সামাজিক উলটপালটে পিস টিভি প্রসঙ্গ

1030 জন পড়েছেন

ভূমিকা 

বিগত বছরগুলো ধরে বাংলাদেশে যেসব ঘটনা ঘটছে সেগুলোর দিকে সমাজ দার্শনিক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে সামাজিক পরিবর্তনের কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য নজরে আসবে। স্পষ্টত, এগুলোর প্রকৃতি দ্রুত (rapid) এবং অবক্ষয়-তাড়িত। সমাজের পরিবর্তন সাধারণত মন্থর। দ্রুত পরিবর্তন অস্বাভাবিকভাবে হয়। কোন প্রতিষ্ঠিত সমাজের প্রকৃতি, অবকাঠামো ও তার নৈতিক ভিত্তিকে অক্ষত রেখে অকস্মাৎ পরিবর্তনের উপায় নেই, যেভাবে পুরানো ঘর না ভেঙ্গে সেই ভিত্তিতে নতুন কিছু গড়ার সহজ পথ নেই। নতুন সমাজের  জন্য পুরাতন নিশ্চিহ্ন হতে হবে; নতুন শ্রেণী অর্থবিত্তের অধিকারী হতে হবে, ক্ষমতার অধিকারী হতে হবে। এই ধরণের উত্থান-পতনের জন্য চাই প্রথমেই বিচারহীনতা, আইন শৃঙ্খলার বন্ধন উন্মোচন। এর হাত ধরে আসে গণসম্পদের চরম হরিলুট, ধামাচাপার রাজনীতি। আর এই ধারা বেয়ে আসে গুম, হত্যা, ক্রস-ফায়ার এবং হরেক রকমের নাটক। একটি সমাজের পেথোলজির দিকে তাকালে তার পীড়া বা তকলীফ বোঝা সহজ হয়।

ইদানীং পিস টিভি বন্ধ করা হয়েছে। আগে দিগন্ত  টিভি এবং ইসলামিক টিভি চ্যনাল দুটি। সাথে ছিল আরও কিছু সংবাদ মাধ্যম। দেশের প্রধান প্রধান ধর্মীয় দলের উপর আক্রমণ এসেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপরও এসেছে। জাতীয় সম্পদের হরিলুট হয়েছে। গুম, হত্যা, ক্রস ফায়ার হয়েছে (এবং এগুলো চলছেই)। এই পরিবর্তনমুখী উলুধ্বণির প্রতি কর্ণপাত করলে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘সেক্যুলার’ ধ্বণি প্রধান হয়ে আসবে। এগুলো গুঁজনধ্বনি এবং এদের লক্ষ্যধ্বণি হচ্ছে জঙ্গি, সন্ত্রাসী। 

পিস টিভি সন্ত্রাসের অভিযোগে বন্ধ হয়েছে। পিস টিভি মুসলিম সমাজের একটি সংখ্যালঘু দলের প্রচার মাধ্যম ছিল। এই দলটি বাংলাদেশের এবং বিশ্ব মুসলিমের মধ্যে অতি ক্ষুদ্র একটি দল হলেও, (এবং তাদের মধ্যে কিছু ধর্মীয় বাড়াবাড়ি থাকলেও, যার কথা পরে উদাহরণসহ আসবে), তারা সন্ত্রাসী নয় এবং জাকির নায়েকের উপর সন্ত্রাসের অভিযোগ কেবল সত্যের অপলাপই হতে পারে। এটা কেবল মতলবাজ ও ঔপনিবেশবাদের ছত্রছায়ায় আনা যেতে পারে।

ইতিপূর্বে আক্রমণ ও নির্যাতনের শিকার হওয়া প্রধান প্রধান মুসলিম দলের কথা বাদ দিয়ে চোখ অন্যত্র  স্থাপন করলে দেখা যাবে যে স্বর্গের এজেন্টদের ধর্মকে নিরাপত্তায় রাখা হচ্ছে। যেসব বাবা তাদের স্বর্গীয় জাহাজে  তোলে সকল ঘুষখোর, মদখোর, ভূমিদস্যু, ব্যাঙ্কলুটার, নারী-পাচারি, বেশ্যার পিম্প -সবাইকে আল্লাহর বিচার থেকে সরিয়ে সহীস-সালামতে স্বর্গের আসনে নিয়ে বসাবেন আজ সেই বাবাদের ধর্মই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। মুরগী-চোর থেকে দলীয় কারসাজিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চাসনে বসা গাড়ি বাড়িসমূহের মালিক, রাস্তায়-রাস্তায়-ঘোরা অপদার্থদের মিডিয়া টাইকুন হওয়া, কেরানি থেকে বিলিয়নিয়ার হওয়া বিত্তবান -এরা সবাই এই পরিবর্তনের সুবিধাভোগী (beneficiaries)। তারা মাফিয়া-মিডিয়ার মাধ্যমে অনবহিতের (unwary/unsuspecting) কাছে জাতীয় আবেগ বিক্রি করেছে। এই আবেগকে বাজারজাত করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে, বিদেশিদের সহায়তাও নিয়েছে। তারপর অসাম্প্রদয়িকতা ও সেক্যুলার মুখোশ পরে জঙ্গি, জঙ্গি হেঁকেছে এবং এভাবেই নিজেদেরকে দ্রুততরভাবে একটি ক্ষমতাবান শ্রেণিতে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।

পরিবর্তনের ময়দানে আরও যা দৃশ্যগত হতে পারে তা হল:  শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন; কালচার ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে জাতীয় সংস্কৃতির ভিন্ন রূপায়ন; ধর্মীয় ক্ষেত্রে দেওয়ানবাগী, উরসবাদী-ধর্ম ও পৌত্তলিক সভ্যতার প্রাধান্য দান; রাষ্ট্রযন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুসমূহ ইসলামী ভাবাপন্নদের ঊর্ধ্বে স্থাপন; এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ধারাবাহিকতা পাকাপোক্তকরণ।

তবে ইদানীং পিস-টিভি বন্ধ করায় সরকার ও আহলে হাদিস/সালাফি বিষয়টি নানান আলোচনায় অগ্রবর্তী হয়ে এসেছে। তাই উপরের কথাগুলো নেপথ্যে ছেড়ে দিয়ে এই বিষয়ের উপর কিছু কথা রাখতে চাই।

সরকার ও পিস-টিভি

আমি নীতিগতভাবে পিস-টিভির প্রতি সমর্থন দিচ্ছি কিন্তু সালাফি/আহলে হাদিসদের অনেক কর্মকাণ্ড আমার দৃষ্টিতে ধর্মীয় সৌহার্দের পরিপন্থী –আমি মুসলিম সমাজের কথাই বলছি। সম্ভবত কথাটি বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বেশি সত্য। তবে সরকারের ক্রিয়াকর্মে যেমন নানান বৈশিষ্ট্যের বিরূপ সমাহার রয়েছে, পিস-টিভির পিছনেও রয়েছে নানান বৈশিষ্ট্যের সমাহার।

বর্তমান সরকার যেমন একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতার হকদার ভাবে, দেশের ইতিহাসের একচ্ছত্র ভাষ্যকার ভাবে, জাতির একমাত্র এজেন্ট ভাবে, তেমনি আহলে হাদিস/সালাফিগণ ইসলামের তথাকথিত তেহাত্তর দলের একমাত্র  সত্য-সঠিক দল ভাবে, আল্লাহ-রাসূলের কথার মূলে আসল কোন অর্থ নিহিত সেই সত্য তারাই যেন একচ্ছত্রভাবে বুঝে এবং তারা ব্যতীত বাকি সবাই কোন না কোন উপায়ে সহীহ হাদিসের উপর আমল করতে ব্যর্থ। সৌদি থেকে বাংলা পর্যন্ত তারা সরকার ব্যবস্থার তেমন সমালোচক নন। মিশরে সংগঠিত একটি আন্দোলনে যখন আরেকটি দল ক্ষমতার চেয়ারে বসে যেতে পারে এই সম্ভাবনায় এসেছিল তখন রাজনৈতিক কোন অভিজ্ঞতা ছাড়াই তারা (সালাফিগণ) ওদের সাথে জড়িয়ে পড়ে এবং তাদেরকে গাছে তোলে মইখানা সরিয়ে নেয়।  এটা ছিল রাজনৈতিক প্রজ্ঞা গড়ে উঠার অভাবেই, উদ্দেশ্য প্রণোদিত নয়। তবে ঘটনা থেকেই গেল যে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে সেনাশাসনের  সমর্থন দেয়া হল, এবং মাশাল্লাহ এখন অবস্থা সেই চিরকালের মতই।

বাংলাদেশে সরকারের সাথে তাদের সম্পর্ক অনেকটা সৌদি শাসকের সাথে যেমন তেমনি ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আর সৌদির ক্ষমতাসীনদের মনোবৃত্তি ও ধর্মীয় প্রকৃতি আকাশ পাতালের পার্থক্যে। সৌদির আভ্যন্তরীণ ও পারিপার্শ্বিক সমাজ সংস্কৃতি ও বাংলার আভ্যন্তরীণ ও পারিপার্শ্বিক সমাজ সংস্কৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানকার মুসলিম নামধারী এক মহলে ইসলাম নিয়ে যে এলার্জিতে ভোগেন এবং যে কারণে দেশের সমাজ ব্যবস্থা থেকে ইসলাম নির্বাসনেসচেষ্ট থাকেন, সেটার অস্তিত্ব বা সমান্তরাল কিছু সৌদিতে নেই।

কিন্তু ঘটনা যা’ই হোক, বাংলাদেশ সরকার তাদের টিভি ফিরিয়ে দিলে তারা সরকারের লোক হয়েই থাকবে। মিশর, সৌদির মতই। কিন্তু সরকারের ভিতরে সেটি না হতে দেয়ার একটি আদর্শ এখন অন্যভাবে সক্রীয় মনে হচ্ছে। তা না হলে এই ঘটনা এভাবে ঘটত বলে মনে হয় না।

সরকার ইতিপূর্বে বিভিন্ন ইসলামী দলের উপর সাড়াশি আক্রমণ চালালেও সালাফিদের সাথে তা করা হবে –এমনটি তারা হয়ত ধারণা করে নি। তারাই সত্য ইসলামের লোক –এমন সরল বিশ্বাসই হয়ত কাজ করে থাকবে। কিন্তু ইনু-মুনু-শরি-জা-মোজা গংদের সংস্কৃতি কোথায় এবং সালাফি অবস্থান কোথায় তা যে তারা বুঝতে ব্যর্থ হবে –এমনটি হতে পারে না। বরং স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপারটি সময় সাপেক্ষ ছিল। যেমনভাবে জামাতের ঠ্যাং ভেঙ্গে তবেই বিএনপির ঠ্যাং ও হাড্ডি ভাঙ্গার পরিকল্পনা। ২০১০ সাল থেকে যখন জামাতের উপর আক্রমণ চলে তখন বিএনপি নীরব ছিল, ভাবেছিল, ওদেরকে মেরে যদি সন্ত্রাসী জালেমদের আক্রোশ প্রশমিত হয়ে যায়, তো মাশাল্লাহ ভালই। কিন্তু বিষয়টি হয়ে দাঁড়িয়েছিল মার্টিন নীমুলারের ‘দে কেইম ফার্স্ট’ কবিতার মত। এটা সালাফিদের ব্যাপারেও এবার সত্যে পরিণত হল। এখন তারা যদি এই ধাক্কা থেকে ঐক্যের শিক্ষা গ্রহণ করেন তবে ভাল, নইলে যেই সেই।

স্থান-কাল, রাজনীতি ও সংহতির দাবি  

বাংলাদেশ সৌদি নয়। এখানে ভিন্ন আঙ্গিকের ধর্মীয় সম্প্রীতি, সংযত ভাষা ও উদার দৃষ্টির প্রয়োজন। (তবে সর্বাবস্থায়ই তা প্রয়োজন)। কিন্তু সালাফি/আহলে হাদিসদের মাযহাবি আক্রমণ এবং নিজেদের অবস্থানকে খোদায়ী এজেন্সির মত করে দেখা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর কুফুরি আরোপণ করা –এসব সম্প্রীতির প্রতিকূলে থেকে যায়। লক্ষণীয় যে কেউ বিদাত করে থাকলেও কাফের হয়ে যায় না।  এসব সমস্যা আমরা হাজার বছর আগেই সমাধান করেছি, নতুনভাবে সেই পুরানো সমস্যার দ্বার উন্মোখ ঠিক নয়। যারা এক কিবলার লোক, যারা আমাদের হালাল-হারামের অনুবর্তী, যারা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, হজ্জ করে, যাকাত দেয়, তারা গোনাহের কাজ করলেও আমাদের দ্বীন-ধর্ম থেকে বেরিয়ে যায় না। ছোট গোনাহ হোক, বড় গোনাহ হোক, কিন্তু কুফুরিতে টানা যাবে না। কবিরাহ গুনাহ করলেও ঈমান বহির্ভূত হবে না (আবুল ইজ্জ আল-হানাফি, (২০০২), শারহ আল-আকীদাহ আত-তাহাওয়্যিয়াহ, কায়রো: দার ইবন রাজব, পৃ. ২৯২)। সুতরাং, অতীতের মত ফতোয়াবাজি শুরু হলে আমাদেরকে সেই খারেজি/মু‘তাজিলি বিবাদে নেমে পড়া হয়ে যাবে।

অসহিষ্ণুতা ও তাকফীর

এখানে উদাহরণসহ কিছু কথা আনতে যাচ্ছি। মতিউর রাহমান মাদানি নামের একজন আলেমের কথাবার্তা দেখুন,  লিঙ্কটি প্রথমে দেখুন। এখানে বলা হচ্ছে, যারা ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী তারা মুসলিম নয়, তাদের নামাজ, রোজা করার দরকার নেই। কথাগুলো ব্যতিক্রমধর্মী (exception) ভাষায় আসতে পারত, কিন্তু আসে নি। কেউ ধর্মনিরপেক্ষ বা কমিউনিস্ট হলে অমনিতেই নাস্তিক হয়ে যায় না। আমরাও নিজেরাও এই আদর্শগুলোর সমালোচনা করি কিন্তু বিষয়ের অবস্থানগত সীমা ও আঙ্গিনাকে সামনে রেখেই করি। লাখো লাখো এমন লোক রয়েছেন যারা আর্থ-সামাজিক দর্শনে কোনভাবে কমিউনিস্ট অর্থ ব্যবস্থাকে যথার্থ ভেবে নিয়েছেন কিন্তু আল্লাহ রাসূলে বিশ্বাস হারান নি। অধিকন্তু অনেকে আবার সেই ব্যবস্থাকে ইসলামের সাথে ব্যাখ্যাগত রূপ দিয়ে রূপায়িত করেছেন। তাদের চিন্তায় ভুল থাকতে পারে। কিন্তু সেই ভুল এই ভাষা দিয়ে সংশোধন সম্ভব নয় এবং এভাবে তাদের নামাজ রোজা এবং যাবতীয় আমল বাতিল করা কতটুকু প্রজ্ঞা-প্রসূত তা অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। এমন ভাষা ও আক্রমণ সরাসরিভাবে সামাজিক দ্বান্দ্বিকতা সৃষ্টি করতে পারে। আবার তাদের প্রতিপক্ষ চাইলে ফতোয়ার নলও ঘুরিয়ে দিতে পারেন। আজ ধর্মীয় দলের ভাষা সংযত হওয়া জরুরি কেননা ইসলাম কোনো এক পক্ষের পৈতৃক সম্পত্তি নয়। মাথায় আলখেল্লাহ পরিয়ে আল্লাহর পক্ষে কথা বললেই সেই কথা বা ব্যাখ্যা আপনাতেই ‘আল্লাহর কথা/ব্যাখ্যা’ হয়ে যায় না।

উল্লেখিত মতিউর রাহমান নামক ব্যক্তি হেফাজতে ইসলামের আমীর মুফতি শফি ছাহেবকে কুফুরি, এমন কি নাস্তিক্যবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। কী সাংঘাতিক কথাবার্তা! মুফতি ছাহেবের কলেমার জিকিরকে তিনি মিথ্যাচার ও ব্যঙ্গোক্তিতে নিয়ে বলছেন, ‘ইল্লাল্লাহ’ মানি ‘কিন্তু আল্লাহ’। শফি ছাহেব তার লা ইলাহা ইল্লাল্লার জিকিরের মাধ্যমে কুফুরি করেছেন (ভিডিও লিঙ্ক)! নায়ূজুবিল্লাহ।

কিন্তু এক্ষেত্রে, ইল্লাল্লাহ মানি কি  ‘কিন্তু আল্লাহ’? মতিউর রাহমান নাকি শিক্ষকও ছিলেন! কিন্তু এসব কি কথা? এখানে আলাদাভাবে হলে, ‘ইল্লাল্লাহ’ ‘এক মাত্র আল্লাহ’ হবে, ‘কিন্তু আল্লাহ’ নয়। তারপর, প্রাথমিকভাবে, ইলাহ হবে মা’বুদ অর্থে, উপাস্য অর্থে। অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কোন উপাস্য নাই। তারপর ধরুন আমরা তার ‘কিন্তু’কে মেনে নিলাম। তারপর কেউ যদি ‘কোন উপাস্য নাই, কিন্তু আল্লাহ’ বলে, তবে তা কি নাস্তিকতার কলেমা হয়ে যায়? এই কথা বলার কারণে কি মুফতি শফি ছাহেব কুফুরি করে ফেলেছেন? এই যে মাদানিদের নাদানী কথাবার্তা এসব সামাজিক সংহতির প্রতিকূলে। ধরুন শফি ছাহেবের কোন ভক্ত যদি তার মজলিসে থাকত তবে হয়ত পায়ের জুতা খুলে তার মুখে মারত। তখন কি হত? এই সমস্যা তখন কার কারণে ঘটে থাকত –আলেমের কারণে না জালেমের কারণে? এভাবেই চলছে অনেক নাদান সালাফিদের “প্রজ্ঞাপ্রসূত” দ্বীনে ইসলামের খেদমত! তাদের কাছে আহমদ শফির ধর্ম হয়ে পড়ে কার্ল মার্ক্সের ধর্ম! এটা মতি সাহেবের কোন ভীমরতি হল? তিনি কার্ল মার্ক্সও পড়ে ফেলেছেন! তারপর শফি ছাহেবের বই না পড়ে, বক্তব্যের স্থান না বুঝে, ফাতোয়াবাজির সাফাইও গাইছেন!

ইদানীং জাকির নায়েক সাহেব ও কোরান-সুন্নাহ যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে। পিস-টিভির ‘বিরোধিতাকে’ কুফুরির সাথে তুলনা করা হচ্ছে। ভয়ের বিষয় বটে। কেননা, কোনো দ্বিমত পোষণ করলেই তা বিরোধিতা ধরা হতে পারে। অতঃপর সমালোচক ইয়াহুদী-খৃষ্টিয়ানদের দালাল হতে পারেন, বা অজ্ঞ মুসলিম হতে পারেন, বা মাজার পূজারি হতে পারেন (এই লিঙ্ক দেখুন)। এতে বাড়াবাড়ি প্রকাশ পাচ্ছে। (আপনাদের কারো যদি কোমরে ব্যাথা হয়, তবে মুফতি ইব্রাহীম সাহেবের  এই ভিডিও নিজেদের স্ত্রীদের দৃষ্টি-সীমার বাইরে রাখবেন। কেননা, তারা দেখলেই বলে উঠতে পারেন, ‘আপনি যদি অপর নারীর দিকে দৃষ্টিপাত না করে থাকলেন, তবে আপনার কোমরের ব্যাথা আসল কিভাবে?) আবার তাদের কেউ কেউ নিজেদেরকে এই উম্মতের “ডাক্তার” বানিয়ে তিক্ত ঔষধ সেবন করাচ্ছেন (লিঙ্ক)

এতটুকু আলোচনার পরে এটা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না যে পিস-টিভি আহলে হাদিস/সালাফি মতবাদের একটি বাহন এবং এই মতবাদটির ধর্মীয় অবস্থান প্রাচীন প্রতিষ্ঠানাদি (যেমন আলআজহার/দেওবন্দ) থেকে নানান দিয়ে ভিন্ন। এটিই ওয়াহহাবিজম যা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবের সাথে সমন্বিত আন্দোলন।

সালাফি দল ও অন্যরা

বাংলাদেশে আহলে হাদিস/সালাফিদের জিহাদের ক্ষেত্র নিছক দেওয়ানবাগী-উরসবাদীদের মধ্যে সীমিত নয়, তা বরং জামাত, তবলীগ, খিলাফত, হেফাজত তথা গোটা দেওবন্দী স্কুল, না বরং গোটা হানাফি সম্প্রদায় পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত। পিস-টিভির একজন বক্তা কাজি ইব্রাহীম সাহেবের ধারণা হয়েছে যে বাংলাদেশে নাকি আলেমদের মধ্যে লাখে দু/চারজন ছাড়া কেউ ‘মাযহাব’ বুঝে না (লিঙ্ক), সাধারণ পাঠক ও শিক্ষিত শ্রেণী দূরে থাকুক!

সালাফিদের দৃষ্টিতে প্রচলিত মাযহাবগুলো যেন জাল/ভুল হাদিসের সমন্বয়ে গঠিত, এবং মাযহাবের ইমামদের কাওল: ‘শুদ্ধ হাদিস পেলে শুদ্ধটাই অনুসরণ করতে হবে’, এই কথার বারংবার উদ্ধৃতি টানাতে সালাফিদের এই ধারণাই বলবৎ দেখা যায় যে ইমামদের নিকট জাল/ভুল হাদিস ছিল এবং এখন যেহেতু তাদের কাছে (সালাফি/আহলে হাদিসদের) শুদ্ধ হাদিস ও ধর্মের শুদ্ধ ব্যাখ্যা পাওয়া গিয়েছে তাই ইমামদের মত-পথ ত্যাগ করে সালাফি নির্বাচিত এবং তাদেরই ব্যাখ্যায় সজ্জিত খাটি ইসলামে পদার্পণ করতে হবে। এটাই সত্যিকারের ইসলাম।

কিন্তু তাদের এই অবস্থানে নতুন কিছু নেই। পুরাতন দর্শনের পরিভাষায় এরা হচ্ছেন আহলুল-নাকল (أهل النقل) অর্থাৎ সংক্ষেপে, কেবল “আল্লাহ বলেছেন”, “রাসূল বলেছেন” –এইসব উদ্ধৃতির সমাহারে সাজানো “মতবাদ” এবং এরই প্রতিকূলে সেদিন ছিল আহলুর-আকল (أهل العقل) অর্থাৎ, সংক্ষেপে, কোরান-হাদিসের বাণী যুক্তি/আকল ভিত্তির সমাহারে সাজানো পথ। মূলের দিক থেকে আহলুল-নাকলকে প্রাথমিক যুগের খারেজিদের মতবাদের সাথে সমন্বয় করা যায় যদিও বিষয়টিতে অনেক পার্থক্য ও ব্যাখ্যা সাপেক্ষতা রয়েছে এবং দ্বিতীয়টি এই চরমধর্মী আন্দোলন ও দ্বন্দ্ব-কলহের মোকাবেলায় এক সময় যে মু’তাজিলি আন্দোলন রূপলাভ করেছিল -সেটির সাথে। এখানেও অনেক পার্থক্য ও ব্যাখ্যা সাপেক্ষতা রয়েছে।

সালাফি শব্দ ও ধারণা

‘সালাফ’ অর্থ পূর্ববর্তী আর ‘খালাফ’ অর্থ পরবর্তী। কোরানে ক্রিয়াবাচক শব্দ হিসেবে ‘সালাফা’ শব্দটি অতীতে ঘটে যাওয়া আমল বা কাজ বুঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। পূর্ববর্তী লোক হিসেবে একটি মাত্র ব্যবহার এসেছে কিন্তু তা কোন সম্মানসূচক অর্থে নয়। আল্লাহ ফিরাউনকে ডুবিয়ে মেরে এই পূর্ববর্তী (সালাফ) জালেমদের উদাহরণ পরবর্তীদের জন্য স্থাপন করেছেন –এই অর্থে (৪৩:৫৬)।  আবার যে হাদিসে রাসূলের (সা) পরের প্রথম ৩ শতাব্দীর বিবরণ এসেছে, সেখানে সালাফ শব্দ ব্যবহৃত হয় নি। অধিকন্তু ৪ মাযহাবের ৪ ইমামই সেই ৩ শতাব্দীর লোক। ওই কাল থেকে সালাফি ধরা হলে তারা সবাই সালাফি। আবার এই ৩ শতাব্দীতে অনেক ফিতনা ফ্যাসাদ ঘটেছে।  খারেজি ফিতনা প্রথম শতাব্দীতেই শুরু। ৪ খলিফার ৩ জন্ হত্যা, জঙ্গে জমল, জঙ্গে নাহরাওয়ান, জঙ্গে সিফফীন, কারবালা ইত্যাদি ওই প্রথম শতাব্দীতেই হয়েছিল। প্রথম ৩ শতাব্দী-কেন্দ্রিক হাদিসের মর্মার্থ ভিন্ন আঙ্গিকের।

সালাফি শব্দটি ওয়াহহাবি আন্দোলনকে প্রাচীনতার রঙ ও আবহে দেখাতে এবং প্রথম ৩ শতাব্দীর শব্দসম্ভারে ভিন্ন এক বৈধতার আঙ্গিক স্থাপন করতে ব্যবহৃত বলে ধারণা করা হয়।

আবারও সরকার ও পিস-টিভি

মূল কথায় আবার যাই। ধর্মীয় আন্দোলন ও মাযহাবি দৃষ্টিতে সালাফিদের অবস্থান কী -তা এক পাশে রাখা যাক। কিন্তু কোনো মিথ্যা অজুহাতে পিস টিভি বন্ধ করা শুধু অন্যায়ই নয় বরং ধর্মীয় গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে পাক্ষিকতাও দেখা যাবে। সকল পীর-মাযারিদের কার্যক্রম বহাল তবিয়তে রাখা, তাপসীর নামে না হলেও সরকারী খুতবাহ পাঠের আহবান করা, তারপর ইসলামী দলগুলোর উপর কড়া নজরদারী করা –এসব কিন্তু সরকার অপর কোন ধর্মের ব্যাপারে গ্রহণ করার সাহস করবে না যেভাবে আমেরিকা ইসরাইলের ব্যাপারে কথা বলার সাহস পাবে না। আমরা এক বিস্ময়কর সমান্তরাল বাস্তবতা লক্ষ্য করছি।

ভারতে পিস-টিভি বন্ধ হয়েছে, তাই বাংলাদেশেও বন্ধ হতে হবে –এটা কোন ইঙ্গিত বহন করে? ভূমিকায় যে কথাগুলো রেখেছিলাম, সেগুলো এবারে খেয়ালে আনা যেতে পারে।  জাকির সাহেবকে মনিটর করার জন্য ইনু সাহেব ভারত সরকারকে আহবান জানিয়েছেন (নিউজ-আওয়ার ইউথ অর্ণব ঘোঘ ৯/৭/১৬), যদিও ভারতের গোয়েন্দা সন্ত্রাসের সাথে তার কোন সংশ্লিষ্টতা পায় নি বলে জানিয়েছে। এদিকে ঘটনা দাঁড়িয়েছে এই যে কোন ধরণের ন্যায্যতা ছাড়াই তার উপর চলছে হুমকি-ধমকি। ভারতের এক হিন্দুত্ববাদী মহিলা জাকির সাহেবের মস্তকের উপর ৫০ হাজার রুপি পুরষ্কার আরোপ করে দিয়েছে। এটা তো কোন সভ্য সমাজের আচরণ হতে পারে না।

শেষ কথা

পিস টিভিতে সরকার কামড় দিল কেন? হয়তবা নতুন কিছু ধ্যানে এসেছে -তাই। তবে তা নিশ্চয় সন্ত্রাস নয়। বাংলাদেশের মুসলামানগণ প্রধাণত হানাফি মাযহাবের লোক। এই মাযহাবটি সহিষ্ণুতার উপর, অর্থাৎ কোরান-হাদিসের বিমল ব্যাখ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত। এর রূপায়ণ প্রাচীন সভ্যতার দেশ ইরাকেই হয় এবং এর ইমাম আবু হানিফা তার ধর্মীয় ব্যাখ্যা যুক্তির প্রাধান্যতায় প্রতিষ্ঠা করেন, এজন্য, তার বিরোধিরা তাঁর অনুসারীদেরকে ‘আহলুর রায়’ বা (যুক্তি-প্রাধান্যবাদী) বলে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশে কৃত্রিম পদ্ধতিতে ঘটানো সমাজ পরিবর্তনে হানাফি স্কুলের ধারক-বাহক সবাইকে জঙ্গি-সন্ত্রাসী বলে তাদের ইমেজকে টার্নিস করে দিলে যুবসম্প্রদায় সালাফিবাদেই আশ্রয় নিতে যায়। কিন্তু ধর্মীয় দৃষ্টিতে সালাফি ব্যাখ্যার জীবন পদ্ধতি ও হানাফি ব্যাখ্যার জীবন পদ্ধতির মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তা হয়ত কোন কোন কোয়ার্টারে অনুভূত হচ্ছে।  আরবিতে একটি প্রবাদ আছে,  غاب عنا فرحنا، جاءنا أثقل منه অর্থাৎ ‘ও সরে গেল (তাই) আমরা খুশি হলাম, কিন্তু পরে যে এল সে ওর চেয়ে আরো কঠোর’! হানাফিদের ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও সালাফি ব্যাখ্যার প্রেক্ষিতে  সমাজ সংস্কৃতির রূপায়নে যে পার্থক্যসূচিত হবে সেই দৃশ্যটি হয়ত কোন কোন দিগন্তে উদ্ভাসিত হচ্ছে। অন্যদিকে গাজাখোর বাবাদের ধর্মীয় পথ ইতিহাসের মিথ্যা ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রশস্ত করলেও অর্থাৎ সুফিবাদের মাধ্যমেই এদেশে ধর্ম প্রচার ঘটেছে তাই ওটাই খাটি ধর্ম -এই ইতিহাসকে কিন্তু বাবাদের জাহাজে চড়ে স্বর্গযাত্রীরা ব্যতীত কেউ গিলতে পারছে না, কেননা সেই প্রচারকগণ বিদাত প্রচার করতে এদেশে আসেন নি, গাজা সেবনও করেন নি এবং মানুষের ঈমান আমল শুদ্ধ না করেইই তাদেরকে নিজ জাহাজে তোলে স্বর্গের আশ্বাসও দেন নি। এখন সবদিক থেকে ‘তান্ত্রিক-নৈরাজ্যের’ মাধ্যমে উদ্ভাবিত সমাজ পরিবর্তন নানামুখী সমস্যার এড়োপথে (crossroad) এসে দাঁড় হয়েছে। ওরা কৌশল করে, আল্লাহও কৌশল করেন এবং আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলি। এখন ঔপনিবেশ-সদৃশ মায়াময়ী-ছায়াময়ী রূপ ও তৎসংশ্লিষ্টতার লোটেরাশ্রেণী যে দিকেই পা বাড়াচ্ছে সেখানেই তাদের ল্যাঞ্জা প্রমাণ করে দিচ্ছে সেটি কোন প্রাণীর ল্যাঞ্জা।

সালাফিদের উদ্দেশ্যে হয়ত একথা বলা যেতে পারে যে আপনারা পারলে নিজেদের পলিসি পরিবর্তন করুন। ঐক্যের প্রতি নজর রাখুন। সবাই তাদের মাযহাব ত্যাগ করে আপনাদের দলে চলে গেলেই ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে -এই স্বপ্ন ত্যাগ করুন। এটা মিথ্যা স্বপ্ন। এই উম্মাহ ১৪০০ শো বছর ধরে নানান দ্বিমত নিয়েই বেঁচে আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত অনেক দ্বিমত নিরসনের উপায় নেই। তাই পার্থক্যের মধ্যেই ঐক্য খোঁজা যুক্তিসংগত। মানুষ অন্যের সাথে উঠা-বসার মাধ্যমে এবং সুযোগমত সমঝ গ্রহণের ভিত্তিতে নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনে, কোন ফাতোয়াবাজির ভিত্তিতে নয়। মনে রাখতে হবে ধর্মীয় টেক্সট বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যার অবকাশ রেখে যায় -এবং এজন্যই দ্বিমতের উদ্ভব হয়।

মাযহাবগুলো কোরান হাদিসের গভীর ব্যাখ্যায় সুপ্রতিষ্ঠিত –এগুলো অগভীর আক্ষরিক (literal) ব্যাখ্যায় ধ্বংস হয়ে পড়বে না। জাকির নায়েক সাহেবের অডিয়েন্স সালাফি সম্প্রদায় অতিক্রম করলেও তা তার্কিক লড়াই উপভোগের আবহে বিরাজ করছে আর অন্যদিকে মাযহাব বিরোধি জিহাদ তার আপন স্থানেই ঘুরপাক খাচ্ছে। তাছাড়া হানাফি সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি গণতান্ত্রিক (!) দেশে তাদের উপর ধর্মীয় অজ্ঞ-মূর্খতা, বিদাতি, কবর পূজারি ইত্যাদি এলজাম দিয়ে মাযহাবি-জিহাদ খুব একটা ভাল যায় বলে মনে হয় না।

[P.S. এখানে আরেকটি কথা সংযোগ করি। সালাফি সম্প্রদায়ের অনেক আলেম মাযহাবি জিহাদে নেই, অন্তত আমার পরিচিত কয়েকজন রয়েছেন যাদের ক্ষেত্রে আমি এই স্পৃহা লক্ষ্য করি নি। সুতরাং এই প্রবন্ধের কোন কোন বাক্যে সাধারণী রূপ থাকলেও তাতে ব্যতিক্রমের বিষয়টিও খেয়ালে রাখতে হবে।]

1030 জন পড়েছেন

About এম_আহমদ

প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজ বিজ্ঞান), ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের পাঠক। বসবাস: বার্মিংহাম, ইউকে। দেশের বাড়ী: দেউলগ্রাম (উত্তর), বিয়ানী বাজার। Monawwarahmed@aol.com

Comments are closed.