অসদাচরণ হলে ব্যবস্থা নয় কেন?

1823 জন পড়েছেন

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ফিলিপাইনে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ও শ্রীলঙ্কায় দুই কোটি ডলার চুরি করে নিয়ে যাওয়া বিষয়ে যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল ওই কমিটির দাখিল করা প্রতিবেদনে অপরাপর বিষয়ের পাশাপাশি রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি গোপন করার জন্য তৎকালীন গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরদের দায়ী করে তাদের কর্মকাণ্ডকে অসদাচরণ মর্মে উল্লেখ করেছেন।
চুরির ঘটনাটি ঘটার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত গভর্নর ব্যাংকের কর্মসম্পাদনে যতটুকু না সময় দিতেন, তার চেয়ে বেশি সময় দিতেন দেশ ও বিদেশে বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও সভায় যোগদান করে নিজের ভাবমর্যাদা প্রতিষ্ঠায়। এই গভর্নর তার সময়ে দেশের ভেতরে যেসব সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও সভায় যোগদান করেছেন এগুলোর প্রায় শতভাগ আয়োজনে অর্থের যোগানদাতা ছিল বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল। এসব তহবিল থেকে গভর্নরের নির্দেশনায় প্রদত্ত অর্থ যতটুকু না সামাজিক দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার পূরণে অবদান রেখেছে, তার চেয়ে বেশি অবদান রেখেছে গভর্নরকে তার কথিত মতে নির্ভেজাল দেশপ্রেমিক কৃষকের বন্ধু হিসেবে প্রতিষ্ঠায়। এই গভর্নর তার দায়িত্বে থাকা সময়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় সফরে গেলে তাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল, যা যেকোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের জন্য বিদেশের মাটিতে পাওয়া বিরল সম্মান। কিন্তু তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন তৎকালীন সোনালী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের জনৈক প্রভাবশালী সদস্য। ওই সদস্যের উদ্যোগের কারণেই এখানকার কিছু শিল্পোদ্যোক্তা সংবর্ধনা সংশ্লেষে অর্থ ব্যয় করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছিলেন।
চুরির ঘটনার পরবর্তী গভর্নর ও দু’জন ডেপুটি গভর্নরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়। গভর্নর চুক্তির মেয়াদ পর্যন্ত থাকার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেও অর্থমন্ত্রীর অনড় অবস্থানের কারণে তা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার সময় কর্মরত চারজন ডেপুটি গভর্নরের মধ্যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া হিসেবে যিনি সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত ছিলেন, তিনি এখনো পদে বহাল রয়েছেন। এই ডেপুটি গভর্নর কোনো রাখঢাক ছাড়াই দীর্ঘ দিন ধরে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম করে চলেছেন। তার দুর্নীতির বিষয়টি প্রতিকারবিহীনভাবে সর্বমহলে জ্ঞাত।
চুরির ঘটনার পরবর্তী এ ডেপুটি গভর্নরের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি দেশের বহুলপ্রচারিত একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় শীর্ষ সংবাদ হিসেবে স্থান পেয়েছিল। সংবাদটি প্রকাশের পর এ দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ন্যায়পরায়ণ ও নীতিবান মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, এবার হয়তো তার রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি ঘটবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেল তা গুড়েবালি। দুঃখজনক হলেও সত্য সংবাদটি প্রকাশের পর দীর্ঘ দুই মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও ওই ডেপুটি গভর্নর তার বিরুদ্ধে আনীত অনিয়ম ও দুর্নীতি বিষয়ে মুখ খোলেননি। এ দেশের জনমানুষের প্রত্যাশা ছিল ব্যাংকে সদ্য যোগদানকারী গভর্নর অথবা অর্থ মন্ত্রণালয় এর একটা বিহীত করবে। কিন্তু কোথাকার সুতার টানে এরা এই ডেপুটি গভর্নরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনীহ, তা প্রকৃত অর্থেই দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সাথে জড়িত এমন সবার ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগেকার গভর্নরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপরবর্তী সময়ে তিনি তার আগেকার কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছেন। কোনো এক কালের প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষয়িষ্ণু হলেও এখনো এটি দেশসেরা সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। দেশসেরা বিদ্যাপীঠে এ ধরনের বিতর্কিত ব্যক্তির প্রবেশ এক দিকে বিদ্যাপীঠটির ক্ষয়িষ্ণু সুনাম ও ভাবমূর্তিকে আরো ক্ষয়িষ্ণুতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, অপর দিকে শিক্ষার্থীরা এ ধরনের শিক্ষকের কাছ থেকে যা কিছু বাণী শুনবেন, তা চরিত্রের সাংঘর্ষিকতার কারণে অগ্রহণযোগ্যই হবে। সুতরাং দেশের সেরা বিদ্যাপীঠকে যেকোনোভাবেই এ ধরনের বিতর্কিত ব্যক্তির পদচারণা থেকে মুক্ত রাখা কাম্য।
দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এ ক্ষমতাটির কার্যকর প্রয়োগে ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের নিয়মিত রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরীক্ষা পরিদর্শন সম্পাদনের প্রয়োজন রয়েছে। সদ্যবিদায়ী বিতর্কিত গভর্নর ছাড়া অপরাপর গভর্নরের মেয়াদে এ কাজটি সুষ্ঠুভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু সদ্যবিদায়ী বিতর্কিত গভর্নরের প্রশাসনিক দক্ষতা ও নজরদারির অনুপস্থিতিতে তার সময়ে নিরীক্ষা পরিদর্শনের কাজে নিয়োজিতরা নিয়ম-অনিয়মের দিকে ভ্রƒক্ষেপ না করে ভালো প্রতিবেদন দেয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে তাদের অন্যায় আবদার পূরণের সক্ষমতাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এর সুযোগ নিয়ে তাদের সব অনিয়ম ও অন্যায় কর্মকাণ্ডকে জায়েজ করে নিত। এ বিতর্কিত গভর্নরের সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকটির নি¤œ থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রায় সবাই রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক বা একাধিক চাকরি হাসিল করে নিয়েছেন। তাদের পক্ষ থেকে যদিও বলা হতো চাকরিপ্রার্থীরা তাদের পোষ্য বা আত্মীয়, কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে এভাবে চাকরি নেয়া বেশির ভাগই তাদের পোষ্য বা নিকটাত্মীয় নয়, বরং এদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়েই তাদের চাকরি দেয়া হয়েছে।
বিতর্কিত বিদায়ী গভর্নরের সময়কালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকটির উচ্চপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা চিকিৎসার নামে বিদেশে গিয়েছেন। এসব কর্মকর্তা বিদেশে যাওয়া-পূর্ববর্তী বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপকের কাছ থেকে চিকিৎসাব্যয় সহায়তা বাবদ বৈদেশিক মুদ্রায় যে পরিমাণ অর্থ নিয়েছেন, তা তাদের প্রকৃত চিকিৎসাব্যয়ের কয়েক গুণ বেশি। এভাবে দেখা গেছে, উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিদেশে চিকিৎসা সফরটি পারিবারিক আনন্দভ্রমণে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়টি সম্পর্কে ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সবাই অবহিত এবং এভাবে ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা অন্যায় সহায়তা নেয়ায় মধ্য ও নি¤œশ্রেণীর কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করলেও গভর্নরের নির্লিপ্ততা ও উদাসীনতায় বাধাহীনভাবেই এ কাজটি চলেছে। বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে উচ্চপর্যায়ের এসব ব্যাংক কর্মকর্তা বিদেশে চিকিৎসা খরচ বাবদ ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়েছেন।
চুরির ঘটনাটির পর দীর্ঘকাল ব্যাংকটির গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরগণ কেন বিষয়টিকে জনসমক্ষে আসতে দেননি, সেটি এখনো রহস্যাবৃত। এ কথাটি অনেকটা নিশ্চিত, চুরির ঘটনাটি বিদেশী পত্রিকায় প্রকাশিত না হলে এ দেশের মানুষ কখনো হয়তো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানার সুযোগ পেত না। ঘটনাটি সংঘটন-পরবর্তী গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরগণ মামলা দায়ের দূরের কথা, অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনার রহস্য উদঘাটনে কোনো উদ্যোগ নেননি। এভাবে ঘটনাটির বিষয়ে দেশবাসীকে আড়ালে রাখা দুরভিসন্ধিমূলক এবং কেন তারা এমনটি করেছেন, এর উন্মোচন জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান। অর্থমন্ত্রী বরাবর বলে এসেছেন, চুরির বিষয়টি আমাদের দেশীয় গণমাধ্যমে প্রকাশের পরও গভর্নর আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে তাকে কিছুই অবহিত করেননি। অপর দিকে গভর্নরের দাবি, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে অবহিত না করে প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি অবহিত করাও অসদাচরণ। নিজেকে মেধাবী দাবিদার গভর্নর এ বিষয়টি না জানার কথা নয়।
আমাদের সংবিধানের অনন্য বৈশিষ্ট্য আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার। তদন্ত প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত না হলেও এর সভাপতি ও সদস্যদের সাথে সংবাদকর্মীরা কথা বলে প্রতিবেদন বিষয়ে যতটুকু জানতে পেরেছেন তাতে দেখা যায়, সরাসরি সম্পৃক্ত ছয় কর্মকর্তার কার্যকলাপ বিষয়ে গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরগণ ওয়াকিবহাল ছিলেন না, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। তা ছাড়া কাকে বাঁচানোর জন্য তারা ঘটনাটি আড়ালে রেখে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন, সে প্রশ্নটির সুরাহা হওয়া আবশ্যক।
‘অসদাচরণ’ শব্দটি আইন ও নৈতিকতা দিয়ে অনুমোদিত নয়, এমন সব কার্যকলাপকে আকৃষ্ট করে। একজন ভদ্রলোকের পক্ষে অনুচিত যেকোনো কাজই অসদাচরণ। বিতর্কিত গভর্নর এবং তার সময়কালে একজন বিশেষ ক্ষমতাধর ডেপুটি গভর্নরের চুরির ঘটনা আড়াল ছাড়াও উপরোল্লিখিত সব ধরনের অন্যায় কাজে সহায়তাও অসদাচরণের অন্তর্ভুক্ত।
তদন্ত প্রতিবেদনে তথ্য গোপনের বিষয়টিকে অসদাচরণ হিসেবে উল্লেখ করায় প্রকারান্তরে তা অপরাধীদের বিচারিক কার্যক্রম ও শাস্তি থেকে লুকানোর অপকৌশল হিসেবে স্বীকৃত। এ ধরনের অপকৌশল এক দিকে দণ্ডবিধির অধীন অপরাধ, অপর দিকে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ অনুযায়ী ফৌজদারি অসদাচরণ। তদন্ত কমিটি বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সাবেক গভর্নরের নেতৃত্বে কারিগরি ও প্রশাসনিক বিষয়ে অভিজ্ঞ এরূপ কিছু সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সাবেক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরদের কার্যকলাপকে অসদাচরণ হিসেবে উল্লেখ করায় ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির সাথে ব্যাংকসংশ্লিষ্ট যারা জড়িত তারাসহ এদের বিচারের আওতায় আনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরি অভিনব ও ব্যাংক সংশ্লেষে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা। এ চুরি সংঘটনের সাথে যারা সরাসরি সম্পৃক্ত, শুধু তাদেরই বিচারের আওতায় আনলে এ ধরনের চুরি রোধ হবে, এটি নিশ্চিত করে বলা যাবে না। সুতরাং যাদের নজরদারির অভাবে ও অব্যবস্থাপনার কারণে এ চুরি সংঘটিত হতে পেরেছে এবং যারা সর্বোপরি চুরির ঘটনাটি আড়ালে সচেষ্ট ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত কমিটিতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় দেশের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী বিচারিক ব্যবস্থা না নেয়া যথার্থ হবে না। –

1823 জন পড়েছেন

Comments are closed.