পাক-ভারত উত্তেজনা : সার্ক – কাশ্মির – বেলুচিস্তান

1129 জন পড়েছেন

মাসুমুর রহমান খলিলী

মাসুমুর রহমান খলিলী

কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামী এক যুব নেতার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে অব্যাহত উত্তেজনা প্রশমন না হতেই ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ রেখার ৬ কিলোমিটার ভেতরে উরি সেনানিবাসে সন্ত্রাসী ধরনের হামলায় ১৭ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার ঘটনার পর ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা নতুন রূপ নিয়েছে। এ ঘটনার পরপরই ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল অনেক বেশি তীব্র এবং সর্বাত্মক। ঘটনার সাথে সাথেই ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এ জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছে। পাকিস্তান অবশ্য বলেছে ভারতে কিছু ঘটলে এর তদন্ত না করেই পাকিস্তানকে দায়ী করা তাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। এ ঘটনার ব্যাপারে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভাষা যাই হোক না কেন, ঘটনার পরপরই এর নিন্দা জানিয়েছে বিশ্বের সব নেতৃস্থানীয় দেশ। এমনকি পাকিস্তানও এর নিন্দা জানিয়েছে। তবে একই সাথে কাশ্মির সঙ্কটের বিষয়টিও উল্লেখ করেছে ইসলামাবাদ।

পাকিস্তান ও ভারত মনস্তাত্ত্বিকভাবে পরস্পরের প্রতি বৈরী দুই প্রতিবেশী। এই বৈরিতা তাদের মধ্যে এমন অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করেছে যে, ইসলামাবাদ মনে করে, পাকিস্তানকে বিখণ্ডিত এমনকি অস্তিত্ব বিপন্ন করার জন্য তার বৃহৎ প্রতিবেশী সব সময় সক্রিয়। আর এটি ভারতের প্রধান স্থপতি জওয়াহের লাল নেহরুর চিন্তা-দর্শনের একটি অংশ, যেটি স্বল্প ব্যতিক্রম ছাড়া দেশটির সব সরকারপ্রধান বিশ্বাস করেন। অন্য দিকে, ভারতের অনেক শীর্ষ নেতাই মনে করেন, পাকিস্তান সব সময়ের জন্যই ভারতের অখণ্ডতা ও স্থিতির জন্য হুমকি। দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নতাবাদের পেছনে গোপন ইন্ধন রয়েছে পাকিস্তানের। বিশেষত কাশ্মিরে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা চলছে তার পেছনে সক্রিয় হাত রয়েছে ইসলামাবাদের। এ ক্ষেত্রে তাদের অঙ্গুলি নির্দেশ থাকে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মিরের মুজাহিদদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতি। ভারত সব সময় এসব সংগঠনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে এবং সে দেশে পরিচালিত বেশির ভাগ সন্ত্রাসী ধরনের ঘটনার পেছনে তাদের ভূমিকা রয়েছে বলে দাবি করে।

ভারত পাকিস্তান পরস্পরের প্রতি এই আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ বা একে অন্যকে ঘায়েল করার এই প্রক্রিয়া গত ৬ দশক ধরে চলে আসছে। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনার তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। পাকিস্তানের দিক থেকে একসময়ের দেশটির পূর্বাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশকে ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়গুলোকে দেশটির অনেকেই অস্বীকার করেন না, কিন্তু এসবকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ কাজে লাগিয়েছে বলে অনেক পাকিস্তানি নেতা বিশ্বাস করেন। এই বিশ্বাসকে বাস্তব হিসেবে প্রমাণ করতে অনেক তথ্য-উপাত্তও তুলে ধরা হয়। আর ভারতের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশকে স্বাধীন করার ব্যাপারে তাদের পূর্বাপর ভূমিকাকে অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই বিষয়টি পাকিস্তানি নেতাদের মন এবং মননে দেশটিকে বিখণ্ডিত করার ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সব সময় আতঙ্কিত করে রাখে।

আগামী নভেম্বরে পাকিস্তানে ষোড়শ সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মাত্র দেড় মাসের কম সময়ের মধ্যে এই সম্মেলন অনুষ্ঠানের পূর্বাপর যেসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, সেগুলো রুটিন অনুযায়ী হচ্ছে। কিন্তু কোনোটাই সেভাবে ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। এ সময়ে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে যেমন হরতাল কারফিউ সেনা ও পুলিশের গুলিতে শতাধিক কাশ্মিরির মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটছে, তেমনি বেলুচিস্তানের ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদির স্বাধীনতা দিবসের বক্তব্যও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এই বক্তব্যে তিনি বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতার প্রতি তার সহানুভূতি ও সমর্থনের কথা প্রত্যক্ষভাবে বিবৃত করেছেন। এর পরপরই উরির সেনানিবাসে বন্ধুকধারীদের গুলিতে ১৭ সেনা নিহত হওয়ার ঘটনা দৃশ্যত সেখানে লড়াইরত বিচ্ছিন্নতবাদী বা স্বাধীনতাকামীদের তৎপরতার অংশ হিসেবে দেখা স্বাভাবিক। ভারতের মিডিয়াতেও সেভাবে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সেখানকার সরকার এবং বিরোধী দলের বক্তব্যের সুরও অনেকটা সে রকম। কিন্তু পাকিস্তানি অনেক মিডিয়ার মূল্যায়নে এ ঘটনাকে বর্ণনা করা হচ্ছে ‘ফলস প্ল্যাগ অপারেশন’ হিসেবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গোপন তৎপরতার মাধ্যমে তাদের টার্গেট করা দেশের ওপর অভিযোগ চাপিয়ে দেয়ার জন্য ঘটনা ঘটিয়ে সেটিকে একটি নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত করতে চেষ্টা করে এ ধরনের অভিযানে। এসব ঘটনা এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে এটি যে দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়, সেই দেশের ইন্ধনেই সংঘটিত হয়েছে বলে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়। এর আগে পাঞ্জাবের শিয়ালকোট সেনানিবাসের হামলা এবং তাজমহল হোটেলের ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলাসহ একাধিক সন্ত্রাসী ঘটনার সাথে এ ধরনের যোগসূত্র রয়েছে বলে পাকিস্তানি মিডিয়ার বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে। এসব অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে কোনটি প্রকৃত পক্ষে সত্য সেটি নিরূপণ করার মতো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া বেশ কঠিন। তবে কিছু বিষয় অবলোকন করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, উরির এই সন্ত্রাসী ঘটনার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হতে পারে সুদূরপ্রসারী। এর সাথে তিনটি বিষয়ের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বাতিল করা। এ জন্য ইতোমধ্যে ভারতে নিযুক্ত আফগান রাষ্ট্রদূত প্রকাশ্যে বক্তব্য রেখেছেন। তিনি ভারত, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের সার্ক সম্মেলন বয়কট করার ডাক দিতে বলেছেন। তিনি উরির ঘটনার জন্য পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করেছেন। আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির বক্তব্যে তার রাষ্ট্রদূত আফগান সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই যে এটি করেছে তা স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও উরির ঘটনার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে যে বাণী দিয়েছেন, তার সুর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের নেয়া পদক্ষেপে পাশে থাকার ইঙ্গিত বলে পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন। এর আগে বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বেলুচিস্তানের ব্যাপারে মোদির রাখা বক্তব্যকে সমর্থন করে বাংলাদেশ শিগগিরই এ ব্যাপারে একটি নীতিবিবৃতি প্রকাশ করবে বলে উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের এই প্রকাশ্য অবস্থান অচিরেই বিবৃত হতে পারে। আর এরই মধ্যে ভারতের নিযুক্ত আফগান রাষ্ট্রদূত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে জোট গঠনের কথা বলছেন, সেটি একটি অবয়ব নিতে পারে। এই জোটে সার্কের সবচেয়ে দুর্বল দেশ হিসাবে খ্যাত ভুটানও যুক্ত হতে পারে। আর নেপাল মালদ্বীপ শ্রীলঙ্কা নিতে পারে নিরপেক্ষ অবস্থান। তবে সার্কের গঠনতন্ত্র অনুসারে কোনো একটি সদস্য দেশ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানালে সেবারের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় না। ফলে পাকিস্তানে নির্ধারিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠান যে একবারে অনিশ্চিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ক্ষেত্রে নয়া দিল্লি এবং এর সহযোগিরা উরির ঘটনাকে দিয়ে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে না পারার দায় পাকিস্তানের ওপর চাপানোর চেষ্টা করতে পারে। এ ব্যাপারে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পাকিস্তান যাই করার চেষ্টা করুক না কেন, ভারত পাকিস্তানে সার্ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত না হওয়ার ব্যাপারে কোনো অবস্থান নিয়ে থাকলে সেটি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে এই পদক্ষেপের সাথে অদূরভবিষ্যতে সার্ক সংস্থাটিই একটি অকার্যকর সংগঠনে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সেটি দিল্লি চাইছে কিনা এ মুহূর্তে সিদ্ধান্তে আসা মুশকিল। তবে সংশ্লিষ্ট অন্য দু’টি প্রসঙ্গ পর্যালোচনা করলে একটি ধারণা এ ব্যাপারে পাওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয় প্রসঙ্গটি হলো বেলুচিস্তান। উরির ঘটনার আগেই বেলুচিস্তান প্রসঙ্গকে আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে নিয়ে আসেন নরেন্দ্র মোদি দিল্লির লাল কেল্লা থেকে তার স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতায় প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে। বেলুচ ইস্যুটিকে সামনে নিয়ে আসার জন্যই কাশ্মিরে উত্তেজনা সৃষ্টির ফাঁদে পাকিস্তানকে ফেলা হয়েছে কিনা বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তবে কাশ্মিরের অনেক নেতার বক্তব্য এবং মিডিয়ার মূল্যায়নে বেলুচ ইস্যুটিকে একটি সুদূরপ্রসারী ঘটনা ঘটানোর প্রচেষ্টার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। মোদির বক্তব্যের পর ভারতীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর বেলুচিস্তানের ঘটনার সাথে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের ঘটনার তুলনা করে দেয়া বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি একই ঘটনা বেলুচিস্তানে ঘটার ব্যাপারেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর পরই বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে বিভিন্ন দেশে ভারতীয় কর্মকর্তাদের যোগাযোগ এবং তাদের কাউকে কাউকে ভারতে আশ্রয় বা ভ্রমণের জন্য ভিসা দেয়া তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। ইতোমধ্যে ভারতীয় নেতারা পাকিস্তানকে এক ঘরে করার সর্বাত্মক অঙ্গীকারের কথা বিবৃত করেছেন। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং বাকি বিশ্বকেও এটি করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্বব্যাপী ইসলাম মানে সন্ত্রাস এরকম একটি প্রচারণা চালানোর যে প্রবণতা একটি অংশের মধ্যে রয়েছে, সেটাকে কাজে লাগানোর কৌশল এ ক্ষেত্রে ভারত নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

সার্ক বানচাল এবং বেলুচ ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসার সাথে সাথে আরেকটি ইস্যু তুলে আনা হয়েছে, সেটি হলো পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর থেকে চীনের কাসগড় পর্যন্ত চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণের যে প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে সেটির ব্যাপারে। ৪৬ বিলিয়ন ডলারের এই মেগা প্রকল্পটি চীনের ভূ-কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘ওয়ান বেল্ট’ নীতির অংশ হিসেবে নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক চেহারা পাল্টে যেতে পারে বলে ধারণা করা হয়। ভারত শুরু থেকে এ ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে আসছিল। এখন এ ব্যাপারে চাপকে তার মিত্রদের সাথে নিয়ে সর্বাত্মক করতে চাইছে। এই প্রকল্পের মূল অংশ বেলুচিস্তানে বলে বেলুচ ইস্যুটিকে হয়তোবা সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। আর এশিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তৃত হওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রকল্পটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হওয়ায় এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানের মতো দেশগুলোও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। অন্য দিকে, চীন এই প্রকল্প বাস্তবায়নে এতটাই সিরিয়াস যে, বেলুচিস্তানের ব্যাপারে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ব্যাপারে যে ভাষায় বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয়েছে সেটি অতীতে দেখা যায়নি।

সব মিলিয়ে পাকিস্তান-ভারত যে উত্তেজনা এখন সৃষ্টি হয়েছে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পুরো উপমহাদেশেই যে পড়বে তাতে সংশয়ের অবকাশ কমই রয়েছে। পাকিস্তানকে ভাঙা বা দুর্বল করা ভারতের দেশটির প্রারম্ভিক সময় থেকে অনুসৃত কৌশল। অন্য দিকে, বিচ্ছিন্নতাবাদ বা এ ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে ব্যতিব্যস্ত রাখতে পারলে ভারত তার হাত আশপাশে সম্প্রসারিত করতে পারবে না বলেই পাকিস্তানের অনেক নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষক মনে করেন। ফলে এক দেশের গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা অন্য দেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। কিন্তু এই অবিশ্বাস ও পরস্পরের বিরুদ্ধে তৎপরতা পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থির করে তুলছে। এতে কোনো পক্ষ যে সাফল্যের পথে তরতর করে এগিয়ে যাবে, এমনটি মনে হচ্ছে না। এ ব্যাপারে ভারতের শীর্ষ স্থানীয় সংবাদপত্র ‘হিন্দুস্থান টাইমস’ একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত এই লেখায় পাঁচটি কারণে ভারত পাকিস্তানকে এক ঘরে করার যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সফল হবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর প্রথম কারণ হলো উরি হামলার ব্যাপারে বিশ্বের নিন্দার ভাষাটি খুব গভীর নয়। যুক্তরাজ্য তাদের বিবৃতিতে এটিকে ভারতের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির হিসেবে উল্লেখ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এর নিন্দা করেছে পাকিস্তানের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না করেই। রাশিয়া বলেছে, আমরা এ ব্যাপারে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন এ কারণে যে, নয়া দিল্লি পাকিস্তানি ভূখণ্ড থেকে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে। এসব বক্তব্য ভারতের অবস্থানকে জোরারোভাবে সমর্থনের প্রমাণ দেয় না।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো পাকিস্তান পরাশক্তিগুলোর কাছে বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কাছে ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এখনো প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হচ্ছে। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানকে অনেক সুবিধা এনে দিচ্ছে।

তৃতীয়ত, জাতিসঙ্ঘের অবরোধ কমিটিতে পাকিস্তানভিত্তিক ‘জঙ্গি সংগঠনের’ নেতাদের কারো ব্যাপারে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার যে উদ্যোগ ভারত নিয়েছে, তাতে চীন বাধা দিয়েছে। পাকিস্তানের সাথে চীনের এই সম্পর্কের সাথে অনেক বড় দেনা পাওনার বিষয় যুক্ত রয়েছে। ফলে চীন পাকিস্তানের বিপক্ষে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।

চতুর্থত, বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র দু’দিকে খেলার নীতি অনুসরণ করে আসছে। এর একটি বড় কারণ হলো পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। আফগানিস্তানে যতদিন আমেরিকান সৈন্য অবস্থান করবে ততদিন এর ব্যতিক্রম দেশটি করবে বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র তার ভারসাম্যমূলক নীতি অব্যাহত রাখতে পারে।

পঞ্চমত, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ফোরাম ওআইসির সমর্থন পাকিস্তান সবসময় লাভ করে। এই ইস্যুতেও ওআইসির সেক্রেটারি জেনারেলের বক্তব্যে পাকিস্তানের অবস্থানের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করা হয়েছে।

এ সবকিছুর পরও দিল্লি এই ইস্যুতে অনেক দূর আগাতে হয়তো পারে যদি এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিকভাবে পাশ্চাত্য কোনো সম্মিলিত নীতিগত অবস্থান নিয়ে থাকে। যদিও এই অবস্থান নিলেই যে পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলা যাবে বলে মনে হয় না বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বিশ্ব বাস্তবতার জন্য। আর আমেরিকান কংগ্রেসে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ঘোষণার জন্য দু’জন কংগ্রেসম্যানের যে বিল উত্থাপনের কথা বলা হচ্ছে, সরকারের শেষ বেলায় তার প্রতিকী গুরুত্বের বাইরে বেশি তাৎপর্য আছে বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক বিভিন্ন কারণে অবনতি ঘটেছে এবং আফগানিস্তানে ভারতের ভূমিকা বাড়ানোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিচ্ছে বলে মনে হয়। এমনকি এশিয়াতে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে কৌশলগত মিত্র হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সম্প্রতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি দিল্লি-ওয়াশিংটন হওয়ার পরও ভারসাম্যের বড় রকমের পরিবর্তন নাও হতে পারে। পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব যত বাড়ছে, তত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে রুশ-পাকিস্তান সম্পর্ক। ওয়াশিংটন এফ-১৬ বিমান সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তের সাথে সাথে পাকিস্তান উন্নত প্রযুক্তির বিমান ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ব্যাপারে রাশিয়ার সাথে চুক্তি করেছে। আর চীনকে বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের সব পরিস্থিতিতে পরীক্ষিত বন্ধু।

এসব বিবেচনায় আনা হলে মনে হবে না একতরফা কোনো কিছু করার মতো পরিবেশ এখন আর দক্ষিণ এশিয়ায় আছে। তবে এখানকার আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো যেভাবে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে পারে যদি সত্যি সত্যিই পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বানচাল করা হয়। এখান থেকে ভারত যদি কিছু অর্জন করতে পারে, সে জন্য তাকে যে মূল্য দিতে হতে পারে সেটি কোনোভাবেই কম হবে না। বাস্তবতা হলো ভারত ও পাকিস্তান দু’টিই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। আমেরিকাও এখন আর বিশ্বের একমাত্র খেলোয়াড় নয়।

পূর্ব প্রকাশিত : নয়া দিগন্ত

1129 জন পড়েছেন

Comments are closed.