এটা কোন বিচ্ছিন্ন যুদ্ধ হবে না

1938 জন পড়েছেন

যুদ্ধের দামামা

কাশ্মীরে ১৮ জন ভারতী সেনার মৃত্যুকে ঘিরে যুদ্ধধ্বনি যেন দ্রিম দ্রিম করছে। ভারত এই হত্যার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করলেও পাকিস্তান তা অস্বীকার করেছে। কিন্তু অভিযোগ ও অস্বীকৃতি, এমন কি এই হত্যাও আসল কথা নয়। কোন একটি যুদ্ধ এভাবেই হয়ে যায় না, এর পিছনে আরও অনেক কারণ থাকে। এই সত্য আবহমান কালের। কিন্তু এই যুদ্ধ নিছক ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ না হয়ে বৈশ্বিক উদ্দেশ্যে ও সূত্রে প্রোথিত থাকবে। তবে ভারতের আঞ্চলিক ও ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য তো থাকবেই।

এ পর্যন্ত হুমকি-ধমকি যে আকারে এসেছে ও আসছে তার রূপ এভাবে: ভারত থেকে বলা হয়েছে মাত্র ৫ মিনিটে গোটা পাকিস্তানকে মানচিত্র থেকে উড়িয়ে দেয়া হবে। এবং পাকিস্তান অনুরূপ কথা বলা থেকেও পিছিয়ে নেই। এপর্যন্ত যুদ্ধ ফেঁটে না পড়লেও, ইতিমধ্যে কিছু অস্ত্র ধারিতও হয়েছে। তারপর যুদ্ধ তো যুদ্ধই –তা গ্রামে হোক অথবা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে। এখানে আপন আপন কারণে পক্ষাপক্ষি হয়। জমিদারের রায়ত ও গোলাম-চামাররা তুক-তাক করে বেশি। যুদ্ধ বাঁধলে বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে থাকবে। এই মর্মে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত (সৈয়দ মুয়াজ্জম আলী) নাকি ভারতকে আশ্বস্ত করেছেন। তবে ওয়াইসি কাশ্মীরে ভারতের যুদ্ধংদেহী ভূমিকার নিন্দা জ্ঞাপন করেছে। সৌদি আরব নাকি পাকিস্তানের পক্ষে থাকবে, চীনও। চীন নাকি পাকিস্তানের বিপক্ষে যে কোন অপশক্তির আগ্রাসী আক্রমণ সহ্য করবে না। ভারত নাকি রাশিয়াকে সতর্ক করেছে। আবার নেপাল পাকিস্তানের পক্ষে লড়বে বলেছে। কথাগুলো এভাবে বলছি কেননা আজকাল সংবাদপত্রের সকল কথাবার্তা তেমন বিশ্বাস করি না। তবে স্থানীয় ও বৈশ্বিক বিবেচনায় যুদ্ধের সম্ভাবনাকে একদম নাচক করা যায় না। কেননা যায়োনবাদী উদ্দেশ্য মুসলিম দেশগুলো যেভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে সেই উদ্দেশ্যে কেবল আরব জগতেই থেমে থাকার কথা নয়, এটা পাক-ভারত উপমহাদেশেও ঘটার কথা।

যুদ্ধ ও তার অন্তর্নিহিত কারণ

তবে প্রত্যেক যুদ্ধের পিছনে এমনসব কারণ থেকে থাকে যেগুলো সর্বসাধারণের জানার বাইরে। এই বিশ্বের অনেক যুদ্ধের মূল সত্য ও তথ্য সাধারণ মানুষ জানেই না। স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকে যা লিখা হয়ে থাকে তা সাধারণত নাগরিকদেরকে একটি বিশেষ মানসিকতায় গড়ার প্রয়োজনে ও যুদ্ধ-বাঁধানো শ্রেণীর ন্যায্যতা দেখানোর প্রয়োজনে। কোন পক্ষ কখনও এমনভাবে ইতিহাস রচনা করে না যাতে তাদের নিজেদের ‘দোষ’ স্বীকৃত হয়ে পড়ে। অনেক যুদ্ধ এমন রয়েছে যেগুলো বুঝতে পাঠককে গভীর অধ্যয়নে যেতে হয় এবং সঠিক পটভূমির ল্যাজ আবিষ্কার না করে অধ্যয়ন কার্য চালালেও সেই মূল স্থানে যাওয়া যাবে না।

আধুনিক কালের কোন যুদ্ধই বিচ্ছিন্ন (isolated) নয়। তবে প্রাচীন কালের যুদ্ধেও আভ্যন্তরীণ ও পার্শ্ববর্তী স্বার্থ ও উপকরণ জড়িত থাকত। আধিপত্যবাদ সবদিনই যুদ্ধের প্রাণকেন্দ্রে অথবা আশেপাশে থাকত।

আধিপত্যবাদী আমেরিকার কারসাজিপূর্ণ অর্থ-ব্যবস্থার মুখোশ এখন অনেকটা উন্মোচিত। অতীতের যেকোনো সময় থেকে এই বিষয়টি আমেরিকার সর্বসাধারণ অনেক বেশি বুঝতে পারছে, যদিও এই দেশের জনগণ বিশ্বের অপরাপর জনগোষ্ঠীর চাইতে বৈশ্বিক অবস্থা সম্পর্কে কম ওয়াকিবহাল কারণ তাদের জানার উপায় অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। অনেক দিন থেকে অনেকে ডলার পতনের আশংকা করে আসছেন। যদি দৈবাৎ ঘটে যায়, এবং অসংখ্যসূত্রে স্থাপিত বিষয়ে তা হতে পারে, তবে শুধু আমেরিকাই নয় গোটা বিশ্বে এর এমন প্রভাব পড়বে যে তা বৈশ্বিক সমাজকে উলটপালট করে দেবে। পাউন্ডের অবস্থাও ভাল নয়। ইউরোপ আমেরিকায় রাজনীতির উপর মানুষের আস্থা হারিয়ে গিয়েছে। অর্থনৈতিক অবস্থাও মন্দা। কিন্তু অর্থ-বিত্ত কেবল একটি ক্ষুদ্র শ্রেণীতে কুক্ষিগত হয়ে ফানুসের মত স্ফীত হচ্ছে। আমেরিকা ও চীন বৈশ্বিক বাজার ও প্রভাব নিয়ে এবং আমেরিকা ও রাশিয়া পারস্পারিক রেষারেষিতে অনেকটা শীতলভাবে মুখামুখি। তবে শীতল হলেও যুদ্ধের ময়দান এখন প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য।

প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর, যায়োনবাদীরা চরম এক ধ্বংসলীলা চালিয়ে তাদের নতুন বিশ্বব্যবস্থার (world order) কাজ কীভাবে সমাধা করবে এটাই অনেকের কাছে ভয়, দুশ্চিন্তা ও কৌতূহলের বিষয়। মুসলিম বিশ্ব যায়োনবাদের কর্তৃত্বে থাকলেও ইসলাম ধর্মে যেহেতু কোন সংস্কার আনতে পারছে না কারণ এই ধর্মের চাবিকাঠি কোন একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে নেই এবং একারণে মুসলিম সর্বসাধারণ, এমনকি, তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও একটি মহল ইউরোপীয় আধিপত্যবাদপূর্বের ইসলামী ধ্যান ধারণায় থেকেই যাচ্ছে, যা সন্ত্রাস নামের বৈশ্বিক কৌশলের পরেও সম্পূর্ণভাবে চূর্ণ করা সম্ভব হচ্ছে না বরং প্রাচীন ইসলামের একটি ধাঁচে যেন সেটা থেকেই যাচ্ছে। এই বিষয়টি ধনতন্ত্রের বৈশ্বিক অগ্রযাত্রায় আশ্বস্তিকর নয়। অন্যদিকে রাশিয়ান ক্যাথোলিক অর্থোডক্সি যায়োনবাদী আদর্শ মেনে নিতে পারছে না। এসব দিক থেকে যায়োনবাদী ধনতন্ত্র একটি বড় আকারের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে যাতে মানুষ অস্তিত্বের ভয়ে কাতর হবে, বেঁচে থাকার জন্য সহিংস সরকারের অপকৌশল জেনেও তাদের পিছনে থাকতে বাধ্য হবে, তাদেরকে যা শোনানো হবে তাই নতশিরে গ্রহণ করবে, দাসের আনুগত্যের মতই; হাসিমুখে, গুণগান গেয়ে।

যুদ্ধ অন্তর্দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেয়, গণমন মশগুল রাখে। প্রেসিডেন্ট বুশ, একজন ডাম্বো (dumbo) প্রকৃতির লোক হওয়া সত্ত্বেও, একটি প্রশ্নবিদ্ধ ও প্রতারণাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ‘জয়লাভ’ এর পরবর্তীতে ৯/১১ ও তারপর ইরাক-আফগান যুদ্ধ ঘটে গেলে বুশ ও তার সরকার ভীতি ও মিথ্যার বেসাতি করে দুই টার্ম পাশ করে দেয়। এখন বুশের চাইতে আরও ডাম্বো (dumbo) ডনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হলে বহির্বিশ্বে একটা কিছু ঘটে যাওয়াই স্বাভাবিক। তবে হিলারি ক্লিনটন বিজয়লাভ করলেও উল্লেখিত সম্ভাবনাময়ী বাস্তবতায় কোন পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। কোন এক ব্যক্তি ও তার আশে পাশের কিছু লোক দিয়ে রাজনীতির বিচার-বিবেচনা খুব একটা সঠিক নয়। কেননা এদের মূল চালিকা শক্তি এদের পিছনেই থাকে। আমরা কি দেখতে ব্যর্থ হই যে আমেরিকার মত একটি পরাশক্তির নির্বাচন-প্রাক্কালে প্রত্যেক দলের প্রধানরা প্রকাশ্যে বার বার ইসরাইলের প্রতি তাদের “শর্তহীন” (unconditional) সমর্থন উল্লেখ করতে হয়! কী আশ্চর্য! এটা গণতন্ত্র? আন্তর্জাতিক ন্যায়নিষ্ঠ-শিষ্টাচার? নোয়াম চমস্কির ভাষায় এই গণতন্ত্রে যা আছে তা নিছক এ-টিম, বি-টিম ও সি-টিম –এরা মূলত একই টিম। ঘোড়-দৌড় কর্তৃপক্ষের নামানো তিনটি ঘোড়া মাত্র। যেকোনো একটি জিতলেই তাদের জিত।

কোন বিশেষ ক্রমিক আকারে না হলেও যায়োনবাদ ও ইউরোপীয় একটি চিত্র উপরে অঙ্কিত হয়েছে যেখানে যুদ্ধের একটি রেখা আঁচ করা যায়।

ভারতের যুদ্ধ

আজকের বিশ্বব্যবস্থা যেহেতু পরস্পর-সংযুক্তিতে অত্যন্ত জটিল (intricate) তাই এই নেটওয়ার্কের কোন সুতোয় টেনে কোন জাগায় ছিদ্রকরণ করা হবে সেটাই ৬ মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। তবে কোনো যুদ্ধ তা এই ভারত-উপমহাদেশে হোক অথবা মধ্যপ্রাচ্যে, সেখানে মূল সূত্র সেই বিশ্বব্যবস্থা, ইউরোপীয় নানান অনিশ্চয়তা, মানুষের দৃষ্টি ভীতির সূত্রে অন্যত্র স্থাপন, মুসলিম বিশ্বকে আমূল পরিবর্তন (ভৌগলিকভাবেও), ডলার-পাউন্ড ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকবে –এটাই স্বাভাবিক।
আমেরিকার যায়োনবাদী যুদ্ধংদেহী জীবন ব্যবস্থা

আমেরিকা শব্দ উচ্চারিত হলেই যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে যাবে। এই দেশ যুদ্ধের খনি। তার রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পূর্ণই যুদ্ধংদেহী। প্রতি বছর ৫৫ বিলিয়ন ডলার কেবল গোয়েন্দাগিরিতে ব্যয় হয়! এই কর্মে একটি নয়, দুটি নয়, পাঁচটি নয়, ৭টি নয় বরং ১৭টি গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে বলে টোম এঙ্গলহার্ট উল্লেখ করেন। চিন্তা করুন। এগুলো ঘিরে ডিপার্টম্যান্টস রয়েছে। লাখ লাখ লোক কাজ করছে। সকল দেশে তাদের গোয়েন্দা রয়েছে। আপন দেশসহ গোটা বিশ্ব জোড়ে ডেইটা সংগ্রহ, প্রোসেসিং, এনালিসিস, রিপোর্টিং, কমিউনিকেশন, নানান যুদ্ধের পরিকল্পনা: শীতল যুদ্ধ, গোপন যুদ্ধ, প্রোপাগান্ডা যুদ্ধ, আকাশ যুদ্ধ, মাটির যুদ্ধ, পানির যুদ্ধ, আভ্যন্তরীণ যুদ্ধ –সবকিছু মিলিয়ে যুদ্ধই হয়ে পড়েছে আমেরিকান জীবন পদ্ধতি। এই দেশের বৈদেশিক নীতি বলতে যা আছে তা মূলত যুদ্ধনীতি। এমনসব দেশের সার্বিক ব্যবস্থাকে “করপোরেট ওয়ার্ল্ড” নামেই পরিচিত যাদের বৈদেশিক নীতি চলে ব্যবসায়-স্বার্থে। এই উদ্দেশ্যে চালিত যুদ্ধে অন্য দেশের কত নারী পুরুষ, কত বৃদ্ধ, কত শিশু মারা গেল সেটা কোন ব্যাপার নয়, সেটার একটা পরিচ্ছন্ন পরিভাষা রয়েছে, ‘পার্শ্ববর্তী-ক্ষয়ক্ষতি’ (collateral damage)। এসব অমনি অমনি বলা কথা নয় –এগুলো ময়দানের বাস্তবতা। তাছাড়া আমেরিকার ভিতরে এমনসব সিভিল প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক ডিপার্টম্যান্ট রয়েছে যেখানে প্রাক্তন মিলিটারি প্রধানদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে (প্রাগুক্ত, টোম এঙ্গলহার্ট)। এই অবস্থা ইসরাইলেরও।

বিশ্ব ব্যাপী এই করুণ যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ লোকের প্রাণহানি হচ্ছে, মানুষ বিকলাঙ্গ হচ্ছে, ঘরবাড়ি ছাই হচ্ছে, নগর সভ্যতা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। এই যুদ্ধ ঘিরে আবার তাদের “সমাজ বিজ্ঞান” গড়ে উঠছে, তাদেরই ধারায়। ব্যক্তি ও সমাজ মনস্তত্ত্বের (individual and social psychologists) সংযোজন হচ্ছে। বলা যেতে পারে ইসরাইল-আমেরিকার অপর নামই যুদ্ধ। সত্যের বিপক্ষে যুদ্ধ করে ওরা সত্যকে মিথ্যা দেখাতে পারে। মানবজাতি এমন মিথ্যাচার এমন হারে কোন কালে দেখে নি। আজকের সংগঠিত সহিংসতা (organised violence) তথা যুদ্ধই তাদের রাজনীতি, ব্যবসা, উপার্জন! এখন থেকে আগামী অর্ধ-শতাব্দী, পূর্ণ-শতাব্দী যুদ্ধেরই পরিকল্পনা হচ্ছে। এদের হাতে জ্ঞান বিজ্ঞান ধ্বংস-লীলার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বৈশ্বিক যায়োনবাদ, ভারত ও হিন্দু ধর্ম

যায়োনবাদের জন্য ভারত একটি উর্বর স্থান। এটা এজন্য যে এই ভূখণ্ডের হিন্দু ধর্মে “সবকিছু” অন্তর্ভুক্ত: সমকামিতা, পশুকামিতা, নাস্তিক্যবাদ, এবং সর্বতোভাবে যায়োনবাদের প্রতি একনিষ্ঠতা। পূর্ব ইউরোপের ধর্মান্তরিত কাজারি (খাজারি) যায়োনিস্ট-আর্যদের প্রতিষ্ঠিত ইসরাইল রাষ্ট্র ও ভারতের আর্য-মিতালি এখন একত্রিত। ভারতের ব্যবসা, সামরিক প্রশিক্ষন, চুক্তি ও লেন-দেন, পারস্পারিক সহযোগিতা ইত্যাদির পরিমাণ বিবেচনা করলেই তা স্পষ্ট হবে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাঁধলে, আমেরিকা ভারতের সাথে সবদিক থেকেই থাকতে বাধ্য হবে। ইসরাইলের সাথে থাকার শর্তহীন অঙ্গিকারে নির্বাচিত কোন সরকার অন্য কিছু করতে পারবে না।

এদিক থেকে এই যুদ্ধ পর্যায়ক্রমিকভাবে-অগ্রসর-হওয়া যায়োনবাদী বিশ্বব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করণের সংশ্লিষ্টতায় চীন ও রাশিয়ার শক্তি ও বাণিজ্যিক তৎপরতা খর্বকরণের উদ্দেশ্যে প্রোথিত থাকতে পারে। আবার নানান জুজু ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও আফগানিস্তান ধ্বংসের পর এখন ভারতকে এই অঞ্চলের ইসরাইল বানিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে ইরাকিকরণ করার উদ্দেশ্যেও প্রোথিত হতে পারে।

সর্বোপরি, আজকের বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় ও রাজনীতিতে ভারত ইসরাইল, আমেরিকা ও ইউরোপের স্রোতধারায়। আবার ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ধনাঢ্য শ্রেণীর, বড় বড় কোটিপতি চোর-ডাকু সকলের প্রধান সঞ্চিত অঙ্ক ইউরোপ আমেরিকায়। বলা যেতে পারে যে হিসাবের দৃষ্টিতে ওরা সবাই একই সরাইখানার লোক। ধনতন্ত্রে ধর্ম, রাষ্ট্রসীমা ও গোত্র নেই, কেবল ধনই সার বস্তু। যায়োনবাদী ধনতন্ত্র বর্তমান বিশ্বকে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন করে আসছে এবং চূড়ান্ত রূপায়ন হয়ত বাকি।

যুদ্ধ –অনিশ্চয়তা ও নৈরাজ্য

যুদ্ধে সব সময় কিছু অনিশ্চয়তা থেকে যায়। পরিণতি একদম হিসাবের আওতায় থাকে না। এমনটি না হলে এই বিশ্বের ইতিহাস অন্যভাবে লিখা হত।

যুদ্ধ বেঁধে গেলে স্বাধীনতাকামীদের বিষয় নিয়ে ভারতের ভয় রয়েছে। পাকিস্তানেরও আছে। তবে পাকিস্তানের চেয়ে ভারতের দুশ্চিন্তা বেশি। স্বাধীনতাকামীরা আবার হাত-পা নাড়া-চাড়া করছে বলে সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। সত্য-মিথ্যা সঠিকভাবে নির্ণয় করা মুস্কিল। মোদীর প্রাথমিক বজ্র-গর্জন এখন নরম দেখা যাচ্ছে। তবে এটা যুদ্ধ কৌশলও হতে পারে। এদিকে ভারতের ৪০,০০০ সৈন্য নাকি ছুটি চেয়ে বসেছে। কিন্তু যুদ্ধ সামনে রেখে এমন কোন কথাই বাইরে থেকে মূল্যায়ন করা কঠিন।

তবে যুদ্ধ যদি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে, এবং হতেই তো পারে, আর পাকিস্তান যদি শক্ত হয়ে যুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় এবং ভারতের স্বাধীনতাকামীরা এই সুযোগে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয় তবে এই উপমহাদেশে শান্তির একটি সঠিক পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হতে পারে। কেননা এতে ভারতের একচ্ছত্র প্রভাব ভেঙ্গে পড়বে এবং আশে পাশের দেশগুলো নিজেদের অঞ্চলে প্রকৃত স্বাধীনতা অনুভব ও উপভোগ করার সুযোগ পাবে।

আবার সবকিছু উলটাও হতে পারে। বাংলাদেশেও বিশৃঙ্খল মূহুর্ত্তে অঘটন থতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভারত থেকে যা বলা হচ্ছে তা ভাল শোনাচ্ছে না। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকার বলেছেন যে লঙ্কা বিজয় করে রাম যেমন বিভীষণের হাতে অর্পণ করেছিলেন বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারত তাই করেছে। ভারত কারও ক্ষতি করতে চায় না কিন্তু কেউ ভারতের ক্ষতি করতে চাইলে তারা সমুচিত জবাব দেবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠা লক্ষ্য থেকে এখনো পিছপা হই নি। বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তান শ্রীলঙ্কা ও মায়ানমার মিলে আবারো মহাভারত প্রতিষ্ঠা করা হবে’ [লিঙ্ক]। বর্তমানের কথাবার্তায় জড়িত রাজনীতি, হুমকি-ধমকি ও সত্য-সঠিকতা যা’ই হোক, রামরাজ্যের ধারণার ঐতিহাসিকতা সত্য ও স্পষ্টতা সঠিকতায় নির্ণীত। এই যুদ্ধের সম্ভাব্য ফলশ্রুতিতে ভারতের একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রয়োগের স্বপ্ন পূরণের বিষয়টিও চলে আসতে পারে।

এক্ষেত্রে মোদীর একটি বক্তব্যও প্রণিধানযোগ্য, মোদীকে অনেকে হিন্দু তালিবানও ভাবেন। তিনি বলেছেন, ভারত আক্রান্ত হলে বাংলাদেশও আক্রান্ত হবে। এই কথাটিতে ‘লালটি’ রয়েছে। ঘটনা এমনও হতে পারে যে যুদ্ধ বেঁধে গেলে ভারতীরা বাংলাদেশের ভিতরে কোন একটি বিরাট অঘটন ঘটিয়ে দিতে পারে। তারপর, যারা বাংলাদেশের সত্যিকার স্বাধীনতার পক্ষের লোক, যারা ভারত-বান্ধব রাজনীতির নামে ভারতী আধিপত্যবাদের ব্যাপারে সচেতন, তাদের বিপক্ষে এই বলে প্রচারণা চালাতে পারে যে তারা পাকিস্তানের পক্ষের লোক যারা এখন পাকিস্তান বানানোর জন্য অঘটন ঘটাচ্ছে, অস্ত্র ধারণ করছে। তারপর বিগত ৫/৬ বছর ব্যাপী চালিত হত্যা-নির্যাতনের পর, ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের মত বাছাই বাছাই করে অবশিষ্ট বিরোধী মতাদর্শের নেতাকর্মীদের নির্মূল করা হতে পারে। বিশেষ করে জামাত-বিএনপির নেতাদেরকে মিথ্যা অজুহাতে ক্রস-ফায়ারে ঠেলে দেয়া হতে পারে। “ভারতবান্ধব” রাজাকার শ্রেণীতে শ্লোগান উঠতে পারে, ‘একটা একটা পাকি ধর, (ধরে ধরে জবাই কর)’। এমনটিও আশ্চর্যের নয় যে জয় বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার নামে ভারতী সেনারা তাদের আপন পোশাকেই দেশের ভিতরে প্রবেশ করবে। অনেক রক্তের বন্যা বইবে। তারপর বাকীটুকু না হয় না’ই বলা হল। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি ভুল ছিল, দ্বিজাতিত্বের ধারণা ভুল ছিল এবং যা ভুল ছিল তা কেন সুযোগমত, ভিন্নভাবে হলেও, শুদ্ধ হতে পারবে না –এই যুক্তি বিশ্বাসীদের মাথায় তরঙ্গায়িত হতে বেশিক্ষণ লাগবে না। যদি শিক্ষা, আদর্শ ও ভ্রাতৃত্ব একই “সংস্কৃতি” থেকে উৎসারিত হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে তবে সেই ঐক্যে ও অভিলক্ষ্যে পৌঁছাতেও টেকনিক্যালি কোন বাঁধা থাকবে না। স্বাধীনতা ও পতাকা হায়দরাবাদেও ছিল, সিকিমেও ছিল। এসবের পিছনের আবেগ হয় ‘সৃষ্ট’, তাই পরিবর্তনের মাধ্যমে অন্য আবেগও সৃষ্টি করা যেতে পারে।
আমাদের দোয়া

শেষ কথা

তবে আমরা আশা করব এবং দোয়াও করব এই যুদ্ধ যেন পরিপূর্ণভাবে না বাঁধে, যেন উভয় পক্ষ একে অন্যকে হুমকি ধমকি দিয়ে ক্ষান্ত হয়ে যায়। যদিও এখানে সেখানে কিছু গোলাগুলি হচ্ছে –এটাও বন্ধ হোক। কেননা এই যুদ্ধ ফেঁটে পড়লে সকল ধর্ম ও বর্ণের লোকজন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অসংখ্য প্রাণনাশ হবে। ভারতের অনেক স্থানে মুসলিম নারী পুরুষের দশা হায়দরাবাদ, কাশ্মীর ও ভারতের অন্যান্য স্থানের মতই করুণ, অতি করুণ হতে পারে। তবে পূর্ণযুদ্ধ এবারে না হলেও, আমাদের ধারণা, ইসরাইল আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতিতে পরিবর্তন না আসলে, আগামী ১০/১৫ বছরের মধ্যে এই সম্ভাবনা আরও প্রকট হয়ে উঠবে। আমরা দোয়া করি আল্লাহ যেন সকল যুদ্ধ সরিয়ে রাখেন, প্রাণহানি ও ধ্বংস থেকে সবাইকে রক্ষা করেন –আমীন

Facebook Comments

1938 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক।

Comments are closed.