বোরকা কি বাধ্যতামূলক?

    মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রেরিত কিতাব আল-কোরআনে নারীর পাশাপাশি পুরুষের জন্যও দৃষ্টি সংযত রাখার এবং এবং ইজ্জত-আবরু রক্ষার সীমানা নির্ধারন করে দিয়েছেন এবং তা উভয়ের জন্য অবশ্য পালনীয়। তাই এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি বা শিথিলতা নয়, বরং সঠিক বাস্তবায়নই সময়ের দাবি। এ সীমানার প্রতি শিথিলতা প্রদর্শন যেমন অন্যায় তেমনি অতিরিক্ত চাপিয়ে দেয়াও মোটেই উচিত নয়। ইজ্জত-আবরু রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শরীর ঢাকার জন্য শালীন পোষাক পরিধান করা। অথচ কালের প্রবাহে ভিন্ন সংস্কৃতির সাথে মিশ্রনের কারণে সমাজে প্রচলিত পর্দাপ্রথার অযুহাতে অতিরঞ্জিত নিয়ম চালু করা হয়েছে। এমনকি মুসলিম নারীদের উপরে বোরকা’ (Veil; covering for the whole body) নামক আপদ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, হাত ও পা মোজা পরিয়ে আপাদমস্তক আবৃত করার জন্যও বাধ্য করা হচ্ছে। আবার অপরদিকে ইজ্জত-আবরু রক্ষায় কাউকে কাউকে উদাসিন থকতেও দেখা যায়। যা মোটেই ঠিক নয়। কারণ কোন বিষয়ে অযথা বাড়াবাড়ি বা অবজ্ঞা করা জুলুমের নামান্তর। আর জালিমের উপর তো আল্লাহতায়ালার লানত বর্ষিত হতে থাকে। তাছাড়া চরম-পন্থীরা এবং উদাসিনরা যেমন নিজেরা শান্তি পায়না, তেমনি অপরকেও শান্তি থেকে বঞ্চিত করে এবং সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।

The burka is the most concealing veils. It is a one-piece veil that covers the face and body, often leaving just a mesh screen to see through.

পশ্চিমা বিশ্বের জনগণ জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনা, বিলাসিতা ও যান্ত্রিক আরাম-আয়েশ ভোগের ক্ষেত্রে যে অনেক উন্নতি অর্জন করেছেন- তা অনস্বীকার্য। তবে (পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রে) ইজ্জত-আবরু রক্ষার ক্ষেত্রে লাগামহীন শিথিলতার করণে তারা নিজেদের অজান্তেই ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে। ধর্ষন, ফ্রি-সেক্স কালচার এর কারণে জারজ সন্তানের হার ক্রমেই বেড়ে চলেছে। মরণব্যাধি এইডস রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ফলে মানসিকভাবে তারা অশান্তিতে ভুগছেন এবং পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতা এমন অবস্থায় পৌছেছে যে গোটা জাতি এই সংকটের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য একেক সময় একেক পন্থা ও পথ অবলম্বন করছে। কিন্তু ঐশী বিধানকে অবজ্ঞা করার কারণে সার্বিকভাবে তারা এ সংকট সমাধানের বিষয়ে কোন কুল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না। তবে খুব কম সংখ্যক হলেও তাদের মধ্যে যারা ধর্মীয় বিধি বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল তারা, ধর্মকে যারা অবজ্ঞা করেন তাদের তুলনায় মানসিকভাবে অনেক শান্তিতে আছেন।

    মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতেও পশ্চিমা হাওয়া লেগেছে। আমাদের দেশ সহ এসব দেশের জনসংখ্যার প্রায় বেশীর ভাগই জন্মসূত্রে মুসলিম। কিন্তু কোরআন ও হাদিছের স্বচ্ছ জ্ঞান অর্জনের প্রতি অনীহা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকার করণে এ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ধীরে ধীরে পাশ্চাত্য কালচারের প্রতি ঝুঁকে পড়ছেন। তাই মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ দেশগুলোও এ সমস্যা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত নয়।

    কারও পক্ষে বা বিপক্ষে না গিয়ে নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যে যাদেরকে আমি অধিক অধিকার বঞ্চিত মনে করেছি, স্বাভাবিকভাবে আমার এ লেখায় তাদের কথাই বেশি এসেছে। এই সীমানার বাইরে অতিরঞ্জিত বিধি নিষেধ আরোপের কারণে নারীরা যেন নির্যাতনের স্বীকার না হন সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। কারণ অপপ্রয়োগের ফলে এ বিধানকে কঠিন ভেবে তা পালনের ক্ষেত্রে নারীদের মধ্যে অনীহা সৃষ্টি হতে পারে। এই সুযোগে কুমন্ত্রণাদাতারা ইসলামের নামে কুৎসা রটনা ও নারীদেরকে বিপথে চালানোর প্রয়াস পাবে। পাশ্চাত্যের মত শিথিলতা প্রদর্শন অথবা অতিরিক্ত কঠোরতা আরোপ, কোনটাই আমাদের কাম্য নয়। যে কোন ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি বা পশ্চাদপদতার হাত থেকে আল্লাহতায়ালা যেন আমাদের রক্ষা করেন।

    সভ্য মানুষ সব সময়ই লজ্জাশীল, তাই তারা লজ্জাস্থান ঢেকে রাখতে চায়। আমাদের আদি পিতা-মাতা লজ্জাশীল ছিলেন বলেই তো নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেন এবং অনুতপ্ত হয়ে সেই জনশূন্য স্থানেও নিজেদের লজ্জাস্থান ঢাকার ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন। আর শালীন পোষাক হিসেবে তাকওয়া/ ধর্মপায়ণতা/ ন্যায়নিষ্ঠতার পোষাক পরিধান করাকে সর্বোত্তম বলা হয়েছে-

    সূরা আ’রাফ (মক্কায় অবতীর্ণক্রম- ৩৯)

    (৭:২২) অতঃপর সে (শয়তান) তাদের উভয়ের মতিবিভ্রম ঘটালো। অনন্তর যখন তারা (উভয়ে) বৃক্ষ (থেকে ফল) আস্বাদন করল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের সামনে প্রকাশিত হয়ে গেল এবং তারা নিজেদের উপর জান্নাতের বৃক্ষ-পত্র জড়াতে/ আকড়ে ধরতে লাগল। তাদের প্রতিপালক তাদেরকে ডেকে বললেনঃ আমি কি তোমাদেরকে এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করিনি এবং বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।

    (৭:২৬) হে বনী-আদম! আমি তোমাদের জন্যে পোশাক অবর্তীণ করেছি যা তোমাদের লজ্জাকে ঢাকে এবং যা সাজ সজ্জা স্বরূপ, আর ন্যায়নিষ্ঠ পোশাক, যা সর্বোত্তম। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক নিদর্শন, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।
(৭:২৭) হে বনী-আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে প্রলুব্ধ না করে; যেমন সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছিল, তাদের থেকে তাদের পোশাক ছিন্ন করে, যাতে তাদের কাছে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে যায় তাদের লজ্জাস্থান। নিঃসন্দেহে সে এবং তার দলবল তোমাদেরকে দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখ না। নিশ্চয় আমি শয়তানদেরকে তাদের অভিভাবক বনিয়ে দিয়েছি, যারা বিশ্বাস করে না।

     সূরা আত ত্বহা (মক্কায় অবতীর্ণক্রম- ৪৫)

    (২০:১২০) অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রনা দিল, বললঃ হে আদম, আমি কি তোমাকে বলে দিব অনন্তকাল জীবিত থাকার বৃক্ষের কথা এবং অবিনশ্বর রাজত্বের কথা?

    (২০:১২১) অতঃপর তারা উভয়েই এ (বৃক্ষ) থেকে (ফল) ভক্ষণ করল, তখন তাদের সামনে তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশিত হয়ে গেল এবং তারা জান্নাতের বৃক্ষ-পত্র নিজেদের উপর জড়াতে/ আঁকড়ে ধরতে লাগল। আদম তার পালনকর্তার অবাধ্যতা করল, ফলে সে পথভ্রষ্ঠ হয়ে গেল।

    প্রচণ্ড গরমে বা শীতে- লু-হাওয়া কিংবা শৈত প্রবাহের তীব্রতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য চোখে সান-গ্লাস পরার ও মুখ-নাখ সহ সর্বাঙ্গ ঢাকার প্রয়োজন হতেই পারে। সে সময় সাময়িকভাবে যে কোন মত ও পথের পুরুষ ও নারী নির্বিশেষে প্রয়োজন মত তাদের শরীর ঢাকতেই পারেন। তবে তাদের এই ব্যবস্থা সব সময়ের জন্য নয়। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদেরকে সব সময়ের জন্যই শালীনতা রক্ষা করার সঠিক নির্দেশনা তাঁর কিতাবে জানিয়ে দিয়েছেন। লু-হাওয়া কিংবা শৈত প্রবাহের তীব্রতা থাক বা না থাক, জাহান্নামের তীব্রতা থেকে বাঁচতে চাইলে এই নির্দেশ পালন করা তাদের জন্য  বাধ্যতামূলক।

    ইসলাম লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা পছন্দ করে নো এবং পায়ে বেড়ি পড়ানোরও পক্ষপাতি নয়। বরং নারী ও পুরুষ উভয়েই যেন আল-কোরআন ও হাদিছে বর্ণিত নির্ধারিত সীমার ভেতরে থেকে ঘরে-বাইরে সর্বত্র তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ সুশৃঙ্খলভাবে ফেলতে পারেন, ইসলাম প্রকৃত অর্থে সব সময় সে শিক্ষাই দেয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আল-কোরআনে শুধুমাত্র অসভ্য সমাজকে সভ্য করে গড়ে তোলার বিধানই দেয়া হয়নি। বরং সভ্য সমাজের মাঝে ঘাপটি মেরে থাকা অসভ্য মানুষগুলোর হাত থেকে বাঁচার উপায়ও বলে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে সকল সমাজে সভ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার সার্বজনীন সমাধানও এতে রয়েছে। ইসলামে পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য ইজ্জত-আবরু রক্ষা করা ফরজ। শুধুমাত্র হাতে-পায়ে মুজা পড়লে ও আপাদমস্তক ঢেকে রাখলেই এর হক আদায় হয়ে যায় না। পরিপূর্ণ হক আদায় এবং এই বিধানের মাধ্যমে উপকৃত হতে হলে সর্বাবস্থায় অন্তর পরিশুদ্ধ রাখা চাই। যারা শালীনতার ধার ধারেন না এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, তাদের কুদৃষ্টি ও জ্বালাতনের হাত থেকে বাঁচার ঢাল হিসেবে শালীন পোষাক পরিধানের গুরুত্ব অনেক। একটি ইসলামি সমাজ ব্যবস্থায় শক্ত ও সক্ষম প্রশাসনের পাশাপাশি এই বিধানের সঠিক বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরী। কারণ সমাজ থেকে অনাচার ও অশ্লীলতা দূর করার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা এবং যার কোন বিকল্প নেই। আপাতত এ সম্পর্কে সংক্ষেপে আমার জানা-জানি ও মতামত তুলে ধরছি। অনুগ্রহকরে এই বিধান সম্পর্কিত আল-কোরআনের বাণীগুলো ভাল করে লক্ষ্য করবেন এবং এর সাথে আপন আপন জ্ঞান ও বিবেককেও কাজে লাগানোর অনুরোধ রইল।

    সূরা আল আহযাব (মদীনায় অবতীর্ণক্রম-৯০)

    (৩৩:৫৯) হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে ও কন্যাগণকে এবং বিশ্বাসীদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের লম্বা পোষাক/ ঢিলাঢালা পোষাক/ চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।

    [জিলাবিবুশব্দটির অর্থ- মেয়েদের লম্বা পোষাক, ঢিলাঢালা পোষাক, চাদর– ১৬০ পৃষ্ঠা- “কোরআনের অভিধান”- মুনির উদ্দীন আহমদ।]

    সূরা নূর (মদীনায় অবতীর্ণক্রম-১০২)

    (২৪:২৭) হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য গৃহে প্রবেশ করো না, যে পর্যন্ত আলাপ-পরিচয় না কর এবং গৃহবাসীদেরকে সালাম না কর। এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম, যাতে তোমরা স্মরণ রাখ।

    (২৪:২৮) যদি তোমরা গৃহে কাউকে না পাও, তবে অনুমতি গ্রহণ না করা পর্যন্ত সেখানে প্রবেশ করো না। যদি তোমাদেরকে বলা হয় ফিরে যাও, তবে ফিরে যাবে। এতে তোমাদের জন্যে অনেক পবিত্রতা আছে এবং তোমরা যা কর, আল্লাহ তা ভালোভাবে জানেন।

    (২৪:২৯) যে গৃহে কেউ বাস করে না, তাতে তোমাদের কোন সামগ্রী/পুঁজি/গৃহস্থালী থাকলে এমন গৃহে প্রবেশ করাতে তোমাদের কোন পাপ নেই এবং আল্লাহ জানেন তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন কর।

    আলাপ-পরিচয় না থাকলে হঠাৎ কোন অপরিচিত জনের গৃহে ঢুকে পড়লে সেই গৃহের বাসিন্দাদের প্রাইভেসি নষ্ট হতে পারে। (২৪:২৭) তাই সালাম ও পরিচয় পর্ব শেষে তাদের অনুমতি নিয়ে গৃহে প্রবেশের শিক্ষা দেয়া হয়েছে। সেই মূহুর্তে যদি গৃহে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়া যায়, (২৪:২৮) তাহলে জোর করে প্রবেশের চেষ্টা না করে আপাতত ফিরে যাওয়াই ভদ্রতার পরিচায়ক। তবে কোন গৃহে যদি কেউ বাস না করেন (২৪:২৯) এবং সেখানে কারো কোন প্রয়োজনীয় পুঁজি/ গৃহস্থালী/ সামগ্রী থাকে, সেক্ষেত্রে সেই গৃহে প্রবেশ করায় কোন দোষ নেই। এগুলো সামাজিক আবরুর বিভিন্ন পর্যায়, যা সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষায় যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।

    সূরা নূর (মদীনায় অবতীর্ণ)

    (২৪:৩০) মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জা-স্থানের হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন।

    (২৪:৩১) ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জা-স্থানের হেফাযত করে। তারা যেন তাদের (‘জীনাতাহুন্না’) দেহের গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তা ব্যাতীত- এর থেকে যাকিছু আপাত দৃশ্যমান/ প্রকাশিত হয়। আর তারা যেন (bikhumurihinna) তাদের ওড়না/ চাদর/ দোপাট্টা টেনে নিয়ে বক্ষ দেশে ফেলে রাখে এবং তাদের দেহের গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে- তবে তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌন কামনামুক্ত পুরুষ ও বালকদের মধ্যে নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞরা ব্যতীত; আর তারা যেন গোপন করে রাখা বা ঢেকে রাখা দেহের গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্য জানান দেয়ার/ অবগত করানোর করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।

    খেমারুন- চাদর, ওড়না, দোপাট্টা (আল-কাওসার-আধুনিক আরবী-বাংলা অভিধান- মদীনা পাবলিকেশন্স)

    খুমুরুন- চাদরগুলো (কোরআনের অভিধান-১৮৪ পৃষ্ঠা- মুনির উদ্দীন আহমদ)

    The khimar is a long, cape-like veil that hangs down to just above the waist. It covers the hair, neck, shoulders & upper part of chest, but leaves the face clear.

    (৩৩:৫৯) নং আয়াতে নারীদের বাহিরে যাওয়ার প্রয়োজন হলে মেয়েদের লম্বা পোষাক/ ঢিলাঢালা পোষাক/ চাদরগুলো তাদের নিজেদের উপরে টেনে নেয়ার মাধ্যমে গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্যকে আড়াল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

    এরপর বেশ কিছু সময়ের ব্যবধানে তারই রেশ ধরে (২৪:৩০) ও (২৪:৩১) নং আয়াতে পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রে একই ভাষায় বক্তব্য দেয়ার পর নারীদের শলীনতা রক্ষার ব্যাপারে বিষদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, আবরু রক্ষার এই বিধানের প্রাথমিক ধাপ সম্পর্কে (২৪:৩০) বিশ্বাসী পুরুষদেরকেও অবহিত করা হয়েছে। কারন কোন সমাজে পুরুষরা যদি সংযত হয়ে চলা শুরু করেন, তাহলে সেই প্রভাব নারীদের উপরেও পড়ে। এভাবে একটি জাহেলি সমাজকে ধীরে ধীরে পর্দা সম্পর্কে সচেতন ও আইন প্রণয়নের মাধমে সেই বিধানটিকে কার্যকর করার ধরাটি অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য এবং ফলপ্রসূ পদক্ষেপ বলেই আমি বিশ্বাস করি। যা শুধু সে সময়ের জন্য নয়, বরং সব সময়ের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। পুরুষ এবং নারী উভয়কেই দৃষ্টি নত রাখতে বলা হয়েছে। কারন সরাসরি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলে তাতে যেমন নিজের ব্যক্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, তেমনি পুরুষ বা নারী যার দিকেই তাকিয়ে থাকা হোক না কেন এটি যে খুবই অস্বস্থিকর ব্যাপার তা বিবেক সম্পন্ন মানুষ মাত্রই বুঝতে পারার কথা। মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে শালীন ভাবে মেলামেশা, কথাবার্তার সময় পুরুষ-নারী উভয়ের দিকে চোখ পরতেই পারে। কিন্তু এই চোখে চোখ রাখাটা যেন মাত্রা না ছাড়ায় অর্থাৎ শালীনতার পর্যায়ে থাকে সেই জন্য পরস্পরের প্রতি একনাগারে না তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি অবনত রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া রাস্তা ঘাটে অশালীন কিছু থাকতেই পারে। সেক্ষেত্রে দৃষ্টি অবনত/সংযত করলেই তো তার কু-প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তবে লজ্জাস্থানের হেফাজত করা অর্থাৎ ঢেকে রাখাটাও খুবই জরুরী। কিন্তু এমন কোন স্থানে যেতে হলো যে, সেখানকার মানুষেরা লজ্জাস্থান ঢাকার প্রতি যত্নশীল নয়। এ ক্ষেত্রে দৃষ্টি অবনত করার অর্থাৎ সেদিকে তাকিয়ে না থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এই আয়াতগুলোর ধরাবাহিকতা ও বক্তব্য থেকে এটাও বোঝা যায় যে, পর্দার বিধান কার্যকর করার ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী উভয়কেই সচেতন হতে হবে, তবে পুরুষদেরকেই অগ্রনী ভুমিকা পালন করতে হবে।

    (২৪:৩১) নং আয়াতে ব্যবহৃত ‘জিনাত’ শব্দটি স্ত্রী-বাচক বিশেষ্য পদ (genitive feminine noun)। রং-বেরঙের সুন্দর ও শালীন পোষাক কিংবা অলঙ্কারাদিকে বোঝানোর জন্য এটি প্রযোজ্য নয়। বরং এক্ষেত্রে ‘জীনাতাহুন্না’ শব্দটি শুধুমাত্র নারীদের দেহের গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্যকে বোঝাবার জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে। কারন রং-বেরঙের সুন্দর পোষাক ও অলঙ্কারাদি পড়ে নারীরাই তো সাজবে এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে বেহায়াপনা কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এই ‘জীনাত’ অর্থাৎ ‘নারীদের দেহের গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্যকে’ কিভাবে ঢাকতে হবে বিস্তারিতভাবে সেই শিক্ষাও দেয়া হয়েছে। শুধু ঢাকলেই হবে না, ঢেকে রাখা/ গোপন করে রাখা সেই বিশেষ সৌন্দর্য প্রদর্শনের জন্য জোর পদক্ষেপে বিশেষ বিশেষ অঙ্গসমূহ হেলিয়ে দুলিয়ে প্রকাশ করার চেষ্টা যেন করা না হয় সে ব্যাপারেও সাবধান করে দেয়া হয়েছে। সুতরাং রং-বেরঙের পোষাক ও অলঙ্কার পড়লে সেটাও ঢেকে রাখতে হবে- এমন কোন নির্দেশ এখানে দেয়া হয়নি। বরং আম জনতার সামনে নারীদের দেহের গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্য প্রদর্শন না করার এবং ঢিলেঢালা পোষাক পরিধান করার সাথে সাথে শালীনভাবে চলাফেরা করার নির্দেশই দেয়া হয়েছে।

    সূরা নূর (মদীনায় অবতীর্ণ)

    (২৪:৫৮) হে বিশ্বাসীগণ! (‘মা-মালাকাত-আইমানুকুম’) তোমাদের ‘ডান হাতের অধিকারভূক্তরা’ এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্ত বয়স্ক হয়নি তারা যেন তিন সময়ে তোমাদের কাছে অনুমতি গ্রহণ করে, ফজরের নামাযের পূর্বে, দুপুরে যখন তোমরা বস্ত্র শিথিল কর এবং এশার নামাযের পর। এই তিন সময় তোমাদের গোপনীয়তা অবলম্বনের সময়। এ সময়ের পর তোমাদের ও তাদের জন্যে কোন দোষ নেই। তোমাদের একে অপরের কাছে তো যাতায়াত করতেই হয়, এমনি ভাবে আল্লাহ তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট আয়াত সমূহ বিবৃত করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

    (২৪:৫৯) তোমাদের সন্তান-সন্ততিরা যখন বায়োপ্রাপ্ত হয়, তারাও যেন তাদের পূর্ববর্তীদের ন্যায় অনুমতি চায়। এমনিভাবে আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ তোমাদের কাছে বর্ণনা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

    (২৪:৬১) অন্ধের জন্যে দোষ নেই, খঞ্জের (খোঁড়া/অসম্পূর্ণ) জন্যে দোষ নেই, রোগীর জন্যে দোষ নেই, এবং তোমাদের জন্যেও আহার করায় দোষ নেই তোমাদের নিজেদের গৃহে অথবা তোমাদের পিতাদের গৃহে অথবা তোমাদের মাতাদের গৃহে অথবা তোমাদের ভ্রাতাদের গৃহে অথবা তোমাদের ভগিণীদের গৃহে অথবা তোমাদের পিতৃব্যদের গৃহে অথবা তোমাদের ফুফুদের গৃহে অথবা তোমাদের মামাদের গৃহে অথবা তোমাদের খালাদের গৃহে অথবা সেই গৃহে, যার চাবি আছে তোমাদের হাতে অথবা তোমাদের বন্ধুদের গৃহে; তোমরা একত্রে আহার কর অথবা পৃথকভবে আহার কর, তাতে তোমাদের কোন দোষ নেই। তবে তোমরা যখন গৃহে প্রবেশ কর, তখন তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম বলবে। এটা আল্লাহর কাছ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র দোয়া। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্যে আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ননা করেন, যাতে তোমরা বুঝে নাও।

    (২৪:৫৮) নং আয়াতে প্রথমত শালীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে ডান হাতের অধিকারভূক্তদের পাশাপাশি অপ্রাপ্ত বয়স্কদের অনুমতি গ্রহণের বিষয়টিও এসেছে। ফজরের নামাজের পূর্বে অর্থাৎ রাতে শোবার পর থেকে ফজরের নামাজের আগ পর্যন্ত নারী-পুরুষ উভয়েই রাতের হালকা কাপড় পড়ে ঘুমিয়ে থাকেন। তাছাড়া স্বামী-স্ত্রীর মাঝে নিবিড় সম্পর্কের সময়ও এটি, তেমনি দুপুরে কাজ কর্ম সেরেও অনেকে বিশ্রাম গ্রহণের উদ্দেশে বস্ত্র শিথিল করে অর্থাৎ শরীর থেকে অতিরিক্ত কাপড় খুলে রাখতে পারেন। একই ভাবে এশার নামাজের পর বলাতে রাতের কোন অংশ থেকে অনুমতি নেবার সময়সীমা শুরু হবে- মূলত সেটাই নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। ( সময়ের পর তোমাদের তাদের জন্যে কোন দোষ নেই। তোমাদের একে অপরের কাছে তো যাতায়াত করতেই হয়) – এই অংশে মূলত সেই তিন সময় ছাড়া অন্য সময়ে অনুমতি ব্যতিত দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্মের জন্য স্বাভাবিক যাতায়াত করা যে দোষের নয় অর্থাৎ পনিবারের মধ্যে বসবাসরত ডান হাতের অধিকারভূক্তদের পাশাপাশি অপ্রাপ্ত বয়স্কদেরও যে অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজন নেই- মূলত সেটাই বোঝানো হয়েছে। (২৪:৫৯) নং আয়াতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান-সন্ততিরা বায়োপ্রাপ্ত হলে অনুমতি গ্রহনের শিক্ষা দেবার প্রতি তাগিদ দেয়া হয়েছে।

    (২৪:৬১) নং আয়াতে পরিবারের সকলে একসাথে বসে খাদ্য গ্রহণ করার বিষয়ে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিজ পরিবারের সকল সদস্য ও আত্মীয়দের সাথে আহার করার ক্ষেত্রে কোন বাধা না রেখে মূলত সামাজিক সুসম্পর্ক সৃষ্টির প্রতিই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোনরূপ কুসংস্কার বা হীন মনোভাবের কারনে সেই সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ থেকে যেন অন্ধ, খঞ্জ ও রুগ্ন ব্যক্তিরাও বাদ না পড়েন সেদিকেও বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার ইংগিত দেয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধীদের প্রতি যেন কোনরূপ অবজ্ঞা করা না হয় সেই শিক্ষাই এখানে দেয়া হয়েছে। অবস্থা ভেদে একসাথে বা একাকী আহার করায় দোষের কিছু নেই, এখানে সেটাই বলা হয়েছে। অনেক সময় দেখা যায় যে, কোন পরিবারে কর্তা ব্যক্তিরা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার রেওয়াজ চালু করা হয়। এতে কোন কোন সময় অযথা হয়রানি বা দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকায় অনেকের কষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে তারা রুগ্ন হলে তাদের শারীরিক ক্ষতি হতে পারে। তাই পরিবেশ পরিস্থিতির কারনে একটি নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষার পর একাকী আহার করায় দোষের কিছু নেই। আর এখানে সেই বিষয়টি তুলে ধরে জীবনকে সহজভাবে গ্রহণ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।  আল-কোরআনের নির্দেশাবলী পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। তাই কোন বিষয় সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনা বুঝতে হলে সেই বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য নির্দেশকেও জানা জরুরী। সঙ্গত কারনেই এ সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হলে (০৪:২২, ২৩) নং আয়াতের বক্তব্য উপলব্ধি করা প্রয়োজন-

    সূরা নিসা (মদীনায় অবতীর্ণ)

    (৪:২২) যে নারীকে তোমাদের পিতা-পিতামহ বিবাহ করেছে তোমরা তাদের বিবাহ করো না। কিন্তু যা বিগত হয়ে গেছে। এটা অশ্লীল, গজবের কাজ এবং নিকৃষ্ট আচরণ।

    (৪:২৩) তোমাদের (বিবাহের) জন্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তোমাদের মা, তোমাদের মেয়ে, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভাইয়ের মেয়ে; বোনের মেয়ে, তোমাদের সেই মায়েরা যারা তোমাদেরকে স্তন্যপান করিয়েছে, তোমাদের দুধ-বোন, তোমাদের স্ত্রীদের মা, তোমরা যাদের সাথে সহবাস করেছ সেই স্ত্রীদের কন্যা- যারা তোমাদের লালন-পালনে আছে। যদি তাদের সাথে সহবাস না করে থাক, তবে এ বিবাহে তোমাদের কোন গোনাহ নেই। তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রী এবং দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা; কিন্তু যা অতীত হয়ে গেছে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।

    (০৪:২২) নং আয়াতে স্পষ্টভাবে বিয়ে সম্পর্কে বক্তব্য শুরু করা হয়েছে। সুতরাং পরবর্তী (০৪:২৩) নং আয়াতে হারাম বলতে যাদেরকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ সে সম্পর্কে বলা হয়েছে। এখানে মূলত কাকে বিয়ে করা যাবে বা যাবে না সে সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

    আল-কোরআনের কোন আয়াতেই বিশেষভাবে নারীদের ক্ষেত্রে ‘হিজাব’ কিংবা ’নিকাব’ করার নির্দেশ দেয়া হয় নাই। বরং (২৪:৩০, ৩১) পুরুষ এবং নারী উভয়কেই দৃষ্টি সংযত রাখার ও লজ্জাস্থান হেফাযত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

    আমরা জানি যে, সেই জাহেলি যুগে উলঙ্গ হয়ে উন্মুক্ত আকাশের নীচে সবার সামনে কাবাঘর তাওয়াফ করা একটি সামাজিক রীতি ছিল এবং বেহায়াপনা তাদের মজ্জাগত কালচারে পরিণত হয়েছিল। বহুদিনের সেই নির্লজ্জ বেহায়াপনা থেকে মুসলিমরা যেন সরে আসে, তার প্রথম পদক্ষেপ স্বরূপ (০৭:২৬) নং আয়াতে সেই নির্দেশনা দেয়া হলো। বাসগৃহ থেকে শুরু করে মাঠে-ঘাটে, ক্ষেতে- খামারে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহনের সময় পুরুষ ও নারীরা যেন পরিবেশ পরিস্থিতি অনুসারে ভদ্রভাবে কাপড় পড়ে তাদের শরীরের লজ্জাস্থান ঢেকেঢুকে রাখার বিষয়টি এখানে তুলে ধরা হয়েছে। আর পোষাকের মধ্যে পরহেজগারী/ ধর্মপরায়ণতার পোষাককে উত্তম বলা হয়েছে। 

    সুতরাং লজ্জাস্থান ঢেকে রাখার জন্য পোষাক পরিধান করা পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য ফরজ। অথচ হিজাব করার অর্থ নিজেকে আড়াল করে রাখা। আল-কোরআনে এমন কোন আয়াত নেই যেখানে বলা হয়েছে যে, পুরুষ এবং নারীকে পরস্পর থেকে একেবারে আড়াল করে রাখার জন্য ‘হিজাব’ পালন করতে হবে কিংবা মুখমণ্ডল ঢেকে রাখার জন্য ‘নিকাব’ পরতে হবে। তবে শালীনতা ও লজ্জাশীলতা যেন লঙ্ঘিত না হয় সেজন্য উভয়কেই একটা সীমা রক্ষা করতে বলা হয়েছে। দৃষ্টি সংযত রাখার মাধ্যমে মনের পর্দা রক্ষাকে প্রথমেই উল্লেখ করে এর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি নারীদেরকে যেহেতু বাহ্যিক অর্থাৎ দেহের গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্য দান করা হয়েছে, তাই তা ঢেকে রাখার মাধ্যমে শালীনতা রক্ষার জন্য কিভাবে পোষাক পরিধান করতে হবে তার নির্দেশনাও স্বয়ং স্রষ্টাই খুব সুন্দরভাবে খুলে খুলে জানিয়ে দিয়েছেন। অহেতুক বাড়াবাড়ি নয়, বরং এটি মেনে চলা ও দৈনন্দিন কাজে কর্মে নিয়োজিত থাকাই বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীদের জন্য অবশ্য পালনীয়। সত্যিকার অর্থে চক্ষুষ্মানদের জন্য এরপর মুনুষ্য উদ্ভাবিত প্রথা (হিজাব কিংবা নিকাব) সম্পর্কিত আর কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রয়োজন পরেনা। আর অনুকরণ করার তো প্রশ্নই আসেনা।

    অনেক সময় (৩৩:৫৩) নং আয়াতটিকে নারীদের জন্য হিজাব পালনের দলিল হিসেবে পেশ করা হয়ে থাকে। অথচ এখানে কিন্তু নবী পত্নীগণকে বা অন্য কোন নারীদেরকে আপাদমস্তক ঢেকে রাখার মত কোন পর্দা কিংবা ঢাকনা পরার নির্দেশ দেয়া হয়নি, বরং বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষাপটে পর পুরুষদেরকেই নবী পত্নীগণের কাছে থেকে আড়াল অবলম্বন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল-

    সূরা আল আহযাব (মদীনায় অবতীর্ণ)
     (৩৩:৫৩) হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া না হলে তোমরা আহার্য গ্রহণের জন্য তা প্রস্তুতির অপেক্ষা না করে নবীর গৃহে প্রবেশ করো না। তবে তোমরা আমন্ত্রণ করা হলে প্রবেশ করো, অতঃপর যখনই খাওয়া শেষ হয় তখনই চলে যাও, কথাবার্তায় মশগুল হয়ে যেয়ো না। নিশ্চয় এটা নবীর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কাছে সংকোচ বোধ করেন; কিন্তু আল্লাহ সত্যকথা বলতে সংকোচ করেন না। তোমরা তাঁর পত্নীগণের কাছে কিছু চাইলে বা প্রশ্ন করলে (min warāi ḥijābin) আড়াল থেকে চাইবে বা প্রশ্ন করবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্যে এবং তাঁদের অন্তরের জন্যে অধিকতর পবিত্রতার কারণ। আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেয়া এবং তাঁর পত্নীগণকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য কখনও উচিত নয় এবং আল্লাহর কাছে এটা গুরুতর অপরাধ।

    মানুষের মধ্যে অনেকের চাওয়া পাওয়া এমনই যে সে নিজেকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ না করলেও উন্মুক্ত করে প্রদর্শন করতে চায়। অনেকে তো লজ্জা-শরমের ধারই ধারেনা। অথচ আল্লাহতায়ালা মুসলিম পুরুষ ও নারীদের জন্য এ ধরনের কোন রূপ বেহায়াপনাকে হারাম করে দিয়েছেন। আবার শুধু নারীই নয়, পুরুষদের মধ্যেও অনেকে অযথা এমন ভাবে চলাফেরা করে যে অনেক ক্ষেত্রে তাদের গোপন অঙ্গ প্রদর্শনের সামিল হয়ে পড়ে। যেমন পশ্চিমাদেশ, এমনকি আজকাল আমাদের দেশেও যুবকেরা এমন সব টাইট-ফিটিংস জামা-কাপড় পরিধান করছে যে, মনে হয় তারা তাদের গোপন অঙ্গের স্থানগুলোকে হাইলাইট করছে। একে তো টাইট, তার উপর আবার নাভির নিচে, মনে হয় যেন কোন রকমে কোমরে আটকে আছে!! খুলে যায় কিনা এ ভেবে লজ্জাই লাগে। কিন্তু ওদের যেন তাতে কোন ভ্রুক্ষেপই নেই! এ ধরনের কু-রুচিপূর্ণ চালচলন যে সীমালংঘনের পর্যায়ে পড়ে- তা হয়ত তারা জানেই না। একজন প্রকৃত মুসলমানের যে এভাবে চলা ঠিক নয়, তা মহান সষ্টা অনেক আগেই আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। তাই বলে আবার ভাববেন না যে, আমি লুজ-ফিটিংস প্যান্ট-সার্ট পরিধানের ক্ষেত্রেও বিরোধিতা করছি।

    সকল অবিশ্বাসী এবং বিশ্বাসীদের মধ্যে যাদের সাথে বিবাহ বৈধ, সেই সকল নারী-পুরুষের মাঝে দূরত্ব রক্ষা করে চলা ফরজ। তবে বৃদ্ধা এবং বিশ্বাসীদের মধ্যে নিকট আত্মীয়তা সূত্রে যাদের সাথে বিবাহ বৈধ নয়, তাদের বেলায় কিছুটা শিথিলতা রয়েছে। পুরুষের জন্য দেহের কতটুকু অংশ ঢাকতে হবে এবং নারীর জন্য কখন কতটুকু অংশ কিভাবে ঢাকতে হবে তা আমারা আল-কোরআন ও সহী হাদিছের আলোকে অতি সহজেই বুঝে নিতে পারি। শিথিলতা প্রদর্শন বা অতিরিক্ত আরোপ না করে এই নির্ধারিত সীমানা মেনে চলাই ইসলামের দাবি।

    মহান স্রষ্টা সৃষ্টিগতভাবেই নারীদেরকে গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্য (জিনাত) দান করেছেন এবং তাদের নিজেদের স্বার্থেই তা ঢেকে রাখতে বলেছেন। কিন্তু এর বাহিরে নারীদের জন্য বোরকা পরিধান করে নাক-চোখ সহ সম্পূর্ণ মুখমন্ডল ঢেকে রাখার হুকুম তিনি কখনই দেন নাই। তাই সঙ্গত কারণেই বোরকা সহ হাতে ও পায়ে মোজা লাগিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে রাখতে হবে, এমন উদ্ভট খেয়ালের সাথে আমি একমত নই।

 



    কেউ যদি স্বেচ্ছায় বোরকা পরিধান করে আপাদমস্তক ঢেকে রাখতে চান বা একচোখ ঢেকে উদ্ভট সাজতে চান এবং সব সময় ঘরে  বসে থাকতে  চান, তাহলে সেটা  তার অতিশয় পরহেজগার মনোভাব কিংবা নিজস্ব চিন্তাধারা হতে পারে।

    অনেক সময় দেখা যায় যে, কেউ কেউ হঠাৎ কোন বিপদ-আপদে পড়ে বা অতীত জীবনের স্বেচ্ছাচারীতার কারনে নিজের উপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পার্থিব জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচতে চান। এক সময়ে ইহকালের অতিরিক্ত মাতামাতির সাথে তাল শামলাতে না পেরে তারা যেমন খেই হারিয়ে ফেলেন, তেমনি আবার পরকালীন অনন্ত শান্তি প্রাপ্তির নেশায় পড়ে জীবনকে সংকুচিত করে রাখেন। আদর্শগত ও আত্মিক উন্নয়নের আগেই না বুঝে বাহ্যিক পরিবর্তনকে এতটাই প্রাধান্য দিয়ে বসেন যে, বলতে গেলে তারা তখন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবন যাপন করাকেই ধর্মের মূল বিষয় হিসেবে ভাবতে শুরু করেন। অন্যের স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনা ও জীবনধারনের পদ্ধতিকে তারা ইসলামহীন জীবন ভেবে কটাক্ষ করতে কিংবা অবলীলায় দূরে ঠেলে দিতেও কুণ্ঠিত হন না। কিন্তু তাদের বোঝা উচিত যে, আল্লাহতায়ালা পৃথিবীর সব মানুষকে একই রকম মন-মানসিকতা দিয়ে প্রেরণ করেননি। প্রত্যেকের ক্ষেত্রে কিছু না কিছু ভিন্নতা আছেই। আর এই সৃষ্টি বৈচিত্রের কথা স্মরণ রেখেই বিধাতা মহান আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের (সাঃ) মাধ্যমে নারী, পুরুষ উভয়ের জন্য সর্বকালেই গ্রহণযোগ্য ও অত্যন্ত বাস্তবসম্মত বিধান নির্ধারন করে দিয়েছেন। যা মানুষের সামনে সঠিকভাবে পেশ করে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্যকে তুলে ধরাই বাস্তবতার দাবি।

    পরহেজগারী/ ধর্মপরায়ণতার পোষাক (০৭:২৬) কেমন হবে তা জানতে হলে সহী হাদিছের আশ্রয় গ্রহণ করা প্রয়োজন রয়েছে। তবে নারীদের পোষাকের ব্যাপারে দুটি মতামত রয়েছে, তাই অনেকেই আপন বিবেক ও অভিরুচি অনুসারে এর মধ্যে থেকে যে কোন একটি বেছে নেন। একজন মধ্যপন্থি হিসেবে আমি এই মতের সাথে একমত পোষন করি যে, কখনই এমন পোষাক পড়া উচিত নয় যাতে নারীদের/ পুরুষদের দেহের আকর্ষনীয় অঙ্গসমূহ প্রকাশ হয়ে পড়ে।

    (৩৩:৫৯) নং আয়াতে নারীদের বাহিরে যাওয়ার প্রয়োজন হলে মেয়েদের লম্বা পোষাক/ ঢিলাঢালা পোষাক/ চাদরগুলো তাদের নিজেদের উপরে টেনে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এখানে কতটা লম্বা ও কতটা ঢিলা হবে তার সীমানা নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। তবে এর মাধ্যমে যে দেহের গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্যকে আড়াল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা পরবর্তীতে আরও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

    (২৪:৩১) নং আয়াতে বলা হলো-

    [ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জা-স্থানের হেফাযত করে। তারা যেন তাদের (‘জীনাতাহুন্না’) দেহের গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তা ব্যাতীত- এর থেকে যাকিছু আপাত দৃশ্যমান/ প্রকাশিত হয়। আর তারা যেন তাদের (bikhumurihinna) ওড়না/ চাদর/ দোপাট্টা টেনে নিয়ে বক্ষ দেশে ফেলে রাখে এবং তাদের দেহের গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে- তবে তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌন কামনামুক্ত পুরুষ ও বালকদের মধ্যে নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞরা ব্যতীত; আর তারা যেন গোপন করে রাখা বা ঢেকে রাখা দেহের গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্য জানান দেয়ার/ অবগত করানোর করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।]

    সুতরাং এমন পোষাক পড়া উচিত নয় যাতে দেহের গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়ে পড়ে। তবে যাকিছু আপাত দৃশ্যমান/ প্রকাশিত হয় (মুখমণ্ডল, হাত, পা, এমনকি মাথার চুল), তা প্রকাশ হলে কোন অসুবিধা নেই। তাই সাবার সামনেই ঢিলেঢালা শালীন পোষাক পড়ে যাওয়াই (০৭:২৬) ধর্মপরায়ণতার পরিচায়ক। স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌন কামনামুক্ত পুরুষ ও বালকদের মধ্যে যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের সামনে অতিরিক্ত হিসেবে ওড়না/ চাদর/ দোপাট্টা খুলে রাখলেও দোষের কিছু নেই অর্থাৎ শীথিলতা রয়েছে। এদের ছাড়া অন্যদের সামনে ঢিলা ও লম্বা পোষাকের পাশাপাশি অতিরিক্ত হিসেবে খিমার অর্থাৎ ওড়না/ চাদর/ দোপাট্টা দিয়ে গ্রীবা ও বক্ষদেশ ঢেকে রাখতে হবে। তবে বিশেষ মূহুর্তে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে (০২:২২৩ নং আয়াত অনুসারে) বিশেষ শীথিলতা রয়েছে।

    সূরা আল বাক্বারাহ (মদীনায় অবতীর্ণ)

    (০২:২২৩) তোমাদের স্ত্রীরা হলো তোমাদের জন্য শস্য ক্ষেত্র। তোমরা যেভাবে ইচ্ছা তাদের কাছে গমন করতে পার। আর নিজেদের জন্য আগামী দিনের ব্যবস্থা কর এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাক। আর নিশ্চিতভাবে জেনে রাখ যে, আল্লাহর সাথে তোমাদেরকে সাক্ষাত করতেই হবে। আর যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে সুসংবাদ জানিয়ে দাও।

    ঢিলেঢালা পোষাক বলতে এমন ঢিলা নয় যাতে বেখাপ্পা দেখায়। আবার লম্বা পোষাক মানেই এর দ্বারা সরাসরি মাথা, নাক-মুখ সহ মুখমণ্ডল এবং হাতের তালু ও পায়ের পাতা অর্থাৎ পা থেকে মাথা পর্যন্ত সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে উদ্ভট সাজা নয়, বরং নারী দেহের গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্য ঢাকার জন্য যতটা ঢিলা ও লম্বা হলে শালীনতা বজায় থাকে সেটা নির্ধারণের ভার বিশ্বাসীদের উপরেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

    মাথার একটি চুলও যেন দেখা না যায় সেই অযুহাতে মোটা কালো কাপড়ে সম্পূর্ণ মাথা ঢেকে গরমের দিনে কান-মাথা গরম হয়ে অসুস্থ হওয়ার মত কিংবা সাভাবিক হাটাচলায় ও কাজেকর্মে ব্যাঘাত ঘটতে পারে এমন লম্বা পোষাক পরিধানের মত সামান্যতম কোন ইংগিতও দেয়া হয়নি। তবে নিচের দিকে গোড়ালির উপর ও হাতের কব্জির উপর পর্যন্ত ঝুলিয়ে দিয়ে ও উপরের দিকে ঘাড়ের উপরে মাথার খানিকটা ঢেকে নিলেই লম্বা পোষাকের মাধ্যমে দেহের গঠনগত বিশেষ সৌন্দর্য ঢাকার হক আদায় হয়ে যাবে। সেইসাথে বক্ষ ঢাকার ব্যাপারেও সচেতন হতে হবে। এরূপ পোষাকই ধর্মপরায়নতার পোষাক হিসেবে গন্য হবে- ইনশাল্লাহ। এছাড়াও জাক-জামকের সাথে অতিরিক্ত সেজেগুজে ও নিজের গোপন অঙ্গগুলো প্রদর্শন করার মতলবে জোর পদক্ষেপে চলাফেরা করাও বৈধ নয় অর্থাৎ গুনাহ। সুতরাং চালাফেরার ব্যাপারেও সাবধনতা অবলম্বন করতে হবে যেন শালীনতা ক্ষুন্ন না হয়। অযথা একাকী রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা করা ও যাদের মধ্যে বিয়ে বৈধ তাদের সাথে (একজন পুরুষ ও একজন নারী একাকি) নির্জনে কথা বলা বা সময় কাটানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আর বৃদ্ধাদের ক্ষেত্রে কিছু শীথিলতা থাকলেও সাবধানতা অবলম্বনই উত্তম বলা হয়েছে-

    সূরা নূর (মদীনায় অবতীর্ণ)

    (২৪:৬০) অর্থ- বৃদ্ধা নারী, যারা বিবাহের আশা রাখে না, যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না কোরে তাদের বহির্বাস খুলে রাখে, তাদের জন্যে দোষ নেই, তবে এ থেকে বিরত থাকাই তাদের জন্যে উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

    প্রায়ই হাদিছের রেফারেন্স টেনে নারীদের ক্ষেত্রে নিকাব পরিধান করার ব্যাপারে জোর দাবি জানানো হয়ে থাকে

    হাদিছটি এরূপঃ (একদা হযরত উম্মে সালামাহ হযরত উম্মে মাইমূনাহ নবী সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বসে থাকা অবস্থায় হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম আসলেন। নবী (সাঃ) উভয় স্ত্রীকে বললেন, “তার থেকে পর্দা করো স্ত্রীরা বললেনঃহে আল্লাহর রসূল, তিনি কি অন্ধ নন? তিনি তো আমাদের দেখতে পাচ্ছেন না, চিনতেও পাচ্ছেন না।রসুল (সাঃ) বললেনঃতোমরা দুজনও কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখতে পাচ্ছো না?”)

    এর উত্তর দেয়ার আগে আলকোরআনের কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করতে চাই

    সূরা আল আহযাব (মদীনায় অবতীর্ণ)

    (৩৩:৩০) অর্থ- হে নবী পত্নীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ প্রকাশ্য অশ্লীল কাজ করলে তাকে দ্বিগুণ শাস্তি দেয়া হবে; আর এটা আল্লাহর জন্য অত্যন্ত সহজ।

    (৩৩:৩১) অর্থ- তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে এবং সৎকর্ম করবে, আমি তাকে দুবার পুরস্কার দেব এবং তার জন্য আমি সম্মান জনক রিযিক প্রস্তুত করে রেখেছি।

    (৩৩:৩২) অর্থ- হে নবী পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কথা বলার সময় কোমলতা প্রকাশ করবে না, এর ফলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে তোমার ব্যাপারে প্রলুব্ধ হয়ে পড়বে, তবে তোমরা কথাবার্তা বলবে সংগতভাবে।

    (৩৩:৩৩) অর্থ- তোমরা ঘরে অবস্থান করবে, জাহেলিয়াতের যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না, নামায কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে; হে নবী পরিবার! আল্লাহ তো এসবের মাধ্যমে তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র রাখতে চান।

    এই (৩৩:৩০ – ৩৩) আয়াতগুলোর নির্দেশ রাসূলের (সাঃ) স্ত্রীদের জন্য যেভাবে অবশ্যপালনীয় আওতার মধ্যে পড়ে, অন্যদের ক্ষেত্রে সেভাবে অবশ্যপালনীয় নয় বলেই মনে হয়। বিশেষ করে করে (৩৩:৩২) নং আয়াতে তো স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে- //হে নবী পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও;//

    কাজেই মুমিন নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আল-কোরআনের বিধান যে রাসূলের (সাঃ) স্ত্রীদের থেকে কিছুটা আলাদা ছিল, তা এই বক্তব্যের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

    এবার আরেকটি হাদিছের প্রতি লক্ষ্য করি

    ( হিজরী সনে একদল হাবশী পুরুষ মসজিদে নববীর চত্বরে একটি সামরিক খেলার আয়োজন করলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে হযরত আয়েশাকে খেলা দেখালেন।)

    উপরে উল্লেখিত এই হাদিছ দুটির বক্তব্য ও ইংগিত থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এখানে নারীর দৃষ্টি সংযত রাখার ব্যপারে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সুতরাং ‘পরপুরুষকে একদম দেখাই যাবে না বা পরপুরুষও কোন নারীর মুখ একদমই দেখতে পারবেন না’- এর থেকে এমনটি ভেবে নিয়ে অযথা বাড়াবাড়ি করা মোটেই ঠিক নয়। তবে খুব কাছাকাছি অবস্থানের সময় নারী ও পুরুষ উভয়েই যেন একে অপরের প্রতি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে না থাকেন, বরং চোখ নামিয়ে ফেলার মাধ্যমে এবং ক্ষেত্র ও পাত্র ভেদে প্রয়োজন অনুসারে দূরে সরে গিয়ে দৃষ্টি সংযত রাখার বিষয়ে সচেতন থাকেন- সেই ইংগিতই এই হাদিছ দুটির বক্তব্যে ফুটে উঠেছে।

    এবার নিচের হাদিছ দুটির বক্তব্য লক্ষ্য করুন-

পরিচ্ছদঃ ৩২. মুহরিম স্ত্রী লোকের মুখমন্ডল ঢাকা। সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)- ১৮৩৩. আহমাদ ইবন হাম্বল (রহঃ) ……….. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্নিত । তিনি বলেন অনেক কাফেলা (হজ্ব মওসুমে) আমাদের অতিক্রম করছিল আর আমরা ইহরাম অবস্থায় রাসুল (সাঃ)-এর সাথে ছিলাম। তারা আমাদের সম্মুক্ষে এসে পড়লে আমাদের স্ত্রী লোকেরা মাথায় কাপড় টেনে মুখ ঢাকতেন। আর তারা আমাদের সম্মুখ হতে দুরে সরে গেলে আমরা আমাদের মুখমন্ডল খুলতাম।

পরিচ্ছদঃ ২৮/১৩. মুহরিম পুরুষ ও মুহরিম নারীর জন্য নিষিদ্ধ সুগন্ধিদ্রব্য। সহীহ বুখারী (তাওহীদ)- ১৮৩৮. ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইহরাম অবস্থায় আপনি আমাদেরকে কী ধরনের কাপড় পরতে আদেশ করেন? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জামা, পায়জামা, পাগড়ী ও টুপী পরিধান করবে না। তবে কারো যদি জুতা না থাকে তাহলে সে যেন মোজা পরিধান করে তার গিরার নীচ হতে এর উপরের অংশটুকু কেটে নিয়ে তোমরা যাফরান এবং ওয়ারস্ লাগানো কোন কাপড় পরিধান করবে না। মুহরিম মহিলাগণ মুখে নেকাব এবং হাতে হাত মোজা পরবে না। মূসা ইবনু ‘উকবাহ, ইসমা‘ঈল ইবনু ইবরাহীম ইবনু ‘উকবাহ, জুওয়ায়রিয়া এবং ইবনু ইসহাক (রহ.) নিকাব এবং হাত মোজার বর্ণনায় লায়স (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। ‘উবাইদুল্লাহ (রহ.) وَلاَ الْوَرْسُ এর স্থলে وَلاَ وَرْسُ বলেছেন এবং তিনি বলতেন, ইহরাম বাঁধা মেয়েরা নিকাব হাত মোজা ব্যবহার করবে না। মালিক (রহ.) নাফি‘ (রহ.)-এর মাধ্যমে ইবনুউমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, ইহরাম বাঁধা মেয়েরা নিকাব ব্যবহার করবে না। লায়স ইবনু আবূ সুলায়ম (রহ.) এ ক্ষেত্রে মালিক (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। (১৩৪)  (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭০৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৭১৬)

১৮৩৮. নং হাদিছের বর্ণনায় বলা হলো- //ইহরাম বাঁধা মেয়েরা নিকাব হাত মোজা ব্যবহার করবে না।//

    কিন্তু ১৮৩৩. নং হাদিছের বক্তব্যে বলা হলো- //আমরা ইহরাম অবস্থায় রাসুল (সাঃ)-এর সাথে ছিলাম। তারা আমাদের সম্মুক্ষে এসে পড়লে আমাদের স্ত্রী লোকেরা মাথায় কাপড় টেনে মুখ ঢাকতেন। আর তারা আমাদের সম্মুখ হতে দুরে সরে গেলে আমরা আমাদের মুখমন্ডল খুলতাম।//

    ১৮৩৮. নং হাদিছে ইহরাম অবস্থায় নারীরা চেহারা আবৃতকারী (নেকাব) এবং হাত আবৃতকারী (কুফ্ফাযাইন) পরবে না বলে নির্দেশ দেয়া হল। সুতরাং এই নির্দেশ পালন করতে হলে ইহরাম অবস্থায় মুখমণ্ডল ঢাকার প্রশ্নই আসেনা। অথচ ১৮৩৩. নং হাদিছের বক্তব্যে (আমাদের স্ত্রী লোকেরা মাথায় কাপড় টেনে মুখ ঢাকতেন) স্পষ্টভাবেই তা অমান্য করার বিষয়টি প্রকাশ পাচ্ছে। এক হাদিছের সাথে অন্য হাদিছের বক্তব্যের স্ববিরোধিতা এবং আল-কোরআনের বিধানের সাথে অসামঞ্জস্যতা থাকার কারণে এই হাদিছগুলো সহী কিনা কিংবা এগুলোর বক্তব্য সঠিকভাবে পেশ করা হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে খটকা লাগাটাই স্বাভাবিক নয় কি?

    এবার বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। পবিত্র কোরআনের সর্বমোট পাঁচটি আয়াতে ‘হিজাব’ শব্দটি এবং একটি আয়াতে ‘আকিন্নাতিন’ ও ‘হিজাব’ শব্দ দুটি একত্রে ব্যবহার করা হয়েছে-

    (৭:৪৬) উভয়ের মাঝখানে একটি আড়াল থাকবে এবং আরাফের (জান্নত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থান) উপরে অনেক লোক থাকবে। তারা সকলেই তাদের চিহ্ন দ্বারা চিনে নেবে। তারা জান্নাতীদেরকে ডেকে বলবেঃ তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তারা তখনও জান্নাতে প্রবেশ করবে না, কিন্তু প্রবেশ করার ব্যাপারে আগ্রহী হবে।

    (১৯:১৬) এই কিতাবে মারইয়ামের কথা বর্ণনা করুন, যখন সে তার পরিবারের লোকজন থেকে পৃথক হয়ে পূর্বদিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল।

    (১৯:১৭) অতঃপর তাদের থেকে আড়াল অবলম্বন করলো। অতঃপর আমি তার কাছে আমার রূহ প্রেরণ করলাম, সে তার নিকট পুর্ণ মানবাকৃতিতে আত্নপ্রকাশ করল।

    (৩৩:৫৩) হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া না হলে তোমরা আহার্য গ্রহণের জন্য তা প্রস্তুতির অপেক্ষা না করে নবীর গৃহে প্রবেশ করো না। তবে তোমরা আমন্ত্রণ করা হলে প্রবেশ করো, অতঃপর যখনই খাওয়া শেষ হয় তখনই চলে যাও, কথাবার্তায় মশগুল হয়ে যেয়ো না। নিশ্চয় এটা নবীর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কাছে সংকোচ বোধ করেন; কিন্তু আল্লাহ সত্যকথা বলতে সংকোচ করেন না। তোমরা তাঁর পত্নীগণের কাছে কিছু চাইলে বা প্রশ্ন করলে (min warāi ḥijābin) আড়াল থেকে চাইবে বা প্রশ্ন করবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্যে এবং তাঁদের অন্তরের জন্যে অধিকতর পবিত্রতার কারণ। আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেয়া এবং তাঁর পত্নীগণকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য কখনও উচিত নয় এবং আল্লাহর কাছে এটা গুরুতর অপরাধ।

    (৪১:৫) তারা বলে তুমি যে বিষয়ের দিকে আমাদেরকে দাওয়াত দাও, সে বিষয়ে আমাদের অন্তর/ হৃদয় (أَكِنَّةٍ – akinnatin) পর্দা/ ঢাকনা/ আবরণের মধ্যে রয়েছে, আমাদের কর্ণে রয়েছে বধিরতা এবং আমাদের ও তোমার মাঝে রয়েছে (حِجَابٌ – ḥijābun) অড়াল। অতএব, তুমি তোমার কাজ কর, নিশ্চয় আমরা আমাদের কাজ করছি।

    (৪২:৫১) কোন মানুষের জন্য এমন হওয়ার নয় যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন- ওহী প্রেরণ করা অথবা কোন আড়ালের আশপাশ থেকে অথবা কোন সংবাদ বাহক প্রেরণ করা ব্যতীত, অতঃপর তিনি (আল্লাহ) যা চান, সে তাঁর অনুমতিক্রমে তা অবতীর্ণ করে। নিশ্চয় তিনি সর্বোচ্চ প্রজ্ঞাময়।

    উল্লেখিত একটি আয়াতে (৩৩:৫৩) নবী পত্নীগণকে বা অন্য কোন নারীদেরকে পর্দা কিংবা ঢাকনা পরার নির্দেশ দেয়া হয়নি, বরং পুরুষদেরকেই আড়াল অবলম্বন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

    এখন বিবেকবান মুসলিম ভাই ও বোনেরা নিজেরাই বিচার করুন এবং সিদ্ধান্ত নিন- সন্দেহ মুক্ত নয় এমন কথা/ ব্যাখ্যা গ্রহণ করবেন, নাকি মহান স্রষ্টা প্রেরিত কিতাবের স্পষ্ট বাণী/ নির্দেশকেই সবার উপরে স্থান দেবেন।

Comments are closed.