‘বংশতন্ত্র’ কতটুকু খারাপ কতটা অপরিহার্য?

2673 জন পড়েছেন

আজকের কলামে তিনটি স্পর্শকাতর বিষয় আলোচনার জন্য বেছে নিয়েছি। এই তিনটি বিষয় জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি বলয়ে একধরনের মানসিকবৈকল্য কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অস্বস্তি সৃষ্টি করে রেখেছে, যা প্রকারান্তরে বর্তমান স্বৈরাচারকে দীর্ঘতর করছে। জাতীয় স্বার্থেই এই তিনটি বিষয়ের খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। সেই তিনটি জিজ্ঞাস্য নি¤œরূপ : এক. পরিবারতন্ত্র এ দেশে কি একটি রাজনৈতিক দুষ্টচক্র, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতা? দুই. খালেদার বিএনপি জিয়ার বিএনপি থেকে সরে এসেছেÑ কেন এই প্রচারণা? তিন. বিএনপি জামায়াতের গহ্বরে ঢুকে পড়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া কোন জামায়াতের প্রভাবে সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস সংযোজন করেছিলেন? জিয়াপ্রেমিক এই মুন্সিরা কার শিরনি খাচ্ছেন, তারা কি তা আসলেই জানেন?

এক.
বংশতন্ত্র বা পরিবারতন্ত্র বিশেষ করে বিএনপির পরিবারতন্ত্র নিয়ে অনেকেই তাদের উষ্মা প্রকাশ করেছেন। পরিবারতন্ত্র বা বংশতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই বিদগ্ধজনদের সেই উষ্মা বর্তমান শাসক পরিবারটিকে তেমন করে স্পর্শ করবে না।
বিএনপিকে ঘিরে এই পরিবারটি না থাকলে অনেক আগেই বিএনপির ইতি ঘটার সাথে সাথে এ দেশে গণতন্ত্রের জানাজা পড়তে হতো বলে অনেকেই মনে করছেন। বিএনপিকে যতই দলিত-মথিত চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হোক না কেন এই পরিবারের ছোঁয়া পেয়ে যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো জায়গা থেকেই তা আবার দাঁড়িয়ে পড়তে পারে। কথাটি যতই খারাপ শোনাক না কেন, এটাই বাস্তব সত্য।
গণতন্ত্রের জন্য দরকার দুই বা ততোধিক সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। পরিবারতন্ত্রে যতই খারাপ থাকুক না কেন, একটি রাজনৈতিক দলের জন্য প্রয়োজনীয় আনুগত্য বা শৃঙ্খলা এটি জুগিয়ে এসেছে। অন্যথায় উপমহাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো সকাল-বিকেল অ্যামিবার মতো খণ্ডিত-বিখণ্ডিত হতে থাকে। ভারতে বামপন্থীরা কোনোমতে টিকে থাকলেও বাংলাদেশে তাদের মধ্যে আনুগত্য ও শৃঙ্খলার অবস্থা খুবই নাজুক।
উপমহাদেশে পরিবারতন্ত্রের বাইরে যে আবেগটি রাজনৈতিক দলকে প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলা ও ঐক্য জুগিয়েছে তা হলো ধর্মীয় আবেগ বা ভাবাদর্শ। তা-ও সব দল নয়। ভারতে বিজেপি এবং পাকিস্তান বা বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর েেত্র পারিবারিক উত্তরাধিকার দেখা যায় না। পাকিস্তানে মাওলানা মওদূদীর ছেলে অথবা বাংলাদেশে অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলেদের জামায়াতের নেতৃত্বে দেখা যায়নি। বামধারার কিছু দলেও পারিবারিক উত্তরাধিকার দেখা যায় না।
উপমহাদেশের বাইরে সভ্য বিশ্বও পরিবারতন্ত্রকে পুরোপুরি বাদ দিতে পারেনি। বুশের ছেলের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পটভূমি না থাকলেও পরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। হিলারি কিনটন ‘অবিশ্বস্ত’ স্বামী কিনটনের ছায়া ধরেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। সেখানকার ডেমোক্র্যাটিক ইনস্টিটিউশনগুলো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে বলেই এসব পরিবারতন্ত্র সেখানে কোনো মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে না। কাজেই আমাদের জন্য কোনটা আগে জরুরি? পরিবারতন্ত্রকে খতম করা নাকি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো?
এক-এগারোর সময়ে যারা পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে ‘জেহাদ’ শুরু করেছিলেন, তাদের অনেকে পুরো পরিবার নিয়েই তাতে শামিল হয়েছিলেন। এক-এগারোর তথাকথিত হিরো মইন উদ্দিনের এক ভাইও এগিয়ে যাওয়া শুরু করেছিলেন। কাজেই দুই পরিবার ধ্বংস হলেও নতুন পরিবার যে গজিয়ে উঠত তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আমাদের রাজনৈতিক মানস বা গঠন সত্যিই অদ্ভুত। অন্যকে যদি মনে করি, আমার মতোই রক্ত-মাংসের মানুষ তবে আর আনুগত্য করতে রুচি হয় না। কাজেই পরিবারতন্ত্র আমাদের একধরনের নিয়তি বা রাজনৈতিকভাবে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। পুরো জাতির রাজনৈতিক মানসের পরিবর্তন না হলে দু-একজন চিন্তাবিলাসী দিয়ে পরিবারতন্ত্রের উচ্ছেদ সম্ভব হবে না। কাজেই মূল জায়গায় হাত না দিয়ে এভাবে নিজের অপছন্দের পরিবারকে উৎখাতে মূল্যবান সময় ও শক্তির অপচয় ভিন্ন অন্য কিছু হবে না। ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ও মুক্ত পরিবেশে মানুষের ভেতরে পরিবর্তন হলে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব ধীরে ধীরে এমনিতেই কমে আসবে। শক্তি বা কূটকৌশল প্রয়োগ করে এটা কখনই সম্ভব হবে না।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, শুধু একটি নয়, পরস্পরের মুখোমুখি দু’টি পরিবার থাকায় এই পথেই গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্ভব। গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকলেই এই দু’টি দলের বাইরে অন্য দলের সৃষ্টি হতে পারে। পরিবারতন্ত্রের ধ্বংসের চেয়ে এ মুহূর্তে দরকার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার কার্যকর করা।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো মোটামুটি একটা পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, নির্বাচনব্যবস্থা শতভাগ ত্রুটিমুক্ত না হলেও জনগণের ইচ্ছার মোটামুটি প্রতিফলন ঘটত। এগুলো নিয়ে আমরা যতটুকু এগিয়েছিলাম, তা থেকেও অনেক পেছনে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য যখন একটি শক্তিশালী কমান্ড সেন্টারের অধীনে দুর্বার গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার তখন হঠাৎ বংশতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়াজ চিন্তার বিলাসিতা ছাড়া অন্য কিছু মনে হয় না।
বাকশাল বা একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার পথে বর্তমান প্রোপটে বিএনপি যতটুকু বাধা, তার চেয়ে বড় বাধা হয়ে পড়েছে শহীদ জিয়ার পরিবারটি। ফলে এ মুহূর্তে পরিবারতন্ত্র কিছুটা আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করছে। আমাদের গণতান্ত্রিক বিকাশের একটা পর্যায় পর্যন্ত এই পরিবারতন্ত্রকে সাথে নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। একটি পরিবারের হাত থেকে দেশের গণতন্ত্রকে রা করতে অন্য পরিবারের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে মজার কথা হলো বিএনপির বলয় থেকে পরিবারতন্ত্র বিলুপ্ত করার জন্য যতটুকু প্রচেষ্টা বা উসখুস ল করা গেছে, আওয়ামী লীগ বলয়ের ক্ষেত্রে সেরূপ দেখা যায়নি। ফলে বিএনপির পরিবারতন্ত্রের ধ্বংস কামনা করে আওয়ামী লীগের পরিবারতন্ত্রকে পোক্ত করতে চাইছে কি না সে প্রশ্ন আসছে।

দুই.
মিডিয়ার একটি অংশের বিশেষ উৎসাহ ও সহযোগিতায় কিছু জরিপকারী বের হয়ে পড়েছেন। তারা জিয়ার বিএনপি থেকে খালেদার বিএনপি কতটুকু দূরে সরে গেছে তা মাপা শুরু করেছেন। শরীরে বিএনপির গন্ধ আছে এ ধরনের জরিপকারীর কৌশলগত মূল্য এ ক্ষেত্রে অপরিসীম। আত্মসমালোচনা বা আত্মপর্যালোচনা একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নিঃসন্দেহে উপকারী। কিন্তু এখানেও ‘সব কিছু নিয়তের ওপর নির্ভরশীল’। দলে পদ-পদবি অটুট থাকাবস্থায় এসব জরিপকারীর কেউ সংস্কারের কথা ভাবেন না বা জিয়ার আদর্শের প্রতি এ ধরনের মাত্রাতিরিক্ত আবেগ-ভালোবাসা প্রদর্শন করেন না। পদ-পদবি চলে গেলে কিংবা হাওয়া একটু উল্টো দিকে বহিবা মাত্রই সবাই সংস্কারবাদী হয়ে পড়েন কিংবা অতিমাত্রায় জিয়াপ্রেমিক সেজে যান।
তাদের সাথে নিয়ে এক-এগারোর পর থেকেই বিকল্প বিএনপি দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা ল করা গেছে। সাবেক সিইসি শামসুল হুদা ছিলেন এসবের পালের গোদা। তিনি কার ইশারায় এ কাজে হাত দিয়েছিলেন তা আজ স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। একটি রাজনৈতিক দলকে ভেঙে নিঃশেষ করার নির্লজ্জ প্রচেষ্টা তিনি সরাসরি চালিয়েছিলেন। সেই একই পালের কেউ কেউ এখন সুশীল সেজে জাতিকে ক্রমাগত জ্ঞান দান করে চলেছেন।
বিএনপিকে বিব্রত করতে এক টোকাইকেও ময়দানে নামানো হয়েছে। বিএনপির শিরনি খাওয়া দুই-দুইবারের মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাকে দিয়েও বিকল্প বিএনপি দাঁড় করানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রচেষ্টাই ফলপ্রসূ হয়নি। এমতাবস্থায় সহমর্মী হিসেবে জিয়ার এক অসুস্থ সহোদরকে পেয়ে মনে হলো তারা অমাবস্যার চাঁদ হাতে পেয়ে গেছেন।
এ দেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে জিয়ার এই ছোট ভাই আজীবন দূরে থেকেছেন। রাজনীতির গতিধারা সম্পর্কে তিনি যে খুব একটা ওয়াকিবহাল তা-ও মনে হচ্ছে না। রাজনীতি হলো একটা বহমান নদীর মতো। জ্যামিতির কোণ মেপে এর গতিপথ নির্ধারিত হয় না। রাজনীতির সেই গতিধারাকে খুঁজে বের করার মতো শারীরিক সমতা, মানসিক অবস্থা কিংবা পূর্ব অভিজ্ঞতা কোনোটিই তার নেই। যাদের ওপর ভরসা করে জাতির এবং নিজের জীবনের এই অসময়ে তিনি ভাইয়ের রাজনীতি খুঁজতে চাচ্ছেন তাদের সবাই সেই একই ঘরানার। তাদের একেকজন মতলববাজির এক চরম উদাহরণ সৃষ্টি করে রেখেছেন। তার পাশে যে কয়টি চেহারা দেখা গেছে, তাদের সবার ভূমিকাই প্রশ্নবিদ্ধ। বেগম জিয়া বা তারেক জিয়ার আশপাশে থেকে যারা বিএনপির তি করছে বলে তিনি অভিযোগ তুলেছেন, নিজের আশপাশে তিনি এর চেয়ে উন্নতমানের কাউকে জোগাড় করতে পেরেছেন বলে মনে হয়নি।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার অনন্য গুণের মধ্যে এটাই ছিল যে, মতায় থাকাবস্থায় তার কোনো আত্মীয়স্বজন সম্পর্কে দেশবাসী কিছুই জানতে পারেনি। অথচ তার আগে বা পরের প্রায় সব রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান একধরনের রাজতান্ত্রিক ভাবধারা সৃষ্টি করে গেছেন। জিয়া এখানে সত্যি অনন্য এবং অসাধারণ।
সমসাময়িক অন্যরা যেখানে দুর্ভিরে প্রাক্কালে স্বর্ণের মুকুট পরিয়ে ছেলেদের বিয়ে দিয়েছেন, জিয়া সেখানে নিজের পুরনো শার্ট কেটে ছেলেদের শার্ট বানিয়ে পরিয়েছেন। এই ব্যাপারে তার ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত মোহনীয় ও দৃষ্টিশক্তি প্রখর, জাগ্রত বা সতর্ক ছিল। জিয়ার অনেক বক্তৃতা বা কথার রেকর্ড আছে। কিন্তু কোথাও নিজের সততার কথা, ধার্মিকতার কথা বা নিজের ঢোল নিজে পেটানোর মতো কোনো শব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। শ্রোতাদের তাক লাগানোর কথা কখনই শোনা যায়নি। তার মৃত্যুর পর তার জীবনের এসব ঘটনা জানা গেছে। তখন জাতি সম্যক টের পায় যে, আমরা আসলেই কী হারিয়েছি!
সেই জিয়ার দলকে বর্তমান অবস্থায় দেখে খারাপ লাগারই কথা। আগের এবং বর্তমানকালের মধ্যে তুলনাটিও সঙ্গত কারণেই চলে আসবে। সবাই জিয়ার সততার কথা বলে কিন্তু নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে সেই সততার প্র্যাক্টিস অনেকেই করেন না। সে জন্য কোনো তাগিদও অনুভব করেন না। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদের মূল প্রবক্তা হিসেবে এই দলটি এবং তাদের কর্তাব্যক্তিরা আধিপত্যবাদী শক্তির মূল চুশূল হবেÑ এটাই স্বাভাবিক। নিজেদের স্বার্থেই আধিপত্যবাদী শক্তির দেশীয় দোসররা এই দলের মধ্যে পাওয়া কোনো তিলকে তাল বানিয়ে পরিবেশন করে। কিন্তু সেই তিলটিও যাতে সৃষ্টি হতে না পারে সেই প্রচেষ্টাটি এই দলের মধ্যে কতটুকু সক্রিয় ছিল বা এখনো আছেÑ তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থিত হতেই পারে।

তিন.
বিএনপিতে কাজের লোক কমে গেছে, পরামর্শকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। পরামর্শ ভারাক্রান্ত এমন রাজনৈতিক দল পৃথিবীতে বোধহয় দ্বিতীয়টি নেই। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীকুলও বিএনপিকে অনবরত বুদ্ধি দিচ্ছেন। বিএনপির প্রতি অনবরত বুদ্ধি নিপে করা বুদ্ধিজীবীরা আবার কয়েক কিছিমের রয়েছেন।
প্রথম পর্যায়ে রয়েছেন যারা আওয়ামী লীগের হানিফ এবং হাছান মাহমুদের বুদ্ধিজীবীয় সংস্করণ। তারা বিএনপির অবৈতনিক পরামর্শদাতার মতো। বিএনপি থেকে খালেদা এবং তারেককে মাইনাস করলেই বিএনপি ঠিক হয়ে পড়বে বলে তারা প্রকাশ্যেই বলেন। তারা যখন কথা বলেন তখন গণপ্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে থোরাই কেয়ার করেন। ছন্দ মিলুক আর না মিলুক, যুক্তি মিলুক আর না মিলুক হানিফ আর হাছান মাহমুদরা প্রতিপরে দিকে সর্বদা কথার ফুলঝুরি ছুড়ে দেন। তারা বিএনপির জন্য তেমন কোনো হুমকি নয়। মোটা মাথার বিএনপি নেতা ও সমর্থকও তাদের পরামর্শের মাহাত্ম্য বুঝতে পারে।
পরামর্শদাতাদের দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছেন নিরপে ঘরানার বুদ্ধিজীবীকুল। কৌশলে তারা আওয়ামী লীগেরও সমালোচনা করে। মুক্তিযুদ্ধের ভাবধারা তাদের জন্য একধরনের রাকবজ হিসেবে কাজ করে। যেখানে আওয়ামী লীগকে সরাসরি সমর্থন করা যায় না সেখানে তারা মুক্তিযুদ্ধকে টেনে আনেন। তারা গণতন্ত্র চান তবে শর্ত একটাইÑ মুক্তিযুদ্ধের পরে শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগকেই সর্বদা মতায় থাকতে হবে। তারা যখন বিএনপিপ্রেমিক সেজে পরামর্শ দেয়, তখন বিএনপির অনেক জ্ঞানীগুণীরাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। তাদের কাছে প্রায়ই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে মনের কথা খুলে বলেন, যা তারা নিজেদের কমিটিতে আলোচনা করতে পারেন না।
পরামর্শদাতাদের তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছেন বিএনপির তথাকথিত উদার অংশ। তারা বিএনপির মধ্যে আওয়ামী লীগের ‘মাই ডিয়ার’ অংশ। তাদের ‘উদার’ পদবিটি আওয়ামী লীগেরই দেয়া। বিএনপির কর্মী ও নেতাদের বিভ্রান্ত করতে যে কাজটি উপরিউল্লিখিত দু’টি গ্রুপ দিয়ে করানো সম্ভব হবে নাÑ সেই কাজটিই তাদের দিয়ে করানো হয়।
তাদের একজন ছিলেন দৈনিক দিনকালের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। ইদানীং বিএনপির প্রতি মুহুর্মুহু উপদেশ বর্ষণ করছেন। বিএনপি নিজের পায়ে কুড়াল মারছে এ ধরনের আর্তচিৎকার করে প্রায়ই বিএনপির অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে তুলছেন তিনি। মতায় থাকতে বিএনপির শিরনি এই মুন্সিরাই খেয়েছেন। এখন জিয়ার সহোদরকে তিনিই জিয়ার আসল দল পয়দা করতে সাহায্য করছেন।

এই মুন্সির অন্যতম এজেন্ডা জামায়াতের ‘খপ্পর’ থেকে বিএনপিকে বাঁচানো। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন জামায়াতকে তাদের কৌশলগত মিত্র হিসেবে বেছে নেয়, তখন এ ধরনের কোনো মুন্সি আওয়ামী বলয় থেকে বের হননি। এই মুন্সিরা কার শিরনি খেয়েছেন তা নিজেরাই জানেন না।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াকে তারা কতটুকু জানেন বা কতটুকু চেনেন তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এ দেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেতার পরিবর্তে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের কথা সংযোজন করেছিলেন এই জিয়াই। এখন প্রশ্ন, কোন জামায়াতের খপ্পরে পড়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া এই ভয়ানক কাজটি করেছিলেন?
ধর্মবিশ্বাস ও গণতন্ত্র এ দেশের মানুষের রক্তের সাথে মিশে গেছে। অনেকের রক্তচুকে উপো করেই তিনি এই কাজটি করেছিলেন। পাকিস্তানের ভাবধারা দূর করার নামে যখন এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাস ও ভাবধারা মুছে ফেলার সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু হয়েছিল, তখন এ দেশের মানুষের মন থেকে হীনম্মন্যতা দূর করে প্রয়োজনীয় সাহসটি জুগিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া। এর পরিণাম তিনি জানতেন। জেনেই তিনি তা করেছেন। এ দেশবাসী তার নামের সাথে শহীদ শব্দটি জেনেশুনেই যোগ করেছে।
কবি নজরুল যেমন সাংস্কৃতিক মোড়লদের রক্তচুকে উপো করে জানিয়ে দিয়েছিলেন, বিশ্ব কাব্যলক্ষ্মীর একটা মুসলমানী ঢঙ রয়েছে। তেমনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া রাজনৈতিক মোড়লদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, বিশ্ব রাজনীতির একটা মুসলমানী ঢঙ থাকতে পারে। সেই ঢঙটি তথাকথিত মৌলবাদ বা জঙ্গিবাদ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আজ থেকে ত্রিশ বা পঁয়ত্রিশ বছর আগে জিয়ার সেই আদর্শটি বর্তমান টালমাটাল বিশ্বকে রা করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি একই কথা বলে গেছেন। জিয়া ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার। বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল ডান, বাম কিংবা পেছন দিকের। তিনিই প্রথম দেখিয়েছেন সামনের দিকের রাজনীতি।

minarrashid@yahoo.com

পূর্ব প্রকাশিত নয়া দিগন্ত

2673 জন পড়েছেন

Comments are closed.