সিরিয়ায় আলাওয়িদের ক্ষমতায় উত্তরণ ও কিছু ভাবনা

601 জন পড়েছেন

পাঠকদের মাঝে যারা “প্রথম বিশ্বযুদ্ধের” উপর আমার গত ব্লগ নিবন্ধটি পড়েছেন তাদের নিশ্চয় স্মরণ আছে যে মুসলিম উম্মার ঐক্য পরিত্যাগ করে  আরবদের জাতীয়তাবদী হঠকারী নেশাকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে উসমানী সাম্রাজ্যেকে পরাজিত করে মিত্রশক্তি আরব ভুখন্ডকে তাদের মধ্যে পিঠাভাগ করে নিয়েছিল। সেই ভাগে ১৯১৭ সালে ফ্রান্স পেয়েছিল সিরিয়া ও লেবানন । সিরিয়া ১৯৪৬ ফ্রান্সের অধীনতা থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

জনসংখ্যা

সুন্নি মুসলিম ৭৫%
আলাওয়ই ১১%
দ্রুজিস ১%
ক্রিশ্চিয়ান ৭.৮%
ইহুদী ০১%  (৪৮৬০

সুত্র:

এটা ঐতিহাসিক সত্য যে ১৯২০ সালে ফ্রান্সের সিরিয়া দখলের আগে থেকে বহু শতাব্দী ধরে আলাউয়ি সম্প্রদায় সেদেশে সবচেয়ে অনগ্রসর অশিক্ষিত একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ছিল।

সেন্টার ফর মিডিলইষ্ট স্টাডিজ এর পরিচালক জসুয়া ল্যন্ডিজ (JOSHUA Landis)  সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, “Until the French arrived in Syria in 1920, the Alawites were locked in the coastal mountains of Syria. And the Alawites used to be the lowest of the low. They were the poorest Syrians, uneducated. The Sunnis thought of them as bandits.”
অর্থাৎ “১৯২০ সালে ফ্রান্সের সিরিয়া দখলের আগে থেকে  আলাউয়ি সম্প্রদায় সিরিয়ার উপকূলীয় পর্বতমালা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। তারা অপরাপর সম্প্রদায়ের তুলনায় সার্বিকভাবে অত্যন্ত নিম্ন মাত্রায় ছিল, তারা ছিল  হত দরিদ্র, অশিক্ষিত। সু্ন্নিরা তাদেরকে ডাকাত হিসাবেই চিহ্নিত করত।” (সুত্র)

কিন্তু গত কয়েক দশকের বছরগুলোতে বিশেষ করে ১৯৫৯ সন থেকে তারা নিজেদের অবস্থার উন্নতি করে আজ সিরিয়াতে একটি অভিজাত (elite), বিত্তবান তথা ধনী সম্প্রদায়ে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছে। আলাওয়াইরা বিগত কয়েক দশক থেকে সিরিয়ার শাসন ক্ষমতাও কব্জা করে আছে। ১৯৭০ সালে তারা শক্তভাবে সিরিয়ার শাসন ক্ষমতায় বসতে সক্ষম হয়। রাষ্ট্রের সামরিক, বেসামরিক সকল গুরুত্বপূর্ণ পদ তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং শিক্ষায়, ব্যবসা বাণিজ্যে ও সম্পদ বণ্টনে অনুপাতহীন (disproportionate) ভাগ ভোগ করে চলছে। এক কথায় দেশের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এখন তাদের হাতে।

ইতিহাসবেত্তা ডাবার্গ এক্টন (Dalberg Acton) বলেছিলেন, “power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely” অর্থাৎ ক্ষমতা মানুষকে দূষিত করে ফেলে এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা একেবারে নিরঙ্কুশভাবে দূষিত করে।” আলাউয়িরা সিরিয়ার একছত্র বা নিরঙ্কুশ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় দখল করে সুন্নিদের সামনে সেই উদাহরণ রাখার ফলেই আলাউয়ি সম্প্রদায়ের প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে সিরিয়ার জনগণের বিদ্রোহ চলছে। এ প্রসঙ্গে “সিরিয়ার বিপ্লব বদলে দিতে পারে মুসলিম বিশ্ব” শিরনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম, ইচ্ছা করলে এখানে পড়তে পারেন।”

কীভাবে আলাউয়িগণ একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হয়েও সিরিয়ার প্রায় ৮০% সুন্নি মুসলিমদের দেশে ক্ষমতার মসনদে আরোহন করতে সক্ষম হল তা জানা দরকার বিশেষ করে সিরিয়ার বর্তমান সঙ্কট ও গৃহ যুদ্ধের কারণ বুঝতে। আজকে লিখাটি মূলত সে উদ্দেশ্য লিখা। তাছাড়া সচেতন নাগরিক হিসাবে পৃথিবীর যে কোন দেশের বড় বড় সঙ্কটের  ইতিহাস জানা দরকার বিশেষ করে নিজের দেশে সে ধরণের সঙ্কটের আশংকা দেখা দিতে পারে কিনা সে বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ ও সতর্ক হওয়া, কেননা কৌশলের মাধ্যমে যেকোনো কোন ছোট্ট সম্প্রদায় ক্ষমতা কব্জা করে নিতে পারে।

আলাউয়িদের ধর্ম বিশ্বাস কি?

যদিও বলা হয় আলাউয়িরা শিয়া ইসলাম থেকে উদ্ভূত (offshoot of Shia Islam) কিন্তু তাদেরকে প্রকৃত অর্থে মুসলিম বলা যায় না। কারণ তারা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ পালন করে না এবং তাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ইসলামের মূল ভিত্তির সাথে সাংঘর্ষিক। তারা আলী ইবনে আবুতালেব (রা:) কে আল্লাহর “অবতার” বলে বিশ্বাস করে এবং অনেকটা হিন্দুদের মত মৃত দেহের আত্মার পুনর্জন্ম হয় বলে বিশ্বাস করে।  আলাউয়ি কাল্ট সম্পর্কে মুসলিম স্কলারদের অভিমত শুনতে নিচের ভিডিওটা শুনতে পারে।

 

 

কিভাবে আলাউয়িরা ক্ষমতায় আসল?

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সিরিয়া ফরাসিদের দখলে যাওয়ায় পর সুন্নি মুসলিমরা ফরাসীদেরকে সিরিয়া থেকে বিতাড়িত করতে  ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহ করতে থাকে। সে বিদ্রোহ দম্ন করতে ফরাসিরা তাদের সেনাবাহিনীতে স্থানীয় সংখ্যালঘুদের নিয়োগ করতে শুরু করে। তারা আলাউয়িদেরকে তাদের পেয়ে মূলত তাদেরকেই বিরাট সংখ্যায়  সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করে। এ যেন ঠিক অনেকটা ভারত উপমহাদেশের মুসলিম বাদশাহদেরকে পরাজিত করে ব্রিটিশের ভারত দখলের ইতিহাসের ন্যায়। তখন ব্রিটিশরা যেভাবে হিন্দুদেরকে মিত্র পেয়ে তাদেরকে প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব দিয়েছিল।  একই চাল ফরাসীরা চালিয়েছিল সিরিয়াতে আলাউয়িদেরকে দিয়ে। ফরাসীদের বিদায়ের পর ১৯৫৫ সাল নাগাত  তারা সেনাবাহিনীর ৬০ শতাংশ হয়ে যায় এবং ষাটের দশকে পুরা সামরিক বাহিনী আলাউয়িদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সিরিয়ার ফরাসী ম্যান্ডের সময় আলাউয়িদের ভুমিকা শুরুতে কি ছিল তা জানতে এ  নিবন্ধটি পড়তে পারেন।

 

সুন্নিরা কি করছিল?

ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৩ পর্যন্ত সুন্নিদের হাতে সিরিয়ার শাসন ক্ষমতা ছিল। কিন্তু তখন থেকেই সুন্নিদের আধিপত্য আলাউয়িরা মানতে অস্বীকার করে। তারা একটি আলাদা রাষ্ট্রের দাবী করে এবং  কয়েকবার সশস্ত্র বিদ্রোহও করে। সুলায়মান আল মুর্শিদ ১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়ায় তার মৃত্যুদন্ড হয়। পরে মুর্শিদ পুত্রের নেতৃত্বে ১৯৫২ সালে তৃতীয় বিদ্রোহও ব্যর্থ হয়। তখন থেকেই তারা বৃহত্তর সিরিয়ার মধ্যে থেকেই তাদের অবস্থা সুদৃড় করার পরিকল্পনা শুরু করে। এদিকে সুন্নিরাও নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু করলে তাদের মধ্যেও অনৈক্যের বীজ বাড়তে থাকে।

আরেকটি কারণ হচ্ছে উপনিবেশিক আমলের সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থায় গড়ে উঠা তখনকার সুন্নি ইলিট সমাজের যুবকেরা দেশের সকল সমস্যার সমাধান খুঁজতে ছুটে পড়ে ষাটের দশকের বিশ্বে সেকুল্যারিজম ও সমাজতন্ত্র এবং আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের জোয়ারে। পুঁজিবাদের অবসানে তৃতীয় বিশ্বে তখন চলছে সমাজতন্ত্রের কোরাস! ইসলামী চেতনা বা মুসলিম ঐক্যের কথা চিন্তা করার সময় কারো ছিলনা। একমাত্র পারস্য উপসাগরের পেট্রল সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গুলা ছাড়া সিরিয়া সহ আরবের সর্বত্র সম্ভব হয় বামপন্থী বাথ পার্টি গঠন করা। তাই আলাউয়িরাও যোগ দেয় বাথ পার্টিতে এবং অতি অল্প সময়ে তারা পার্টির গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করতে সক্ষম হয়।আলাউয়িরা তদের স্বার্থের খেয়াল মাথায় থাকলেও সুন্নিদের মাথায় সেটা ছিলনা। বিশেষ করে নিজেদেরকে অসাম্প্রদায়িক প্রমাণ করতে তাদেরকে আরো বেশী উদার হতে হয়েছে।

তার পরের ইতিহাস মাত্র দশ বছরের মাথায় আলাউয়িরা (Alawites) সামরিক বাহিনীতে তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে ফেলে। ১৯৭০ সালে হাফেজ আসাদ সিরিয়ার ক্ষমতা হাতে নিয়ে নিজ পরিবারের কাছে দেশকে জিম্মি করে রাখেন। বিগত ৪৫ বছর পর্যন্ত এ পরিবারের কাছেই সিরিয়ার শাসন ক্ষমতা চলে আসছে।

আজ তারই পুত্র বাশার আল্ আসাদ দেশে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে লাখো লাখো মানুষ হত্যা ও কুটি কুটি মানুষকে উদ্বাস্তু করেছে। এ আগুন কবে নিভবে কেউ বলতে পারে না।

 

উপসংহার:

সিরিয়ার ইতিহাস ও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ লক্ষ্য করে আজ অনেকে বলতে শুরু করছেন যে সিরিয়ার মত বাংলাদেশেও একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে একচেটিয়া তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে গিয়ে যদি এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠরা ক্ষমতার ভারসাম্যতা হারায় তা হলে কি হবে? একটি সুবিধাবাদী ও আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক দলের জন-বিচ্ছিন্নতার কারণে বা তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকতে তারা যা করে যাচ্ছে তা আরো কয়েক বছর চললে এদেশেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দাপটে সংখ্যাঘরিষ্ট মানুষের অধিকার ভুলন্ঠিত হতে বেশী দেরী হবে না। এটা কোনো সাম্প্রদায়িকতার কথা নয় বরং রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতার কথা। যে কোন দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে একছত্র ক্ষমতা চলে গেলে তা কোন দেশের জন্য মঙ্গলকর হয় না। কোনো ঘটনা যে এক্ষুণি পরিলক্ষিত হবে এমন নয় তবে যে আলামত দেখা যাচ্ছে তাতে সেই সম্প্রদায়ের ভয়ে অনেকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখা যায়। কেননা সে সম্প্রদায়ের অনেকেই বিশ্বাস করেন বঙ্গভঙ্গ ভুল ছিল! অধিকন্তু আজকাল অনেকেই মনে করেন যে, যে মাত্রায় ‘অসাম্প্রদায়িকতার’ নামে যে তোড়জোড় চলছে, এরই আড়ালে হয়ত প্রকৃত ‘সাম্প্রদায়িকতা’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা চলছে। অতএব আজ হোক অথবা কাল বাংলাদেশকে আলাদা থাকতে না দেয়ার ষড়যন্ত্র হয়ত ভিতর থেকে চলছে।

তবে এরকম যারা চিন্তা করছেন তাদেরকে সাম্প্রদায়িকতার দুষে দুষিত করার আগে এদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে বাংলাদেশকে যে রাজনৈতিক মেরুকরণ করা হয়েছে তা বন্ধ করা উচিৎ হবে এবং এ জন্য ক্ষমতাসীনদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। আর এদেশের মুসলিম সমাজকেও শুধু বারো মাসে তের পার্বণের পিছনে না রেখে নিজেদের প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষা দিয়ে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।

তাই আবার ঐতিহাসিক ডালবার্গ এক্টনের সেই কথা দিয়ে সারাংশ টানছি:  “power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely” অর্থাৎ ক্ষমতা মানুষকে দূষিত করে ফেলে এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা একেবারে নিরঙ্কুশভাবে দূষিত করে।”

 

 

রেফারেন্স:
JOSHUA LANDIS -In Syria’s Sectarian Battle, Who Are The Alawites?
Daniel Pipes – Middle Eastern Studies

 

601 জন পড়েছেন

Comments are closed.