লাশের মিছিলে মুনাফার হাসি

1031 জন পড়েছেন

‘শ্রমিক’ বলতে শুধু গার্মেন্টসই নয়, বরং সবধরনের পণ্যই বিদেশে যায়। সব শ্রমিকই এই সংজ্ঞার আওতাভুক্ত। লাশের মিছিল দেখেছে অনেকেই কিন্তু মুনাফার হাসি দেখেছে ক’জন? হাসির নাম- রানাপ্লাজা…। কিন্তু নজিরবিহীন দুর্ঘটনা সত্ত্বেও টাম্পাকোর ঘটনায় আবারো প্রমাণ, মুনাফাই সব। যেন কফিন ভর্তি করে পরকালে সব কিছুই নিয়ে যাবে। ১০টা রানাপ্লাজা আর তাজরীনের ঘটনা সত্ত্বেও অপ্রতিরোধ্য ওরা। ওরা বলতে, দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ী সমাজ। ওই দিবসগুলোতে রাষ্ট্রের নীরবতা এবং শ্রমিক নেতাদের দায়সারা কর্মকাণ্ডেই প্রমাণ, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই পারে, হইচইয়ের কিছু নেই, লাশপ্রতি কিছু দিলেই চলবে।’ রানাপ্লাজা এবং তাজরীনের ঘটনা খুব কাছে থেকে দেখেছি। অনেকের ঘরেই হাড়, আইডি, কোম্পানির ল্যাবেল। সস্তা শ্রমের অপব্যবহার এবং অমানবিকতায়, অদম্য বাংলাদেশ।

তাজরীন-রানাপ্লাজার ঘটনাকে এক ধরনের হত্যাযজ্ঞ বলা যায়। এখানে ভিক্টিম, নিম্ন মূল্যের শ্রমজীবীরা। এত বছর পরেও সোহেল রানা এবং দেলোয়ারের মতো রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের বেলায় কাঠগড়ার চেহারা না দেখাই স্বাভাবিক। কিন্তু নির্বাহী আদেশে কাদের বিরুদ্ধে সর্বক্ষমতা প্রয়োগ? বাংলাদেশের কর্মপরিবেশ, তৃতীয় বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বিপজ্জনক হওয়ার প্রমাণ আবারো দেখানো হলো। যতই দিন যাচ্ছে, লাশের মিছিলের সাথে মুনাফার হাসিও প্রলম্বিত হচ্ছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক, যাদেরই শ্রমিকদের রক্ষা করার কথা, তারাই যেন মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। বলছি, কনফ্লিক্ট ইন্টারেস্টের কুশীলব, আইন প্রণেতার ভূমিকা নেয়া ব্যবসায়ীদের কথা। ব্যবসায় সুশৃঙ্খলতা আনলে, তাদের ঘরেই আগুন।
দেশী-বিদেশী উভয়পক্ষই জানে বারবার দুর্ঘটনার কারণ। বিল্ডিং কোড ভঙের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও অ্যাক্টিভিস্ট, উভয়পক্ষই ড্যামকেয়ার। সব জেনেই বিদেশী লগ্নিকারকেরা টার্গেট বাড়াচ্ছেন। মাত্র ৪ ভাগ ইউনিয়নের খবর জানেন না? ৯৯ শতাংশ আইনপ্রণেতাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার খবরও জানে। টার্গেট বাড়ানোর বদলে সাময়িক কমিয়ে দিলে, বহু জীবন রক্ষা পেত। অপমৃত্যুর অধিকাংশ খবরই অপ্রকাশিত। ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলারের টার্গেট- অবিবেচনাপ্রসূত ও অগ্রহণযোগ্য।
প্রতিটি দুর্ঘটনার সাথে সাথে লাশপ্রতি ক্ষতিপূরণ ঘোষণা যেন মানবতার গালে চপেটাঘাত। টঙ্গিতেও পোড়া শেষ হওয়ার আগেই মাইক লাগিয়ে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা। ব্যবসায়ী আইনপ্রণেতাদের মানবতার সূচক কেন শূন্যের কোঠায়? যত দিন পর্যন্ত ব্যবসাকে ক্ষমতার রাজনীতির কব্জা থেকে আলাদা না করা হবে, দুর্ঘটনা বন্ধ হবে না। বিদেশী ব্যবসায়ীদের প্রধান সুবিধা, বাংলাদেশে সাংবিধানিক অধিকার এবং ইউনিয়নের বালাই নেই। জিএসপি নাটক আসলেই কী, যার বোঝার সে ঠিকই বুঝবেন! পণ্য রফতানি কি আমেরিকাতে বন্ধ আছে?
টঙ্গীর ঘটনার পরই একজন যথারীতি ব্যস্ত ক্ষমতা বাঁচাতে, অন্যজন মনের পশুকে জবাই দিতে দিতে বোবাই হয়ে গেছেন। এ দিকে কোরবানির ঈদের সাথে যুক্ত হওয়া ১২ দিনের বিদেশ সফর যেন শাপেবর। মিডিয়া ছুটছে তার পেছনেই, প্রথম সংবাদও তিনিই। এ দিকে লাশের সাথেই পুড়ে ছারখার টঙ্গীর ঘটনা। মিডিয়ায় তাজরীনের তুলনায় টাম্পাকোর আয়ু খুবই কম।
ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূতেরা সব অপকর্মের সাক্ষী, একমাত্র লক্ষ্য টার্গেট কিভাবে বাড়ানো যাবে। মানবাধিকারহীন দেশে সবচেয়ে সস্তা শ্রমের তালিকার শীর্ষে বাংলাদেশ, বিদেশীদের চোখে শাপেবর। মন্ত্রীদের দাবি, ‘জিএসপি না দেওয়াটা মার্কিন ষড়যন্ত্র এবং কারখানাগুলো শতভাগ নিরাপদ।’ জিএসপি রাজনীতি আসলেই কী?
জিডিপির শতকরা ৮৫ ভাগই গায়ে-গতরে শ্রমনির্ভর রফতানির ওপর নির্ভরশীল। গার্মেন্টসের ওপরেই মাইক্রোস্কোপ বসিয়ে রেখে অন্য সেক্টরগুলোকে গুরুত্বহীন করা হয়েছে। এর অন্যতম প্রমাণ টাম্পাকো। কারখানাগুলোকে নিরাপদ আর মানবিক করার দায়িত্ব পশ্চিমাদেরই। কারণ, তারাই বেশি সুবিধাভোগী। এক ডলার খরচ করে বিক্রি করা হয় ১৫ ডলারে। ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন টার্গেট দেয়ার কারণ পশ্চিমারা অলস। কাজ তাদের পছন্দ নয়। বড় অঙ্কের পারিশ্রমিক এবং বিভিন্ন সুবিধা চায়। মালিকের খুঁত খুঁজে বেড়ায়। মামলা লেগে গেলেই লাখ লাখ ডলার। বছরে ২০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে পশ্চিমারা মেদ ঝরায়। অথচ আমাদের শ্রমিক বাহিনী চিড়েচ্যাপটা। না আছে ন্যূনতম বেতন, না আছে ইউনিয়নের ক্ষমতা। গার্মেন্টস রফতানি নিয়ে উল্লাস না করে বরং অমানবিক সেক্টরের জন্য বিলাপ করাই মানবিক। একপক্ষ যখন ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায় লগ্নি করে, অন্যপক্ষ তখন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করে।
তদন্ত করলে দেখা যাবে, ৯৯ শতাংশ কারখানাই বিল্ডিং কোডের বাইরে। দেলোয়ার এবং সোহেল রানা দু’জনেই ব্লুপ্রিন্ট আর বিল্ডিং কোড ছাড়াই বহুতল ভবন বানিয়েছিলেন। ক্ষমতার চেয়ে বেশি ওজনের কারণে ধসে পড়েছে একটা, অন্যটার ফায়ার এক্সিট ছিল না। এটা পশ্চিমে হলে, সারা জীবন জেলেই পচতে হতো। ২০১০ সালে হাতিরঝিলে ছয়তলা ভবন ধসে পড়ার পর আবিষ্কার হলো, ভবনের ভিত্তিই নেই। ফিটনেসবিহীন ভবনের খবর রাজউক জানে না, তা সত্য নয়। বিজিএমইএ’র বহু বিতর্কিত ভবনটিও বিল্ডিং এবং পরিবেশ কোড ভঙ্গ করে তোলা। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের চেয়ে বিজিএমইএ’র ক্ষমতা বেশি না হলে আবারো এটা ঝুলে গেলো কিভাবে? কিন্তু ব্রেকিং নিউজের পরে কী?
২০১০ সালে নিমতলীর রাসায়নিক বিস্ফোরণের ঘটনা থেকে ক্যামেরা সরিয়ে দিলো দুই এতিম কন্যার বিয়ে। রানাপ্লাজা আর তাজরীনের গণহত্যাকে উড়িয়ে দিলো, ২০২১ সালে গার্মেন্টস রফতানির টার্গেট। টঙ্গীর ঘটনা থেকে ক্যামেরা চলে গেলো আজিমপুরে। খবর দিয়ে খবর ধামাচাপা দেয়ায় শ্রেষ্ঠ এ দেশ। শুধু আওয়ামী সরকারই নয়, সাংবাদিক, কলামিস্ট, অ্যাক্টিভিস্ট- সবার অভিযোগ, আমেরিকা নচ্ছাড় না হলে জিএসপি দিচ্ছে না কেন? উপরিউক্ত দৃষ্টান্তগুলোর পর, অধিকাংশ কারখানাই বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। জিএসপি আসলেই কোনো ইস্যু নয়।

২.
প্রশ্ন, আমেরিকা বনাম বাংলাদেশে ইউনিয়নের অধিকার। কথায় কথায় রাজনীতিবিদ ব্যবসায়ীদের মুখে বিদেশে ইউনিয়ন না থাকার উদাহরণ। কথাটি মোটেও সত্য নয়। কারণ, দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতেই পারে। পশ্চিমের কঠোর শ্রম আইন এবং ইউনিয়নের কারণেই, তৃতীয় বিশ্বে গার্মেন্টসসহ তৃতীয় শ্রেণীর অমানবিক শিল্পের উদ্ভাবন। তিল থেকে তাল খসলেই, লাখ লাখ ডলার খসাতে হয় পশ্চিমে। এসব কারণেই চাকরি পাচার। মার্কিন নির্বাচনেও প্রভাব ফেলেছে আউটসোর্সিং অর্থাৎ চাকরি পাচার। পশ্চিমে পারদর্শী ট্রায়াল ল’ইয়ারদের যন্ত্রণা অত্যধিক। আগে ক্ষতিপূরণ আদায়, পরে ভাগবাটোয়ারার শর্তে মামলা। চাকরি পাচার করে, মুনাফা আর মামলা, দুই সমস্যা থেকেই রেহাই। ওদের একজনের সারা দিনের বেতনের সমান বাংলাদেশী শ্রমিকের দুই মাসের বেতন। পেনসন ভাতার কথা বাদই দিলাম। ওয়ালমার্টের মতো কোম্পানিগুলো বছরে কত বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে, সে হিসাব ইন্টারনেটে রয়েছে। এসবের মূলে শ্রম আইনের যথার্থ প্রয়োগ, ইউনিয়নের অধিকার, লেবার অ্যাক্টিভিস্টদের কড়া অবস্থান। এমনকি অবৈধ ইমিগ্রান্ট হলেও ক্ষতিপূরণ দিতে সমস্যা নেই।
তাজরীন-রানা প্লাজার ঘটনা আমেরিকাতে ঘটলে, লাশপ্রতি কয়েক মিলিয়ন ডলার খসাতে হতো। নিহত-আহত সব মিলে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলারের ঝামেলামুক্ত হতে পেরেছে বিদেশীরা। উদাহরণস্বরূপ, দুই দশক আগে ধূমপানে মারা যাওয়ার মামলায় ‘ফিলিপস্ মরিস’ কোম্পানিকে খসাতে হয়েছিল ১৫০ বিলিয়ন ডলার, যার বর্তমান মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু আমাদের বেলায় ১০ মিলিয়ন ডলার দিতেও আপত্তি পশ্চিমাদের। মাগুরটিলা থেকে ২০১৬ সাল, ক্ষতিপূরণের তালিকা ৫০০ বিলিয়নের কম নয়। আমাদের বেলায় মাইক মেরে লাশ প্রতি পাঁচ হাজার থেকে দুই লাখে সারে। ক্ষতিপূরণেরও আবার সিন্ডিকেট আছে।
শ্রমনির্ভর দেশে মাত্র চার শতাংশ ইউনিয়ন যেন অপরাধের অভয়াশ্রম। যুক্ত হয়েছে, সংসদ সদস্যদের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের গার্মেন্টস এবং অন্যান্য ব্যবসা। বিনিময়ে শ্রমিকেরা কী পায়, সবাই জানে। অথচ রাজধানী মানেই, ‘গার্মেন্টস কন্যাদের নগরী।’ সংসদে রওশন এরশাদের অভিযোগ, রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণতহবিলে আসা ১০৮ কোটি টাকা কোথায় গেলো?
বিদেশী কোম্পানিগুলোর চোখে বাংলাদেশী শ্রমিকেরা কোহিনূরের মতো মূল্যবান হওয়ার কারণ অনেক। একমাত্র বাংলাদেশেই অবিশ্বাস্য কম মূল্যে শ্রমিক পাওয়া যায়। অন্য দিকে, ভারতের মতো দেশগুলোতে মজুরি এবং ইউনিয়নের সুবিধা বাড়ছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শ্রম অধিকারের দাবিও বাড়ছে। বিদেশীদের টার্গেট পূরণ হতে দিলে, নিম্ন শ্রেণীর শ্রমজীবীদের সংখ্যা বাড়বে। ইতর শ্রেণীর লেবারফোর্স কারোই কাম্য নয়। একে উন্নতি বলা যাবে না। কারণ মূল্যবান গ্যাস-বিদ্যুৎ পুড়িয়ে লাভ করছে বিদেশীরাই। একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে, কিভাবে উজাড় করে দিচ্ছি নিজেদের অমূল্য সম্পদ। বার্ষিক আয়ের বিনিময়ে হয়তো গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণই বেশি।

ইউনিয়ন ছাড়া শ্রমিক আর এতিম, একই রকম ঝুঁকিপূর্ণ। যত দিন পর্যন্ত আইন প্রণেতারাই মোটা দাগে ব্যবসায়ী, ইউনিয়নের অধিকার কিংবা নিরাপত্তা কোনোটাই হবে না। খবরে যত সহজভাবে দেখায়, মনে হয় যেন পুড়ে মরাতে যন্ত্রণা নেই। তপ্ত কড়াইতে আঙুল রেখে দেখা যেতে পারে, জ্যান্ত মানুষ পোড়ার কষ্ট কী রকম! এ কথাগুলো সংসদ সদস্যরা কবে বুঝবেন? টঙ্গীতে আসলেই কয় শ’ পুড়েছে? ইউনিয়ন থাকলে ডাটাবেজ ছাড়াও অন্যান্য হিসাব থাকত। পুড়ে ছাই হলেও হালনাগাদ হতো স্বজনদের। প্রতিটি দুর্ঘটনার পরেই ভিকটিমদের হদিস পায় না স্বজনেরা। এই সিস্টেম আর চলতে পারে না। মৃতের সংখ্যা কয়েক শ’ হওয়ার আশঙ্কার কারণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে ঈদের আগে ২ শিফটের শ্রমিক তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। বারবার দুর্ঘটনা সত্ত্বেও, এখনো তালাবদ্ধ অবস্থায় কাজ করানো হয় কিভাবে? রানা প্লাজার পরেই ৭৫ শতাংশ সংসদ সদস্যের গার্মেন্টস ব্যবসা নিয়ে ২০১৩ সালে ওয়াশিংটন পোস্টের কলামে পিলে চমকানো তথ্য। এক সংসদ সদস্যের অর্থের পরিমাণ ২০০ মিলিয়ন ডলার। এরকম কলাম বহু লিখছে পশ্চিমারা। কিন্তু টার্গেট এবং দুর্ঘটনা, কোনটা কমেছে?
আইন করে ইউনিয়নের অধিকার বন্ধ করার প্রমাণ বহু। ইউনিয়ন করতে গেলেই গুম-খুন-নির্যাতন। শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের কথা অনেকেরই জানা। ভুয়া শ্রমিক নেতা সৃষ্টি করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। অনেকেই ট্রেড ইউনিয়নকে ব্যবসা বানিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, তালা না থাকলে অনেক শ্রমিক বেঁচে যেত। বন্ধ গ্রিলের ভেতরে ‘সত্যবাবুদের’ পুড়ে যাওয়ার ছবি গুম করা যায়নি সোস্যাল মিডিয়া থেকে। শ্রমিক অসন্তোষের বিরুদ্ধে, ২০১০ সালে ‘শিল্প পুলিশ’ বানিয়ে অমানবিক কাজ করানো হচ্ছে। কারণ এই আমলে ব্যবসায়ী সংসদ সদস্যদের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। টঙ্গীতে ধসে পড়া ভবনগুলোর আয়তন চারটি রানা প্লাজার সমান কিভাবে হলো, উত্তর ইতোমধ্যেই দিয়েছি।

রানা প্লাজার বেলায় পশ্চিমা সাংবাদিকদের ভিসা দেয়া হয়নি। ‘রানা প্লাজা’ ছবিটিও নির্বাহী ক্ষমতায় চিরতরে নিষিদ্ধ। কিন্তু সবকিছুতেই ধামাচাপা দিয়ে এত ভয় কাকে? টাম্পাকো থেকে কাকতালীয়ভাবে ক্যামেরা গেলো আজিমপুরে। আজিমপুর বনাম টঙ্গীর ব্রেকিং নিউজের সংঘর্ষ। বিশেষ ভবনভিত্তিক সাংবাদিকদের জন্য সাংবাদিকতার ‘এথিক্স’ গুরুত্বপূর্ণ নয়। রাষ্ট্রদূতেরা ঢাকায় বসে নিশ্চিত করছেন যার যার মুনাফা। এটাই তাদের পররাষ্ট্র নীতি। তাদের অবহেলার কারণেই মৃত্যুকূপগুলো এভাবে সচল। ব্রেকিং নিউজের পর সাংবাদিকদের দায়িত্ব কী?
সুতরাং যে সরকারই মুনাফা নিশ্চিত করবে, গণতন্ত্র সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। পশ্চিমারা জেনেশুনেই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ বর্জন করেছিলেন। পরবর্তীতে ৫ জানুয়ারির সরকারকে গ্রহণ না করলেও বর্জন না করার প্রমাণ তারাই দিচ্ছেন। অনির্বাচিতদের সঙ্গে পশ্চিমের নির্বাচিত সরকারগুলোর সরাসরি যোগাযোগের ঘটনা- অগণতান্ত্রিক এবং শিষ্টাচারবহির্ভূত। শ্রম আইন প্রয়োগের পথে প্রতিবন্ধক আইন প্রণেতা-ব্যবাসায়ীদের তালিকা রাষ্ট্রদূতদের হাতে। ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা এবং কনফ্লিকট অব ইন্টারেস্টের খুঁটিনাটি জেনেই ব্যবসা দিচ্ছে। কোন পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের ওপর ২০ বছর নিষেধাজ্ঞা? রাজনৈতিক শিষ্টাচার ফিরিয়ে আনতে ন্যাশনাল ডায়লগ অবশ্যই জরুরি। সংসদে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা সুচির অংশগ্রহণের বিষয়টি নিষ্পত্তির পর, মানবাধিকারের প্রশ্ন টেবিলে রেখে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলো আমেরিকা। ‘কারণ অনেক। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় সবকিছুই যেন ব্যতিক্রম।
সর্বনিম্ন মূল্যে সর্বোচ্চ মুনাফার যুক্তিতে, তাদের কাছে এথিক্স, আইন এবং বৈধ সরকার- সবকিছুই অপ্রাসঙ্গিক। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ- অপ্রয়োজনীয়। রানা প্লাজার পুনরাবৃত্তি হলেও সমস্যা নেই। ভবিষ্যতে বারবার ৫ জানুয়ারি হলেও, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের মুনাফা নিশ্চিত হবে, গণতান্ত্রিক নির্বাচন- অপ্রাসঙ্গিক। কারণ তারা জেগে জেগে ঘুমান।
টঙ্গীর ঘটনা আজিমপুরের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবুও মন্ত্রীদের সেদিনও টকশোতে উন্নতির সাফাই গাইতে দেখে অবাক হইনি। ঘটনাস্থলে শ্রমিক নেতাদের অনুপস্থিতিতে বিস্মিত নই। টকশোগুলোতে অধিক গুরুত্ব পাওয়া আজিমপুর নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। কারণ এখন আর কিছুতেই অবাক হই না। ৭ দিন পরেও আগুন নেভেনি। পোড়া ছাইয়ের ভেতরে স্বজনদের ‘ডিএনএ’-এর প্রমাণ থাকল না; কিন্তু থাকবে মুনাফার হাসি।

মেইল: farahmina@gmail.com

পূর্ব প্রকিশিত: নয়া দিগন্ত

1031 জন পড়েছেন

Comments

লাশের মিছিলে মুনাফার হাসি — ১ Comment

  1. সালাম,
    গবেষণাধর্মী লেখাটির জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ-

    ব্যবসায়ে লাভ-ক্ষতির হিসেব কষাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তারও তো একটা সীমা থাকা চাই। আমাদের দেশের ব্যবসায়ী মহলের অধিকাংশই এমনই মুনাফা লোভী যে, তাদের কাছে মানবতার বিষটিও মুনাফার হিসাব নিকাশের বহিরে নয়। এক্ষেত্রে মানবতা যেন প্রায়শই মুনাফার সামনে মুখ থুবড়ে পড়ছে। কয়েকটি বাস্তব ঘটনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ বহন করছে। দেশের মানুষই যদি এরূপ আচরণে লিপ্ত হয়, তাহলে বিদেশিরা তো এর ফায়দা লুটবেই।
    রাজনীতির ময়দানে ব্যবসায়ীদের সংখ্যাধিক্য ও স্বজনপ্রীতির কারণে বড় বড় দূর্ঘটনাগুলো কৌশলে ধামাচাপা দেয়ার যে নজির সৃষ্টি হচ্ছে তা শুধু দুঃখজনকই নয়, লজ্জাস্করও বটে।
    এ অবস্থা থেকে অচিরেই বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ অন্ধকারই বলতে হবে।