হবে। প্রাণনাশের এই চক্রান্তের কথা জেনে আমি বাধ্য হয়ে সৌজন্য সাক্ষাতের কর্মসূচি বাতিলের অনুরোধ জানাই। ’

বেগম খালেদা জিয়ার এ বক্তব্য তাকে আবার করুণার পাত্রে পরিণত করেছে কূটনৈতিক এরিয়ায়। যার ধারাবাহিক আচরণ করেছেন তার দলের নেতারা সদ্য সমাপ্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। নির্বাচনের আগে তার দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য সাবেক মন্ত্রী প্রকাশ্য বক্তৃতায় ট্রাম্পকে পাগল বলেছেন। তার এ বলায় ট্রাম্পের কিছু যায় আসে না; তবে একটি দলের জ্ঞানের বহর আবার প্রকাশ পেল নগ্নভাবে। মার্কিন নির্বাচনের আগে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে ছিলেন হিলারি ক্লিনটনের বিজয়ের দিকে। কিন্তু নির্বাচনের ফল হলো উল্টা। ভারতের নির্বাচনের আগেও একই রকম প্রত্যাশায় ছিল বিএনপি। সেবার নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রত্যাশা পূরণ মিষ্টি বিতরণের বালখিল্য আচরণও করেছিল সামরিক শাসনের টেস্টটিউব বেবি বিএনপি। কিন্তু হতাশ হতে বেশি সময় লাগেনি দলটির। হতাশার এত প্রকট প্রকাশের বিষয়ে অনেকেই বলেন, ভারতের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সফরকালে বেগম খালেদা জিয়ার শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ দলটিকে বড় বেকায়দায় ফেলেছে। অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক সরকারের সূতিকাগারে জম্ম নেওয়া বিএনপি জনসম্পৃক্ত দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল— এটি মানতে হবে। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠাকে ফাউন্ডেশন মনে করে পরিচালিত হওয়াই হচ্ছে বিএনপির প্রধান ভুল। কারণ, এ দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেকটা শূন্যের ওপর। বিএনপি জনসম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড এবং এরই ধারাবাহিকতায় বর্বর জেলহত্যার সুযোগ ব্যবহার করে। সে সময় আওয়ামী লীগ ছিল বিপর্যস্ত এবং অনেকটাই কাণ্ডারিহীন নৌকার মতো। এ সুযোগে বিএনপি প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ লাভ করে। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিপর্যস্ত হলেও বিএনপি ক্ষমতায় আসে এরশাদ পতনের পর অনুষ্ঠিত ১৯৯১ সালের নির্বাচনে। নির্বাচনের এ ফলে পর্যবেক্ষকদের সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট হয়ে যায়। পরে অবশ্য প্রকাশ পায় সুপরিকল্পিত ইলেকশন মেকানিজমের বিষয়টি। এ ক্ষেত্রে নৌকা প্রতীকের পরই দেওয়া হয়েছিল নৌকা ধাঁচের জাহাজের প্রতীক। ফলে বড় নৌকা ভেবে অনেকেই সিল দিয়েছেন জাহাজ প্রতীকে। অনেক এলাকায় জাহাজ প্রতীকের প্রার্থী না থাকলেও ভোট পড়েছে অনেক। আরও অনেক ইলেকশন মেকানিজম হয়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানকারী প্রাচীনতম দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। এ দলের সঙ্গে খেলতে গিয়ে এরই মধ্যে গৃহপালিত হয়েছে সামরিক শাসনের টেস্টটিউব বেবি হিসেবে জন্ম নেওয়া আরেক রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি। জেনারেল এরশাদের এলোমেলো নেতৃত্বের কারণে জাতীয় পার্টি এখন যে অবস্থানে আছে তাতে দলটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেকেই মোটামুটি নিশ্চিত। কিন্তু বিএনপির ভবিষ্যৎ সাধারণভাবে স্পষ্ট না হলেও ভিতরের খবর খুবই হতাশাজনক। এ অবস্থাও সৃষ্টি হয়েছে নেতৃত্বের কারণে।

ফলে বিএনপির জনসমর্থনের পারদ আর উপরে তোলা যাচ্ছে না। মানুষের পছন্দ-অপছন্দ রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার মতো পরিশ্রমী ও যোগ্য নেতার সংখ্যা বিএনপিতে শুরু থেকেই কম। কারণ এ দলটি তৈরিই হয়েছিল সামরিক জান্তার উচ্ছিষ্ট ছড়িয়ে। আর নীড়হারা মেধাবী যেসব রাজনীতিক বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন তারাও ক্লান্ত হয়ে গেছেন অল্প ধকলেই। ফলে নেতা-কর্মীর আধিক্য থাকলেও জনসমর্থনকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে পারেনি বিএনপি। বরং রাজধানীর দুর্বিষহ যানজটের মতো নেতাজটের সৃষ্টি হয়েছে দলটিতে। নেতারা এখন দলের জন্য পরিণত হয়েছে বাড়তি মেদে। দলটির জন্য সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, নেতাদের গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেছে কর্মী-সমর্থকরা। আবার এ নেতারা চলেন নিজস্ব লাভ-ক্ষতির ইকোয়েশনে। ফলে দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশ মেনে চলা কর্মীর সংখ্যা খুবই কম। আর যেসব বুদ্ধিজীবী বুদ্ধি পরামর্শ দেওয়ার নামে মঞ্চের গ্লামার বৃদ্ধি করতেন তাদের মধ্যে লাল গোলাপের শফিক রেহমানসহ অনেকেই চুপসে গেছেন, আবার বেগম খালেদা জিয়াকে নসিয়ত করতে গিয়ে ড. জাফরুল্লাহ প্রকাশ্যে যা বলেন তাতে বিএনপির ক্ষতি হওয়া ছাড়া আর কিছু হয় বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের কাছে বাস্তব চিত্র আড়াল করে রেখে কথামালা উপস্থাপন করে নিজের অবস্থান ধরে রাখার প্রক্রিয়ায় প্রথম সারিতে এসেছেন অনেকে।

এরাই এখন দলের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এদের প্রভাবেই দলে জাতীয় পর্যায়ে সম্মানিত পরিচ্ছন্ন ইমেজের দূরদর্শী নেতাদের প্রভাব প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। এদিকে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অর্বাচীন অনেকেই হিরো হয়ে গেছেন। এরা দলের জন্য কাজ করছেন ভিলেন হিসেবে। সামগ্রিক বিবেচনায় বিএনপি এগোনোর পরিবর্তে কেবলই পিছাচ্ছে। এ ধারা দীর্ঘ সময় ধরে চলার কারণে বিপদ-বিপর্যয় মোকাবিলায় সাহসী নেতা-কর্মীর অভাব দেখা দিয়েছে বিএনপিতে। সাংগঠনিক তত্পরতা বলতে কর্মীদের মিছিল-সমাবেশে যোগদান আর নেতাদের বক্তৃতার আবর্তে সীমাবদ্ধ। এ ছাড়া এ দলে রাজনৈতিক দর্শন ও অনুশীলন নেই বললেই চলে, আর আন্দোলন-সংগ্রামের সফল ইতিহাস কেবল এরশাদ সরকারের নয় বছরকেন্দ্রিক। আর এর সঙ্গে ছিল আওয়ামী লীগ ও জামায়াত। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ বিপরীত মেরুতে আর জামায়াত ধুঁকছে জগদ্দল পাথরের চাপে— এ অবস্থায় বিএনপি অনেকটাই হয়ে পড়েছে ফানুসের মতো। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বকে প্রভাবিত করার অতীতের সব সীমা ছাড়িয়ে। নেতাদের পারস্পরিক অবিশ্বাস ও কোন্দল-গ্রুপিং দলকে ভিতর থেকে খুবলে খেয়ে খুবই দুর্বল করে ফেলেছে হাইকমান্ডের অলক্ষেই। এদিকে কাগজপত্রে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী বডি— স্থায়ী কমিটি অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। এ সুযোগে সাফল্য আত্মস্থ করা এবং ব্যর্থতার দায় না নিয়ে এর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ধারায় বিএনপি সঠিক পথের বিপরীতে হাঁটছে।   সব মিলিয়ে কিডনি বিকল মানুষের মতো অবস্থা হয়েছে বিএনপির।    লেখক : সাংবাদিক

পূর্ব প্রকাশিত – বাংলাদেশ প্রতিদিন 

677 জন পড়েছেন

Comments are closed.