স্মার্ট কার্ডে কেন এ অবিশ্বাস?

1250 জন পড়েছেন

মি সরকার, প্রশাসন এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে অবিশ্বাস করতে শিখেছি। এইটা কোন পূর্ব ধারণা থেকে আসা আইডিওলজিকাল পজিশান নয়- এইটা প্রতি দিনের অভিজ্ঞতা এবং কমন সেন্স থেকে আসা ধারণা যা প্রতিদিন এরা পোক্ত করে। কারণ, এরা প্রতি দিন মিথ্যা কথা বলে, যেই গুলো এমনকি লুকোনোর কোন চেষ্টাও এরা করে না।
জাতির বিগত ১০ বছরে সব চেয়ে বড় সিকিউরিটি ইন্সিডেন্টের পরে, এরা আকাশ, বিকাশ, ডন, বাধন, রিপন জন্ম দিয়েছে। যারা সেই সব তথ্যের জন্ম দিয়েছে তাদের কোন বিচার হয় নাই, কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় নাই- তারা ক্ষমতার শীর্ষে বসে থেকে নিয়মিত টক শোতে যায় এবং জঙ্গিবাদ বা আইনের শাসন নিয়ে জ্ঞান দেয়।
ফলে তারা বায়োমেট্রিক স্মার্ট ন্যাশনাল আইডি কার্ডের নামে সারা দেশের সকল নাগরিকের বায়োমেট্রিক ডাটা সংগ্রহ করে, সেইটা কি কি কাজে ব্যবহার করবে তা নিয়ে যথেষ্ট দ্বিধা এবং সন্দেহ রয়ে যাচ্ছে।
বায়োমেট্রিক ডাটা সরকার নতুন করে সংগ্রহ করছেনা। ন্যাশনাল আইডি, মোবাইলের সিম রেজিস্ট্রেশান ,ডিজিটাল পাসপোর্ট সব কিছুতেই দেশের নাগরিকদের বায়োমেট্রিক ডাটা আগেই সংগ্রহ করা হয়েছে । কিন্ত, এইবারের স্মার্ট কার্ডে সরকার নতুন করে দশটা আঙ্গুলের প্রিন্ট এবং আইরিস স্ক্যান করে আইরিসের ব্লাড ভেসেল প্যাটার্ন সংগ্রহ করার যে প্রজেক্ট নিয়েছে তা জনগণের উপরে রাষ্ট্রের অভুতপুরব নজরদারি কায়েম করবে- যার ফলে অনেক ধরণের হুমকি নাগরিকের উপরে চেপে বসতে পারে। প্রতিটা নাগরিকের চোখের আইরিস স্ক্যান করে যেই তথ্যটা নির্বাচন কমিশন নিবে তা ব্যবহার করে সরকার-প্রশাসন-পুলিশ-র‍্যাব যে কোন রাস্তায় আপনাকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারবে, অথবা যে কোন স্থানে, কোন একটা বিশেষ ব্যক্তিকে আলাদা করে খুজে নিতে পারবে।
এমন ধরনের বিশেষ ক্যামেরা প্রযুক্তি এখন মার্কেটে আছে এবং প্রতি নিয়ত তাদের উন্নতি হচ্ছে। এই গুলো আর কোন সাইন্স ফিকশান টেকনলজি না। (লিঙ্ক এখানে)
এই ডাটা ব্যবহার করে এবং সিম ডাটার সাথে ক্রস চেক করে, কোন একটা সরকার বিরোধী মিছিলে কে কে আছে, তাদের বাসা কোথায়, তাদের ফোন নাম্বার কি সব কিছুই বের করতে পারবে সরকার। এবং তার পরে আপনার অজ্ঞাতে, আপনার ফোন ট্যাপ করে নিবে। এই গুলোকেই বিগ ডাটা বলে, যেইটা সরকার এতো দিন মিস করছিল। ফলে রামপালের মিছিলে কে কে যোগ দিয়েছেন তাদেরকে খুজে বের করা কোন বিষয় হবেনা। বিরোধী দলের মিছিল তো বলাই বাহুল্য।

মনে করেন, প্রথম আলোর অফিসের সামনে একটা ক্যামেরা বসিয়ে দিবে, সেইটা চেক করবে কে কে প্রথম আলোতে যায়। আমি চিন্তা করে কয়েকটা ব্যবহার বলেছি, কিন্ত, আপনাকে যে কোন স্থানে খুজে নেয়ার সক্ষমতাকে কি কি দুষ্ট বুদ্ধি দিয়ে আপনাকে হেনস্থা করার কাজে ব্যবহার করা হবে, সেইটা সব চিন্তা করে বলাও সম্ভব না। কিন্ত হবে। এই গুলো সন্ত্রাস দমন নামে জাস্টিফাই করা হলেও, ব্যবহার হবে, শত্রু নিধন এবং বিরোধী মত দমনের কাজেই। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেয়ার জন্যেও এই ডাটা ব্যবহার হতে পারে। এই গুলো হচ্ছে রিস্ক।

এই রিস্ক গুলো জাস্টিফাই করা হচ্ছে কিছু উপযোগিতার কথা বলে। বল হচ্ছে, বায়োমেট্রিক স্মার্ট ন্যাশনাল আইডি কার্ডে এমন সব সার্ভিস পাওয়া যাবে, যেইটা কাগজের আইডি কার্ডে পাওয়া যায়না। এইটা একটা মিথ্যা প্রচারনা।
কাগজের ন্যাশনাল আইডি এবং স্মার্ট বায়োমেট্রিক আইডির কাজ একই। নাগরিককে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করা।

আওয়ামী আন্দোলনের ফসল হওয়ার কারণে, তত্তাবধয়াকের আমলে, ন্যাশনাল আইডি কার্ডের ডাটাবেজটা যথেষ্ট প্রফেশনালিজমের সাথে করা হয়েছে এবং এইটাকে নিয়মিত আপডেট করা হয় যার পেছনে কয়েক হাজার কোটি টাকার ইনফ্রাস্ট্রাকচার গড়ে তোলা হয়েছে। এই ডাটাবেজটাকে মোটামুটি শুদ্ধ ধরা হয়। এই ন্যাশনাল আইডি আমরা এখন বিভিন্ন ধরণের সরকারী রেজিস্ট্রেশানে, ব্যাংকের একাউন্ট খোলা সহ অনেক কাজে ব্যবহার করি।
ন্যাশনাল আইডির এই প্রজেক্টে দেশের সকল নাগরিকের ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয়া আছে, যা নিয়মিত আপডেট করা হয়ে এবং পত্রিকার তথ্যমতে, কল্যান পুরের জঙ্গিদেরকে চিহ্নিত করতে এই ডাটা ব্যবহৃত হয়েছিল।
আমার পয়েন্ট হইলো, আইডেন্টিফিকেশানটা যেহেতু হয়ে গ্যাছে এবং কোটি কোটি টাকা খরচ করে সেই প্রজেক্টটা সাফল্যের সাথে করা হয়েছে এবং তাতে নতুন করে বায়োমেট্রিক ডাটা নেয়ার দরকার নাই। বর্তমান ডাটা ব্যবহার করেই নতুন স্মার্ট ন্যশনাল আইডি কার্ড প্রচলন করা সম্ভব।
কারণ, যেহেতু ইউনিক নাম্বার আছে এবং সেই খানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যান আছে, তাই চোখের আইরিস ডাটা নতুন করে না নিয়ে পুরাতন ডাটা দিয়েই নতুন একটা স্মার্ট কার্ড ইস্যু করা যায়।
পয়েন্টটা গুরুত্ব দেয়ার জন্যে আবার বলছি, সরকার চাইলেই এখন যে ডাটা আছে, সেইটার ভিত্তিতেই স্মার্ট কার্ড ইস্যু করতে পারে, আইরিস স্ক্যান করে নতুন বায়োমেট্রিক ডাটা সংগ্রহের প্রয়োজন নাই। জনগণের ফিঙ্গার প্রিন্টের ইউনিক বায়োমেট্রিক ডাটা ইতোমধ্যেই সরকারে কাছে আছে। সেইটা স্মার্ট কার্ডের জন্যে যথেষ্ট।
তাই এইটা পরিষ্কার একজিস্টিং ডাটা থাকা স্বত্বেও নতুন করে স্মার্ট কার্ডের নামে বায়োমেট্রিক তথ্য যোগ করা মূলত রাষ্ট্রের নজরদারি বাড়ানোর জন্যে মূলত ১৬ কোটি মানুষের রেটিনা প্যাটার্ন কালেক্ট করার একটা ধান্দা মাত্র।
এই খানে শুধু জনগণের উপরে নতুন চোখ বসানোই শুধু নয়, আরো উদ্দেশ্য আছে। সেইটা হইলো ব্যবসা।
অনেক মাস আগে, একটা অনুষ্ঠানে একজন বিষণ্ণ লোকের সাথে পরিচয় হয়েছিল, যে অসংলগ্ন ভাবে বলে যাচ্ছিল – বাংলাদেশের সকল গাড়ির ডিজিটাল নাম্বার প্লেট দেয়াতে কত হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে এবং সে কিভাবে কন্ট্রাক্টটা মিস করলো ।
সে ফার্স্ট হ্যান্ড রেফারেন্সে বলতেছিল, বাংলাদেশের সকল গাড়ি ডিজিটাল প্লেট করাতে আমাদের অনেক অনেক বেনেফিট হবে বলা হলেও, এই প্রজেক্টটা মূলত জনগণের কয়েক হাজার কোটি টাকা মেরে সরকারী কোষাগারে ঢোকানোর নামে কিছু কোম্পানির ব্যবসা করার ধান্দা মাত্র।
এবং চিন্তা করে দেখেন আসলেই তাই প্রতিটা গাড়ির নাম্বার প্লেট নতুন করে বসাতে কয়েক হাজার টাকা নেয়া হয়েছে, কিন্ত, সেইটা দুই বছরে কোন ভ্যালু এডিশান করে নাই। স্মার্ট কার্ডের আর একটা উদ্দেশ্যও তাই ।
এই খানে, প্রথম ধান্দা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের। তারা এই খানে ২০০ মিলিয়ন ডলার মানে, প্রায় ১৬০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। তারা ঋণ দিতে চায়, কারণ, ঋণ দিলে তাদের কর্মচারীদের বেতন বোনাস বাড়ে। তাই কোনটা উৎপাদনশিল খাত, কোনটা অনুৎপাদনশিল খাত সেইটা তাদের দেখার দরকার নাই। তাদের দরকার লোণ দেয়া।
প্লাস এই খানে কিছু ব্যবসায়ির ধান্দা আছে, যারা সরকারকে এই স্মার্ট কার্ড গুলো বেচবে । সারা দেশের ১৬ কোটি মানুষের ডাটা একটা ডিভিডির থেকে বেশী না হইলেও, এই প্রজেক্টের নামে নতুন করে বিশাল সার্ভার কেনা হবে, ডাটাবেজ বানানোর নামে কোটি কোটি টাকা মারা হবে – যেই গুলোকে ডাকা হবে ডাটা সেন্টার, যেন আপনি ভয় পান ভেবে কি না কি, বিশাল আইটি ইস্যু।
তারপরে এই প্রজেক্টের নামে সারা দেশে আইরিস ডাটা কালেক্ট করতে গিয়া আরো কিছু ভাই ব্রাদারদের কোম্পানি টেন্ডার কন্ট্রাক্ট পাবে।
এক দিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয় এবং দুর্নীতি- আরেক দিকে একটা অসৎ দুর্নীতি মগ্ন এবং অনির্বাচিত সরকারের পেটোয়া বাহিনীর নজদারির জন্যে আইরিস ডাটা সংগ্রহ- এই হচ্ছে, এই প্রজেক্টের মূল দুই ধান্দা।
বর্তমানে সংগৃহীত বায়োমেট্রিক ডাটা দিয়ে স্মার্ট কার্ড ইস্যু না করে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের লোণে ২০০ মিলিয়ন ডলার বা ১৬০০ কোটি টাকা খরচ করার উদ্দেশ্য এই দুইটাই।
দুইটা উদ্দেশ্যের মধ্যে কোনটা আপনার বেশী পছন্দ হয়েছে বেছে নিন। মনে রাখবেন, গণতন্ত্র নয়- উন্নয়ন।

পূর্ব প্রকিশিত: ফেইসবুক পোষ্টে

 

 

https://www.facebook.com/zia.hassan.rupu/posts/10153704796871504

1250 জন পড়েছেন

জিয়া হাসান

About জিয়া হাসান

লেখক: প্রাবন্ধিক। প্রকাশিত গ্রন্থ : শাহবাগ থেকে হেফাজত: রাজসাক্ষীর জবানবন্দি -

Comments are closed.